কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত

bdnews24

জন্মদিন নিয়ে ভণ্ডামী

খালেদা জিয়ার জন্মদিন নিয়ে বিতর্ক আছে। অথচ মানুষের জন্মদিন হলো একটা গুরুত্বপূর্ণ দিন। এই দিন নিয়ে যারা বিতর্ক সৃষ্টি করে, তাদের রুচিবোধ ও ভদ্রতা নিয়ে অনায়াসে প্রশ্ন তোলা যায়।
নিচের ছবিটা দেখুন, বোঝা যাবে অনেক কিছু।

Permalink

বিএনপি-জামায়াতের ত্রিমুখী আচরণ

হারুন আল রশীদ

নির্বাচনী আইন সংশোধন প্রসঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর অবস্থান তিন ধরনের। আদালতে মামলা দায়েরের সময়ে এক রকম, নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কাছে আরেক রকম এবং প্রকাশ্যে একবারে অন্যরকম। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, জামায়াতের যে ত্রিমূর্তি আচরণ, তার অন্ধ অনুসারী হয়ে পড়েছে বিএনপি।

বিএনপি ও জামায়াত সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনা প্রবাহের মধ্যে সরকার, আদালত ও নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কাছে যেসব দাবি-দাওয়া পেশ করেছে, সেসব দাবির একটির সঙ্গে অন্যটির কোনো মিল নেই। তারা আদালত এবং ইসির কাছে সংশোধিত গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের সুনির্দিষ্ট কিছু বিধান বাতিলের দাবি জানালেও বাইরে সংশোধিত গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের সব বিধান বাতিলের দাবি জানিয়ে যাচ্ছে। ১৮ ডিসেম্বর নির্বাচন করতে আপাতত সংশোধিত আইন বাতিল বা এ আইনে নতুন করে সংশোধনী আনা সম্ভব নয় জানার পরও তারা সরকার ও ইসির সঙ্গে দরকষাকষির চেষ্টা করে যাচ্ছে। একই সঙ্গে তারা বর্তমান সরকারের আইন সংশোধনের এখতিয়ার নিয়েও প্রশু তুলেছে। ইসির মতে, বিএনপি ও জামায়াত আসলে কী চায় তা তাদের কাছে স্পষ্ট নয়। যে কারণে বর্তমানে বিএনপি ও জামায়াতের দাবি-দাওয়া তাদের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে।

জামায়াত ২৮ আগস্ট গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ সংশোধনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট আবেদন দাখিল করে। এতে ২০২০ সালের মধ্যে দলের কেন্দ্রীয় কমিটিসহ সব পর্যায়ের কমিটিতে ৩৩ ভাগ নারীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা (ধারা ৯০-বি/১/বি/২), ছাত্র-শিক্ষক-শ্রমিক সমন্বয়ে অঙ্গ বা সহযোগী সংগঠন না করার বিধান (ধারা ৯০-বি/বি/৩), প্রবাসে দলের শাখা সংগঠন না রাখার বিধান (৯০-সি/ডি) এবং গঠনতন্ত্রে ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, ভাষা ও লিঙ্গ ভেদে কোনো বৈষম্য না রাখার বিধান (৯০-সি (১/বি) বাতিলের দাবি জানায়। একই সঙ্গে তারা সংবিধানের ৫৮-ঘ/১ অনুচ্ছেদের উল্লেখ এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আইন সংশোধনের এখতিয়ার নিয়েও প্রশ্ন তোলে।

এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার মুহাম্মদ ছহুল হোসাইন সমকালকে বলেন, ‘জামায়াত গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ধর্ম, বর্ণ সংক্রান্ত (৯০-সি ১/বি) বিধান বাতিলের যে দাবি জানিয়েছে, তা সংবিধানের সঙ্গে মিল আছে বলেই আমরা গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে অন্তর্ভুক্ত করেছি। একই বিধান সংবিধানের ২৮ অনুচ্ছেদেও রয়েছে।’

ইসির তৃতীয় দফা সংলাপ শুরু হওয়ার পর ৭ সেপ্টেম্বর বিএনপি এবং ৮ সেপ্টেম্বর জামায়াত ও ইসলামী ঐক্যজোট ইসিকে চিঠি দিয়ে জানিয়েছিল, অর্থহীন সংলাপে তারা অংশ নেবে না। খালেদা জিয়ার মুক্তির পর হঠাৎ করেই বিএনপি তাদের মত পাল্টে সংলাপে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। বিএনপির এ সিদ্ধান্তেরর পর জামায়াত এবং ইসলামী ঐক্যজোটেরও সুর পাল্টে যায়। তারাও সংলাপে অংশ নেওয়ার আগ্রহ জানিয়ে ইসিকে চিঠি দেয়।

২০ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত সংলাপে জামায়াত এবং ইসলামী ঐক্যজোট ইসির কাছে লিখিত প্রস্তাব দাখিল করলেও বিএনপির পক্ষ থেকে তা করা হয়নি। ইসির কাছে মৌখিক প্রস্তাব দিয়েছে তারা। তবে তিনটি দলেরই প্রস্তাব ছিল অভিন্ন।

ইসিতে দাখিল করা জামায়াতের লিখিত দাবির সঙ্গে ২৮ আগষ্ট আদালতে দাখিল করা দাবির কিছুটা অমিল রয়েছে। বিএনপি, জামায়াত ও ইসলামী ঐক্যজোট সুস্পষ্টভাবে গণপ্রতনিধিত্ব আদেশের তিনটি বিশেষ ধারাসহ আরো একাধিক ধারা বাতিল অথবা ক্ষেত্রবিশেষ সংশোধনের দাবি জানায়। বিশেষ তিনটি ধারা হলো- ধারা ৯০-বি/১/বি/২, ৯০-সি (১/এ) ও ৯০-সি (১/বি)।

৯০-বি/১/বি/২ ধারা মতে, রাজনৈতিক দলের সব স্তরের কমিটিতে ৩৩ ভাগ নারীর প্রতিনিধিত্ব আগামী ২০২০ সালের মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে।

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ৯০-সি (১/এ) ধারায় রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনের শর্তে বলা হয়েছে, দলীয় গঠনতন্ত্রের উদ্দেশ্যসমূহ সংবিধানের পরিপন্থী হতে পারবে না।

৯০-সি (১/বি) ধারায় বলা হয়েছে, রাজনৈতিক দলের গঠনতন্ত্রে ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, ভাষা ও লিঙ্গভেদে কোনো বৈষম্য থাকতে পারবে না।

কিন্তু ওইদিন সংলাপ শেষে তিনটি দলই বাইরে অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের জানায়, তারা সংশোধিত গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ পুরোটাই বাতিলের দাবি জানিয়েছে। যার পরিপ্রেক্ষিতে একজন নির্বাচন কমিশনার ক্ষোভের সঙ্গে বলেছিলেন, ‘সবই যদি বাতিল করতে হয়, তাহলে সংলাপে বসে অহেতুক আমাদের সময় নষ্ট করা হলো কেন?’

একই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ড. এটিএম শামসুল হুদা ২২ সেপ্টেম্বর দুঃখ ও বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছিলেন, ‘হায় আল্লাহ... ইয়া রাহমানুর রাহিম, পবিত্র মাহে রমজানে জামায়াত ও ইসলামী ঐক্যজোটের হুজুরদের মুখে এ আমি কী শুনিতে পাইলাম!’ বিস্ময়ের কারণ, আগের দুটি সংলাপে জামায়াত ও ইসলামী ঐক্যজোট আমাদের সিংহভাগ সংস্কার প্রস্তাবের সঙ্গে একমত পোষণ করলেও তৃতীয় দফা সংলাপে তারা সব ধরনের সংস্কারই নাকচ করে দিয়েছে।

ইসির মতে সংবিধানের ৯৩/১ অনুচ্ছেদ অনুসারে বর্তমান সরকারের আইন প্রণয়ন এবং সংশোধন করার এখতিয়ার রয়েছে। সংবিধানের ৯৩/১ অনুচ্ছেদে বলা আছে- ‘সংসদ ভাঙ্গিয়া যাওয়া অবস্থায় অথবা উহার অধিবেশন ব্যতীত কোন সময়ে রাষ্ট্রপতির নিকট আশু ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় পরিস্টি’তি বিদ্যমান রহিয়াছে বলিয়া সন্তোষজনকভাবে প্রতীয়মান হইলে, তিনি উক্ত পরিস্থিতিতে যেরূপ প্রয়োজনীয় বলিয়া মনে করিবেন, সেইরূপ অধ্যাদেশ প্রণয়ন ও জারি করিতে পারিবেন এবং জারি হইবার সময় হইতে অনুরূপভাবে প্রণীত অধ্যাদেশ সংসদ আইনের ন্যায় ক্ষমতাসম্পন্ন হইবে।’

ইসি ২০০১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার কর্তৃক গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে সংশোধনের বিষয়টিকেও নজির হিসেবে দেখছে। ২০০১ সালের ৮ আগস্ট গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২ সংশোধন করে গেজেট জারি করা হয়। তখন বিএনপি ও জামায়াত ওই সংশোধনীকে সাধুবাদ জানিয়েছিল। অপরদিকে আপত্তি জানিয়েছিল আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগ ১২ আগস্ট তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা লতিফুর রহমান, ১৩ আগস্ট সিইসি এম সাঈদ এবং ১৪ আগস্ট রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দীন আহমেদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ সংশোধন সংক্রান্ত গেজেট বাতিলের দাবি জানায়। কিন্তু রাষ্ট্রপক্ষ তা আমলে নেয়নি।

নির্বাচন কমিশনারদের মতে, ২০০১ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকার আইন সংশোধন করতে পারলে বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকার পারবে না কেন? যে কারণে বিএনপি-জামায়াতের দাবিকে তারা পুরোপুরি অযৌক্তিক বলে মনে করছেন।

আদালত এবং ইসির বাইরে বিএনপি ও জামায়াত সরকারের সঙ্গে যে ধরনের দরকষাকষি করে যাচ্ছে তাকেও অযৌক্তিক বলে মনে করছে ইসি। সরকারের কাছে তারা যেসব দাবি-দাওয়া রেখে যাচ্ছে, তার সঙ্গে আদালত ও ইসির কাছে রাখা দাবির যথেষ্ট অমিল রয়েছে। যে কারণে ইসি মনে করে বিএনপি ও জামায়াতের দাবি সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট নয়।

এ অবস্থায় ইসি আপাতত বিএনপি ও জামায়াতের দাবি আমলে না নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। সূত্র জানিয়েছে, এ বিষয়ে ইসি থেকে সরকার পক্ষকে সুস্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, ১৮ ডিসেম্বর নির্বাচন এবং ১ অথবা ২ নভেম্বর নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করতে হলে নির্বাচনী আইনে আর কোনো ধরনের সংশোধনী আনা সম্ভব নয়। একই সঙ্গে নির্বাচনে অংশ নিতে হলে বিএনপি-জামায়াতসহ তাদের অন্য দুই শরিক দলকে আগামীকালের মধ্যেই দলের নাম নিবন্ধনের জন্য আবেদন করতে হবে।

Permalink

সব ভাস্কর্য ভেঙে ফেলার হুমকি দিলেন আমিনী

সব ভাস্কর্য ভেঙে ফেলার হুমকি দিলেন আমিনী
হজ মিনারের দাবিতে মিছিল
নিজস্ব প্রতিবেদক
ক্ষমতায় গেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরসহ সারা দেশে শেখ হাসিনার সরকারের আমলে নির্মিত সব মূর্তি (ভাস্কর্য) ভেঙে ফেলার ঘোষণা দিয়েছেন ইসলামী আইন বাস্তবায়ন কমিটির আমির ও ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান মুফতি ফজলুল হক আমিনী।

গতকাল শুক্রবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ ঘোষণা দেন। তিনি ‘শিখা চিরন্তন’ ও ঢাকা সেনানিবাসে অবস্স্থিত ‘শিখা অনির্বাণ’ নিভিয়ে দেওয়ারও হুমকি দেন।
এক প্রশ্নের জবাবে মুফতি আমিনী বলেন, ‘যেগুলো স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ইয়ে হিসেবে বানানো হইছে, সেগুলোর ব্যাপারে আমাদের আপত্তি নাই।’

তাহলে শিখা অনির্বাণের ব্যাপারে আপত্তি কেন? জবাবে তিনি বলেন, ‘শিখা অনির্বাণ স্বাধীনতার কিছু হইতে পারে না। স্বাধীনতার সময় কি আগুন জ্বালানো হইছিল?’

চারদলীয় জোটের শরিক একটি দলের শীর্ষ নেতা মুফতি আমিনী আরও বলেন, দেশ ও জাতির কঠিন দুঃসময়ে বর্তমান সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর দুর্নীতি দমনসহ প্রাথমিক বেশ কিছু পদক্ষেপে দেশবাসীর অকুন্ঠ সমর্থন লাভ করেছিল। কিন্তু ২১ মাসের জরুরি অবস্থার মধ্যে এই সরকারের দেশ ও ইসলামবিরোধী কিছু পদক্ষেপ মারাত্মক উৎকন্ঠার সৃষ্টি করেছে। তিনি উদাহরণ হিসেবে নারী উন্নয়ন নীতিমালা, ব্র্যাকের হাতে দেশের প্রাথমিক শিক্ষা তুলে দেওয়া এবং বিভিন্ন স্থানে ভাস্কর্য নির্মাণের কথা উল্লেখ করেন। তিনি প্রথম আলো ও সাপ্তাহিক ২০০০-কে ইসলামবিরোধী পত্রিকা হিসেবে আখ্যায়িত করেন এবং সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরীর সমালোচনা করেন।

মুফতি আমিনী বলেন, ‘আমাদের রাজনীতির থিউরি হচ্ছে, আমরা সব ক্ষমতার মালিক আল্লাহ্কে মনে করি। কাজেই এই দেশের ভবিষ্যৎ খুব অন্ধকার। একদিকে দেশ বিক্রি হয়ে যাচ্ছে, আরেক দিকে ইসলামের বিরুদ্ধে কাজ হইতাছে।’

এক প্রশ্নের জবাবে আমিনী বলেন, ‘আমরা ক্ষমতায় এলে হাসিনা যেসব মূর্তি বানাইছে ইউনিভার্সিটিতে, এইগুলো ভাইঙ্গা চুরমার কইরা দিব। হাসিনা এই দেশটাকে মূর্তির দেশ বানাইতেছে। ইউনিভার্সিটি চত্বরে যে মূর্তিগুলো বানানো হইছে, এটা মারাত্মক ইসলামবিরোধী এবং ইসলামি শক্তি ক্ষমতায় এলে এ সমস্ত মূর্তি রাখতে পারে না।’

খালেদা জিয়ার আমলেও তো কিছু বানানো হয়েছে, সেগুলো কী করবেন−এ প্রশ্নের জবাবে আমিনী পাল্টা প্রশ্ন করেন, ‘কোথায় বানাইছে?’

একজন সাংবাদিক বলেন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৯২ সালে বানানো হয়েছে। আমিনীর জবাব, ‘ওইডা আমরা দেখি নাই। তার পরে আরেকটা জিনিস; আগুন পূজা হইতাছে, এইডারও আমরা বিরোধী। এই যে আগুন পূজা করে সেনাবাহিনীর দ্বারা, এইডারও আমরা বিরোধী। আমরা অনুরোধ করছি, আগুন পূজা আপনারা বন্ধ করুন। আগুনকে শ্রদ্ধা করা আর আগুন পূজা করা একই কথা।’ জোট সরকারের পাঁচ বছর এসব বলেননি কেন? জবাবে তিনি বলেন, ‘তখন তো বলেছি, খালেদা জিয়াকে বলেছি তো ব্যক্তিগতভাবে। কিন্তু আমাদের কথায় কি কান দিছে? আমাদের তো ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি বানানো হইছে। আমাদের কোনো কথায় কান দেওয়া হই নাই।’

বিমানবন্দর চত্বর থেকে লালন শাহের ভাস্কর্য সরানোর দাবিতে মুফতি নুর হোসাইন নুরানীর নেতৃত্বে আন্দোলন সমর্থন করেন কি না−জানতে চাওয়া হলে মুফতি আমিনী বলেন, ‘নুরানী কে, আমরা ওনারে চিনি না।’
সংবাদ সম্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ইসলামী ঐক্যজোটের মহাসচিব আবদুল লতিফ নেজামী, মাওলানা শফিউদ্দিন, মাওলানা আবুল কাশেম, আহরুল্লাহ ওয়াছেল প্রমুখ।

হজ মিনারের দাবিতে মিছিল: বিমানবন্দর গোলচত্বরে একটি ‘হজ মিনার’ নির্মাণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন খতমে নবুওয়ত আন্দোলন বাংলাদেশের আমির মুফতি নুর হোসাইন নুরানী। গতকাল উত্তরার ফায়দাবাদ কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের সামনে মিছিল-পূর্ব সমাবেশে তিনি বলেন, ‘আশা করি সরকার অচিরেই মসজিদের নগর ঢাকার মর্যাদা ও সৌন্দর্য বর্ধনে জিয়া বিমানবন্দর গোলচত্বরে একটি আধুনিক হজ মিনার নির্মাণ করবে। অন্যথায় যেকোনো ত্যাগ-তিতিক্ষার বিনিময়ে আমরা হজ মিনার নির্মাণে সরকারকে বাধ্য করেই ঘরে ফিরব।’

‘বিমানবন্দর গোলচত্বর মূর্তি প্রতিরোধ কমিটি’র ব্যানারে এ কর্মসুচি পালিত হয়। এতে বক্তব্যকালে মুফতি নুরানী বলেন, ‘আমাদের বিরুদ্ধে কুৎসা রটনা ও অপপ্রচার করে কোনো লাভ নেই। কারণ, আমরা বাঘের গর্জন শুনে অভ্যস্ত, বানরের ভেংচিতে ভয় পাই না।’

মিছিলে উপস্থিত ছিলেন কমিটির সদস্য সচিব ও জামেয়া বাবুস সালাম মাদ্রাসার অধ্যক্ষ আনিছুর রহমান এবং খতমে নবুওয়ত আন্দোলনের মহাসচিব আবদুল আলীম নিজামী। সমাবেশের পর একটি মিছিল এলাকা প্রদক্ষিণ করে। এ সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় মিছিলের সামনে পুলিশের একটি দলও ছিল।

প্রথম আলো, ১৮ অক্টোবর, ২০০৮

Permalink

ক্ষমতায় গেলে সব ‘মূর্তি’ ভেঙে ফেলার ঘোষণা আমিনীর

সমকাল প্রতিবেদক

‘২১ মাসের জরুরি অবস্থার মধ্যে সরকারের দেশ ও ইসলামবিরোধী কিছু পদক্ষেপে মারাত্মক উৎকণ্ঠা সৃষ্টি করেছে’ বলে অভিযোগ করেছেন ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান মুফতি ফজলুল হক আমিনী। তিনি বলেন, ‘আমরা ক্ষমতায় আসলে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরসহ শেখ হাসিনার সময়কার যত মূর্তি আছে সব ভেঙে ফেলা হবে।’ এক প্রশ্নের জবাবে আমিনী বলেন, ‘আমরা শিখা অনির্বাণসহ সেনাবাহিনীর আগুন পূজারও বিরোধী।’
জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সামনে গোলচত্বরে লালন ভাস্কর্য ভাংচুরের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে মুফতি আমিনী এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, জরুরি অবস্থায় রাজনৈতিক দলের মুখ বন্ধ করা যায়, ইসলামের মুখ বন্ধ করা যায় না।
সেনাশাসকরা যদি মনে করেন তারা চিরদিন ক্ষমতায় থাকবেন- তা অসম্ভব। অতীতে আওয়ামী লীগ-বিএনপিও তাই মনে করেছিল। তিনি সরকারের উদ্দেশে বলেন, সময় থাকতে সতর্ক না হলে আফসোস করতে হবে।
আমিনী বলেন, বর্তমান সরকার আবার মুসলমানদের মাতৃভূমিকে ‘পৌত্তলিক দেশ’ বানানোর কাজে হাত দিয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে আমিনী বলেন, খালেদা জিয়ার সময়ে তৈরি মূর্তিও ভাঙতে হবে। ওই সময় কেন শিখা অনির্বাণের বিরোধিতা করেননি জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের কথা তারা শোনেনি।
চারদলীয় ঐক্যজোটের এই শীর্ষ নেতা সাংবাদিকদের বলেন, লুকোচুরির কিছু নেই, সরকার ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ড অবিলম্বে বন্ধ না করলে প্রয়োজনে হরতাল করব, রক্ত দেব, জরুরি অবস্থায় মার্শাল ল’ ভঙ্গ করব। এর আগে লিখিত বক্তব্যে তিনি অঙ্গীকার করেও নারী উন্নয়ন নীতিমালা বাতিল না করা, দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায় হজরত মুহাম্মদের (সাঃ) ব্যঙ্গচিত্র প্রকাশ ও সাপ্তাহিক ২০০০-এ কাবা শরিফ অবমাননার দায়ে মালিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া, ব্র্যাকের হাতে প্রাথমিক শিক্ষা তুলে দেওয়া, সারাদেশে মূর্তি স্থাপন, যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তাবিষয়ক কলেজের শিক্ষক ড. তাজ হাশমীকে দিয়ে ইসলামবিরোধী বক্তব্য প্রদানের সমালোচনা করেন।

