কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত

bdnews24

সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম এর দেয়া ৫০ যুদ্ধাপরাধীর তালিকা

সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম এর দেয়া ৫০ যুদ্ধাপরাধীর তালিকা

১. গোলাম আজম
২. মওলানা এ কে এম ইউসুফ
৩. মতিউর রহমান নিজামী
৪. দেলোয়ার হোসাইন সাঈদী
৫. মো: কামরুজ্জামান
৬. মওলানা আব্দুর রহিম
৭. আব্বাস আলী খান
৮. আলী আহসান মোহাম্মদ মোজাহিদ
৯. আব্দুল কাদের মোল্লা
১০. মোহাম্মদ হামিদুল হক চৌধুরী
১১. খাজা খায়রুদ্দিন
১২. মোহাম্মদ আলী
১৩. মোহাম্মদ আব্দুল আলীম
১৪. এএমএস সোলায়মান
১৫. সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী
১৬. ফজলুল কাদের চৌধুরী
১৭. জুলমত আলী খান
১৮. কাজী কাদের
১৯. খান আব্দুস সবুর খান
২০. মওলানা ফরিদ আহমেদ
২১. শাহ্ মোহাম্মদ আজিজুর রহমান
২২. মাওলানা আব্দুল মান্নান
২৩. ডা: আবু মোতালেব মালেক
২৪. মোহাম্মদ ইউনুস
২৫. এবিএম খালেক মজুমদার
২৬. এএন এম ইউসুফ
২৭. নুরুল আমিন
২৮. এ কিউ এম শফিউল ইসলাম
২৯. আবদুল মতিন
৩০. এড. মোহাম্মদ আইনুদ্দিন
৩১. মাওলানা নুরুজ্জামান (আইআরপি)
৩২. মাওলানা মোহাম্মদ ইসহাক
৩৩. গোলাম সরোয়ার
৩৪. মোহাম্মদ আকতার উদ্দিন আহমেদ
৩৫. মাওলানা আবদুস সোবাহান
৩৬. ক্যাপ্টেন (অব: ) আব্দুল বাছেদ
৩৭. আবদুল মতিন ভূঁইয়া
৩৮. মোহাম্মদ আবুল কাশেম
৩৯. ওবায়দুল্লাহ মজুমদার
৪০. মীর কাশেম আলী
৪১. ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল জব্বার
৪২. মাওলানা আবুল কালাম আজাদ
৪৩. মোহাম্মদ আবদুল হান্নান
৪৪. ব্যারিস্টার কোরবান আলী
৪৫. আশরাফ হোসাইন
৪৬. এড. আনসার আলী
৪৭. মোহাম্মদ কায়সার
৪৮. আবদুল মজিদ তালুকদা
৪৯. নওয়াজেস আহমেদ
৫০. একে মোশাররফ হোসেন।

Permalink

একাত্তরে যে সুযোগ হারিয়েছি আবার তা হারানো চলবে না

‘একাত্তরে যে সুযোগ হারিয়েছি আবার তা হারানো চলবে না’
- বোস্টারকে মোশতাক
’৭৫ এর ট্র্যাজেডি ॥ মার্কিন দলিলে -৩
অজয় দাশগুপ্ত

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পঞ্চম দিন ২০ আগস্ট বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ইউজিন বোস্টার রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এ প্রসঙ্গে ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাস থেকে ওয়াশিংটনে যেসব গোপনীয় বার্তা পাঠানো হয় তা ছিল নিম্নরূপ :
শিরোনাম : নতুন রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আমার (বোস্টার) প্রথম বৈঠক
বোস্টার : আমাকে মাত্র এক ঘণ্টার নোটিশে আজ বিকেল ৩টায় বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মোশতাকের অফিসে ডেকে পাঠানো হয়। এ ভবনে আগে রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদউল্লাহ থাকতেন। যদিও আমি রাজনৈতিক কাউন্সিলরকে সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলাম, কিন্তু রাষ্ট্রপতি একান্ত বৈঠকের অনুরোধ করেন। তিনি প্রথমেই জানতে চাইলেন : আমি কবে ওয়াশিংটন চলে যাচ্ছি [অভ্যুত্থানের আগের সস্পাহে তার সঙ্গে ডিনারে আমি তাকে জানিয়েছিলাম, আমি এ মাসের শেষদিকে সিলেকশন বোর্ডে দায়িত্ব পালনের জন্য চলে যাচ্ছি]। আমি তাকে জানাই, আমি কিছু সময় আগে জেনেছি, আমার ওই দায়িত্ব প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং আমাকে ঢাকাতেই রেখে দেওয়া হচ্ছে। রা®দ্ব্রপতি বলেন, এ খবরে তিনি আনন্দিত হয়েছেন এবং তিনি এটা আশা করছিলেন।
বোস্টার : এরপর রাষ্ট্রপতি আন্তরিকতার সঙ্গে কথা বলতে থাকেন। বারবার তিনি আমার হাত চেপে ধরছিলেন। দেশে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা চাইছিলেন। তিনি বলেন, কী ধরনের সাহায্য প্রয়োজন তার তালিকা তিনি তৈরি করেননি। কিন্তু এটা জোর দিয়ে বলেন, ১৯৭১ সালে যে সুযোগ আমরা হারিয়েছি, আবার তা হারানো চলবে না। এ প্রসঙ্গে তিনি আমার সঙ্গে গত মে মাসে তার আলোচনার কথা স্মরণ করিয়ে দেন। ১৯৭১ সালে তিনি কলকাতায় যুক্তরাষ্ট্রে কর্মকর্তাদের সঙ্গে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে আপসের বিষয়ে চেষ্টা করেছিলেন, যা সফল হয়নি। তিনি বলেন, বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান আমাদের উপলব্ধি করতে হবে। এ প্রসঙ্গে তিনি তার বিরুদ্ধে ভারতীয় সংবাদপত্রে যে অবন্ধুসুলভ খবর প্রকাশ হচ্ছে তার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তিনি বলেন, দেশে রক্তপাত ছাড়াই পরিস্থিতি সামাল দিয়েছেন। কিন্তু যদি ভারত স্থলপথে কিংবা আকাশপথে বিশেষভাবে আকাশপথে যদি অভিযান চালায় তাহলে তিনি প্রতিরক্ষাহীন হয়ে পড়বেন। তিনি বলেন, অসন্তুষ্ট বাঙালিদের শরণার্থী অভ্যর্থনা কেন্দ্রগুলোতে জড়ো করা হচ্ছে বলে তার কাছে খবর রয়েছে এবং তার আশঙ্কা, ১৯৭১ সালে ভারতীয় ও বাঙালিরা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যে কৌশল অনুসরণ করে সফল হয়েছে এখন সেটাই বাংলাদেশের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করা হতে পারে। আমি তাকে এখানে যা ঘটছে তা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার বলে ভারতের বিবৃতির কথা স্মরণ করিয়ে দেই এবং এটাও বলি, ভারত অন্য কোনো পদক্ষেপ নেবে না। তিনি বলেন, তিনি এটা আশা করেন।

বোস্টার : তিনি এরপর আমার কাছে যুক্তরাষ্ট্রের স্বীকৃতির প্রসঙ্গ তোলেন। আমি তার সরকারের সঙ্গে আমাদের স্বাভাবিক সম্পর্ক বজায় রাখার প্রসঙ্গ তুলে ধরি এবং স্বীকৃতির’ বিষয়টিকে কম গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলি। তিনি বলেন, আপনাদের অবস্থান আমি বুঝি কিন্তু স্বীকৃতির মনস্তাত্ত্বিক তাৎপর্য রয়েছে। স্বাভাবিক অবস্থা বজায় রাখা এবং ভারতের পদক্ষেপের বিরুদ্ধে রক্ষাকবচের জন্য স্বীকৃতি এ মুহূর্তে- ‘আজই’ দেওয়া প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেন। আমি তার এ অবস্থান ওয়াশিংটনে জানিয়ে দেব বলে তাকে জানাই।
তার সরকারের নতুন কার্যক্রম বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ৬১ জেলায় পুরনো প্রশাসন ফিরিয়ে আনা হয়েছে। তিনি বলেন, এ ব্যবস্থা [জেলায় গভর্নর নিয়োগ] একদলীয় বাকশালের অংশ। তিনি বলেন, মাকে হত্যা করে সন্তানকেও হত্যা করতে তিনি সক্ষম হবেন। আমি তার কাছে জানতে চাই, এর দ্বারা তিনি একদলীয় বাকশালের পরিবর্তে বহুদলীয় ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়া বোঝাতে চান কি-না। তিনি হ্যাঁ-সূচক জবাব দেন।
বোস্টার বলেন, আমি তার নতুন দায়িত্বে সাফল্য কামনা করি। আমি তাকে যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হোসেন আলীর সঙ্গে আমাদের সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী আথারটনের আলোচনা প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলি, আমরা অর্থনৈতিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখব এবং এটা সহায়ক হবে। তিনি উপসংহারে আমাকে যে কোনো সময়ে তার সঙ্গে আমার সাক্ষাতে সমস্যা নেই বলে জানান।

বোস্টারের মন্তব্য : মোশতাকের সঙ্গে সাক্ষাৎ প্রসঙ্গে বোস্টার প্রতিবেদনে বলেছেন : আমার কাছে মনে হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি নতুন সরকারের প্রতি আমাদের সহানুভূতির মনোভাব প্রকাশের সবচেয়ে কার্যকর ও সহজ উপায় হতে পারে। বাংলাদেশের নতুন রাষ্ট্রপতি যুক্তরাষ্ট্র যেসব নীতিগত পরিবর্তন দেখতে চায় তা করতে আগ্রহী বলেই মনে হয়। আমি এ কারণে জরুরিভিত্তিতে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদানের জন্য অনুরোধ জ্ঞাপন করছি।
কে এই মোশতাক : ১৫ আগস্ট অভ্যুত্থানের পরপরই ঢাকাস্থ যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস ওয়াশিংটনে খন্দকার মোশতাকের পরিচিতি জানায়। এতে বলা হয়, তিনি সবসময়ই মার্কিনপন্থি হিসেবে পরিচিত। ভারতবিরোধী ও সোভিয়েতবিরোধী হিসেবেও তার সুনাম রয়েছে। বেখোটো ও রোগা দেখতে মোশতাককে বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্বের মানুষ মনে হয় না। শেখ মুজিবের যে ক্যারিশমা সেটাও তার নেই। তিনি তাজউদ্দিন আহমদের বিরোধী। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পদ হারানোর জন্য তিনি এ প্রভাবশালী নেতা এবং ভারতীয় নেতৃত্বকে দায়ী মনে করেন।
১৯৭২ সালে তিনি ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের কর্মকর্তাদের বলেন, তিনি বাংলাদেশে ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মাত্রাতিরিক্ত প্রভাবের সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বিগ্ন। তিনি সে সময়ে আশা প্রকাশ করেন, যুক্তরাষ্ট্র সোভিয়েত ও ভারতের প্রভাবের বিরুদ্ধে পাল্টা ভারসাম্য বজায় রাখায় সহায়তা করবে। ১৯৭৪ সালে ঢাকায় রাষ্ট্রদূত বোস্টারের সঙ্গে এক সৌজন্য সাক্ষাৎকালে তিনি নিজেকে বাংলাদেশ সরকারে মার্কিনপন্থি সদস্য হিসেবে উল্লেখ করেন। সে সময়ে তিনি মুজিবকে আরো সহায়তা করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি অনুরোধ করেন যাতে তিনি বামপন্থার প্রতি ঝুঁকে না পড়েন। ১৯৭৫ সালের ১০ আগস্ট ঢাকায় এক ডিনার পার্টিতে, যেখানে রাষ্ট্রদূত বোস্টার উপস্টি’ত ছিলেন- খন্দকার মোশতাক আহমদ বলেন, ‘বাংলাদেশে এখন কেউ ভোট দেয় না।’
২২ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ইউজেন বোস্টার বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও সাবেক রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর সঙ্গে কিছু সময় কথা বলেন। তিনি ১৯৭১ সালে তার যুক্তরাষ্ট্র সফরের উল্লেখ করে বলেন, সে সময় তাকে ৫ বছরের ভিসা দেওয়া হয়েছিল। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি সর্বদা কৃতজ্ঞ থাকবেন বলেও জানান। আমি তাকে আমাদের অব্যাহত সাহায্যের কথা জানাই।
বোস্টার ওয়াশিংটনে পাঠানো তার প্রতিবেদনে বলেন, মোশতাকের সঙ্গে যে অনুষ্ঠানে আবু সাঈদ চৌধুরী ছিলেন সেখানে যুক্তরাষ্ট্রে নবনিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এম আর সিদ্দিকীও উপষ্থিত ছিলেন। তিনি আমাকে জানান, রাষ্ট্রপতি চাচ্ছেন তিনি যত দ্রুত সম্ভব ওয়াশিংটনে গিয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করুন।
বোস্টারের প্রতিবেদনে ২৩ আগস্ট বাংলাদেশের জাতীয় টুপি প্রসঙ্গও স্থান পেয়েছে। তিনি লিখেছেন : এ পর্যন্ত কেবল খন্দকার মোশতাক আহমদই এ টুপি ব্যবহার করতেন। আজকের অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবু সাঈদ চৌধুরী এবং এম আর সিদ্দিকী দু’জনেই যে টুপি পরেছিলেন তা ছিল একেবারে নতুন বানানো। বোঝাই যাচ্ছে, টুপি বানিয়ে বাংলাদেশের দর্জিরা আগামী কিছুদিন ভালো ব্যবসা করবে।