ড. হাশমী সম্প্রতি সেনাবাহিনীর স্টাফ কলেজে ক্লাস নিতে আমন্ত্রিত হয়ে ঢাকায় আসেন। মুফতি আমিনী বলেন, ১৩ অক্টোবর প্রথম আলোতে ড. হাশমী বাংলাদেশে ইসলামী রাজনীতিকে বেআইনি ঘোষণার সুপারিশ, মাদ্রাসা শিক্ষার বিলুপ্তি, ধর্মাশ্রিত রাজনীতি উন্নতির অন্তরায় ইত্যাদি বক্তব্য দিয়েছেন। এ অবস্থায় কোনো মুসলমানের চুপ করে বসে থাকার সুযোগ নেই। তিনি অবিলম্বে ‘মুরতাদ’কে দেশ থেকে বহিষ্কারের দাবি জানান। এক প্রশ্নের জবাবে আমিনী বলেন, আর্মি স্টাফ কলেজের উচিত ড. হাশমীর ক্লাস না নেওয়া।

ইসলামী আইন বাস্তবায়ন কমিটির ব্যানারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে মাওলানা আবদুল লতিফ নেজামী, মাওলানা শফিক উদ্দিন, মুফতি মোহাম্মদ তৈয়্যব, মাওলানা আবুল কাশেম, মাওলানা আহলুল্লাহ ওয়াছেল প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

প্রতিরোধ কমিটির ঘোষণা

এদিকে অপসারিত ভাস্কর্যের জায়গায় হজ মিনার নির্মাণ কাজ শুরু না করা পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাবে ‘বিমানবন্দর গোলচত্বর মূর্তি প্রতিরোধ কমিটি’। গতকাল জুমার নামাজ শেষে বিক্ষোভ মিছিল-পূর্ব সমাবেশে এই ঘোষণা দেন মূর্তি প্রতিরোধ কমিটির প্রধান মুফতি নূর হোসাইন নূরানী।

উত্তরা ফায়দাবাদ জামে মসজিদ থেকে মিছিলটি বের হয়ে চুয়ারিরটেক, কোটবাড়ী হয়ে আবদুল্লাহপুরে এসে শেষ হয়। নূরানী কোনো অপপ্রচারে বিভ্রান্ত না হয়ে আগামী ২৪ অক্টোবর বাদ জুমা হজ ক্যাম্পের উত্তর গেটে অনুষ্ঠেয় সমাবেশ সফল করার আহ্বান জানান।
সমকাল, ১৮ অক্টোবর, ২০০৮

Permalink

উগ্রবাদীদের প্রতিবাদে অপসারিত হলো লালনের ভাস্কর্য

সমকাল প্রতিবেদক

উগ্র ধর্মীয় গোষ্ঠীর প্রতিবাদের মুখে অবশেষে অপসারণ করা হলো জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সামনের গোল চত্বরে নির্মাণাধীন ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি’ শীর্ষক লালন শাহর ভাস্কর্যটি। মূলত বাঙালির লোকসংস্কৃতিকে তুলে ধরা হয়েছিল এ স্থাপত্যটিতে। কয়েকদিন ধরে তারা ভাস্কর্যটিকে অপসারণের জন্য আন্দোলন করে আসছিল। আন্দোলন চলছিল খতমে নবুওয়াত আন্দোলনের নেতৃত্বে।

বিমানবন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা খান মোঃ সিরাজুল ইসলাম সমকালকে জানান, ভাস্কর্যটি অপসারণ করা হচ্ছে। বুধবার দুপুর থেকে অপসারণের কাজ শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে ভাস্কর্য নির্মাণের কাজ প্রায় ৭০ ভাগ সম্পন্ন হয়েছিল।

তবে মৌলবাদীদের দাবির মুখেই তা অপসারণ করা হচ্ছে- এ রকমটি স্বীকার করেননি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড প্ল্যান) গ্রুপ ক্যাপ্টেন নাইম হাসান। তিনি বলেন, মূলত নকশা পছন্দ না হওয়ায় তা অপসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আরো নকশা পছন্দ করা আছে, প্রয়োজনে সেগুলো ব্যবহার করা হতে পারে।

পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, কয়েকদিন ধরে মৌলবাদীরা নির্মাণাধীন ভাস্কর্যটির পেছনে লাগে। আন্দোলনকারী মৌলবাদীরা দলবেঁধে সেখানে হাজির হয়ে শ্রমিকদের কাজও বন্ধ করতে বলে। গতকালও কয়েকজন সেখানে গিয়ে ভাস্কর্যটি টেনে উপড়ে ফেলার চেষ্টা করে। এছাড়া তারা নুর হোসেন নুরানীর নেতৃত্বে মূর্তি প্রতিরোধ নামে একটি কমিটিও গঠন করে। কয়েকদিন আগে ইসলামী ঐক্যজোটসহ বেশ কয়েকটি মৌলবাদী রাজনৈতিক দল এ ব্যাপারে একটি বিবৃতি দেয়।

বিমানবন্দর সড়ক থেকে জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রবেশের মুখে গোল চত্বরে ৪৫ ফুট উঁচু নির্মাণাধীন ভাস্কর্যটির শিল্পী মৃণাল হক। ৩ মাস আগে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের অনুমোদন পাওয়ার পর শিল্পী বাড়িতে বসে কাঠামো তৈরির কাজ শেষ করেন। ঈদের ৪ দিন আগে তা গোল চত্বরে বসানো হয়। এখন এতে ঘষামাজার কাজ চলছিল। লালন ছাড়াও সেখানে একতারা এবং আরো ৪ বাউলশিল্পীর মুখায়ব স্থাপন করা হয়েছিল। ভাস্কর্যটিতে শিল্পী লালন শাহের প্রতিকৃতি ও একতারা ছাড়া লোক সংস্কৃতির বিভিন্ন চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়। কিন্তু মৌলবাদীরা ভাস্কর্যটিকে মূর্তি আখ্যা দিয়ে তা অপসারণের দাবি তোলে। তাদের যুক্তি, হজক্যাম্পের পাশে ওই ধরনের মুখায়বসম্পন্ন ভাস্কর্যের কারণে সেখানে আসা হাজিদের সমস্যায় পড়তে হবে। এখানে মিনার স্থাপন করতে হবে।

সমকাল, ১৬ অক্টোবর, ২০০৮

Permalink

মাদ্রাসাছাত্রদের হুমকির মুখে বিমানবন্দরের সামনে নির্মাণাধীন ভাস্কর্য সরিয়ে ফেলা হচ্ছে

ছবি: প্রথম আলো
ছবি: বাংলার চোখ
কওমি মাদ্রাসার কয়েক শ ছাত্রের হুমকির মুখে নির্মাণাধীন ভাস্কর্য সরিয়ে নিচ্ছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ। বিমানবন্দরের সামনে ভাস্কর্য নির্মাণের বিরোধিতা করতে "বিমানবন্দর গোলচত্বর মূর্তি প্রতিরোধ কমিটি"র ব্যানারে মাদ্রাসার ছাত্রদের সংগঠিত করেন খতমে নবুওয়ত আন্দোলনের আমির মুফতি নুর হোসাইন নুরানী।
ভাস্কর মৃণাল হক জানান, স্থানীয় বাবুস সালাম মসজিদ ও মাদ্রাসার আপত্তির মুখে কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তে গতকাল বুধবার দুপুর থেকে তাঁর নির্মিত ভাস্কর্য পাঁচটি কেটে সরিয়ে নেওয়ার কাজ শুরু হয়। দেশীয় বাদ্যযন্ত্র হাতে পাঁচ বাউল এই ভাস্কর্যের মূল চরিত্র।
বিমানবন্দর থানার পুলিশ সুত্র জানায়, ভাস্কর্য সরিয়ে নেওয়ার পরও মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকেরা আগামী ২২ অক্টোবরের সমাবেশের কর্মসুচি প্রত্যাহার করেনি। তারা এখন নতুন দাবি তুলেছে, এখানে হজ মিনার করতে হবে।
মাদ্রাসার কিছু ছাত্র-শিক্ষকের হুমকির মুখে নতি স্বীকার করে ভাস্কর্য সরিয়ে নেওয়ার কথা স্বীকার করতে রাজি নয় বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (সিভিল এভিয়েশন)। সিভিল এভিয়েশনের চেয়ারম্যান এয়ার কমোডর শাকিব ইকবাল খান মজলিস গতকাল দুপুরে প্রথম আলোকে বলেন, "আমরা চেয়েছিলাম বিমূর্ত টাইপের ভাস্কর্য করতে। কিন্তু যেভাবে চেয়েছিলাম, সেভাবে হচ্ছিল না। তাই এটা আজকের মধ্যেই সরিয়ে ফেলছি। কাল-পরশুর মধ্যে এখানে ফোয়ারা বা উঁচু স্তম্ভ (টাওয়ার) ধরনের কিছু একটা বসানোর সিদ্ধান্ত নেব।"
মাদ্রাসার কিছু ছাত্র-শিক্ষকের আন্দোলনের মুখে ভাস্কর্য সরানো হচ্ছে কি না−এই প্রশ্নের জবাবে সিভিল এভিয়েশনের চেয়ারম্যান বলেন, কারও আন্দোলনের মুখে এটা সরানো হচ্ছে না। তিনি বলেন, "কেবল তারাই তো মুসলমান নয়, আমরাও মুসলমান। আমরা নিশ্চয়ই চাইব না, হাজিরা মূর্তি দেখে হজে রওনা হোন।"
সংশ্লিষ্ট সুত্রে জানা যায়, জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রবেশমুখে গোলচত্বরে এর আগে একটি বড় ফোয়ারা ছিল। বিমান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মাহবুব জামিলের উদ্যোগে সৌন্দর্য বর্ধনের অংশ হিসেবে ফোয়ারা ভেঙে সেখানে দেশীয় সংস্কৃতির নিদর্শন হিসেবে বাউলের ভাস্কর্য বসানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেটা তৈরির জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয় ভাস্কর মৃণাল হককে। আগামী ২০ অক্টোবর উদ্বোধন করার কথা ছিল।
মৃণাল হক প্রথম আলোকে বলেন, সিভিল এভিয়েশন ও সড়ক বিভাগের সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি সাড়ে তিন মাস ধরে লালন শাহকে স্নরণে রেখে ভাস্কর্য তৈরির কাজ করেন। এরপর সেগুলোর কাঠামো ১৫ দিন আগে বিমানবন্দর গোলচত্বরে স্থাপন করে বাকি কাজ করা হচ্ছিল। তিনি বলেন, "এর জন্য সিভিল এভিয়েশন বা সড়ক বিভাগকে কোনো অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছিল না। অর্থায়নের জন্য তারা আমাকে বলেছে স্পন্সর জোগাড় করতে। আমি স্পন্সর জোগাড়ও করেছিলাম।"
মৃণাল হক বলেন, স্থানীয় মসজিদ-মাদ্রাসার লোকদের আপত্তির মুখে বিমানবন্দর থানার পুলিশ ও সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ কয়েক দিন ধরে তাঁকে বলে আসছিল, হুবহু লালনের প্রতিকৃতি না করে যেন বিমূর্ত ধরনের কিছু করা হয়। তারপর সেটাও করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু মাদ্রাসা সংশ্লিষ্টদের এক কথা, মানুষ আকৃতির কিছু থাকতে পারবে না। এরপর গতকাল তারা এসে হুমকি দেয় যে সরকার না সরালে তারা নিজেরাই ভাস্কর্য উপড়ে ফেলবে। তাই সরকার এখন এটা সরিয়ে নিচ্ছে।"
স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, খতমে নবুওয়ত আন্দোলন বাংলাদেশের আমির ও ফায়দাবাদ মসজিদের ইমাম মুফতি নুর হোসাইন নুরানীর উদ্যোগে কিছুদিন ধরে আশকোনা, দক্ষিণ খান, গাওয়াইর ও ফায়দাবাদ এলাকার বিভিন্ন মসজিদ ও ছোট ছোট মাদ্রাসায় সভা করে ছাত্র-শিক্ষক ও মুসল্লিদের উত্তেজিত ও সংগঠিত করার চেষ্টা করে। মুফতি নুরানীকে চেয়ারম্যান করে "বিমানবন্দর চত্বর মূর্তি প্রতিরোধ কমিটি" গঠন করা হয়। বিমানবন্দরের সামনের জমেয়া বাবুস সালাম মসজিদ ও মাদ্রাসা কমিটির সভাপতি মুশতাক হোসেন রতন ও অধ্যক্ষ মাওলানা আনিসুর রহমানকে যথাক্রমে প্রতিরোধ কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান ও সদস্য সচিব করা হয়। "ভাস্কর্যবিরোধী আন্দোলনের" কেন্দ্রবিন্দু করা হয় জামেয়া বাবুস সালাম মসজিদ ও মাদ্রাসাকে।
এর আগে আহমদিয়া বিরোধী উগ্র কর্মসুচির মূল কেন্দ্র হিসেবে এই মাদ্রাসাকে ব্যবহার করা হয়েছিল। বর্তমানে এই মাদ্রাসা ও সংলগ্ন মসজিদের সভাপতি মুশতাক হোসেন রতন সিভিল এভিয়েশনের সাবেক গাড়ি চালক। চাকরিচ্যুত হওয়ার পর তাঁর উদ্যোগে সিভিল এভিয়েশনের জমিতে এই মসজিদ ও মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। একই কমপ্লেক্সে তারা মার্কেট করে বেশ কিছু দোকানও ভাড়া দেয়।
স্থানীয় দোকানদাররা জানায়, গত সোমবার কয়েক শ মাদ্রাসাছাত্র গোলচত্বরে এসে হুমকি দিয়ে যায় ভাস্কর্য সরিয়ে নিতে। গতকাল বেলা সাড়ে ১১টার দিকে শখানেক মাদ্রাসাছাত্র এসে আবারও একই হুমকি দেয়। বেলা সাড়ে তিনটার দিকে তারা আবার এসে ভাস্কার্য সরানোর জন্য বাঁধা রশি ধরে টানাটানি করে। তারা সেখানে "বিমানবন্দর গোলচত্বর মূর্তি প্রতিরোধ কমিটি" নামে ব্যানার ঝোলানোর চেষ্টা করে। পুলিশ তা করতে না দিলে পাশের বাবুস সালাম মসজিদের দেয়ালে ব্যানারটি ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। ওই ব্যানারে লেখা আছে−২১ অক্টোবরের মধ্যে ভাস্কর্য সরিয়ে না দিলে মুফতি নুর হোসাইন নুরানীর নেতৃত্বে আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।
বিমানবন্দর থানার পুলিশও দিনভর সেখানে নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিল। সন্ধ্যায় বিমানবন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা খান সিরাজুল ইসলাম বলেন, "গত পরশু মাদ্রাসা থেকে ছাত্র-শিক্ষকেরা এসে ভাস্কর্য নির্মাণ বন্ধের দাবি জানালে ওই দিনই কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়। গতকাল সকাল থেকে সরানোর কাজ শুরু হয়। তিনি বলেন, তিনি নিজে মুফতি নুর হোসেন নুরানী এবং জামিয়া বাবুস সালাম মসজিদ ও মাদ্রাসা কমিটির সভাপতি মোশতাক আহমেদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। আমরা তাদের বলেছি, তবু তারা কর্মসুচি প্রত্যাহার করেনি। তারা এখন দাবি করছে, এখানে হজ মিনার স্থাপন করতে হবে।"
এদিকে "মূর্তি প্রতিরোধ কমিটি"র প্যাডে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ঢাকা মহানগরীর উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন মসজিদের ইমামরা গতকাল মুফতি নুরানীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এলে তিনি তাঁদের উদ্দেশে বলেছেন, রক্ত আর লাশের বিনিময়ে হলেও বিমানবন্দর গোলচত্বর থেকে মূর্তি অপসারণ করা হবে। তিনি আজ সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে কর্মসুচি ঘোষণার কথা জানিয়ে তা ঠিকভাবে বাস্তবায়নের জন্য ইমামদের প্রতি আহ্বান জানান। এ সময় মুশতাক হোসেন রতন ও মাওলানা আনিসুর রহমানও উপস্থিত ছিলেন।