সংগ্রহ করা হয়েছে সমকাল পত্রিকা থেকে।

Permalink

অভ্যুত্থান চলাকালেই কিসিঞ্জার খবর পাচ্ছিলেন, বঙ্গবন্ধু তখনো বেঁচে

সমকাল ১৩ আগস্ট ২০০৮ সংখ্যায় আমেরিকা সরকারের বিভিন্ন গোপন দলিলে প্রাপ্ত তথ্য নিয়ে অজয় দাশগুপ্তের এক মূল্যবান লেখা প্রকাশিত হয়েছে। এই লেখায় বঙ্গবন্ধু হত্যাকালীন সময়ে আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরী কিসিঞ্জার ও তার স্টাফ অফিসারদের মধ্যে কথোপকথনের বর্ণনা রয়েছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতির নানা গোপন কাহিনী সমৃদ্ধ এই লেখাটি সমকাল পত্রিকা থেকে নেয়া হয়েছে।

অভ্যুত্থান চলাকালেই কিসিঞ্জার খবর পাচ্ছিলেন, বঙ্গবন্ধু তখনো বেঁচে
৭৫ এর ট্রাজেডি মার্কিন দলিলে

অজয় দাশগুপ্ত

[যে কোনো বৃহৎ শক্তির কূটনৈতিক কর্মকান্ডে বিস্তর লিখিত দলিল চালাচালি হয়। আর এতে থাকে আপাতভাবে তুচ্ছ থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার আনুপূর্ব বিবরণ। তাৎক্ষণিক প্রয়োজন তো আছেই, আরেকটি উদ্দেশ্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য শিক্ষণীয় রেখে যাওয়া। বাংলাদেশের ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট ট্র্যাজেডি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। বঙ্গবন্ধু হত্যা-কান্ডে তাদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ সুবিদিত। এর সত্যতা অনুসন্ধানে গবেষকরা নিরন্তর চেষ্টা চালা-চ্ছেন। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতরের শত শত দলিলে ওই সময়ের ঘটনাবলির রয়েছে লিখিত বিবরণ। ঘটনার ৩০ বছর পর অতি গোপনীয় ও গোপনীয় নথি প্রকাশের বিষয়ে আইন প্রণয়নের কারণে এসব দলিল এখন শুধু ওই দেশের নাগরিক নয়, বিশ্ববাসীও জানতে পারছে। তবে নথি প্রকাশ করার আগে তা পর্যালোচনা-পরীক্ষা করে দেখবেন অরিজিনেটিং এজেন্সির প্রধান। তিনি যদি কোনো বিষয় প্রকাশ না করার সিদ্ধান্ত দেন তবে তা অনির্দিষ্টকাল আলোর মুখ দেখবে না। ১৫ আগষ্ট ট্র্যাজেডির সঙ্গে প্রত্যক্ষ সংশ্লিষ্টতা ছিল তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারের। এখনো তিনি বেঁচে আছেন। তাই গোপনীয় ও অতি গোপনীয় হিসেবে চিহ্নিত মার্কিন পররাষ্ট মন্ত্রণালয়ের দলিল প্রকাশের আগে তার মতামত নেওয়া হয়েছে এবং তিনি বেশকিছু দলিল সংশোধিত আকারে প্রকাশের সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। আর এ কারণেই বাংলাদেশের ইতিহাসের বিয়োগান্ত ও সুদূরপ্রসারী তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়ের কিছু অংশ আপাতত থেকে যাচ্ছে অন্ধকারে। কে জানে, হয়তোবা চিরকালের জন্যই।]

১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট। শুত্রক্রবার। ওয়াশিংটন সময় সকাল ৮টা। বাংলাদেশে তখন ১৫ আগষ্ট, রাত ১০টা। এদিন প্রত্যুষে বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার তার স্টাফ সভায় বসেছেন কয়েকজন কর্মকর্তা নিয়ে। এখানে কী আলোচনা হয়েছে তার বিবরণ
পররাষ্ট্র দফতরের অনেক দলিলে, যার সংশোধন করা হয়েছে। অর্থাৎ পূর্ণ বিবরণ আপাতত জানার অবকাশ নেই।
বৈঠকের শুরুতেই কিসিঞ্জার বলেন, আমরা এখন বাংলাদেশ প্রসঙ্গে কথা বলব।
নিকট প্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী আথারটন : এটা হচ্ছে সুপরিকল্কিপ্পত ও নিখুঁতভাবে বাস্তবায়ন করা অভ্যুত্থান।
কিসিঞ্জার : মুজিবুর কি জীবিত না মৃত?
আথারটন : মুজিব মৃত। তার অনেক ঘনিষ্ঠ সহচর, পরিবারের সদস্য, ভাই, ভাগ্নে নিহত হয়েছেন।
কিসিঞ্জার : আমি ব্যুরো অব ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড রিসার্চ (আইএনআর) থেকে ভালো পরামর্শ পেয়েছি [তিনি এ কর্মকর্তার সঙ্গে ওয়াশিংটনে আগেই কথা বলেছেন। তবে এটা ফোনে নাকি সরাসরি, সেটা স্পষ্ট নয়]।
হিল্যান্ড (ব্যুরো পরিচালক) : আমি যখন আপনার সঙ্গে কথা বলেছি তখন তিনি মৃত ছিলেন না।
কিসিঞ্জার : আচ্ছা? তারা কি কিছু সময় পর তাকে হত্যা করেছে?

এ আলোচনা থেকে স্পষ্ট, ১৫ আগষ্ট অভ্যুত্থান চলাকালেই কিসিঞ্জার অবহিত হচ্ছিলেন [১৫ আগষ্ট ঢাকার যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস প্রেরিত বার্তায় বলা হয় : ঢাকার সময় বিকেল চারটা পর্যন্ত দেখা যায়, অভ্যুত্থান সফল হচ্ছে বলেই প্রতীয়মান হয়। কোনো সক্রিয় প্রতিরোধ দেখা যাচ্ছে না]।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্টাফ বৈঠকে কিসিঞ্জারের প্রথম প্রশ্নও সন্দেহ সৃষ্টি করে। তিনি প্রথমেই জানতে চেয়েছেন, মুজিব জীবিত নাকি মৃত। এ ধরনের ঘটনায় প্রথম প্রশ্ন হওয়ার কথা, মুজিব ক্ষমতায় আছেন কি নেই। কিন্তু প্রভাবশালী মার্কিন নেতা জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি বেঁচে আছেন কি-না। ১০ ঘণ্টা আগে অভ্যুত্থান চলাকালেই তিনি ঘটনার বিবরণ পাচ্ছিলেন হিল্যান্ডের কাছ থেকে। এ অভ্যুত্থান রোধে তাদের কিছু করণীয় প্রতিকারের কথা ভাবেননি। বরং যেন মনে হয়, তিনি অপেক্ষা করে ছিলেন একটি দেশের রাষ্ট্রপতির মৃত্যু সংবাদের জন্য!

বাংলাদেশের স্থপতির প্রতি কিসিঞ্জারের বিরাগ ছিল ১৯৭১ সাল থেকেই। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই বৈঠকে তিনি মুজিব সম্পর্কে যে মন্তব্য করেছিলেন তাতেও ওই বিদ্বেষের প্রতিফলন : হি ওয়াজ ওয়ান অব দ্য ওয়ার্ল্ড’স প্রাইজ ফুলস।
১৯৭৪ সালের ৩০ অক্টোবর কিসিঞ্জার এসেছিলেন বাংলাদেশে। তিনি বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে। এ সফরের মাত্র তিনদিন আগে ২৭ অক্টোবর অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ পদত্যাগ করেন। মুক্তিযুদ্ধকালে দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকালে তিনি চমকপ্রদ দক্ষতা ও যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখেন। তাকে অপসারণের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের চাপ ছিল বলে ধারণা করা হয়। কিসিঞ্জাসের সফরের প্রাক্কালে তাকে অপসারণ কাকতালীয় নাকি এর পেছনে কোনো বিশেষ কারণ ছিল, সেটা ইতিহাসের গবেষণার বিষয় হতে পারে। তাজউদ্দীনের অনমনীয় মনোভাবের কারণে একাত্তর সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের পরিকল্পনা মেনে নেওয়ার জন্য খন্দকার মোশতাকের চক্রান্ত সফল হতে পারেনি।
১৯৭৪ সালের বন্যার পরপরই দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। এ সময়ে খাদ্যের ঘাটতি ছিল ব্যাপক এবং তা পহৃরণে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বাংলাদেশ সহায়তা চাইছিল।
কিসিঞ্জার বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বৈঠকে বলেন, ‘আপনার তো দেখছি চারদিক থেকেই সমস্যা।’
বঙ্গবন্ধু বন্যা সমস্যা, খাদ্য সমস্যা, রাসায়নিক সারের ঘাটতি, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পদ বণ্টন এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন শিবিরে অবস্থানকারী পাকিস্তানি নাগরিকদের তাদের দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রসঙ্গ তুললে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী সম্ভবত ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করেই ‘আপনার তো দেখছি চারদিক থেকেই সমস্যা’ বলেছিলেন। কারণ বৈঠকে তোলা প্রতিটি বিষয়েই তার অবস্থান ছিল বাংলাদেশের বিপক্ষে।
কিসিঞ্জারের বাংলাদেশ সফরের কিছুদিন আগে বঙ্গবন্ধু জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দিয়েছিলেন। ওই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ডের সঙ্গে তার বৈঠক হয়। কিসিঞ্জারের সঙ্গে ঢাকায় আলোচনাকালে বঙ্গবন্ধু ফোর্ডকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানিয়ে বলেন, তিনি ভারতে তার আসন্ন সফরের সঙ্গে মিল রেখে ঢাকা আসতে পারেন। এর জবাবে কিসিঞ্জারের মন্তব্য ছিল কূটনৈতিক শিষ্টাচারের পরিপন্থী। তিনি ঢাকায় বঙ্গবন্ধুকে বলেন, ‘ফোর্ড ভারত সফরের সময়ে বাংলাদেশে আসতে পারেন। তবে আমরা মনে করি না বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের তরফে ভারতের অনুমতি গ্রহণের প্রয়োজন রয়েছে।’
কিসিঞ্জার ওয়াশিংটনে ফোর্ডের সঙ্গেও বঙ্গবন্ধুর বৈঠকের প্রসঙ্গ তোলেন। তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট আপনার সঙ্গে আলোচনায় সন্তুষ্ট। ণড়ঁ নধসনড়ড়ুষবফ যরস! এ বাক্যের অর্থ হতে পারে, আপনি তাকে মুগ্ধ করেছেন। আবার, আপনি তাকে কথার জাদুমালা আর ব্যক্তিত্ব দিয়ে ভুলিয়েছেন বলেও ধরে নেওয়া যায়। কিন্তু ধুরন্ধর কূটনীতিক যদি নধসনড়ড়ুষবফ শব্দের আক্ষরিক অর্থ ‘প্রতারণা’ বুঝিয়ে থাকেন?
ঢাকার বৈঠকে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কাছে বাংলাদেশের ন্যায্য পাওয়ার প্রসঙ্গ তোলেন। তিনি বলেন, আমরা সম্পর্ক স্থাপনের জন্য অনেক কিছু করেছি। যুদ্ধবন্দিদের ছেড়ে দিয়েছি। পাকিস্তানের বৈদেশিক সম্পদের দায়দেনার যতটা আমাদের ওপর বর্তায় তা বহনের কথা জানিয়েছি। কিন্তু পাকিস্তান কেবল কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনে আগ্রহী।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতর যে গোপনীয় দলিল সংশোধন করে প্রকাশ করেছে তাতে দেখা যায়, কিসিঞ্জার এ প্রশ্নে পাকিস্তানের বক্তব্যই তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, আমি পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আজিজ আহমদের সঙ্গে কথা বলেছি। তিনি দায়দায়িত্ব গ্রহণের বিষয়ে আপনাদের অনাগ্রহের কথা জানিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী মুজিব : আমি ইতিমধ্যেই দায়দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। আমরা এ বিষয়ে ঋণদাতাদের সঙ্গে চুক্তি করেছি। কিন্তু কেন আমি সম্পদের ভাগ পাব না?
মুজিব : আমরা এক বা দুই বছর খাদ্য সহায়তা চাই। আমি দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার জন্য ব্যাপক সহায়তা চাই। আমরা শিল্পের কাঁচামাল চাই। আমাদের পাটের জন্য ভালো দাম চাই।
এর জবাবেই কিসিঞ্জার বলেন, আপনার তো দেখি চারদিক থেকেই সমস্যা।
বঙ্গবন্ধু চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক স্থাপনে আগ্রহের কথাও বলেন। এ প্রসঙ্গে কিসিঞ্জারের বক্তব্য : তারা হয়তো আপনাদের সঙ্গে পাকিস্থানের সম্পর্ক স্থাপন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে চাইবে।