প্রথম আলো, ১৬ অক্টোবর, ২০০৮

Permalink

হুজি এবার ‘আইডিপি’ নামে প্রকাশ্য রাজনীতিতে

নিজস্ব প্রতিবেদক
‘ইসলামী ডেমোক্রেটিক পার্টি−আইডিপি’ নামে প্রকাশ্য রাজনীতি শুরু করল হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী−হুজি। গতকাল শুক্রবার রাজধানীতে ইফতার অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ করল সাবেক আফগান মুজাহিদদের এই সংগঠন আইডিপি।
অবশ্য সংগঠনের আহ্বায়ক মাওলানা শেখ আবদুস সালাম প্রথম আলোকে বলেছেন, “তাঁদের সংগঠন এ দেশে ১৯৯২ সালেই আত্মপ্রকাশ করে হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী বাংলাদেশ নামে। এরপর ১৯৯৮ সালে তা বিলুপ্তি ঘোষণার পর ‘ইসলামী গণ-আন্দোলন’ নামে সংগঠন করেছিলাম। সেই সংগঠন থেকে এখন আইডিপি নামে কাজ করছি।”
গতকাল ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে মাওলানা শেখ আবদুস সালামের সভাপতিত্বে আইডিপির ইফতার ও আলোচনা সভায় সংগঠনের নেতারা ছাড়াও সংগঠনের ভাষায় ‘আন্তসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি উন্নয়নের স্বার্থে আমন্ত্রিত’ ইংরেজি সাপ্তাহিক ব্লিৎজ-এর সম্পাদক সালাহউদ্দিন শোয়েব চৌধুরী, দৈনিক আমার দেশ-এর সহকারী সম্পাদক ও হিউম্যান রাইটস ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব চৌধুরী, বৌদ্ধ কৃষ্টি প্রচার সংঘের পি কে বড়ুয়া, খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি চিত্ত ফ্রান্সিস রিভেরু বক্তব্য দেন।
আলোচনায় অংশ নিয়ে সালাহউদ্দিন শোয়েব চৌধুরী বলেন, আইডিপির আত্মপ্রকাশের মধ্য দিয়ে দেশে নতুন রাজনীতির জন্ন হলো। তিনি বলেন, আইডিপির সঙ্গে হরকাতুল জিহাদের নাম জড়িত। এটা এমন একটি সংগঠন, যার সম্পর্কে নানা আলোচনা রয়েছে। আইডিপিকে যারা সন্ত্রাসী সংগঠন বলে, ওই সব পত্রিকা বিদেশের টাকায় চলে। তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন দেশে নিষিদ্ধ এবং বালিতে বোমা হামলার সঙ্গে জড়িত সত্ত্বেও হিযবুত তাহ্রীরের মতো সংগঠন যদি এ দেশে প্রকাশ্যে রাজনীতি করতে পারে, তাহলে আইডিপি কেন পারবে না। যারা বাংলাদেশকে করদ রাজ্য বানাতে চায়, তারা আইডিপিকে হুমকি মনে করে।
সঞ্জীব চৌধুরী বলেন, ‘আফগানফেরত মুক্তিযোদ্ধাদের মূলধারার সদস্যরা আইডিপি গঠন করেছে। পরিচয়সুত্রে আমি এদের সঙ্গে অনেক কাজ একত্রে করেছি। এ নিয়ে অনেক প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছি। আমরা এই অনুষ্ঠান আরও আগে করতাম, কিন্তু সরকারের সংশ্লিষ্টদের অনুমতি পেতে দেরি হয়েছে। তাতে একদিকে ভালোই হলো। আজ পবিত্র জুমাতুল বিদার দিন আইডিপির প্রথম প্রকাশ্য মাহফিল হচ্ছে।’
আইডিপির উপদেষ্টা ও খেলাফত আন্দোলনের আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক কাজী আজীজুল হক বলেন, তথ্য ও যোগাযোগের ঘাটতির কারণে আইডিপি সম্পর্কে ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। হরকাতুল জিহাদ বিলুপ্ত করার পর প্রথমে ইসলামী দাওয়াতি কাফেলা, তারপর ইসলামী গণ-আন্দোলন এবং এখন আইডিপি নামে সংগঠন হয়েছে। সবার সঙ্গে আলোচনা করেই এটা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য দেন আইডিপির সদস্যসচিব মাওলানা রুহুল আমিন, তিন যুগ্ম আহ্বায়ক কারি হোসাইন আহমদ, মাওলানা আবুল কাশেম রহমানী ও মাওলানা মাহবুবুর রহমান এবং মাওলানা মুফতি কামাল, মাওলানা মীর ইদ্রিস, মুফতি ফজলে এলাহি, মাওলানা মুফতি নোমান, খেলাফত মজলিসের (ইসহাক) নায়েবে আমির এমদাদুল হক আড়াইহাজারী, খেলাফত আন্দোলনের নায়েবে আমির ছফর উল্লাহ খান, জৈনপুরী পীর মাওলানা এহছানুল্লাহ আব্বাসী প্রমুখ। এ ছাড়া মরহুম হাফেজ্জী হুজুরের মেজ ছেলে হাফেজ মাওলানা হামিদুল্লাহ ও মাওলানা আতাউল্লাহ উপস্িথত ছিলেন। ইফতার অনুষ্ঠানে সংগঠনের সহস্রাধিক নেতা-কর্মী উপস্িথত ছিল।
সমাপনী বক্তৃতায় মাওলানা আবদুস সালাম নিজেদের আন্তর্জাতিক মুক্তিযোদ্ধা দাবি করে বলেন, তাঁরা মদিনা সনদের আলোকে একটি অসাম্প্রদায়িক কল্যাণ রাষ্ট্র গড়ে তুলতে চান।
আশির দশকে আফগানিস্তানে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী মুজাহিদ কমান্ডার আবদুস সালাম এর আগে গত ১৭ জুলাই প্রথম আলোকে বলেন, সংগঠনের মজলিশে শুরার সভায় সিদ্ধান্ত নিয়ে তাঁকে আহ্বায়ক করে গত ১৮ মে আইডিপির ১৫ সদস্যবিশিষ্ট আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়।
অনুসন্ধানে জানা যায়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চাপসহ নানা কারণে সংগঠনটি বিভিন্ন সময় নাম পাল্টালেও এর নেতৃত্ব, সাংগঠনিক কাঠামো, মজলিশে শুুরা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ-প্রক্রিয়া প্রায় একই ছিল। ২০০৬ সালের আগস্ট মাসে প্রথম গোপন এই সংগঠনটি ইসলামী গণ-আন্দোলন নামে প্রকাশ্য রাজনীতিতে আসার চেষ্টা করে। এই লক্ষ্যে ওই বছরের ১৮ আগস্ট জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে সচেতন ইসলামী জনতার ব্যানারে বড় একটি সমাবেশ করেছিল। তখন সচেতন ইসলামী জনতার আহ্বায়ক হিসেবে সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন হাফেজ মাওলানা আবু তাহের। এই তাহের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় অভিযোগপত্রভুক্ত আসামি। বর্তমানে তিনি কারাগারে। আবু তাহের হুজির ঢাকা মহানগর সভাপতি ও মজলিশে শুরার সদস্য ছিলেন।
বিভিন্ন নাশকতামূলক ঘটনার পর বাংলাদেশ সরকার ২০০৫ সালের ১৭ অক্টোবর হুজিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ২০০২ সালের ২১ মে বাংলাদেশের হরকাতুল জিহাদকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করে। গত ৫ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী কন্ডোলিৎসা রাইস এক নির্বাহী আদেশে বাংলাদেশের হুজিকে একটি ‘বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন’ এবং একটি ‘বিশেষভাবে চিহ্নিত আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী’ হিসেবে ঘোষণা দেন।
গতকাল ইফতার অনুষ্ঠানে প্রথম আলোর সঙ্গে আলাপকালে মাওলানা সালাম বলেন, ‘কয়েকটি কারণে আমরা হরকাতুল জিহাদ বিলুপ্ত করি। এর মধ্যে মূলত আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কিছু কারণ ছিল। আপনারা জানেন, আমরা যারা হরকাতুল জিহাদ করি, সবাই আফগান মুজাহিদ ছিলাম। সেখানে মুজাহিদদের মধ্যে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হলে তার প্রভাব আমাদের এখানেও পড়ে। তা ছাড়া যে জিহাদি জজবা নিয়ে, আফগানিস্তানে আমরা গিয়েছিলাম, বিশেষ করে সোভিয়েত দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে মুসলমানদের সাহায্য করা ও মানবিকতা পুনরুদ্ধারের জন্য, সেই কাজ হয়ে গেছে। এখন আর সেই নামটি (হরকাতুল জিহাদ) ধরে রাখার কোনো কারণ নেই।’
হুজির সঙ্গে জড়িত মুফতি হান্নানসহ অনেকের বিরুদ্ধে নাশকতার অভিযোগ আছে−এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘১৯৯৮ সালেই মুফতি হান্নানকে আমরা দল থেকে বহিষ্ককার করি। বহিষ্ককারের পর কেউ যদি ওই নামে নাশকতা করে থাকে, তার দায়দায়িত্ব তাদেরই। আমাদের ওপর বর্তায় না। তবে সরকারকে ধন্যবাদ, তাদের ধরেছে। এখন তাদের বিচার চলছে।’

প্রথম আলো, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০০৮

Permalink

খালেদা মুক্ত

চোরের মা মুক্তি পেয়েছে। আর কি? বাকী চোরগুলাকেও মুক্ত করা হোক। বর্তমান গণতান্ত্রিক, দুর্নীতিবিরোধী সরকারের কাছে এটাই প্রত্যাশা। বড় চোর অপরাধ করে পার পেয়ে যায়, আর ছোট চোরেরা জেলে আটকা থাকে। এই জন্যই কি আলেকজান্ডার বলেছিলেন:- "সত্যি সেলুকাস, কি বিচিত্র এই দেশ"

ঢাকা, ১১ সেপ্টেম্বর (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম)--জামিনে মুক্ত চিকিৎসাধীন ছেলে তারেক রহমানকে দেখতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব চিকিৎসা বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে গেছেন সদ্য কারামুক্ত খালেদা জিয়া। দুপুর দেড়টার দিকে তিনি ডি ব্লকে
প্রবেশ করেন। ডি ব্লকের চারতলার একটি কেবিনে তারেক রহমান রয়েছেন।

এর আগে এক বছর ৭ দিন আটক থাকার পর সংসদ ভবনের বিশেষ কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পান সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। ১১ টা ৩৫ এর দিকে কারাগারের বাইরে আসেন তিনি। মুক্তি পেয়েই প্রয়াত স্বামী জিয়াউর রহমানের মাজার জিয়ারত করেন তিনি। জানাচ্ছেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম এর সুমন মাহমুদ, লিটন হায়দার, প্রদীপ চৌধুরী ও গোলাম মোর্তজা অন্তু। সর্বশেষ খবর জানার জন্য জিপি,একটেল ও বাংলা লিংক থেকে ২৩২৪ এ ফোন করুন।

মুক্তি পেয়েই একটি নিশান প্যাট্রোল জিপে করে জিয়ার
মাজারে যান খালেদা। দুপুর ১২টা ২৮ মিনিটে ফুল দিয়ে মাজারে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন তিনি। এরপর তিনি মাজার জিয়ারত করেন।

এসময় তার সঙ্গে আরো ছিলেন দলের মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেন , অধ্যাপিকা সারোয়ারি রহমান, এম কে আনোয়ার, নুরুল হুদা, সেলিমা রহমান, ডেপুটি স্পিকার আখতার হামিদ সিদ্দীকী ও রিজভী আহমেদসহ কেন্দ্রীয় নেতা ও সাবেক সাংসদরা। এসময় খালেদা জিয়ার পরনে ছিল সুতার কাজ করা সাদা সুতির শাড়ি ও খয়েরি রংয়ের সানগ্লাস। ১২টা ৪০মিনিটে বড় ছেলে তারেককে দেখতে বঙ্গবন্ধু মেডিক্যালের উদ্দেশে রওয়ানা হন খালেদা।

খালেদা জিয়ার গাড়ি ঘিরে ছিল অসংখ্য উৎফুল্ল নেতাকর্মীর ভিড়। তারা ফুলের পাপড়ি ছিটিয়ে ও স্লোগান দিয়ে নেত্রীকে স্বাগত জানায়।

দুপুর ১২টার দিকে খালেদা জিয়া স্বামীর মাজারে প্রবেশ করেন এবং মাজার জিয়ারত করেন। এর পর তিনি মাজারে ফুল দেন। এসময় বিএনপি মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেন, বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী, হান্নান শাহ ও গয়েশ্বর রায়সহ সিনিয়র নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে কারা উপ মহাপরিদর্শক মেজর শামসুল হায়দার ছিদ্দিকী বৃহস্পতিবার সকালে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, " আমি আশা করছি সকাল সাড়ে এগারোটার মধ্যে খালেদা জিয়া মুক্তি পাবেন। জামিন সংক্রান্ত যাবতীয় কাগজপত্র পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা শেষ হয়েছে।"

খালেদা জিয়া তখন বিশেষ কারাগার থেকে বের হয়ে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন বলে জানান কারা উপ মহাপরিদর্শক।

হাইকোর্ট গত মঙ্গলবার নাইকো ও গ্যাটকো
দুর্নীতি মামলায় তিন মাসের জামিন দিলে বিএনপি সভানেত্রীর মুক্তির পথ পরিষ্কার হয়।

এক বছর ৭ দিন কারাবাসের পর খালেদা জিয়া মুক্তি পেলেন।

সকাল সাড়ে ১১ টার দিকে তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জোবায়দা রহমান এবং মেয়ে জাইমা রহমান ফুল নিয়ে বিশেষ কারাগারের ভিতরে প্রবেশ করেন।

জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার
আখতার হামিদ ও কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জাকির হাসান বেলা ১১টার দিকে বিশেষ কারাগারে যান।

বিশেষ কারাগার ও জিয়ার মাজারের সামনে বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের প্রচুর নেতাকর্মী সকাল থেকেই ভিড় জমান। ছাত্রদল ও যুবদলের অনেক সাবেক নেতা মোটর সাইকেল শোভাযাত্রার আয়োজন করেন।

খালেদা জিয়া মুক্তি পেয়ে প্রথমেই জিয়ার মাজারে যাবেন এ খবর পেয়ে বিএনপির হাজার হাজার নেতাকর্মী মাজারে সমবেত হন।
মাজার এলাকায় র‌্যাব ও পুলিশ মোতায়েনসহ ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

এদিকে খালেদার আসন্ন মুক্তির খবরে সংসদ ভবনের পেছনের রাস্তায় (লেক সড়ক) বিএনপির নেতাকর্মীরা খণ্ড খণ্ড মিছিল করেন। এসময় রাস্তায় সর্বসাধারণের চলাচল বন্ধ রাখা হয়।

এর আগে বিএনপির দপ্তর সম্পাদক রিজভী আহমেদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, " খালেদা জিয়া মুক্তি পেয়ে প্রথমেই জিয়ার মাজারে যাবেন। এর পর পিজি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বড় ছেলে তারেক রহমানকে দেখতে যাবেন। এছাড়া বিএনপি অফিসেও তার যাওয়ার কথা রয়েছে।"

সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও তার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোকে গত বছরের ৩রা সেপ্টেম্বর গ্যাটকো দুর্নীতি মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর খালেদার বিরুদ্ধে আরো তিনটি দুর্নীতি মামলা দায়ের করা হয়। সবগুলো মামলাতেই তিনি পর্যায়ক্রমে জামিন পান।

বুধবার রাতে খালেদার জামিনের কাগজপত্র কারা কর্তৃপক্ষের হাতে পৌঁছায়। সে সময় উপ কারা মহাপরিদর্শক মেজর শামসুল হায়দার ছিদ্দিকী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, বৃহস্পতিবার যে কোনো সময় খালেদা মুক্তি পেতে পারেন।

খালেদার ছোট ছেলে কোকো এবং বড় ছেলে তারেক রহমান আগেই মুক্তি পেয়েছেন। গত ১৭ই জুলাই কোকোকে চিকিৎসার জন্য সাময়িকভাবে এবং ৩রা সেপ্টেম্বর তারেককে জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়।

এর আগে কয়েকটি মামলার আসামী আরেক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেও চিকিৎসার জন্য সাময়িক মুক্তি দেয় সরকার। গত বছরের ১৬ই জুলাই গ্রেপ্তারের পর এ বছরের ১১ই জুন হাসিনাকে চিকিৎসার জন্য আট সপ্তাহের জন্য মুক্তি দেওয়া হয়। সরকার তার মুক্তির মেয়াদ আগামী ৬ই অক্টোবর পর্যন্ত বাড়িয়েছে। হাসিনা চিকিৎসার জন্য বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছেন।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম/এসএম/পিসি/এলএইচ/জিএমএ/এইচবি/এসকে/এফএফ/জিএনএ/১৩৩২ ঘ.

Permalink

রাজনীতিকদের পাশাপাশি শীর্ষ সন্ত্রাসীও ছাড়া পেলেন


সাকা চৌধুরী ও ওবায়দুল কাদের জামিনে মুক্ত। ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর অন্যতম লিয়াকতও বেরিয়েএলেন নিজস্ব প্রতিবেদক

রাজনীতিবিদদের পাশাপাশি রাজধানীর একজন শীর্ষ সন্ত্রাসীও ছাড়া পেয়েছেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরী ও আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের গতকাল শুক্রবার জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। একইভাবে শীর্ষস্থানীয় সন্ত্রাসী ও যুবলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা লিয়াকত হোসেনও ছাড়া পেয়েছেন। গত বৃহস্পতিবার তিনি কারাগার থেকে বের হন। তাঁকে ধরিয়ে দিতে সরকার এক লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছিল।

কারা সুত্র জানায়, গতকাল বেলা ১১টার দিকে কাশিমপুর কারাগার থেকে সাকা চৌধুরী এবং সকাল ১০টার দিকে বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রিজন সেল থেকে ওবায়দুল কাদেরকে মুক্তি দেওয়া হয়। তবে মুক্তি পেয়ে তিনি বাসায় না গিয়ে হাসপাতালেই আছেন।



দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া রাজনৈতিক নেতাদের পাশাপাশি এবার সরকারের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসীদেরও জামিনে ছাড়া পাওয়ার ঘটনায় জনমনে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক−সুজনের সভাপতি ও টিআইবির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদের মতে, এই সরকারের শুরুতে দুর্নীতি দমনের বিষয়ে মানুষের মনে আশার সঞ্চার হয়েছিল। এখন এসব ঘটনার কারণে তা দুরাশায় পরিণত হয়েছে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, দুর্নীতিবিরোধী অভিযান এত বিস্তৃত করে সরকার ভুল করেছে। তারা যদি দুদককে অনুসরণ করে রুই-কাতলাদের টার্গেট করত, তাহলে বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করে ফেলতে পারত।
এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শাহ্দীন মালিক বলেন, শীর্ষ সন্ত্রাসী ও দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলো বিচারের পর্যায়ে নিয়ে শেষ করার ক্ষেত্রে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে সরকার।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত প্রথম আলোকে বলেন, ‘সরকার নিজেই বলেছে, খালেদা জিয়া আবেদন করলে জামিন পাবেন। অর্থাৎ সরকার বললে জামিন পাওয়া যাবে। আবার সরকার যখন বলে জামিন পাওয়া যাবে না, তখন জামিন পাওয়া যায় না। এখন যখন জামিন পাওয়ার একটা অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে, সবাই এই সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করছে। মোট কথা আমরা একটা নৈরাজ্যের দিকে এগোচ্ছি।’
সাকা চৌধুরী: বর্তমান সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের প্রথম দফায় গত বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে তাঁর ধানমন্ডির বাসা থেকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুর্নীতিগ্রস্তদের তালিকায় প্রথম তালিকায় তাঁর নাম ছিল। গ্রেপ্তারের পর তাঁর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজিসহ ছয়টি মামলা হয়। এর মধ্যে তিনি পাঁচটি মামলায় জামিন পান। সর্বশেষ গত ২৮ আগস্ট একটি মামলায় জামিন পান।
গতকাল বেলা ১১টার দিকে কাশিমপুর কারাগারের দুই নম্বর কারাগার ভবন থেকে বের হন সাকা চৌধুরী। এ সময় কারাগারের প্রবেশমুখে তাঁর স্ত্রী-সন্তান এবং বেশ কয়েকজন নেতা-কর্মী উপস্িথত ছিল। কারাগার থেকে বের হয়ে তিনি ধানমন্ডির বাসায় যান।
দুপুরে সাকা চৌধুরীর ছেলে হুমাম কাদের চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, জুমার নামাজ আদায় শেষে তাঁরা সপরিবারে চট্টগ্রাম যাবেন এবং সেখানে দু-তিন দিন থেকে ঢাকায় ফিরবেন।
সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে সম্পদের তথ্য গোপন করে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে একটি দুর্নীতি মামলা ছাড়াসহ কয়েকটি চাঁদাবাজির মামলার বিচারকাজ চলছে। অবৈধ সম্পদ অর্জনসংক্রান্ত দুর্নীতির মামলায় এখন সাক্ষীর জেরা শেষপর্যায়ে রয়েছে। মামলাটি হাইকোর্ট স্থগিত করায় কয়েক দফা এই আদালতে বিচারকাজ স্থবিরও হয়ে পড়ে।
মুক্তি পাওয়ার পর উপস্িথত সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সাকা চৌধুরী বলেন, ‘আমরা যাদের জন্য রাজনীতি করি, তাদের কাছে জবাবদিহি করার দায়িত্ব আমাদের রয়েছে। তাই বলতে হয়, আজকের এ পরিস্িথতির জন্য আমরা রাজনীতিবিদেরাও খানিকটা দায়ী।’

ওবায়দুল কাদের:
আওয়ামী লীগের নেতা ওবায়দুল কাদের গতকাল দুপুর ১২টা ৩৫ মিনিটে জামিনে ছাড়া পান। ওবায়দুল কাদেরের মুক্তির খবরে গত বৃহস্পতিবার দুপুরে কয়েক শ যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও যুব মহিলা লীগের নেতা-কর্মী জড়ো হয়েছিল। কিন্তু সন্ধ্যায় তারা জানতে পারে, ওবায়দুল কাদের শুক্রবার ১০টা নাগাদ মুক্তি পাবেন। এরপর গতকাল সকাল থেকে নেতা-কর্মীরা বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে জড়ো হয়। হাসপাতালের নিয়ম ভেঙে কয়েক শ নেতা-কর্মী হাসপাতালের ভেতরে মিছিল করে এবং কারামুক্ত ওবায়দুল কাদেরকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানায়।
বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাধীন ওবায়দুল কাদের মুক্তি পাওয়ার পর তাঁকে এই মেডিকেলেরই এ-ব্লকের তৃতীয় তলার ৩১৮ নম্বর কক্ষে নিয়ে ভর্তি করা হয়। তিনি বেশ কিছু দিন ধরে অসুস্থাবস্থায় এখানে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন।
গত বছরের ৯ মার্চ রাজধানীর খিলগাঁওয়ের একটি বাসা থেকে পুলিশ ওবায়দুল কাদেরকে গ্রেপ্তার করে। সরকারের দুর্নীতিগ্রস্তদের তালিকায় তাঁরও নাম ছিল।
তাঁর বিরুদ্ধে বিশেষ জজ আদালত-৭, আদালত-৯, আদালত-১০-এ পাঁচটি দুর্নীতির মামলার বিচার চলছে। মামলাগুলো এখন সাক্ষ্য গ্রহণের পর্যায়ে রয়েছে।
মুক্তি পেয়ে ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের বলেন, ‘এবারের এই কারাজীবন অন্য সময়ের মতো নয়। এবারের কারাজীবন রাজনীতিবিদদের জন্য একটি পাঠশালা। এই পাঠশালা থেকে আমি অনেক কিছু শিখেছি। আত্মশুদ্ধি করতে পেরেছি। এই শিক্ষা আমি দেশবাসীর সেবায় উৎসর্গ করব।’
শীর্ষ সন্ত্রাসী লিয়াকত: ধরিয়ে দেওয়ার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষিত ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর অন্যতম যুবলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা লিয়াকত হোসেন গত বৃহস্পতিবার জামিনে মুক্তি পেয়ে কারাগার থেকে বেরিয়ে এসেছেন। সব মামলায় জামিন পাওয়ার পর আটকাদেশ দিয়ে তাঁকে কারাগারে রাখা হয়েছিল। কিন্তু তাঁর আটকাদেশের মেয়াদ আর বাড়ানো হয়নি।
কারা প্রশাসনের উপমহাপরিদর্শক মেজর সামসুল হায়দার ছিদ্দিকী প্রথম আলোকে বলেন, বৃহস্পতিবার লিয়াকত মুক্তি পেয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে দেওয়া আটকাদেশের মেয়াদ বৃহস্পতিবার শেষ হয়ে যাওয়ায় তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়।