হ্যাঁ, পাকিস্তান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছিল ১৫ আগষ্ট বঙ্গবন্ধুকে নৃশংসভাবে হত্যার পর। চীনও সম্পর্ক স্থাপন করে এ বিয়োগান্ত ঘটনার পর।
কিসিঞ্জার কি ১৫ আগষ্টের ঘটনা আগেই জানতেন?
বঙ্গবন্ধু বন্যায় খাদ্যশস্য বিনষ্ট হওয়া এবং বিশ্ববাজারে খাদ্যের দাম অনেক বেড়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সাহায্য চাইলে কিসিঞ্জার বলেন, ‘আমাদের সমস্যা হচ্ছে, আমাদের কাছে উদ্বৃত্ত খাদ্য নেই। ... সাহায্য প্রসঙ্গে আমাদের কংগ্রেসের সঙ্গেও সমস্যা রয়েছে। আগামী মঙ্গলবার আমাদের কংগ্রেসের (প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট) নির্বাচন। তবে ১৯৭০ সালে আপনি যেভাবে জিতেছিলেন তেমন সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রশাসন আশা করে না।
জবাবে বঙ্গবন্ধু রসিকতা করে বলেন, ‘নির্বাচনে অত বেশি আসন পাবেন না। আপনারা জানেন, আমি বিপুলভাবে জয়ী হওয়ার পর কী ঘটেছিল : পাকিস্তানিরা এখানে সবকিছু ধ্বংস করে দেয়। আমাকে গ্রেফতার করে। আমার পাঁচ বছরের ছেলেও বলে, আর নির্বাচনে দাঁড়াবে না।’
এর জবাবে কিসিঞ্জার বলেন, ‘আপনি নিশ্চয়ই কিছু সময়ের জন্য আপনার দেশে নির্বাচন এড়াতে চাইবেন না!’
বঙ্গবন্ধু যে কোনো সময়েই নির্বাচন এড়াতে চাননি সেটা কিসিঞ্জার সম্ভবত জানতেন না।
১৫ আগষ্ট ওয়াশিংটনের সকালের বৈঠকে ফিরে তাকানো যাক।
বৈঠকে আথারটন জানান, অভ্যুত্থানকারীরা মুজিবকে হত্যার জন্যই এসেছিল। তারা বাড়িটি ঘেরাও করে এবং ভেতরে গিয়ে তাকে মেরে ফেলে।
আগেও তাকে হত্যার চক্রান্ত প্রসঙ্গ তুলে
কিসিঞ্জার বলেন : তাকে কি গত বছর আমরা এ বিষয়ে কিছু বলিনি?
আথারটন : গত মার্চে এ বিষয়ে আমরা অনেক ইঙ্গিত পাচ্ছিলাম।
কিসিঞ্জার : তাকে কি আমরা কিছু জানাইনি?
আথারটন : তাকে সে সময়ে জানিয়েছি।
কিসিঞ্জার : কারা এর পেছনে, সে বিষয়ে কি মোটামুটি কিছু ধারণা দিয়েছি?
আথারটন : কারা জড়িত সেসব নাম তাকে বলেছি কি-না, সেটা পরীক্ষা করে দেখতে হবে।
হিল্যান্ড : আমরা এ বিষয়ে ঠিক যথাযথ ধারণা দিইনি।
আথারটন : তিনি বিশ্বাস করেননি। তিনি বলেছেন, কেউ তাকে এ ধরনের কিছু করবে না।
বাংলাদেশের অভ্যুত্থান ‘সফল’ হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতরের কাছে খবর পৌঁছে যায় : ‘যারা অভ্যুত্থান করেছে তাদের মধ্যে রয়েছে সামরিক অফিসার, মধ্য পর্যায় ও সিনিয়র অফিসার- যাদের সাধারণভাবে পূর্ববর্তী শাসকদের তুলনায় কম ভারতপন্থি, সোভিয়েতবিরোধী এবং মার্কিনপন্থি হিসেবে গণ্য করা যায়।
কিসিঞ্জার : এটাই হতে হবে।
আথারটন : তারা দেশের নাম পরিবর্তন করে ইসলামী প্রজাতন্ত্র রেখেছে।
কিসিঞ্জার : তারা যুক্তরাষ্ট্রপন্থি হবে, এটা অপরিহার্য নয়। প্রকৃতপক্ষে পথপরিক্রমায় তারা চীনাপন্থি এবং ভারতবিরোধী হবে বলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি। আমি সবসময়ই জানতাম, ভারত বাংলাদেশকে স্বাধীন করার জন্য একদিন অনুতাপ করবে। এ ভবিষ্যদ্বাণী আমি একাত্তর সালেই করেছি।
আথারটন : আমাদের বড় সমস্যা হবে বাংলাদেশের নতুন শাসকদের সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠতা বা মাখামাখি পরিহার করা।
কিসিঞ্জার : কেন তারা আমাদের প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন বলে?
ঝানু কূটনীতিক কিসিঞ্জার ঠিকই বুঝেছিলেন স্বাধীন দেশের স্থপতিকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে যারা রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছে তারা তাদের বন্ধু এবং বৈঠকেই তিনি জানিয়ে দেন : ‘তারা আমাদের কাছ থেকে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ পাবে। আমরা তাদের স্বীকৃতি দেব।’
১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট বাংলাদেশ তার ইতিহাসের কঠিনতম পথে যাত্রা শুরু করে। এর পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা ছিল ৩০ লাখ শহীদের রক্তে অর্জিত বাংলাদেশের জনগণের জন্য অগ্রহণযোগ্য এবং অবশ্যই ক্ষতিকর। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতরের যেসব গোপনীয় দলিল প্রকাশ করা হচ্ছে, তা থেকেও এ সাক্ষ্য মেলে।

Permalink

ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর ভেলকিবাজি

বদরুদ্দীন উমর

বাংলাদেশে ইসলামী মৌলবাদী নামে পরিচিত জামায়াতে ইসলামী সংগঠন ও এর নেতাদের সঙ্গে আফগানিস্তানের তালেবান ও মধ্যপ্রাচ্যের ইসলামী মৌলবাদীদের একটা বড় পার্থক্য এই যে, শোষোক্তরা ধর্মীয় মৌলবাদী হিসেবে প্রতিক্রিয়াশীল হলেও তারা একটা দৃঢ় আদর্শগত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে এবং এদিক দিয়ে তারা সৎ। কিন্তু বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামী এবং এদের মতো ধর্মীয় সংগঠনগুলোর সেরকম কোন দৃঢ় আদর্শ নেই। ঘোষিত আদর্শ অবশ্যই আছে, কিন্তু বাস্তবত সেরকম কিছু নেই। এরা সুবিধাবাদী এবং সে কারণে এদের দ্বারা অনেক কিছুই সম্ভব এবং অনেক কিছুই হয়ে থাকে যার ফলে বোঝা যায় যে, এরা সুবিধাবাদী এবং অসৎ। নিজেদের স্বার্থের কারণে এরা এমন সব কাজ করে থাকে যার সঙ্গে এদের ঘোষিত আদর্শগত অবস্থানের সম্পর্ক সামান্য অথবা নেই বললেই চলে।


এরা মিথ্যাবাদী। এদের মিথ্যাবাদিতা ও প্রতারক চরিত্র এরা নিজেরাই জনগণের কাছে এখন তুলে ধরছে ভাষা আন্দোলন এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় এদের নিজেদের ভূমিকা নিয়ে যে প্রচারণা এরা শুরু করেছে তার মধ্যে। বিষয়টি চরিত্রের দিক দিয়ে এত কদর্য যে এর উল্লেখ করা এক বড় সামাজিক ও রাজনৈতিক দায়িত্ব।
নব্বই দশকের প্রথমদিকে যখন যুদ্ধাপরাধী হিসেবে গোলাম আযমের শাস্তির দাবিতে জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে আন্দোলন চলছিল, তখন ঢাকার দেয়ালে দেয়ালে গোলাম আযমকে ‘ভাষাসৈনিক’ হিসেবে আখ্যায়িত করে চিকা মারা হয়েছিল। সে সময় আমরা এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে এর মিথ্যা চরিত্র জনগণের কাছে তুলে ধরেছিলাম। আমরা বলেছিলাম, শুধু ইসলামের নাম নিয়ে এখন নিজেদের রাজনৈতিকভাবে রক্ষা করা সম্ভব না হওয়ার কারণে তারা ভাষা আন্দোলনের মতো একটি গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ আন্দোলনে তাদের নিজেদের সম্পর্ক জাহির করে বাঁচার চেষ্টা করছে।


এ কাজ তারা এখন আবার নতুন করে শুরু করেছে। সম্প্রতি তারা ‘ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস’ নামে একটি ভিডিও ক্যাসেট প্রকাশ করেছে। এতে সিডির কভারে লেখা আছে ‘মাতৃভাষা বাংলা ভাষা খোদার সেরা দান’। সবকিছু ছেড়ে দিয়ে এরা এখন মাতৃভাষাকে খোদার ‘সেরা দান’ হিসেবে জনগণের কাছে উপস্থিত করার চেষ্টা করছে। এদের নেতাদের বক্তৃতায় এবং এদের সমগোত্রীর লোকদের ওয়াজের মধ্যে খোদার ‘সেরা দান’ বলে যেসব বিষয়ের উল্লেখ করা হয় তার সঙ্গে বাংলা ভাষার কোন সম্পর্ক থাকে না। এর কোন উল্লেখ করা হয় না।
যাই হোক, ক্যাসেটটিতে ভাষা আন্দোলনের ওপর কিছু কথাবার্তা থাকলেও বিশেষভাবে লক্ষণীয় হল জামায়াতে ইসলামীর নেতা গোলাম আযমের দু’দফা সাক্ষাৎকার, যাতে তিনি নিজেকে ভাষা আন্দোলনের একজন সক্রিয় নেতা হিসেবে জাহির করার চেষ্টা করেছেন। এই প্রচেষ্টা যে কত অসৎ ও হীন এর একটা প্রমাণ হচ্ছে, এ ক্যাসেট তৈরির সময় তথ্য সহায়তা যারা করেছেন তাদের মধ্যে আমার নাম উল্লেখ। এ কাজ করার উদ্দেশ্য যে এই প্রতারণাপূর্ণ ব্যাপারটির প্রামাণ্যতা নিশ্চিত করা এতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু আমার তথ্য সরবরাহ করার বিষয়টি সর্বৈব মিথ্যা ছাড়া আর কিছুই নয়। এক বন্ধু ক্যাসেটটি দেখার জন্য আমাকে দেয়ার আগে এ বিষয়ে আমি কিছুই জানতাম না। ভাষা আন্দোলনে গোলাম আযমের ভূমিকা সম্পর্কে প্রচার কাজে আমি তথ্য দিয়ে জামায়াতে ইসলামীকে সহায়তা করেছি এটা প্রচার করা থেকে বড় ধৃষ্টতা আর কি হতে পারে? কতখানি নৈতিক অধঃপতন ঘটলে এ কাজ কোন ব্যক্তির পক্ষে সম্ভব, সেটা বলাই বাহুল্য।