পুলিশ সুত্র জানায়, ২০০৩ সালের ১ অক্টোবর পুলিশের র‌্যাপিড অ্যাকশন টিম−র‌্যাট (বিলুপ্ত) এর সদস্যরা ধানমন্ডির রাস্তা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে। তাঁর বিরুদ্ধে হত্যাসহ নয়টি মামলা ও চারটি সাধারণ ডায়েরি রয়েছে। গ্রেপ্তারের পর থেকে তিনি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ছিলেন।
২০০১ সালের ২৫ ডিসেম্বর তৎকালীন সরকার ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর নাম এবং তাদের ধরিয়ে দেওয়ার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করে। ওই তালিকায় লিয়াকতের নাম ছিল। পুরস্কার ঘোষণার পর পুলিশ লিয়াকতসহ সাতজনকে গ্রেপ্তার করে।
আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী আরমানের সঙ্গে লিয়াকতের সখ্য গড়ে ওঠে। সে সময় লিয়াকতের ঘনিষ্ঠজন বলে পরিচিত মুরগি মিলন ও আরমান জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এলাকার চোরাচালান নিয়ন্ত্রণের কাজ পান। তবে বরাবরই মগবাজার এলাকার চাঁদাবাজি ছিল লিয়াকতের নিয়ন্ত্রণে।
২০০১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর লিয়াকত গা ঢাকা দেন। একপর্যায়ে তিনি ভারতে পাড়ি জমান। সেখানে একটি হোটেলে বেশ কিছু দিন কাটানোর পর কলকাতার নিউমার্কেট এলাকায় পুলিশের হাতে ধরা পড়েন তিনি। ২০০২ সালের ১৯ নভেম্বর ভারতে ধরা পড়ার কিছু দিন পরে কলকাতার আদালত তাঁকে জামিনে মুক্তি দেন। এরপর তিনি ঢাকায় ফিরে এসে আত্মগোপন করেন। পরে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে। লিয়াকতের প্রতিদ্বন্দ্বী সন্ত্রাসীরা র‌্যাবের ক্রসফায়ারে নিহত হয়।

Permalink

ইসলামিস্ট মিলিট্যানসি ইন বাংলাদেশ

ইসলামিস্ট মিলিট্যানসি ইন বাংলাদেশ
মৌলবাদী সন্ত্রাসের রাজনৈতিক মানচিত্র
হাসান ফেরদৌস

ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক, একসময় ঢাকার দৈনিক সংবাদ ও পরে বিবিসি বাংলা বিভাগের সাংবাদিক, আলী রীয়াজ ২০০৪ সালে বাংলাদেশে ইসলামি জঙ্গিবাদের উত্থান নিয়ে তাঁর প্রথম বইটি লেখেন। গড উইলিং: দি পলিটিক্স অব ইসলামিজম ইন বাংলাদেশ নামের সে বইটি কিছুটা চটজলদি লেখা হলেও তাতে বাংলাদেশে সহিংস মৌলবাদের উত্থানের মূল বৈশিষ্ট্য ও তার ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিতটি নিরপেক্ষ গবেষকের দৃষ্টিতে তিনি ঠিকই ধরতে পেরেছিলেন। তাঁর যুক্তি ছিল, ইসলামের রাজনীতিকরণের পেছনে তাঁদের যে দায়-দায়িত্ব, দেশের মূলধারাভুক্ত রাজনৈতিক দল ও নেতৃত্ব তা থেকে ছাড় পেতে পারেন না। দেশের প্রতিটি প্রধান রাজনৈতিক দল ও নেতা সর্বগ্রাহ্য কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হয়ে নিজেদের বৈধতা খুঁজতে ধর্মের দিকে হাত বাড়ান। এরই ফলে ক্রমেই ধর্ম ও রাষ্ট্রের ভেতর বিভাজনরেখা বিলুপ্ত হয় এবং রাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানেই বাংলাদেশে ইসলামি রাজনীতির উত্থান ঘটে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি−দুই প্রধান দলই সে অপরাধে অপরাধী। এই দুই মধ্যপন্থী ও আপসকামী দলের পাশাপাশি কোনো প্রগতিশীল সামাজিক-গণতান্ত্রিক দল বা বামঘেষা আন্দোলন বাংলাদেশে দানা বাঁধতে পারেনি। এর ফলে যে শুন্যতার সৃষ্টি হয়, তার নরম ও উর্বর মাটিতেই মৌলবাদী শক্তি নিজেদের সংহত করার উদ্দাম ও সাহস খুঁজে পায়।

তাঁর নতুন বই, ইসলামিস্ট মিলিট্যানসি ইন বাংলাদেশ (রুটলেজ, নিউইয়র্ক, ২০০৮), তাতে রীয়াজ ইসলামবাদীদের উত্থানের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণের পাশাপাশি এর ভু-রাজনৈতিক মানচিত্র খোঁজার চেষ্টা করেছেন। সহিংস ইসলামি রাজনীতি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সম্ভাবনার প্রতি কত বড় হুমকি ও সে হুমকি মোকাবিলার পথ কী, তা নির্দেশের চেষ্টাও করেছেন তিনি। এই বইয়ে আলী রীয়াজ সাংবাদিক নন, তিনি নিয়মনিষ্ঠ রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। পূর্বনির্ধারিত কোনো সিদ্ধান্ত আরোপের বদলে তিনি এখানে তথ্য ও উপাত্তের ভিত্তিতে যৌক্তিক উপসংহারে পৌঁছাতে তাঁর স্পষ্ট আগ্রহ দেখিয়েছেন। তাঁর যুক্তি, বাংলাদেশে সহিংস ইসলামি মৌলবাদের উত্থান মূলত একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া, দেশি ও বিদেশি শক্তিচক্র একযোগে তার পক্ষে কাজ করেছে। ১৯৭৫-পরবর্তী ঘটনাবলির ওপর আলোকপাত করে তিনি এই যৌক্তিক সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতর মৌলবাদ ও মৌলবাদী রাজনীতি সমর্থন ও আশ্রয় পাওয়ার ফলেই এই সহিংস মৌলবাদ এত দ্রুত প্রসার লাভ করেছে। তাঁর সবচেয়ে নির্দয় সমালোচনার লক্ষ্য ২০০১ থেকে ২০০৬-এর বিএনপির নেতৃত্বে চারদলীয় জোট সরকার। এই পাঁচ বছরে রাষ্ট্র ও রাষ্ট্র-বহির্ভুত শক্তিসমূহ (স্টেট ও নন-স্টেট অ্যাকটর্স) একে অপরের সঙ্গে হাত মিলিয়ে কাজ করেছে, একে অপরকে ব্যবহার করেছে। শুধু তাদের রাজনৈতিক ও আদর্শগত উদ্দেশ্য সাধনই সেই সহযোগিতার লক্ষ্য নয়, তাদের দীর্ঘমেয়াদি রণকৌশলের অংশ হিসেবেও এই আঁতাত কাজ করেছে।
আলী রীয়াজ তাঁর গ্রন্থে প্রায় গোড়া থেকেই ইসলামিক দলগুলোর রাজনৈতিক ক্ষমতার বিষয়ে যে ‘মিথ’ চালু রয়েছে, তা ভাঙার চেষ্টা করেছেন। ১৯৯১-এর নির্বাচনের সময় থেকে জামায়াত ও অন্য ইসলামি দলগুলো বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘কিং-মেকার’-এর ভুমিকা নেয়, অথচ তাদের নীতি ও আদর্শের প্রতি দেশের জনসমর্থন বরাবরই নামমাত্র। জামায়াতে ইসলামী একমাত্র ইসলামবাদী রাজনৈতিক দল, যাদের কোনো অর্থবহ জনসমর্থন রয়েছে। কিন্তু সেই সমর্থনও গত ১৫ বছরে ক্রমাগত নিম্নমুখী হয়েছে। যেমন, ১৯৯১ সালের নির্বাচনে এই দল মোট ভোটের ১২ দশমিক ১৩ শতাংশ অর্জন করে। পরবর্তী প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনেই তাদের বাক্সে ভোটের পরিমাণ ক্রমেই কমে আসে। ২০০১ সালের নির্বাচনে তাদের প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক পরিমাণ দাঁড়ায় ৪ দশমিক ২৯ শতাংশ। অন্য কথায়, এক দশকে জামায়াতে ইসলামীর সমর্থন−ভোটপ্রাপ্তি ও জনসমর্থনের নিক্তিতে ৪১ শতাংশ হ্রাস পায়। তার পরেও দল হিসেবে জামায়াতের রাজনৈতিক সমর্থন আদায়ে দেশের দুই প্রধান দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি যে উদগ্র আগ্রহ দেখিয়েছে, তা থেকে এই অব্যাহত পতনের কোনো ইঙ্গিত পাওয়া অসম্ভব।
রাজনীতির যে ইসলামিকরণ, তার ফল বাংলাদেশে প্রকাশিত হয়েছে নানাভাবে। সহিংসতা তার একটি প্রধান ও চুড়ান্ত প্রকাশ, কিন্তু তার অন্য প্রকাশও রয়েছে। যেমন, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর ক্রমাগত বৈষম্য ও সহিংসতা, নাগরিক সংস্কৃতির বিজাতিকরণ এবং মাদ্রাসা শিক্ষার উল্লম্ফন। আলী রীয়াজ তাঁর গ্রন্েথ এই শেষ বিষয়টি, অর্থাৎ মাদ্রাসা শিক্ষার প্রসার নিয়ে তথ্যভিত্তিক দীর্ঘ বিশ্লেষণ করেছেন। ইসলামি মৌলবাদীদের উত্থানের সঙ্গে মাদ্রাসা-ব্যবস্থার অবিশ্বাস্য প্রসার যে গুণগতভাবে সম্পৃক্ত, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ জাগে না, যখন আমরা এই তথ্যের মুখোমুখি হই যে ১৯৭২ থেকে ২০০৪ সালের ভেতর বাংলাদেশে উত্তর-প্রাথমিক মাদ্রাসার সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে ৭৩২ শতাংশ। কোনো সন্দেহ নেই, আওয়ামী লীগের আমলেও মাদ্রাসা-ব্যবস্থা জোরদার হয় এবং আওয়ামী সরকার মাদ্রাসা-ব্যবস্থার প্রতি সমর্থন তাদের নির্বাচনী রণকৌশলের অঙ্গীভুত করে। কিন্তু বিএনপির জোটের শেষ পাঁচ বছরে মাদ্রাসার যে প্রসার ও তার সহিংস পরিবর্তন ঘটে, পূর্ববর্তী যেকোনো সময়কে তা হার মানায়। ২০০১−২০০৫ সালে দেশের সাধারণ শিক্ষা খাতে বৃদ্ধি যেখানে ৯ দশমিক ৭৪ শতাংশ, সেখানে মাদ্রাসা খাতের সম্প্রসারণ দাঁড়ায় ২২ দশমিক ২২ শতাংশ। একই সময়ে সাধারণ শিক্ষা খাতে মোট শিক্ষার্থীর পরিমাণ বৃদ্ধি পায় ৩৩ শতাংশ, কিন্তু মাদ্রাসা ছাত্রদের সংখ্যা বৃদ্ধি পায় ৫৮ শতাংশ।
মাদ্রাসাগুলো, বিশেষ করে বেসরকারি কওমি মাদ্রাসার অনেকাংশ যে সন্ত্রাসী তৎপরতার সঙ্গে জড়িত, সে কথা পত্র-পত্রিকায় নানা সময়ে লেখা হলেও তার অকাট্য প্রমাণ মেলেনি। সে প্রমাণ মিলল ১৭ আগস্ট ২০০৫ সালে দেশজুড়ে সন্ত্রাসী বোমাবাজির পর। নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে আটক অনেক সন্ত্রাসীই পরে স্বীকার করেছে, তারা বিভিন্ন মাদ্রাসাকে প্রশিক্ষণ ও সদস্য সংগ্রহের কাজে ব্যবহার করেছে। ‘আহলে হাদিস আন্দোলন বাংলাদেশ’ ও ‘মাহাদুত তারবিয়ালতিল ইসলামিয়া মাদ্রাসা’ এই কাজে অগ্রণী ভুমিকা পালন করে। গোয়েন্দা সুত্রের তথ্য উদ্ধৃত করে আলী রীয়াজ জানিয়েছেন, সরকারিভাবে এ পর্যন্ত ২৩৩টি মাদ্রাসা চিহ্নিত করা হয়েছে, যেখানে সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো।
বিএনপির আমলে ২০০১−২০০৬-এর ভেতর সহিংস ইসলামপন্থীদের তৎপরতা যে আশ্চর্য রকম বেড়ে যায়, তার প্রধান কারণ সরকারের ভেতরেই ইসলামপন্থী নীতিনির্ধারকের ভুমিকা গ্রহণ করে। এই নীতিনির্ধারকেরা বাংলাদেশে ইসলামি সন্ত্রাসের অস্তিত্ব এক কথায় কেবল নাকচই করে দেননি, অনেক ক্ষেত্রে সন্ত্রাসীদের সহযোগী হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করেন। আলী রীয়াজ সে ধরনের বেশ কিছু প্রামাণিক উদাহরণ দিয়েছেন। হারকাতুল জিহাদ নামে যে সংগঠনটি পরে সন্ত্রাসী হিসেবে আন্তর্জাতিক কালো তালিকাভুক্ত হয়, তার অন্যতম নেতা আতাউর রহমান খান−যিনি বিন লাদেন বাহিনীর সদস্য হিসেবে আফগান-যুদ্ধে অংশ নেন−১৯৯১ সালে বিএনপির সদস্য হিসেবে আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হন। মুফতি শহিদুল ইসলাম, যিনি ১৯৯৮ সালে বিন লাদেনের সঙ্গে বৈঠক করেন বলে নিজেই স্বীকার করেছেন, ২০০১ সালে বিএনপির সমর্থিত ইসলামী ঐক্যজোটের ব্যানারে আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হন। কুখ্যাত বাংলা ভাইয়ের ‘জাগ্রত মুসলিম জনতা’ রাজশাহীর বাগমারায় প্রথম যে প্রকাশ্য জনসভা করে, তাতে অন্যতম বক্তা ছিলেন স্থানীয় বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। ২০০৪ সালের মে মাসে রাজশাহীতে বাংলা ভাই যখন তাঁর সন্ত্রাসী অভিযানের শীর্ষে, সে সময় রাজশাহীর বিভাগীয় পুলিশের ইনস্পেক্টর জেনারেল নুর মোহাম্মদ সাংবাদিকদের জানান, সরকারি আইন প্রয়োগকারী বাহিনী বাংলা ভাইকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজে সাহায্য করছে। ১৮ আগস্ট ২০০৬ সালে ঢাকায় ‘সচেতন ইসলামি জনতা’ এই ব্যানারে যে প্রকাশ্য জনসভা করে, তাতেও নিষিদ্ধ ‘হুজি’র একাধিক নেতা (যেমন, মুফতি শফিকুর রহমান, মৌলানা মোহাম্মদুল্লাহ) এবং চারদলীয় জোটের একাধিক নেতা (যেমন, শাইখুল হাদিস) অংশ নেন।
রাষ্ট্র নিজেই যখন সন্ত্রাসের লালন ও পালন করে, তখন সে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন না হয়ে উপায় থাকে না। বুদ্ধিজীবীদের একাংশ এ ব্যাপারে বিপদঘণ্টি বাজানোর চেষ্টা করেছে, সরকারি ঢਆা-নিনাদে তা সহজেই ঢাকা পড়ে যায়। কিন্তু থলের বেড়াল বেরোয়, যখন খোদ বাংলা ভাই সে কথা ফাঁস করে দেন। ২০০৬ সালের শেষ মাথায় আদালতের বিচারে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর তিনি সক্ষোভে বলেন, সরকারই তাঁদের ইসলামি হুকুমাত কায়েমের জন্য কাজ করতে উৎসাহিত করেছিল। এখন তারাই সে কাজের জন্য মানুষের তৈরি আইনে তাঁকে শাস্তি দিচ্ছে। তিনি প্রশ্ন করেন, ‘এ অবস্থায় এই সরকারের কি শাস্তি পাওয়া উচিত?’
সরকারের গোয়েন্দা বিভাগের ভেতরও ইসলামি জঙ্গিদের সহযোগী রয়েছে, তারাও সরাসরি বা অপ্রত্যক্ষভাবে ইসলামি জঙ্গিদের তৎপরতার সঙ্গে যুক্ত, এই দাবির সপক্ষে রীয়াজ একটি আগ্রহোদ্দীপক তথ্য দিয়েছেন। গোপন নথিপত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেছেন, ১৯৯৯ সালে এক প্রতিবেদনে গোয়েন্দা বিভাগ জানায় যে দক্ষিণ আফ্রিকাভিত্তিক ‘সারভেন্টস অব সাফারিং হিউম্যানিটি’ নামের একটি ইসলামি সাহায্য সংস্থার সঙ্গে বাংলাদেশের ইসলামি জঙ্গিদের যোগসাজশ রয়েছে, তারা সন্ত্রাসী তৎপরতার সঙ্গে যুক্ত, এই অভিযোগে ১৯৯৯ সালের ২৫ জানুয়ারি দুজন বিদেশিসহ পাঁচ সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করা হয়। কিন্তু ইসলামী ঐক্যজোটের এক নেতা, যিনি ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির সমর্থনে আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হন, তাঁর হস্তক্ষেপে তিন বাংলাদেশিকেই মুক্তি দেওয়া হয়। সন্ত্রাস ও রাজনীতির এই সহাবস্থানে তিক্ত এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা সে সময়ে তাঁর সরকারি প্রতিবেদনে লেখেন: ‘আমাদের কাছে স্পষ্ট প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও দুর্নীতির কারণে ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার যোগসাজশে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তৎপরতায় নিয়োজিত লোকদের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান অর্থহীন হয়ে পড়ছে। তাদের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় সন্ত্রাসীরা নতুন করে বলীয়ান হবে। বিদেশি শক্তিসমূহও উপলব্ধি করবে, সন্ত্রাসীদের চাপের মুখে সরকার কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থাই গ্রহণ করবে না।’
১/১১-এর পট পরিবর্তনের পর রাষ্ট্র ও ইসলামি সন্ত্রাসের এই যোগসাজশের বিষয়টি আমাদের কাছে আরও খোলামেলাভাবে ধরা পড়ে। আলী রীয়াজ অতি সম্প্রতি প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে এই দুইয়ের যে আন্তসম্পর্ক, তার একটি তাত্ত্বিক কাঠামো প্রস্তুত করেছেন। তার ওপর ন্যস্ত ভুমিকা পালনে রাষ্ট্রের ব্যর্থতাকে রীয়াজ ‘রাষ্ট্রের অনুপস্িথতি’ বলে চিহ্নিত করেছেন। ‘অনুপস্িথত রাষ্ট্র’ যখন দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর স্বার্থ তুলে ধরার বদলে শুধু একটি ক্ষুদ্র দল বা গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষা করে, তখন এক ধরনের শুন্যতার জন্ন নেয়। এই শুন্যতার সুযোগেই বাম ও ডান উভয়পক্ষের চুড়ান্তবাদী গ্রুপসমূহ চাঙা হয় এবং কাজ করার জায়গা খুঁজে নেয়। দেশের উত্তরাঞ্চল, যা সবচেয়ে অনুন্নত ও অবহেলিত অঞ্চলের অন্তর্গত, সেখানে এই দুই ধরনের চুড়ান্তবাদীরাই তাদের তৎপরতার ক্ষেত্র নির্বাচন করে। ২০০১−২০০৬ সালে যে চারদলীয় জোট ক্ষমতা গ্রহণ করে, তারা সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক বিবেচনা থেকেই ডানপন্থী গ্রুপসমূহ অর্থাৎ ইসলামি জঙ্গিদের সঙ্গে হাত মেলায়। তাদের জন্য এর পেছনে যেমন আদর্শিক চাপ ছিল, তেমনি ছিল নির্বাচনী রণকৌশলগত বিবেচনা।
তাঁর প্রথম গ্রন্েথ রীয়াজ বাংলাদেশে ইসলামবাদের উত্থানকে প্রধানত একটি ‘বাংলাদেশি ঘটনা’ বলে প্রমাণে আগ্রহী ছিলেন। এই গ্রন্েথ তিনি সে বিশ্লেষণ কিছুটা বদলে নিয়েছেন। বাংলাদেশে ইসলামি জঙ্গিবাদের উত্থানের পেছনে মধ্যপ্রাচ্য থেকে ওয়াহাবি ইসলাম রপ্তানি যেমন এক ধরনের ভুমিকা রেখেছে, তেমনি পরিবর্তিত ভু-রাজনৈতিক বাস্তবতাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে উপমহাদেশের দেশসমূহের ঐতিহ্যিক বৈরিতা ও প্রভাব-বলয় নির্মাণের প্রতিযোগিতা। এই প্রতিযোগিতায় ভারত ও পাকিস্তানের ‘স্যাটেলাইট’ হিসেবে ব্যবহূত হয়েছে বাংলাদেশ। রীয়াজ ভারত ও পাকিস্তান একে অপরের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি প্রভাবিত করার লক্ষ্যে কীভাবে বাংলাদেশ, বিশেষ করে তার সহিংস দলসমূহকে ব্যবহার করেছে, তার তথ্যপূর্ণ বিবরণ দিয়েছেন। বিদেশি অর্থ, বিশেষত মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন এনজিওর মাধ্যমে পাঠানো অর্থ, কীভাবে সন্ত্রাসীকাজে ব্যবহূত হয়েছে, সে কথাও তিনি জানিয়েছেন। তাঁর হিসাবে, ২০০৬ সাল নাগাদ বাংলাদেশে ৩৪টির মতো ইসলামি এনজিও তৎপর ছিল, যাদের মাধ্যমে সেখানে বছরে ২০০ কোটি টাকার হাতবদল হয়। বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিরাও জেনে বা না জেনে অর্থ প্রদানের মাধ্যমে সন্ত্রাসী কাজে মদদ দিয়েছে।
ইসলামি সন্ত্রাসীরা তাদের প্রয়োজনে ‘পপুলার কালচার’, যেমন সংগীত ও নাটককে ব্যবহার করে থাকে, মৌলবাদী উত্থানের সম্পুরক কারণ হিসেবে সম্পুর্ণ নতুন এই দিকটির প্রতি আলী রীয়াজ তাঁর এই গ্রন্েথ আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। ওয়াজ-মাহফিলের মাধ্যমে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ও অন্যরা ধর্মের নামে সহিংসতার পক্ষে উসকানি দিয়েছেন, তা কোনো গোপন কথা নয়। টেপ ও সিডিতে তাঁর ভাষণ দেশের ভেতর যেমন, দেশের বাইরেও এন্তার মেলে। আটককৃত একাধিক সন্ত্রাসী স্বীকার করেছেন, সাঈদীর ভাষণ শুনেই তাঁরা অনুপ্রাণিত হয়েছেন (যেমন, চট্টগ্রামের জেএমবির নেতা জাবেদ ইকবাল)। ইসলামি মৌলবাদীদের আয়োজিত ওয়াজ-মাহফিলের পর সহিংসতা ঘটেছে, এমন ঘটনাও অজ্ঞাত নয়। যেমন, ব্র্যাক অফিস জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে, গ্রামীণ ব্যাংক আক্রান্ত হয়েছে। নব্বইয়ের গোড়া থেকেই এসব ঘটনা ঘটেছে, কিন্তু বাংলাদেশে আমরা কখনোই খুব গুরুত্বের সঙ্গে দুয়ে দুয়ে চার মিলিয়ে দেখিনি। এর সঙ্গে যে জঙ্গিবাদ যুক্ত, তাও ভেবে দেখিনি।
ইসলামি সংগঠনগুলো তাদের উগ্র ধর্মীয় মতাদর্শ প্রচারে কীভাবে সংগীতের ব্যবহার করে থাকে, আলী রীয়াজ তার প্রতিও আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। এ ব্যাপারে অগ্রণী ভুমিকা পালন করেছে ইসলামী ছাত্র শিবিরের সাংস্কৃতিক অঙ্গসংগঠন সাইমুম শিল্পীগোষ্ঠী। তাদের নেতৃত্বে ২০টি ইসলামি সাংস্কৃতিক দল নিয়ে যে জাতীয় সাংস্কৃতিক জোট গঠিত হয় ২০০৫ সালের ২৩ আগস্ট, তারা প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে একটি ‘ইসলামিক কনসার্ট’-এর আয়োজন করে। কনসার্ট শব্দটি বিজাতীয়, অনৈসলামিক, তা সত্ত্বেও এর ব্যবহার থেকে স্পষ্ট তরুণ ও যুবকদের আকর্ষিত করাই এই ‘সাংস্কৃতিক’ আক্রমণের লক্ষ্য। আলী রীয়াজ রণাঙ্গন শিল্পীগোষ্ঠী নামের আরেক ইসলামি দলের কথাও জানিয়েছেন। এই দল শুধু ২০০৪ সালেই ২০টি ইসলামি গানের সিডি প্রকাশ করে। তালিবান নামে যে অ্যালবাম তারা প্রকাশ করে, তার ভুমিকা হিসেবে এই ভাষ্যটি রয়েছে (আমি রীয়াজের উদ্ধৃত ইংরেজি থেকে বাংলায় রূপান্তর করছি): ‘ওসামা বিন লাদেন বিশ শতকের এক মহান মুজাহিদের নাম। আমেরিকা তাঁর নামে কেঁপে ওঠে। আজ সমগ্র বিশ্বে ওসামা বিন লাদেন বীরের সম্মানে ভুষিত। আমেরিকাকে টুকরো টুকরো করে ফেলতে হলে আমাদের দরকার ওসামা। ওসামা, মুসলিম বিশ্বের তুমি নেতা, সারা বিশ্বের মুজাহিদিনদের কাছে তুমি সবচেয়ে প্রিয়। তুমিই আমাদের জিহাদের অগ্রনায়ক।’
আলী রীয়াজের বক্তব্য অনুসারে, বাংলাদেশে ইসলামি সন্ত্রাসবাদ ঠেকাতে হলে একটা প্রধান কাজ হবে সন্ত্রাসী কারা তা চিহ্নিত করা এবং তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ। ইসলামবাদীদের দাবি উদ্ধৃত করে তিনি বলেছেন, বাংলাদেশে ইসলামি সন্ত্রাসীর মোট সংখ্যা ১০ থেকে ১৫ হাজার হবে। ‘আফগান মুজাহিদ’ শুধু এমন সন্ত্রাসীর সংখ্যাই তাঁর হিসাবমতে, দুই হাজার ৮০০। নির্ঘণ্ট হিসেবে আলী রীয়াজ বাংলাদেশের প্রধান ইসলামি জঙ্গি দল ও তাদের প্রধান নেতাদের একটি তালিকা ও বিবরণ সংযুক্ত করেছেন। সন্ত্রাসীদের নেটওয়ার্ক ও তাদের অর্থ ও অস্ত্রের উৎস খুঁজে বের করা ও উৎস নির্মুল করা তাঁর বিবেচনায়, বাংলাদেশের নিজের স্বার্থে অগ্রাধিকারের সঙ্গে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। তিনি শিক্ষা সংস্কারের পাশাপাশি দেশের দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারের ওপরও জোর দিয়েছেন। তাঁর প্রস্তাব, সন্ত্রাসীদের ঠেকাতে হলে বাংলাদেশের মানুষ ও সরকারকে একযোগে কাজ করতে হবে। এই কাজটা সবার, কোনো এক দলের বা গ্রুপের নয়, সে কথা তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন।