আমি আমার ভাষা আন্দোলনের বইটির প্রথম খণ্ডে একবারই মাত্র গোলাম আযমের উল্লেখ করেছি। ১৯৪৮ সালের নভেম্বর মাসে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান পূর্ব পাকিস্তান সফরে আসেন। ২৭ নভেম্বর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের এক সমাবেশে ভাষণ দেন। সেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ইউনিয়নের পক্ষ থেকে তাকে একটি মানপত্র দিয়ে তাতে বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানানো হয়। এ মানপত্রটি পাঠ করেন ইউনিয়নের তৎকালীন সেক্রেটারি গোলাম আযম। আসলে এটি পাঠ করার কথা ছিল ইউনিয়নের ভাইস প্রেসিডেন্ট অরবিন্দ বোসের। কিন্তু লিয়াকত আলীকে ভাষা আন্দোলনের দাবি সংবলিত মানপত্র পাঠ একজন হিন্দু ছাত্রকে দিয়ে করালে তার মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হবে এবং মুসলিম লীগ সরকার এ নিয়ে নানা প্রকার বিরূপ প্রচার শুরু করবেÑ এ আশংকা থেকেই একজন মুসলমান ছাত্র হিসেবে সেক্রেটারি গোলাম আযমকে সেটা পাঠ করতে দেয়া হয়েছিল। এই হল ভাষা আন্দোলনে গোলাম আযমের ‘বিরাট’ ভূমিকা। যাই হোক, এ বিষয়টি আমি আমার ভাষা আন্দোলনের ওপর লেখা বইটিতে স্বাভাবিকভাবেই উল্লেখ করেছি। বইটি থেকে অন্যান্য তথ্যের মতো এ তথ্যও যে কোন লোক ব্যবহার করতে পারে। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, আমি গোলাম আযমকে ভাষা আন্দোলনের একজন নায়ক হিসেবে উপস্থিত করার জন্য জামায়াতে ইসলামীর এই প্রতারণাপূর্ণ প্রচেষ্টার ক্ষেত্রে কোন তথ্য সহায়তা প্রদান করেছি। মানুষ হিসেবে এদের চরিত্র কত কলুষিতÑ এই প্রতারণা তার এক প্রামাণ্য দৃষ্টান্ত।


এ তো গেল বিষয়টির একটি দিক। এর অন্যদিক হল, মহামান্য গোলাম আযম সাহেব ভাষা আন্দোলনে বীরত্বপূর্ণ ও নায়কোচিত ভূমিকা পালন করা সত্ত্বেও তাতে নিজের এই অংশগ্রহণকে সুবিধাবাদী কারণে অস্বীকার করতেও দ্বিধাবোধ করেননি। আজ নয়, পাকিস্তানি আমলে ১৯৭০ সালের জুন মাসে, পশ্চিম পাকিস্তানের শুক্কুর শহরে এক বক্তৃতা প্রসঙ্গে এই জামায়াত নেতা ‘খোদার সেরা দান’ বাংলা ভাষা ও ভাষা আন্দোলনের বিরোধিতা করতে গিয়ে বলেন, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এক মারাÍক রাজনৈতিক ভুল এবং তিনি নিজে এই আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত থাকার জন্য দুঃখিত। গোলাম আযম ভাষা আন্দোলনের বিরুদ্ধে বিষোদগার করতে গিয়ে বলেন, উর্দু হচ্ছে এমন একটা ভাষা যার মাধ্যমে ইসলামী শিক্ষার উপযুক্ত প্রচার ও প্রসার সম্ভব। কারণ ‘উর্দু পাক-ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানদের সাধারণ ভাষা এবং এতে তাদের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় সম্পদ সংরক্ষিত রয়েছে।’ নিজের ভ্রান্ত ভূমিকা সম্পর্কে খেদোক্তি করতে গিয়ে গোলাম আযম আরও বলেন, বাংলা ভাষা আন্দোলন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দৃষ্টিকোণ থেকে মোটেই সঠিক কাজ হয়নি। (দৈনিক আজাদ, ২০ জুন, ১৯৭০) শুক্কুরে দেয়া গোলাম আযমের এই বক্তৃতা পত্রিকায় প্রকাশের পর আমি আমার সম্পাদিত সাপ্তাহিক ‘গণশক্তি’ পত্রিকায় এর ওপর লিখেছিলাম। (২১.৬.১৯৭০) গোলাম আযম এসব কথা বলছিলেন এমন এক সময়ে যার অনেক আগে ভাষা আন্দোলনের দাবি অনুযায়ী ১৯৫৬ সালের পাকিস্তান সংবিধানে বাংলা অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃত হয়েছিল।


দেখা যাচ্ছে, জামায়াত নেতা গোলাম আযম সাহেবের কথাবার্তার ভেল্কিবাজি ও নৈতিক অধঃপতনের তুলনা নেই। ভাষা আন্দোলনে তার অংশগ্রহণের কাহিনী, তারপর ১৯৭০ সালে তাতে অংশগ্রহণে দুঃখ প্রকাশ ও ভাষা আন্দোলনকে বেঠিক কাজ হিসেবে আখ্যায়িত করা, ১৯৯২ সালে নিজেকে ‘ভাষাসৈনিক’ হিসেবে প্রচার করা এবং এখন আবার বাংলা ভাষাকে ‘খোদার সেরা দান’ হিসেবে গৌরবান্বিত করার জন্য মিথ্যায় পরিপূর্ণ ক্যাসেট বের করাÑ সবই হল জামায়াতে ইসলামীর জাদুর খেলা। এর সঙ্গে যে প্রকৃত ইসলামী নৈতিকতার কোন সম্পর্ক নেই একথা বলাই বাহুল্য।