২.
আলী রীয়াজের এই গ্রন্থটি আমার বিবেচনায় বাংলাদেশে ইসলামি জঙ্গিবাদের ওপর লেখা এ যাবৎকালের মধ্যে সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ বই। এখানে তিনি কেবল জঙ্গিবাদ নামের অসুখের লক্ষণ ও গতি-প্রকৃতি চিহ্নিত করেননি, কীভাবে সে রোগের নিরাময় সম্ভব তার প্রতিও আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন। তাঁর বিবেচনায়, যে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে বাংলাদেশের লালন, সেখানে ধর্মের নামে সহিংসতার কোনো স্থান কোনো কালেই ছিল না। রাষ্ট্রের মদদ ছাড়া এই জঙ্গিবাদের উত্থান সেখানে অসম্ভব ছিল।
ক্ষীণদৃষ্টি রাজনীতিক তাঁদের আশু স্বার্থ উদ্ধার করতে সাধ করে এই সর্বনাশ ডেকে এনেছেন, রীয়াজের এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে আমি একমত, কিন্তু এই অপরাধে আমি শুধু রাজনীতিককে একা দায়ী করতে রাজি নই। আমরা সবাই কমবেশি সে অপরাধে অপরাধী। ইসলামিবাদের প্রধান বহির্লক্ষণ সন্ত্রাস হতে পারে, কিন্তু বাংলাদেশে জঙ্গিদের হাতে বোমাবাজি একমাত্র সমস্যা নয়, এমনকি তা প্রধান সমস্যাও নয়। বোমাবাজির যে সমস্যা, তা আইনশৃঙ্খলার সঙ্গে জড়িত। দেশের আইন ও বিচার বিভাগ চাইলে সে সমস্যা নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে। কোনো কোনো জঙ্গির বিচার ও ফাঁসির ভেতর দিয়ে সে কথার প্রমাণও মিলেছে। কিন্তু বাংলাদেশে ধর্মীয় প্রশ্নে যে অসহিষ্ণুতা ক্রমেই জন্ন নিচ্ছে ও প্রসারিত হচ্ছে, সহিংস ও জঙ্গি সংস্কৃতির সেটিই প্রধান আশ্রয়স্থল। তাদের নিজস্ব ধর্মীয় প্রেসক্রিপশনে ধরা না পড়লে যেকোনো ধরনের সাংস্কৃতিক কাজকেই অনৈসলামিক বলে ইসলামি জঙ্গিরা তার ওপর চড়াও হচ্ছে। তারা যা দাবি করছে, অল্প-স্বল্প প্রতিবাদের পর আমরাও তা মেনে নিচ্ছি। আর একবার যা মেনে নেওয়া হচ্ছে, তাই ‘নর্ম’ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
এর একটা প্রধান কারণ, দেশের মূলধারাভুক্ত দলসমূহ প্রায় বিনা বাক্য ব্যয়ে মৌলবাদী রাজনীতি ও সংস্কৃতির এজেন্ডা নিজেদের এজেন্ডা বলে তার আত্তীকরণ করে ফেলেছে। ফলে মৌলবাদী সংস্কৃতি দেশের প্রধান সংস্কৃতিতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সংখ্যালঘুদের প্রতি অব্যাহত আক্রমণ ও মেয়েদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণের ভেতর এই সংস্কৃতির প্রকাশ এখনো ঘটছে হরহামেশা। মধ্যরাতে শহরের রাস্তায় মেয়েরা আক্রান্ত হলে সব দোষ মেয়েদের, এ কথা বলতে সমাজের দায়িত্বসম্পন্ন লোকেরাও দ্বিধা করেন না। আহমদিয়াদের বিরুদ্ধে ‘কাফন মিছিল’ খুব পুরোনো কোনো ঘটনা নয়। পত্রিকার পাতায় নিরীহ কার্টুনকে উপলক্ষ করে সেকুলার তথ্য-মাধ্যমের ওপর আক্রমণ হচ্ছে প্রকাশ্যে, কার্যত প্রশাসনিক সমর্থনে। আমাদের দৃষ্টির গোচরে বাংলা ভাষার ওপরও আক্রমণ চলছে। ব্রাਜ਼ণ্যবাদের বিরুদ্ধে জাগরণ বলে কেউ কেউ বাংলা ভাষার ইসলামিকরণের বস্তাপচা যুক্তি এখনো তুলে ধরছেন। এর কোনোটাই তুচ্ছ বলে অগ্রাহ্য করার উপায় নেই।
ইসলামি জঙ্গিদের ঠেকাতে হলে তাই প্রতিরোধটা হতে হবে দুমুখো। একদিকে তা হতে হবে রাজনৈতিক, অন্য দিকে সাংস্কৃতিক। সংস্কৃতি বরাবরই বাঙালিদের রাজনৈতিক অধিকার অর্জনে হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছে। ’৫২ থেকে ’৭১−এই দীর্ঘ সময়ের সব পর্যায়েই আমাদের সামগ্রিক আন্দোলনে অবিভাজ্য উপাদান হয়ে থেকেছে সংস্কৃতি। এখন আবার প্রয়োজন সেই হাতিয়ারকে সামনে আনা, তাকে ছাতার মতো তুলে ধরা। বাঙালিদের নিজস্ব সংস্কৃতি যত প্রবল ও ব্যাপকভাবে আমাদের দৈনন্দিন সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার অবিভাজ্য উপাদানে পরিণত হবে, জঙ্গিদের প্রভাব তত হ্রাস পাবে। ক্লাসে হিজাব পরে আসার দাবি জানান বিশ্ববিদ্যালয়ের যে শিক্ষক, বাহবা পাওয়ার বদলে তিনি তাহলে ধিਆারের সম্মুখীন হবেন। জঙ্গিদের বিরুদ্ধে সেটিই হবে প্রকৃত বিজয়।
সংস্কৃতির মতো রাজনীতিতেও জঙ্গিদের অনুপ্রবেশ ঘটেছে ধীরে ধীরে। গুটি গুটি পায়ে ঢুকে এখন তারা কার্যত রাজনীতির একটি প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে। প্রথমে বিরোধী রাজনীতির ছত্রচ্ছায়ায় এবং পরে সরকারের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় জঙ্গিরা রাজনৈতিক ‘লেজিটিমেসি’ও অর্জন করেছে। তাদের এখন আর অবৈধ বা বে-আইনি বলে বাতিল করা যাবে না। এসব দলের বিরুদ্ধে একাত্তরের কথা বলে যত গালই দিই না কেন, আজকের বাংলাদেশে তাদের রাজনৈতিকভাবে মার্জিনাল ভাবাও মোটেই বুদ্ধিমানের কাজ নয়। নির্বাচনের ভেতর দিয়ে দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অন্তর্ভুক্ত হয়েছে তারা। ঠিক সে কারণে এসব দলকে ‘মডারেট ইসলামিক পার্টি’ বলে স্বীকৃতিও দিয়েছে আমাদের কোনো কোনো বিদেশি অভিভাবক। এখন তাদের ঠেকানোর একমাত্র উপায় হলো, এসব দলকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করে তাদের সেই লেজিটিমেসিটুকু ছিনিয়ে আনা। আমি জামায়াত বা ইসলামি দলগুলো নিষিদ্ধ হোক সে দাবি তুলছি না, কিন্তু মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলো মৌলবাদ প্রতিহত করার লক্ষ্যে যদি ন্যুনতম একটি কর্মসুচিতে একমত হয়, তাহলে জামায়াত-জাতীয় দলগুলোকে একঘরে করা কঠিন নয়।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে যাঁরা ভাবেন, এমন সবাইকে সে দাবিটি তুলতে হবে, জোরে, আরও জোরে।
ইসলামিস্ট মিলিট্যানসি ইন বাংলাদেশ−আলী রীয়াজ, রুটলেজ, নিউইয়র্ক ২০০৮
নিউইয়র্ক, ২ জুলাই ২০০৮

প্রথম আলো, ২২ আগস্ট, ২০০৮

Permalink

অবশেষে জামিনে মুক্ত তারেক

হাসপাতালের সামনে দলীয় কর্মীদের হাতে লাঞ্ছিত বুলু, মিলন
বিশেষ প্রতিনিধি

সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বড় ছেলে ও বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব তারেক রহমান অবশেষে জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। তবে আপাতত তিনি হাসপাতালেই থাকছেন বলে জানানো হয়েছে।
গতকাল বুধবার বিকেল সাড়ে চারটায় কারা উপমহাপরিদর্শক মেজর সামসুল হায়দার ছিদ্দিকী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডি ব্লকে গিয়ে তারেক রহমানের কেবিন থেকে কারারক্ষী প্রত্যাহার করে নেন এবং তাঁর মুক্তি নিশ্চিত করেন।
তারেক রহমানের মুক্তির জন্য হাসপাতালের সামনে অপেক্ষায় থাকা বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদল ও মহিলা দলের বিক্ষুব্ধ নেতা-কর্মীদের হাতে কয়েক দফায় লাঞ্ছিত হয়েছেন সাবেক বাণিজ্য উপদেষ্টা বরকত উল্লা বুলু, সাবেক প্রতিমন্ত্রী এহছানুল হক মিলন ও সংরক্ষিত আসনের সাবেক সাংসদ বিলকিস ইসলাম। সাবেক প্রতিমন্ত্রী লুৎফর রহমান খান আজাদকেও ধাওয়া করে দলের কর্মীরা। অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জের ধরেই এসব ঘটনা ঘটে বলে জানা গেছে।
বিএনপির নেতা-কর্মীদের মারধর, পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও স্েলাগানের ফলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে দফায় দফায় আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হলেও পুলিশকে নিষ্কিত্র্নয় দেখা গেছে। হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও তাদের আত্মীয়স্বজন এ সময় বিড়ম্বনায় পড়ে।

বিকেল পৌনে পাঁচটায় কারা উপমহাপরিদর্শক মেজর সামসুল হায়দার ছিদ্দিকী সাংবাদিকদের জানান, তারেক রহমানকে জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। তবে তিনি চিকিৎসার জন্য আপাতত হাসপাতালেই থাকবেন। কারারক্ষী প্রত্যাহারের পর তারেক রহমানের নিরাপত্তার জন্য পুলিশি পাহারার ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
তারেক রহমানের আইনজীবী ব্যারিস্টার নাসিরউদ্দিন অসীম সাংবাদিকদের বলেন, তিনি গুরুতর অসুস্থ। তাই বাড়িতে না গিয়ে চিকিৎসার জন্য আপাতত হাসপাতালেই থাকবেন। এর পর উন্নত চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জানা গেছে, মুক্তির খবর নিশ্চিত হওয়ার পর তারেক রহমান স্ত্রী ডা. জোবাইদা রহমানের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি হাসপাতালের কেবিন কক্ষের জানালা দিয়ে নিচে থাকা কর্মীদের উদ্দেশে হাত নাড়েন ও কবুতর উড়িয়ে সবাইকে শুভেচ্ছা জানান।
প্রায় দেড় বছর কারাবন্দী তারেক রহমানের মুক্তির খবর জানানো হলে হাসপাতাল চত্বরে অবস্থানরত নেতা-কর্মীরা উল্লাসে ফেটে পড়ে। এ সময় মুহুর্মুহু স্েলাগান দেয় তারা−‘জেলের তালা ভাঙব, খালেদা জিয়াকে আনব’। সকাল থেকেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে নেতা-কর্মীদের ভিড় ছিল লক্ষণীয়।
বিএনপির মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন, স্থায়ী কমিটির সদস্য চৌধুরী তানভীর আহমেদ সিদ্দিকীসহ বেশ কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা বিকেলেই ফুলের তোড়া নিয়ে তারেকের সঙ্গে দেখা করেন।
ঢাকা সেনানিবাসের শহীদ মইনুল সড়কের বাসভবন থেকে গত বছরের ৮ মার্চ তারেক রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়। ওই দিনই গুলশান থানায় তাঁর বিরুদ্ধে কোটি টাকা চাঁদা নেওয়ার অভিযোগে মামলা করেন ব্যবসায়ী ও বিএনপির নেতা আমিন আহমেদ ভুঁইয়া। তাঁর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, কর ফাঁকি, অবৈধ সম্পদ অর্জনসহ ১৩টি মামলা বিচারাধীন। সব মামলায় তিনি জামিন পেয়েছেন।
গত ৩১ জানুয়ারি অসুস্থতার কারণে তারেক রহমান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। তাঁর মেরুদন্ডে ব্যথা রয়েছে। বিভিন্ন সময় তাঁর চিকিৎসকেরা তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানো প্রয়োজন বলে মত দিয়েছেন।
তারেকের বিবৃতি: গত রাতে এক বিবৃতিতে তারেক রহমান তাঁর জামিনে মুক্তির জন্য আল্লাহর কাছে শুকরিয়া জানান। তিনি তাঁর মা খালেদা জিয়ার মুক্তি এবং সব রাজবন্দীর মুক্তি কামনা করেন। এ ছাড়া দেশের আপামর জনসাধারণ এবং অন্য যাঁরা আল্লাহর দরবারে তাঁদের পরিবারের জন্য দোয়া করছেন, তাঁদের সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তিনি। তারেক রহমান তাঁর চিকিৎসক, আইনজীবী, কৃষক, কলকারখানার শ্রমিক, প্রকৌশলী, ছাত্র-শিক্ষক, সাংবাদিক, প্রতিরক্ষা বাহিনী ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য এবং অন্য সব পেশার মানুষের অকৃপণ ভালোবাসার জন্য কৃতজ্ঞতা জানান।
বুলু, মিলন, বিলকিস লাঞ্ছিত: তারেক রহমানের মুক্তির খবরে বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে জড়ো হওয়া নেতা-কর্মীদের মধ্যে গতকাল কয়েক দফা সংঘর্ষ হয়। এতে এহছানুল হক মিলন, বরকত উল্লা বুলু, বিলকিস ইসলাম ছাড়াও বাড্ডার ওয়ার্ড কমিশনার পেয়ারা মোস্তফা এবং মিরপুর থানা বিএনপির নেত্রী মনিরা মোশাররফ লাঞ্ছিত হন। পরে দলের নেতা ও পুলিশের সহায়তায় এসব নেতা বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ত্যাগ করেন।
আগত নেতা-কর্মীরা সারাক্ষণ মিছিল, স্েলাগানে মুখর করে রাখে বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা। এর সঙ্গে সংস্কারপন্থী বলে পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনায় ভেতরে চিকিৎসাধীন অনেক রোগী, তাদের স্বজনেরা, আগত অসুস্থ রোগী, ভর্তি-ইচ্ছুক রোগী এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসকেরা ছাড়া অন্যরাও রীতিমতো বিপাকে পড়ে। অনেকে এদিক-সেদিক ছোটাছুটি করে নিরাপদ স্থানে যাওয়ার চেষ্টা করে।
বেলা পৌনে দুইটার দিকে তারেককে দেখতে বঙ্গবন্ধু মেডিকেলে যান সাবেক শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী এহছানুল হক মিলন। তিনি শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেট এবং বঙ্গবন্ধু মেডিকেলের মাঝের সড়ক দিয়ে মেডিকেলের মসজিদের প্রবেশমুখ দিয়ে ঢোকেন। এ সময় বেশ কয়েকজন নেতা-কর্মীও তাঁর সঙ্গে ছিলেন।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের যুগ্ম সম্পাদক সাদেউল কবির নীরব বলেন, এহছানুল হক মিলন ডি ব্লকের দিকে খানিকটা এগিয়ে যেতেই ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসম্পাদক ও কচুয়ার অধিবাসী বিল্লাল হোসেনের নেতৃত্বে একদল যুবক ‘ধর ধর’ বলে মিলনের দিকে এগিয়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গেই এদের অনুসরণ করে উপস্িথত শতাধিক ক্ষুব্ধ নেতা-কর্মী। মুহুর্তে মিলন এদের রোষানলে পড়ে লাঞ্ছনার শিকার হন। বিক্ষুব্ধ নেতা-কর্মীরা তাঁকে লক্ষ্য করে একের পর এক জুতা ও ইটপাটকেল ছুড়ে মারে।
একপর্যায়ে যুবদলের সাধারণ সম্পাদক মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল ও পুলিশের সদস্যরা এগিয়ে এসে মিলনকে বিক্ষুব্ধ নেতা-কর্মীদের রোষানল থেকে রক্ষা করে হাসপাতাল চত্বর থেকে বের করে নিয়ে যায়। ছাত্রদলের নেতা সাদেউল বলেন, মিলন ও ছাত্রদলের বেল্লাল হোসেনের বাড়ি চাঁদপুরের একই এলাকায়। সেখানকার অন্তর্কোন্দলের শিকার হয়েছেন মিলন। এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে উপস্িথত সাংবাদিকদের সাদেউল বলেন, বিএনপির বদনাম করতে একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী এ ঘটনা ঘটিয়েছে।
বরকত উল্লা বুলু: বিকেল চারটার দিকে অর্ধশতাধিক নেতা-কর্মী নিয়ে যুবদলের সভাপতি বরকত উল্লা বুলু বঙ্গবন্ধু মেডিকেলে আসেন। প্রবেশমুখ থেকেই বুলুর অনুগামী নেতা-কর্মীদের মুহুর্মুহু স্েলাগানে ভরে ওঠে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর। একপর্যায়ে অবস্থানরত নেতা-কর্মীদের অনেকেও এই মিছিলে যোগ দেয়। কিন্তু মিছিলটি ডি ব্লকের ভবন ঘুরে আবার ফিরে আসতেই প্রতিরোধের মুখে পড়ে।
একদল নেতা-কর্মী তাঁকে দালাল বলে নানা কটুক্তি করতে থাকে। এ সময় বুলুর সমর্থকেরাও পাল্টাপাল্টি ধাওয়া করে। এতে উভয় পক্ষের মধ্যে কিছুক্ষণ পাল্টাপাল্টি ধাওয়া হয়। একপর্যায়ে ব্যাপক রোষের মুখে পড়েন বুলু। তিনি প্রথমে একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের গাড়িতে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করেন।

Permalink

বিচার ভিক্ষা চাই না ন্যায়বিচার চাই

অ্যাডভোকেট আনিসুল হক

রায় পক্ষে না গেলেই আদালতকে কটাক্ষ করতে হবে আর পক্ষে গেলে প্রশংসা করা হবে−সেই দর্শন থেকে আমি লিখছি না। আমি যতটুকু জেনেছি, তা থেকেই রায়ের কয়েকটি অসংগতি তুলে ধরতে চাই।
আদালত তাঁর রায়ে একজনের ফাঁসি বহাল রেখেছেন এবং ছয়জনকে খালাস দিয়েছেন। আমার অভিমত, ফাঁসি বহাল রাখার জন্য আদালত অবশ্যই একজন সাক্ষীর ওপর বিশ্বাস রেখেছেন। আমার কথা হলো, একই সাক্ষীর ওপর বিশ্বাস করে একজনকে ফাঁসি দেওয়া হলো, অথচ আরেকজনের বেলায় সেই সাক্ষীকেই অবিশ্বাস করা হলো। এটা রায়ের একটি অসংগতি।
লক্ষ করেছি, বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিচারিক আদালত থেকে সব বিএনপি নেতা খালাস পেয়ে গেলেন। এখন হাইকোর্টে আসার পর এ মামলার প্রায় সব আসামি খালাস পেলেন। জনগণ যদি মনে করে দলীয় বিবেচনায় রায় হয়েছে−সেটা কি অন্যায় হবে?
ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ভেতরে জাতীয় নেতারা যে নিহত হয়েছিলেন, সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই। আসামি ও বাদী কোনো পক্ষই এ ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করেনি। আসামি খালাস পাওয়ার পর প্রশ্ন উঠতেই পারে, চার নেতাকে কারা হত্যা করল? আসলে দোষী কারা, সেটা আদালতের বিবেচনায় রাখা দরকার ছিল।
শুনেছি, মামলার ৬৪ নম্বর সাক্ষী ছিলেন তদন্তকারী কর্মকর্তা, রায়ে যাঁর সমালোচনা করা হয়েছে। বলা হয়েছে, মামলা সুষ্ঠুভাবে তদন্ত করা হয়নি। ২১ বছর তদন্ত না হওয়ার জন্য যেসব সরকার রাষ্ট্র পরিচালনায় ছিল, সেসব সরকার দায়ী। ২১ বছরে এ মামলার তদন্ত কেন হলো না, সে ব্যাপার আদালত কোনো বক্তব্য রাখেননি।
২১ বছর মামলা তদন্ত না হওয়ায় অনেক সাক্ষ্য, আলামত নষ্ট হয়ে গেছে, সেটা আদালত দেখেছেন। আমি আশা করেছিলাম, আদালত হয়তো এসব বিবেচনায় আনবেন, এসব আইনের বাইরে নয়। আইনকে সমুন্নত রাখতে এসব বিষয় বিবেচনায় আসতেই পারে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি আদালত সেটা করেননি।
আমার বক্তব্য, আমরা বিচার ভিক্ষা চাই না, সুষ্ঠু ও ন্যায়বিচার চাই। এটা পাওয়া আমার অধিকার।
অ্যাডভোকেট আনিসুল হক: রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি

প্রথম আলো, ২৯ আগস্ট, ২০০৮

Permalink

ওরা সবাই খালাস


বিশেষ প্রতিনিধি

হাইকোর্ট ঐতিহাসিক জেলহত্যা মামলায় শুধু পলাতক আসামি রিসালদার মোসলেমউদ্দিন ওরফে হিরন খানের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন। নিম্ন আদালতের বিচারে মৃত্যুদন্ড পাওয়া অপর দু’জন এবং কারাগারে আটক যাবজ্জীবন কারাদন্ডের চার আসামিকেই খালাস দেওয়া হয়েছে। নিম্ন আদালত তিনজনকে মৃত্যুদন্ড এবং ১২ জনকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দিয়েছিলেন।

অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত না হওয়ায় মৃত্যুদন্ড থেকে অব্যাহতি পেয়েছে পলাতক দুই আসামি দফাদার মারফত আলী শাহ এবং এলডি দফাদার মোঃ আবুল হাসেম মৃধা। সন্দেহের সুবিধায় আরো খালাস পেয়েছে লে. কর্নেল (বরখাস্ত) সৈয়দ ফারুক রহমান, কর্নেল (অব.) সৈয়দ শাহরিয়ার রশীদ, মেজর (অব.) বজলুল হুদা ও লে. কর্নেল (অব.) একেএম মহিউদ্দিন আহমেদ।

কারাগারে বন্দি মাত্র এই চার আসামিই নিম্ন আদালতের দেওয়া যাবজ্জীবন কারাদন্ডের বিরুদ্ধে আপিল করেছিল। এ মামলায় খালাস পেলেও বঙ্গবন্ধ হত্যা মামলায় মৃত্যুদন্ড হওয়ায় এখনো তাদের কারাগারেই থাকতে হবে। অপরদিকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড পাওয়া পলাতক অপর আট আসামির সম্পর্কে হাইকোর্ট কোনো মতামত না দেওয়ায় তাদের দন্ড বহাল রয়েছে বলে আইনজীবীদের ব্যাখ্যা পাওয়া গেছে।

বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি আতাউর রহমান খান সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ গতকাল বৃহস্পতিবার নিম্ন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আসামিদের চারটি আপিল ও রাষ্ট্রপক্ষের ডেথ রেফারেন্স নিস্পত্তি করে এ রায় দেন। রায়ে আদালত বলেছেন, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা খুনির সঙ্গীদের চিহ্নিত করতে পারেননি। ভুল ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছিল।

হাইকোর্টের রায়ের পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি আনিসুল হক সর্বোচ্চ আদালতে আপিল করার ঘোষণা দিয়ে বলেছেন, ‘আইনের নামে এ প্রহসন দুঃখজনক। স্বাধীনতার জন্য যারা রক্ত দিয়েছেন এবং আমরা যারা রক্ত দিতে দেখেছি তারা এ রায়ে মর্মাহত।’

অপরদিকে নিম্ন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে দুই আপিলকারীর কৌঁসুলি ব্যারিষ্টার আবদুল্লাহ আল মামুন সমকালকে বলেন, হাইকোর্টের রায়ে প্রমাণ হলো বাংলাদেশে নির্দোষ ব্যক্তি আর ফাঁসিতে ঝুলবে না। এদেশে আইনের শাসন আছে।

তবে অপর এক খালাসপ্রাপ্ত আসামির কৌঁসুলি প্রবীণ আইনজীবী আবদুর রেজাক খান বলেন, এ মামলার তদন্ত যথাযথ হয়নি বলেই প্রকৃত আসামিরা চিহ্নিত হয়নি। একই কারণে কারো বিরুদ্ধে সন্দেহাতীতভাবে অপরাধ প্রমাণ করা সম্ভব হয়নি।

নিম্ন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে কারাগারে আটক যাবজ্জীবন কারাদন্ডপ্রাপ্ত চার আসামির আপিল ও রাষ্ট্রপক্ষের ডেথ রেফারেন্সর ওপর হাইকোর্ট দীর্ঘ ২৬ কার্যদিবস শুনানি গ্রহণ করেন এবং ৮ কার্যদিবসে রায় ঘোষণা শেষ করেন। আপিল ও ডেথ রেফারেন্সের এ শুনানি দীর্ঘ চার বছর পর গত ১৩ জুলাই হাইকোর্টে শুরু হয়।
নিম্ন আদালত যে পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন হাইকোর্টের রায়ে তার আংশিক পরিবর্তন হয়েছে। নিম্ন আদালতের রায়ের ভিত্তি ছিল, ১৫ আগষ্টের পট পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরাই একই বছর ২ নভেম্বরে খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থানে পরাজিত হওয়ার মুখে জেলহত্যা ঘটিয়েছে। এ সিদ্ধান্তের জন্য যে তথ্যকে গুরুত্ব দেওয়া হয় তা ছিল, বঙ্গভবন থেকে টেলিফোনে খুনিদের কারাগারে প্রবেশ করতে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। ১৫ আগস্টের পর থেকে তারা বঙ্গভবনেই থাকত। কিন্তু হাইকোর্ট খুনিদের কারাগারে প্রবেশ করতে টেলিফোনে দেওয়া নির্দেশের বিষয়টি সন্দেহাতীতভাবে বিশ্বাস করেননি।

বিশ্বাস না করার ক্ষেত্রে তিনজন সাক্ষীর সাক্ষ্যকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছে। খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল এমন একজন সাক্ষী কর্নেল শাফায়াত জামিল এ মামলায় সাক্ষ্য দিতে গিয়ে বলেছেন, ১৯৭৫ সালের ২ নভেম্বর মধ্যরাতেই তারা কেন্দ্রীয় টেলিফোন এক্সচেঞ্জের নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব নিজেদের হাতে নিয়েছিলেন।

অপর সাক্ষী রাষ্ট্রপতির তৎকালীন এডিসি কমান্ডার রাব্বানী তার সাক্ষ্যে বলেছেন, ২ নভেম্বর রাত ১১টার দিকেই তিনি ঘুমিয়েছেন। রাত ২টার দিকে রাষ্ট্রপতি তাকে মেসেঞ্জার পাঠিয়ে ডেকে আনেন। তার কক্ষেই টেলিফোন ছিল।

হাইকোর্ট এক্ষেত্রে আসামি পক্ষের কৌঁসুলিদের যুক্তিকে বিবেচনায় নিয়েছেন। তাদের যুক্তি হচ্ছে, বঙ্গভবনের টেলিফোন সচল থাকলে মেসেঞ্জার পাঠিয়ে এডিসিকে ডেকে আনার প্রয়োজন হতো না।

এ পর্যবেক্ষণ সম্পর্কে আদালত আরো নিশ্চত হয়েছেন নিহত জাতীয় নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলামের বোনের ছেলে সেনা কর্মকর্তা আনিসুজ্জামানের সাক্ষ্য থেকে। এ সাক্ষ্যে উল্লেখ রয়েছে, তিনি সে রাতে সদরঘাট এলাকায় দায়িত্ব পালন করছিলেন। উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে টেলিফোনে কেন্দ্রীয় কারাগারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি। একজন হাবিলদার পাঠিয়ে কারাগারে খবর নিয়ে জানতে পারেন বাসা থেকে পাঠানো নাশতা ফেরত গেছে। তিনিই সেদিন কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে সৈয়দ নজরুল ইসলামের লাশ গ্রহণ করেছিলেন।

হাইকোর্টের রায়ে এসব সাক্ষ্যের ভিত্তিতে সেই রাতে বঙ্গভবন থেকে টেলিফোন করে খুনিদের কারাগারে প্রবেশ করতে দেওয়ার তথ্যকে গুরুত্ব দেওয়ার বিপক্ষে মত প্রকাশ করা হয়েছে। আর এ সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই পারিপার্শিকতার আলোকে সরাসরি জড়িত ছিলেন না এমনসব অপরাধীকে সন্দেহাতীতভাবে চিহ্নিত করা যায়নি বলে আদালতের কাছে প্রতীয়মান হয়েছে।

আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, তদন্তকারী কর্তৃপক্ষ প্রকৃত হত্যাকারীদের খুঁজে বের করতে ব্যর্থ হয়েছে। কেবল তিনজন সাক্ষী ছাড়া অন্যরা মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি দফাদার মারফত আলী ও দফাদার আবুল হাসেম মৃধার বিরুদ্ধে জোরালো কোনো সাক্ষ্য দেয়নি। ফলে প্রত্যক্ষদর্শী নয় এমন তিন সাক্ষীর সাক্ষ্যের ওপর ভিত্তি করে হত্যা মামলায় কারো মৃত্যুদন্ড দেওয়া যৌক্তিক নয়।

আরো বলা হয়, যেসব সাক্ষী বঙ্গভবন ও কারাগারে উপস্টি’ত ছিলেন বলে সাক্ষ্য দিয়েছেন তা অবিশ্বাস্য। বঙ্গভবনের যেসব কর্মচারী সাক্ষ্য দিয়েছেন তাদের সাক্ষ্যও বিশ্বাসযোগ্য নয়। কারণ সে রাতে তারা কেন সেখানে উপস্থিত ছিলেন তারও কোনো বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখ্যা নেই।

হাইকোর্টের রায়ে আরো বলা হয়েছে, বঙ্গভবন ও কেন্দ্রীয় কারাগারে আগমন ও প্রস্থানের নিবন্ধন বই নিম্ন আদালতে উপস্থাপন করে হত্যাকারীদের বিষয়টি প্রমাণ করা হয়নি। তাছাড়া সেদিন বঙ্গভবনে সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের আসা-যাওয়া থেকে তাদের উদ্দেশ্য কী ছিল তা প্রমাণ হয় না।

আদালত বলেন, আসামিদের চিহ্নিত করার বিষয়টিও অসামঞ্জস্যপূর্ণ। সাক্ষীদের কেউ কেউ বলেছেন কারাগারে প্রবেশ করা সেনাবাহিনীর সদস্যরা খাকি পোশাক পরা ছিল। আবার কেউ বলেছেন কালো পোশাকের কথা। সব সাক্ষীর বক্তব্য ও মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী কর্নেল শাফায়াত জামিলের সাক্ষ্যের অসামঞ্জস্যতা এ মামলায় বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
হাইকোর্টে রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি আনিসুল হককে শুনানিতে সহায়তা করেন অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলাম সুজন, অ্যাডভোকেট মোশাররফ হোসেন কাজল, অ্যাডভোকেট এসএম রেজাউল করিম, ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস, অ্যাডভোকেট মমতাজ উদ্দিন মেহেদী এবং অ্যাডভোকেট মোতাহার হোসেন সাজু।

আসামি সাবেক সেনা কর্মকর্তা কর্নেল শাহরিয়ারের পক্ষে সাবেক অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল আবদুর রেজাক খান, মেজর মহিউদ্দিন এবং মেজর বজলুল হুদার পক্ষে ব্যারিস্টার আবদুল্লাহ আল মামুন, কর্নেল ফারুক রহমানের পক্ষে অ্যাডভোকেট সৈয়দ মিজানুর রহমান ছাড়াও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক তিন আসামি রিসালদার মোসলেম উদ্দিন, দফাদার মারফত আলী এবং দফাদার আবুল হাসেম মৃধার পক্ষে নিযুক্ত স্টেট ডিফেন্স অ্যাডভোকেট আবদুল হান্নান শুনানি পরিচালনা করেন।

বঙ্গবন্ধ শেখ মুজিবুর রহমান হত্যার পর ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, মনসুর আলী ও এএইচএম কামরুজ্জামানকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে হত্যা করা হয়। মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রবাসী সরকারের চার প্রধান ব্যক্তিত্বকে খুন করার পরদিন লালবাগ থানায় তৎকালীন কারাপুলিশের ডিআইজি কাজী আবদুল আওয়াল আসামি মোসলেমউদ্দিনসহ চারজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। মামলাটি পরবর্তীতে সরকারিভাবেই স্থগিত করা হয়। দীর্ঘ ২৩ বছর পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতা গ্রহণের পর মামলাটি পুনরুজ্জীবিত করে ১৯৯৮ সালের ১৫ অক্টোবর আসামি মোসলেমউদ্দিন, লে. কর্নেল সৈয়দ ফারুক রহমানসহ ২৩ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়।

দীর্ঘ ৬ বছরে মামলার বিচার প্রক্রিয়া শেষ করে ২০০৪ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকা মহানগর দায়রা জজ মোঃ মতিউর রহমান রায় দেন। রায়ে আদালত মোসলেমউদ্দিন, দফাদার মারফত আলী ও দফাদার আবুল হাসেম মৃধাকে মৃত্যুদন্ড দেন। নিল্ফু আদালতে ১২ জনের যাবজ্জীবন কারাদন্ড হয়।

হাইকোর্ট থেকে খালাস পাওয়া চারজন ছাড়াও যাবজ্জীবন পাওয়া অন্যরা হলো লে. কর্নেল খন্দকার আবদুর রশীদ (বরখাস্ত), লে. কর্নেল শরিফুল হক ডালিম, লে. কর্নেল (অব.) এমএইচএমবি নূর চৌধুরী, লে. কর্নেল (অব.) এএম রাশেদ চৌধুরী, মেজর (অব্যাহতি) আহাম্মদ শরিফুল হোসেন, ক্যাপ্টেল্টন (অব.) আবদুল মাজেদ, ক্যাপ্টেন (অব্যাহতি) মোঃ কিসমত হোসেন এবং ক্যাপ্টেন (অব.) নাজমুল হোসেন আনসার। রায়ের পরপরই দন্ডাদেশপ্রাপ্তরা আপিল করে। ল্যান্সার মহিউদ্দিন গত বছর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফেরত পাঠানোর পর জেল আপিল করে।

নিম্ন আদালতের বিচারে মেজর মোঃ খায়রুজ্জামান, কেএম ওবায়দুর রহমান, শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, নুরুল ইসলাম মঞ্জুর ও তাহেরউদ্দিন ঠাকুরকে এ হত্যাকান্ডের দায় থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি আপিল করবেন

রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি অ্যাডভোকেট আনিসুল হক হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবেন। তিনি সমকালকে বলেন, ‘রায়ে কোর্ট কী লিখবেন সেটা পরীক্ষা করে আইনি প্রতিকার চাইব। রায় সম্পর্কে এ মুহূর্তে শুধু এ কথাই বলতে পারি, আইনের নামে এটা প্রহসন। যা দুঃখজনক। বাস্তবতাকে অস্বীকার করা এই রায় বিচারের প্রতি সাময়িকভাবে হতাশাব্যঞ্জক হলেও শেষ পর্যন্ত ন্যায়বিচার পাওয়া যাবে বলে আমি বিশ্বাস করি। বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের ওপর আমার অগাধ বিশ্বাস আছে। তাই আইনি লড়াই চালিয়ে যাব।’
তিনি আরো বলেন, ‘এর আগেও হাইকোর্টের কিছু কিছু বিচারপতির ব্যবহার আমরা দেখেছি। কিন্তু পরবর্তীতে আপিল বিভাগ তা ঠিক করে দিয়েছেন। এখনো আপিল বিভাগের ওপর আমার বিশ্বাস ও আস্থা রয়েছে।’

সমকাল, ২৯ আগস্ট, ২০০৮

Permalink

ফারুক, রশিদ, হুদাসহ মূল আসামিরা বেকসুর খালাস!


হাইকোর্টে জেলহত্যা মামলার রায় ঘোষণা * এ রায় প্রহসন: রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি

আশরাফ-উল-আলম
১৯৭৫ সালের প্রাসাদ ষড়যন্ত্র, ক্ষমতা দখল-পাল্টা দখলের ধারাবাহিকতায় রাতের অন্ধকারে কারাগারে বন্দী অবস্থায় জাতীয় চার নেতাকে হত্যার দায় থেকে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামি দফাদার মারফত আলী শাহ, দফাদার মো. আবুল হাশেম মৃধা ও যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামি লে. কর্নেল (বরখাস্তকৃত) সৈয়দ ফারুক রহমান, লে. কর্নেল (অব্যাহতিপ্রাপ্ত) সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান, মেজর (অব্যাহতিপ্রাপ্ত) বজলুল হুদা ও মেজর (অব.) এ কে এম মহিউদ্দিন আহাম্মদকে খালাস দিয়েছেন হাইকোর্ট।
একই সঙ্গে পলাতক এক আসামির মৃত্যুদন্ড বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট। নিম্ন আদালতে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত অপর আট আসামির সাজাও বহাল রাখা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামিদের মৃত্যুদন্ড নিশ্চিতকরণ (ডেথ রেফারেন্স) ও কারাগারে আটক যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের আপিলের রায় ঘোষণা করা হয়।
বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি আতাউর রহমান খানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের একটি বিশেষ বেঞ্চ এই রায় দেন। গত ১৩ জুলাই হাইকোর্টে জেলহত্যাসংক্রান্ত মৃত্যুদন্ড নিশ্চিতকরণ ও আপিল শুনানি শুরু হয়। গত ১৮ আগস্ট রায় ঘোষণা শুরু হয়। টানা আট কার্যদিবস ধরে রায় ঘোষণা করা হয়।
রায়ের প্রতিক্রিয়ায় রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি অ্যাডভোকেট আনিসুল হক সাংবাদিকদের বলেন, এ রায় প্রহসন, দুঃখজনক ও বাস্তবতাকে অস্বীকার করা। তিনি বলেন, রায়ে মনে হয়েছে যে একজন লোক কারাগারে এসে চারজনকে খুন করে চলে গেল। এর পেছনে যেন আর কেউ জড়িত নয়। হত্যার পেছনে কোনো পরিকল্পনা ছিল না বা কোনো ষড়যন্ত্র ছিল না। কিন্তু বাস্তবতা তো ভিন্ন। আনিসুল হক বলেন, ‘এ রায়ের বিরুদ্ধে আমরা আপিল করব। লড়াই চালিয়ে যাব। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের প্রতি আমাদের বিশ্বাস রয়েছে। শেষ পর্যন্ত আমরা ন্যায়বিচার পাব।’
হাইকোর্টের রায়ে পলাতক আসামি রিসালদার মোসলেম উদ্দিন ওরফে মুসলেম উদ্দিন ওরফে হিরন খান ওরফে মুসলেম উদ্দিন খানের মৃত্যুদন্ড বহাল রাখা হয়েছে। পলাতক অপর আট আসামি কর্নেল (অব.) খন্দকার আবদুর রশীদ, লে. কর্নেল (অব.) শরিফুল হক ডালিম, কর্নেল (অব.) এম বি নুর চৌধুরী, লে. কর্নেল (অব.) এ এম রাশেদ চৌধুরী, মেজর (অব.) আহম্মদ শরিফুল হোসেন, ক্যাপ্টেন (অব.) আবদুল মাজেদ, ক্যাপ্টেন (অব.) কিশমত হাশেম ও ক্যাপ্টেন (অব.) নাজমুল হোসেন আনসারের যাবজ্জীবন কারাদন্ড বহাল রেখেছেন আদালত।
২০০৪ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালত জেলহত্যা মামলার রায় দেন। রায়ে পলাতক তিন আসামিকে ফাঁসি ও ১২ জনকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেন। নৃশংসতম এই হত্যার পেছনে কোনো ষড়যন্ত্র খুঁজে না পাওয়ায় ঢাকা মহানগর দায়রা জজ মো. মতিউর রহমান ষড়যন্ত্রের অভিযোগে অভিযুক্ত চার রাজনীতিবিদ কে এম ওবায়েদুর রহমান, শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, নুরুল ইসলাম মঞ্জুর ও তাহেরউদ্দিন ঠাকুর এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা মেজর (অব.) খায়রুজ্জামানকে বেকসুর খালাস দেন। শুধু তা-ই নয়, ষড়যন্ত্রের কোনো প্রমাণ না পাওয়ায় মামলার ২০ আসামির সবাইকে ফৌজদারি কার্যবিধি ১২০(খ) ধারায় ষড়যন্ত্রের অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
জাতীয় চার নেতাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী অবস্থায় হত্যার ২৯ বছর পর দেওয়া নিম্ন আদালতের ওই রায়ে মূল পরিকল্পনাকারীদের সঙ্গে সেনা কর্মকর্তাদের যোগাযোগ ছিল বলে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু কারা ওই পরিকল্পনাকারী, বিচারিক আদালত তা চিহ্নিত করেননি। নিম্ন আদালতের রায় নিয়ে ব্যাপক সমালোচনাও হয়।
নিম্ন আদালত রায় দেওয়ার চার বছর পর আপিল আদালতের (হাইকোর্ট) রায়েও বলা হয়েছে, জেল হত্যাকান্ডে কোনো ষড়যন্ত্রের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। আপিল আদালতের দৃষ্টিতে জেল হত্যাকান্ড একটি বর্বরোচিত ও কাপুরুষোচিত ঘটনা মনে হলেও ঘটনার প্রকৃত নায়কদের চিহ্নিত করা যায়নি।
হাইকোর্ট বলেছেন, যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আট আসামি আপিল করেননি বলে তাঁদের বিরুদ্ধে আদালত কোনো সিদ্ধান্ত দিচ্ছেন না। তাঁরাও আপিল করলে রায় তাঁদের অনুকুলে যেত। সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের অভিমত, হাইকোর্টের দৃষ্টিতে একজনকেই দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে।
হাইকোর্টের অভিমত: হাইকোর্ট রায়ে বলেছেন, জেলহত্যা মামলায় যাঁরা সাক্ষ্য দিয়েছেন, তাঁদের পরস্পরের বক্তব্যের মধ্যে কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যায়নি। একজন সাক্ষীর সঙ্গে অন্য সাক্ষীর বক্তব্যের বৈপরীত্য রাষ্ট্রপক্ষের পুরো মামলাটিকে সন্দেহপূর্ণ মনে হয়েছে। এই সন্দেহের সুবিধাটুকু আসামিরাই পেয়ে থাকেন।
আদালত বলেছেন, এই মামলার আসামিরা পরস্পর ষড়যন্ত্র করেছেন বা ঘটনা সংঘটনের জন্য বঙ্গভবন থেকে টেলিফোনে কারা কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করেছেন−রাষ্ট্রপক্ষের এই অভিযোগ আদালতের কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়নি।
লে. কর্নেল (বরখাস্তকৃত) সৈয়দ ফারুক রহমান, লে. কর্নেল (অব্যাহতিপ্রাপ্ত) সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান, মেজর (অব্যাহতিপ্রাপ্ত) বজলুল হুদা ও মেজর (অব.) এ কে এম মহিউদ্দিন আহাম্মদসহ বেশকিছু সেনা কর্মকর্তা জেল হত্যাকান্ডের আগে বঙ্গভবনে অবস্থান করছিলেন বলে সাক্ষীরা তাঁদের সাক্ষ্যে বলেছেন। এ প্রসঙ্গে আদালতের রায়ে বলা হয়, সেনা কর্মকর্তারা কোন উদ্দেশ্য নিয়ে বঙ্গভবনে আসা-যাওয়া করেছিলেন, আদালতের কাছে তা সুস্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয়নি।
বঙ্গভবনের তৎকালীন কর্মকর্তারা এই মামলায় সাক্ষ্য দিয়ে সেনা কর্মকর্তাদের বঙ্গভবনে উপস্িথতির কথা বললেও আদালত তা বিশ্বাস করেননি। এ প্রসঙ্গে রায়ে বলা হয়েছে, ঘটনার আগে পরে কারা বঙ্গভবনে আসা-যাওয়া করেছেন, তা নির্ণয় করা হয়নি। ওই সময়কার বঙ্গভবনে রক্ষিত রেজিস্টার আদালতে উপস্থাপন করা হয়নি। উপস্থাপন করা হলে অবশ্যই বঙ্গভবনে যাতায়াতকারীদের চিহ্নিত করা যেত।
কারাগার সম্পর্কেও আদালত বলেন, ঘটনার সময়কার কারা রেজিস্টারগুলো আদালতে উপস্থাপন করা হয়নি বলে কারাগারে কে কে প্রবেশ করেছিলেন, তা চিহ্নিত হয়নি। এসব কারণে আদালত কারাগার ও বঙ্গভবনের সাক্ষীদের সাক্ষ্য বিশ্বাস করেননি।
কর্নেল শাফায়াত জামিলের সাক্ষ্য আদালত গুরুত্ব দিয়েছেন বলে রায়ে বলা হয়। কিন্তু ওই সাক্ষীর সাক্ষ্যকে অন্য কোনো সাক্ষী সমর্থন করেননি। যে কারণে সন্দেহের ঊর্ধ্বে গিয়ে মামলা প্রমাণ করতে পারেনি রাষ্ট্রপক্ষ।
মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামি মারফত আলী ও আবুল হাশেম মৃধার ঘটনাস্থলে উপস্িথতি সম্পর্কে তিনজন সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন। এই তিনজন সাক্ষী যে ঘটনাস্থলে উপস্িথত ছিলেন, তা আদালতের কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়নি বলে রায়ে বলা হয়েছে। আসামিদের শনাক্ত করার বিষয়ে সাক্ষীরা যে সাক্ষ্য দিয়েছেন, তাও আদালতের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হয়নি। অনেক গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীকে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য আদালতে উপস্িথত করা হয়নি বলে রায়ে বলা হয়েছে।
এই মামলার বিচার চলাকালে আসামিপক্ষ জেলহত্যার ঘটনা খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থানের ফল বলে দাবি করেছিল। এ প্রসঙ্গে রায়ে আদালত বলেছেন, খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে অভ্যুত্থান চেষ্টাকারীদেরও এই ঘটনায় সম্পৃক্ত করার বিষয়টি আদালত বিবেচনায় নিয়েছেন।
জেলহত্যা মামলাটি যথাযথভাবে তদন্ত হয়নি বলে আদালত বারবার তাঁর রায়ে উল্লেখ করেছেন। আদালত বলেছেন, তদন্ত কর্মকর্তা সঠিকভাবে তদন্ত করলে প্রকৃত দুষ্ককৃতকারীদের চিহ্নিত করা সম্ভব হতো।
ঘটনার বিবরণ: ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর একই বছরের ৩ নভেম্বর রাত চারটার দিকে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী ও কামরুজ্জামানকে নৃশংসভাবে খুন করা হয়। ৪ নভেম্বর তৎকালীন কারা উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি, প্রিজন) আব্দুল আউয়াল লালবাগ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় রিসালদার মোসলেম উদ্দিনের নাম উল্লেখ করে বলা হয়, তাঁর নেতৃত্বে চার-পাঁচজন সেনাসদস্য কারাগারে ঢুকে চার নেতাকে হত্যা করেন।
অভিযোগপত্র: ঘটনার পরদিন মামলা দায়ের করা হলেও এই মামলার তদন্ত ২১ বছর থেমে ছিল। বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকা সরকারগুলো জেলহত্যা মামলার তদন্তে বাধার সৃষ্টি করে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর তদন্ত শুরু হয়। ১৯৯৮ সালের ১৫ অক্টোবর পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ−সিআইডির এএসপি আবদুল কাহার আকন্দ ২১ জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। আসামি আবদুল আজিজ পাশা মামলা চলাকালে জিম্বাবুয়েতে মারা যাওয়ায় তাঁকে রায়ের আগে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। ২০০১ সালের ১৪ এপ্রিল সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়। মোট ৭৫ জন সাক্ষীর মধ্যে ৬৪ জনের সাক্ষ্য নেওয়া হয় এই মামলায়।
গতকালের আদালত: গতকাল রায় ঘোষণার সময় আদালতের নিরাপত্তাব্যবস্থা কিছুটা বাড়ানো হয়। তবে নিহতদের আত্মীয়রা কেউ উপস্িথত ছিলেন না। সংবাদকর্মীদের উপস্িথতি লক্ষণীয় হলেও কোনো রাজনীতিক বা সাধারণের উপস্িথতি চোখে পড়ার মতো ছিল না।
আইনজীবীদের প্রতিক্রিয়া: রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি অ্যাডভোকেট আনিসুল হক রায়ের প্রতিক্রিয়ায় বলেন, এর আগেও বিভিন্ন মামলায় হাইকোর্ট বাজে রায় দিয়েছেন। ওই সব রায় কিছুক্ষণের জন্য হতাশা তৈরি করলেও আপিল বিভাগে সে হতাশা কেটে গেছে। তিনি বলেন, সার্বিকভাবে স্বাধীনতার পক্ষের শক্তির প্রতিটি লোকই এ রায়ে মর্মাহত।
জেলহত্যা মামলার রাষ্ট্রপক্ষের আরেক আইনজীবী শ ম রেজাউল করিম বলেন, হাইকোর্টের রায় অপ্রত্যাশিত। যথেষ্ট সাক্ষ্য-প্রমাণ রয়েছে এই মামলায়। সাক্ষ্য ও ঘটনার পারিপার্শ্বিকতা সব আসামির সাজা বহাল রাখার জন্য যথেষ্ট। অ্যাডভোকেট মোতাহার হোসেন সাজু বলেন, জেল হত্যাকান্ড সম্পর্কে আপিল আদালতের দৃষ্টিভঙ্গি সঠিক নয়।
আসামিপক্ষের আইনজীবী ব্যারিস্টার আবদুল্লাহ আল-মামুন বলেন, জেলহত্যার সঙ্গে এই আসামিরা জড়িত ছিলেন না তা প্রমাণিত হয়েছে। খালেদ মোশাররফের অনুসারীরা এই ঘটনা ঘটিয়েছে, এটাও এ রায়ে স্পষ্ট হয়েছে। তিনি জেলহত্যা মামলার বিচার চেয়ে বলেন, ‘প্রকৃত অপরাধীদের খুঁজে বের করে শাস্তির ব্যবস্থা করা হোক।’

প্রথম আলো, ২৯ আগস্ট ২০০৮

Permalink

জঙ্গি সংগঠনগুলোর নতুন তৎপরতা

গোয়েন্দা সংস্থার কঠোর নজরদারি দরকার

তিন বছর আগে দেশের ৬৩টি জেলায় একযোগে বোমা হামলার পর জঙ্গিদের সশস্ত্র তৎপরতা রোধে কঠোর আইন প্রয়োগের যে প্রত্যাশা ছিল, তা অনেকাংশে পূরণ হয়নি। সেই ভয়াবহ বোমা হামলার পর সারা দেশে যে ১৬৯টি মামলা দায়ের করা হয়, তার মধ্যে মাত্র ৩৭টি মামলার বিচার শেষ হয়েছে। বাকি ১৩২টি মামলার অধিকাংশই বিচারাধীন; কিছু মামলার তদন্ত শেষই হয়নি। তিক্ত বাস্তবতা হলো, পাঁচটি মামলার রায়ে অভিযুক্ত সব আসামি খালাস পেয়েছে। যেখানে সরকার থেকে শুরু করে দেশের সব মানুষ একবাক্যে জঙ্গি তৎপরতার বিরুদ্ধে একজোট, সেখানে তিন বছরেও অধিকাংশ মামলার নিষ্কপত্তি না হওয়া, মামলার তদন্ত শেষ না হওয়া, অভিযুক্তদের অনেকের বেকসুর খালাস প্রভৃতি ঘটনা প্রমাণ করে যে এ ব্যাপারে সরকারের উদ্যোগে ঘাটতি রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সুত্রের খবরে জানা গেছে, জেএমবির শীর্ষ নেতা শায়খ আবদুর রহমান, সিদ্দিকুল ইসলাম বাংলা ভাইসহ ছয় জঙ্গিনেতার ফাঁসির পর বোমা হামলাসংক্রান্ত মামলাগুলোর বিচার-প্রক্রিয়ায় শিথিলতা এসেছে। এটা কাম্য নয়। জঙ্গি তৎপরতার বিরুদ্ধে আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণে শিথিলতার কোনো সুযোগ নেই। এসব ক্ষেত্রে নির্লিপ্ত মনোভাব মানে জঙ্গিবাদীদের উৎসাহিত করা। বাস্তবে তা-ই হয়েছে। এরই মধ্যে জঙ্গিদের সংগঠিত হওয়ার খবর আসছে। সম্প্রতি গ্রেপ্তার হওয়ার পর একজন জঙ্গিনেতার বক্তব্যে এর সত্যতা পাওয়া গেছে। জানা গেছে, জেএমবি নতুন উদ্যোগ নিতে শুরু করেছে। ইতিমধ্যে তারা কয়েকটি বৈঠক করেছে।
এখন থেকে সরকারপক্ষকে সতর্ক হতে হবে। মামলার তদন্তে যেন কোনো ফাঁক না থাকে তা নিশ্চিত করা দরকার। দেখা গেছে, একজনকে একাধিক মামলায় প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী করা হয়। এতে মামলা দুর্বল হয়ে যায়, আসামির সাজা নিশ্চিত করা যায় না। এসব ব্যাপারে সরকারের নিস্পৃহ থাকার কোনো উপায় নেই। মামলার দ্রুত নিষ্কপত্তিতেও সরকারপক্ষকে উদ্যোগী হতে হবে। অনেক সময় সাক্ষী হাজির না হওয়ার কারণে মামলা পিছিয়ে যায়। অথচ বেশির ভাগ মামলায় সাক্ষী হচ্ছেন পুলিশ বা সরকারি কর্মকর্তা। তাঁরা যদি মামলায় হাজির না থাকেন তাহলে চলবে কেন? কারাগারে আটক আসামিকে সময়মতো আদালতে হাজির না করানোর কারণেও অনেক মামলায় বিচারকাজ বিলম্বিত হচ্ছে। এদিকে সরকারকে মনোযোগী হতে হবে। অন্যদিকে আটক অভিযুক্তরা কারাগারের ভেতর থেকে বাইরের জঙ্গিদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে, সে ব্যাপারেও প্রয়োজনীয় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। কারাগারের ভেতর অভিযুক্ত জঙ্গিদের আলাদা সেলে রাখা ও তাদের গতিবিধির ওপর নজর রাখা একান্ত দরকার। কারাগারের ভেতর যেন তারা অন্যদের জঙ্গি-প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ করতে না পারে, সে জন্য সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার।

জঙ্গিরা যেন নতুনভাবে সংগঠিত হতে না পারে সে জন্য একদিকে যেমন গোয়েন্দা নজরদারি বাড়াতে হবে, অন্যদিকে তেমনি তারা যেন নিরীহ তরুণদের ধর্মের নামে উগ্রতার দিকে নিয়ে যেতে না পারে, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে এ কাজে ব্যবহার করতে না পারে, সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় উদ্যোগও নিতে হবে। এ জন্য উদার দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন প্রকৃত ধর্মীয় নেতাদের ব্যাপক প্রচার একটি অন্যতম উপায়। গণতান্ত্রিক, দায়িত্বশীল নাগরিক সমাজের সোচ্চার ভুমিকাও এ ক্ষেত্রে অপরিহার্য। দেশে ধর্মীয়-সহিষ্ণুতা সমুন্নত রাখার জন্য সরকারকে এ ধরনের বহুমুখী উদ্যোগ নিতে হবে।

প্রথম আলো, ১৮ আগস্ট ২০০৮

Permalink

অভ্যুত্থান চলাকালেই কিসিঞ্জার খবর পাচ্ছিলেন, বঙ্গবন্ধু তখনো বেঁচে

সমকাল ১৩ আগস্ট ২০০৮ সংখ্যায় আমেরিকা সরকারের বিভিন্ন গোপন দলিলে প্রাপ্ত তথ্য নিয়ে অজয় দাশগুপ্তের এক মূল্যবান লেখা প্রকাশিত হয়েছে। এই লেখায় বঙ্গবন্ধু হত্যাকালীন সময়ে আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরী কিসিঞ্জার ও তার স্টাফ অফিসারদের মধ্যে কথোপকথনের বর্ণনা রয়েছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতির নানা গোপন কাহিনী সমৃদ্ধ এই লেখাটি সমকাল পত্রিকা থেকে নেয়া হয়েছে।

অভ্যুত্থান চলাকালেই কিসিঞ্জার খবর পাচ্ছিলেন, বঙ্গবন্ধু তখনো বেঁচে
৭৫ এর ট্রাজেডি মার্কিন দলিলে

অজয় দাশগুপ্ত

[যে কোনো বৃহৎ শক্তির কূটনৈতিক কর্মকান্ডে বিস্তর লিখিত দলিল চালাচালি হয়। আর এতে থাকে আপাতভাবে তুচ্ছ থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার আনুপূর্ব বিবরণ। তাৎক্ষণিক প্রয়োজন তো আছেই, আরেকটি উদ্দেশ্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য শিক্ষণীয় রেখে যাওয়া। বাংলাদেশের ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট ট্র্যাজেডি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। বঙ্গবন্ধু হত্যা-কান্ডে তাদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ সুবিদিত। এর সত্যতা অনুসন্ধানে গবেষকরা নিরন্তর চেষ্টা চালা-চ্ছেন। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতরের শত শত দলিলে ওই সময়ের ঘটনাবলির রয়েছে লিখিত বিবরণ। ঘটনার ৩০ বছর পর অতি গোপনীয় ও গোপনীয় নথি প্রকাশের বিষয়ে আইন প্রণয়নের কারণে এসব দলিল এখন শুধু ওই দেশের নাগরিক নয়, বিশ্ববাসীও জানতে পারছে। তবে নথি প্রকাশ করার আগে তা পর্যালোচনা-পরীক্ষা করে দেখবেন অরিজিনেটিং এজেন্সির প্রধান। তিনি যদি কোনো বিষয় প্রকাশ না করার সিদ্ধান্ত দেন তবে তা অনির্দিষ্টকাল আলোর মুখ দেখবে না। ১৫ আগষ্ট ট্র্যাজেডির সঙ্গে প্রত্যক্ষ সংশ্লিষ্টতা ছিল তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারের। এখনো তিনি বেঁচে আছেন। তাই গোপনীয় ও অতি গোপনীয় হিসেবে চিহ্নিত মার্কিন পররাষ্ট মন্ত্রণালয়ের দলিল প্রকাশের আগে তার মতামত নেওয়া হয়েছে এবং তিনি বেশকিছু দলিল সংশোধিত আকারে প্রকাশের সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। আর এ কারণেই বাংলাদেশের ইতিহাসের বিয়োগান্ত ও সুদূরপ্রসারী তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়ের কিছু অংশ আপাতত থেকে যাচ্ছে অন্ধকারে। কে জানে, হয়তোবা চিরকালের জন্যই।]

১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট। শুত্রক্রবার। ওয়াশিংটন সময় সকাল ৮টা। বাংলাদেশে তখন ১৫ আগষ্ট, রাত ১০টা। এদিন প্রত্যুষে বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার তার স্টাফ সভায় বসেছেন কয়েকজন কর্মকর্তা নিয়ে। এখানে কী আলোচনা হয়েছে তার বিবরণ
পররাষ্ট্র দফতরের অনেক দলিলে, যার সংশোধন করা হয়েছে। অর্থাৎ পূর্ণ বিবরণ আপাতত জানার অবকাশ নেই।
বৈঠকের শুরুতেই কিসিঞ্জার বলেন, আমরা এখন বাংলাদেশ প্রসঙ্গে কথা বলব।
নিকট প্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী আথারটন : এটা হচ্ছে সুপরিকল্কিপ্পত ও নিখুঁতভাবে বাস্তবায়ন করা অভ্যুত্থান।
কিসিঞ্জার : মুজিবুর কি জীবিত না মৃত?
আথারটন : মুজিব মৃত। তার অনেক ঘনিষ্ঠ সহচর, পরিবারের সদস্য, ভাই, ভাগ্নে নিহত হয়েছেন।
কিসিঞ্জার : আমি ব্যুরো অব ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড রিসার্চ (আইএনআর) থেকে ভালো পরামর্শ পেয়েছি [তিনি এ কর্মকর্তার সঙ্গে ওয়াশিংটনে আগেই কথা বলেছেন। তবে এটা ফোনে নাকি সরাসরি, সেটা স্পষ্ট নয়]।
হিল্যান্ড (ব্যুরো পরিচালক) : আমি যখন আপনার সঙ্গে কথা বলেছি তখন তিনি মৃত ছিলেন না।
কিসিঞ্জার : আচ্ছা? তারা কি কিছু সময় পর তাকে হত্যা করেছে?

এ আলোচনা থেকে স্পষ্ট, ১৫ আগষ্ট অভ্যুত্থান চলাকালেই কিসিঞ্জার অবহিত হচ্ছিলেন [১৫ আগষ্ট ঢাকার যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস প্রেরিত বার্তায় বলা হয় : ঢাকার সময় বিকেল চারটা পর্যন্ত দেখা যায়, অভ্যুত্থান সফল হচ্ছে বলেই প্রতীয়মান হয়। কোনো সক্রিয় প্রতিরোধ দেখা যাচ্ছে না]।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্টাফ বৈঠকে কিসিঞ্জারের প্রথম প্রশ্নও সন্দেহ সৃষ্টি করে। তিনি প্রথমেই জানতে চেয়েছেন, মুজিব জীবিত নাকি মৃত। এ ধরনের ঘটনায় প্রথম প্রশ্ন হওয়ার কথা, মুজিব ক্ষমতায় আছেন কি নেই। কিন্তু প্রভাবশালী মার্কিন নেতা জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি বেঁচে আছেন কি-না। ১০ ঘণ্টা আগে অভ্যুত্থান চলাকালেই তিনি ঘটনার বিবরণ পাচ্ছিলেন হিল্যান্ডের কাছ থেকে। এ অভ্যুত্থান রোধে তাদের কিছু করণীয় প্রতিকারের কথা ভাবেননি। বরং যেন মনে হয়, তিনি অপেক্ষা করে ছিলেন একটি দেশের রাষ্ট্রপতির মৃত্যু সংবাদের জন্য!

বাংলাদেশের স্থপতির প্রতি কিসিঞ্জারের বিরাগ ছিল ১৯৭১ সাল থেকেই। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই বৈঠকে তিনি মুজিব সম্পর্কে যে মন্তব্য করেছিলেন তাতেও ওই বিদ্বেষের প্রতিফলন : হি ওয়াজ ওয়ান অব দ্য ওয়ার্ল্ড’স প্রাইজ ফুলস।
১৯৭৪ সালের ৩০ অক্টোবর কিসিঞ্জার এসেছিলেন বাংলাদেশে। তিনি বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে। এ সফরের মাত্র তিনদিন আগে ২৭ অক্টোবর অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ পদত্যাগ করেন। মুক্তিযুদ্ধকালে দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকালে তিনি চমকপ্রদ দক্ষতা ও যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখেন। তাকে অপসারণের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের চাপ ছিল বলে ধারণা করা হয়। কিসিঞ্জাসের সফরের প্রাক্কালে তাকে অপসারণ কাকতালীয় নাকি এর পেছনে কোনো বিশেষ কারণ ছিল, সেটা ইতিহাসের গবেষণার বিষয় হতে পারে। তাজউদ্দীনের অনমনীয় মনোভাবের কারণে একাত্তর সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের পরিকল্পনা মেনে নেওয়ার জন্য খন্দকার মোশতাকের চক্রান্ত সফল হতে পারেনি।
১৯৭৪ সালের বন্যার পরপরই দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। এ সময়ে খাদ্যের ঘাটতি ছিল ব্যাপক এবং তা পহৃরণে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বাংলাদেশ সহায়তা চাইছিল।
কিসিঞ্জার বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বৈঠকে বলেন, ‘আপনার তো দেখছি চারদিক থেকেই সমস্যা।’
বঙ্গবন্ধু বন্যা সমস্যা, খাদ্য সমস্যা, রাসায়নিক সারের ঘাটতি, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পদ বণ্টন এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন শিবিরে অবস্থানকারী পাকিস্তানি নাগরিকদের তাদের দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রসঙ্গ তুললে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী সম্ভবত ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করেই ‘আপনার তো দেখছি চারদিক থেকেই সমস্যা’ বলেছিলেন। কারণ বৈঠকে তোলা প্রতিটি বিষয়েই তার অবস্থান ছিল বাংলাদেশের বিপক্ষে।
কিসিঞ্জারের বাংলাদেশ সফরের কিছুদিন আগে বঙ্গবন্ধু জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দিয়েছিলেন। ওই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ডের সঙ্গে তার বৈঠক হয়। কিসিঞ্জারের সঙ্গে ঢাকায় আলোচনাকালে বঙ্গবন্ধু ফোর্ডকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানিয়ে বলেন, তিনি ভারতে তার আসন্ন সফরের সঙ্গে মিল রেখে ঢাকা আসতে পারেন। এর জবাবে কিসিঞ্জারের মন্তব্য ছিল কূটনৈতিক শিষ্টাচারের পরিপন্থী। তিনি ঢাকায় বঙ্গবন্ধুকে বলেন, ‘ফোর্ড ভারত সফরের সময়ে বাংলাদেশে আসতে পারেন। তবে আমরা মনে করি না বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের তরফে ভারতের অনুমতি গ্রহণের প্রয়োজন রয়েছে।’
কিসিঞ্জার ওয়াশিংটনে ফোর্ডের সঙ্গেও বঙ্গবন্ধুর বৈঠকের প্রসঙ্গ তোলেন। তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট আপনার সঙ্গে আলোচনায় সন্তুষ্ট। ণড়ঁ নধসনড়ড়ুষবফ যরস! এ বাক্যের অর্থ হতে পারে, আপনি তাকে মুগ্ধ করেছেন। আবার, আপনি তাকে কথার জাদুমালা আর ব্যক্তিত্ব দিয়ে ভুলিয়েছেন বলেও ধরে নেওয়া যায়। কিন্তু ধুরন্ধর কূটনীতিক যদি নধসনড়ড়ুষবফ শব্দের আক্ষরিক অর্থ ‘প্রতারণা’ বুঝিয়ে থাকেন?
ঢাকার বৈঠকে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কাছে বাংলাদেশের ন্যায্য পাওয়ার প্রসঙ্গ তোলেন। তিনি বলেন, আমরা সম্পর্ক স্থাপনের জন্য অনেক কিছু করেছি। যুদ্ধবন্দিদের ছেড়ে দিয়েছি। পাকিস্তানের বৈদেশিক সম্পদের দায়দেনার যতটা আমাদের ওপর বর্তায় তা বহনের কথা জানিয়েছি। কিন্তু পাকিস্তান কেবল কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনে আগ্রহী।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতর যে গোপনীয় দলিল সংশোধন করে প্রকাশ করেছে তাতে দেখা যায়, কিসিঞ্জার এ প্রশ্নে পাকিস্তানের বক্তব্যই তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, আমি পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আজিজ আহমদের সঙ্গে কথা বলেছি। তিনি দায়দায়িত্ব গ্রহণের বিষয়ে আপনাদের অনাগ্রহের কথা জানিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী মুজিব : আমি ইতিমধ্যেই দায়দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। আমরা এ বিষয়ে ঋণদাতাদের সঙ্গে চুক্তি করেছি। কিন্তু কেন আমি সম্পদের ভাগ পাব না?
মুজিব : আমরা এক বা দুই বছর খাদ্য সহায়তা চাই। আমি দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার জন্য ব্যাপক সহায়তা চাই। আমরা শিল্পের কাঁচামাল চাই। আমাদের পাটের জন্য ভালো দাম চাই।
এর জবাবেই কিসিঞ্জার বলেন, আপনার তো দেখি চারদিক থেকেই সমস্যা।
বঙ্গবন্ধু চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক স্থাপনে আগ্রহের কথাও বলেন। এ প্রসঙ্গে কিসিঞ্জারের বক্তব্য : তারা হয়তো আপনাদের সঙ্গে পাকিস্থানের সম্পর্ক স্থাপন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে চাইবে।

হ্যাঁ, পাকিস্তান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছিল ১৫ আগষ্ট বঙ্গবন্ধুকে নৃশংসভাবে হত্যার পর। চীনও সম্পর্ক স্থাপন করে এ বিয়োগান্ত ঘটনার পর।
কিসিঞ্জার কি ১৫ আগষ্টের ঘটনা আগেই জানতেন?
বঙ্গবন্ধু বন্যায় খাদ্যশস্য বিনষ্ট হওয়া এবং বিশ্ববাজারে খাদ্যের দাম অনেক বেড়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সাহায্য চাইলে কিসিঞ্জার বলেন, ‘আমাদের সমস্যা হচ্ছে, আমাদের কাছে উদ্বৃত্ত খাদ্য নেই। ... সাহায্য প্রসঙ্গে আমাদের কংগ্রেসের সঙ্গেও সমস্যা রয়েছে। আগামী মঙ্গলবার আমাদের কংগ্রেসের (প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট) নির্বাচন। তবে ১৯৭০ সালে আপনি যেভাবে জিতেছিলেন তেমন সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রশাসন আশা করে না।
জবাবে বঙ্গবন্ধু রসিকতা করে বলেন, ‘নির্বাচনে অত বেশি আসন পাবেন না। আপনারা জানেন, আমি বিপুলভাবে জয়ী হওয়ার পর কী ঘটেছিল : পাকিস্তানিরা এখানে সবকিছু ধ্বংস করে দেয়। আমাকে গ্রেফতার করে। আমার পাঁচ বছরের ছেলেও বলে, আর নির্বাচনে দাঁড়াবে না।’
এর জবাবে কিসিঞ্জার বলেন, ‘আপনি নিশ্চয়ই কিছু সময়ের জন্য আপনার দেশে নির্বাচন এড়াতে চাইবেন না!’
বঙ্গবন্ধু যে কোনো সময়েই নির্বাচন এড়াতে চাননি সেটা কিসিঞ্জার সম্ভবত জানতেন না।
১৫ আগষ্ট ওয়াশিংটনের সকালের বৈঠকে ফিরে তাকানো যাক।
বৈঠকে আথারটন জানান, অভ্যুত্থানকারীরা মুজিবকে হত্যার জন্যই এসেছিল। তারা বাড়িটি ঘেরাও করে এবং ভেতরে গিয়ে তাকে মেরে ফেলে।
আগেও তাকে হত্যার চক্রান্ত প্রসঙ্গ তুলে
কিসিঞ্জার বলেন : তাকে কি গত বছর আমরা এ বিষয়ে কিছু বলিনি?
আথারটন : গত মার্চে এ বিষয়ে আমরা অনেক ইঙ্গিত পাচ্ছিলাম।
কিসিঞ্জার : তাকে কি আমরা কিছু জানাইনি?
আথারটন : তাকে সে সময়ে জানিয়েছি।
কিসিঞ্জার : কারা এর পেছনে, সে বিষয়ে কি মোটামুটি কিছু ধারণা দিয়েছি?
আথারটন : কারা জড়িত সেসব নাম তাকে বলেছি কি-না, সেটা পরীক্ষা করে দেখতে হবে।
হিল্যান্ড : আমরা এ বিষয়ে ঠিক যথাযথ ধারণা দিইনি।
আথারটন : তিনি বিশ্বাস করেননি। তিনি বলেছেন, কেউ তাকে এ ধরনের কিছু করবে না।
বাংলাদেশের অভ্যুত্থান ‘সফল’ হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতরের কাছে খবর পৌঁছে যায় : ‘যারা অভ্যুত্থান করেছে তাদের মধ্যে রয়েছে সামরিক অফিসার, মধ্য পর্যায় ও সিনিয়র অফিসার- যাদের সাধারণভাবে পূর্ববর্তী শাসকদের তুলনায় কম ভারতপন্থি, সোভিয়েতবিরোধী এবং মার্কিনপন্থি হিসেবে গণ্য করা যায়।
কিসিঞ্জার : এটাই হতে হবে।
আথারটন : তারা দেশের নাম পরিবর্তন করে ইসলামী প্রজাতন্ত্র রেখেছে।
কিসিঞ্জার : তারা যুক্তরাষ্ট্রপন্থি হবে, এটা অপরিহার্য নয়। প্রকৃতপক্ষে পথপরিক্রমায় তারা চীনাপন্থি এবং ভারতবিরোধী হবে বলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি। আমি সবসময়ই জানতাম, ভারত বাংলাদেশকে স্বাধীন করার জন্য একদিন অনুতাপ করবে। এ ভবিষ্যদ্বাণী আমি একাত্তর সালেই করেছি।
আথারটন : আমাদের বড় সমস্যা হবে বাংলাদেশের নতুন শাসকদের সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠতা বা মাখামাখি পরিহার করা।
কিসিঞ্জার : কেন তারা আমাদের প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন বলে?
ঝানু কূটনীতিক কিসিঞ্জার ঠিকই বুঝেছিলেন স্বাধীন দেশের স্থপতিকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে যারা রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছে তারা তাদের বন্ধু এবং বৈঠকেই তিনি জানিয়ে দেন : ‘তারা আমাদের কাছ থেকে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ পাবে। আমরা তাদের স্বীকৃতি দেব।’
১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট বাংলাদেশ তার ইতিহাসের কঠিনতম পথে যাত্রা শুরু করে। এর পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা ছিল ৩০ লাখ শহীদের রক্তে অর্জিত বাংলাদেশের জনগণের জন্য অগ্রহণযোগ্য এবং অবশ্যই ক্ষতিকর। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতরের যেসব গোপনীয় দলিল প্রকাশ করা হচ্ছে, তা থেকেও এ সাক্ষ্য মেলে।

Permalink

BBC Asia-Pacific

CNN.com - Asia