শুধু ভাষা আন্দোলনই নয়, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ নিয়েও জামায়াতে ইসলামী এখন একটা জাদুর খেলা দেখাচ্ছে। ১৯৭১ সালে তারা স্বাধীনতা যুদ্ধের সম্পূর্ণ বিরোধিতা করে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর সঙ্গে নানা চক্রান্তে লিপ্ত ছিল। তারা সামরিক বাহিনীর সহায়ক শক্তি হিসেবে এমন ক্রিমিনাল কাজ নেই যা করেনি, ডিসেম্বর মাসে তারা এদেশের অনেক গুণী বুদ্ধিজীবীকে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল। সে সময়ে এদের অপকীর্তি ও গণশত্র“তার শেষ নেই। অথচ এরাই এখন মাঠে নেমেছে নিজেদের একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধের সৈনিক হিসেবে প্রমাণ করার জন্য। এ উদ্দেশ্যে এরা কিছুসংখ্যক বেইমানকে দিয়ে গঠন করেছে এক মুক্তিযোদ্ধা সংসদ।
এই সংক্ষিপ্ত লেখা শেষ করার আগে এটা অবশ্যই বলা দরকার, জামায়াতে ইসলামী এখন ‘বিশুদ্ধ ইসলামী লাইনের’ বাইরে এসে ভাষা আন্দোলন ও স্বাধীনতা আন্দোলনে নিজেদের ভূমিকা প্রমাণ করার চেষ্টার মূল কারণ, ইসলাম দিয়ে এখন আর তাদের বড় বেশি সুবিধা হচ্ছে না। এজন্য এ দেশের প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সঙ্গে নিজেদের সম্পর্ক, মিথ্যার ভিত্তিতে হলেও প্রচার করে, এরা নিজেদের পায়ের নিচে মাটি খোঁজার চেষ্টা করছে। কিন্তু যে মাটি তাদের পায়ের তলায় নেই, সেটা খোঁজ করে কোন লাভ নেই। জামায়াতে ইসলামীর মতো প্রতিক্রিয়াশীল ধর্মীয় রাজনৈতিক দলের ভবিষ্যৎ বাংলাদেশে অনেক আগেই ঐতিহাসিকভাবে নির্ধারিত হয়ে গেছে।

দৈনিক যুগান্তর । ২৭ জুলাই ২০০৮

Permalink

আমি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চেয়েই যাব

আমি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চেয়েই যাব
লাঞ্ছিত সেই মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলী সমকালকে বললেন-
সমকাল প্রতিবেদক

মুক্তিযোদ্ধাদের নামধারী সংগঠন জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা পরিষদের সম্মেলনে গিয়ে লাঞ্ছিত হয়েছিলেন টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার চক্কাশী গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা শেখ মোহাম্মদ আলী আমান। তিনি জানান, সম্মেলনের নিরাপত্তার দায়িত্ব থাকা ছাত্রশিবিরের ক্যাডাররা তাকে টেনেহিঁচড়ে লাথি মেরেই শুধু ক্ষান্ত থাকেনি, প্রায় তিন ঘণ্টা আটকে রেখেছিল ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনষ্টিটিউট ভবনের একটি কক্ষে। ঘরবাড়ির ঠিকানাসহ নানা বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ, সঙ্গে থাকা ভোটার আইডি কার্ডের ফটোকপি নিয়ে তারপর ছেড়ে দেওয়া হয় তাকে।

গতকাল সমকাল কার্যালয়ে বসে এক সাক্ষাৎকারে মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলী বলেন, যত বিপদই আসুক আমি একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চেয়েই যাব। তিনি মধ্য বাড্ডার বিজয় সরণি সড়কে থাকেন। ছেলের সঙ্গে ঘরবাড়ি রঙের কাজ করেন। এলাকার একজন পরিচিত মুক্তিযোদ্ধার আমন্ত্রণে তিনি ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স
ইনষ্টিটিউটে যান। কিন্তু সম্মেলন কক্ষের বাইরে থেকে উঁকি দিয়ে দেখতে পান, সেখানে সেক্টর কমান্ডারদের কেউ নেই। এ অবস্থায় তিনি ভেতরে না গিয়ে বাইরের লনে বসেন। এরই মধ্যে ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা কয়েকজন বিড়বিড় করে বলতে থাকেন, যে মিটিংয়ে সেক্টর কমান্ডারদের বিচার চাওয়া হয়, সে মিটিংয়ে থাকব না।

এ সময় একুশে টেলিভিশনের একজন সাংবাদিক তার কাছে জানতে চান, তিনি মুক্তিযোদ্ধা কি-না? উত্তরে তিনি জানান, তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা। ১১নং সেক্টরে কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বাধীন প্রথম বেঙ্গল রেজিমেন্টের ডি কোম্পানিতে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।

এরপর ইটিভি জানতে চায়, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়ে তার কোনো বক্তব্য আছে কি-না? উত্তরে তিনি বলেন, স্বাধীনতা যুদ্ধে যারা এ দেশের বিরোধিতা করেছিল, নারী ধর্ষণ করেছিল, অগ্নিসংযোগ করেছিল, বুদ্ধিজীবী হত্যা করেছিল সেসব যু™ব্দাপরাধীকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো উচিত। তখন শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান-মেম্বার যারা ছিল তারা জামায়াতে ইসলামী ও বর্তমানে পিডিপি করে।

তিনি বলেন, তাদের এখনই ফাঁসি দিতে হবে। বর্তমান নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারই কেবল এ বিচার করতে পারে। মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলীর ভাষায়, ‘আমার বক্তব্য শেষ হতে দেরি, ধরতে দেরি নাই। উড়াল দিয়ে পাখির মতো ছোঁ মেরে আমাকে ভেতরে নিয়ে যায়। তারা যা করেছে, তা আমি আর বলতে চাই না। বললে এটা মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অপমান হবে।’

ভেতরে নিয়ে বর্ষীয়ান এই মুক্তিযোদ্ধাকে তিন ঘণ্টা আটকে রাখা হয়। এ সময় ইটিভির কাছে দেওয়া সাক্ষাৎকারের জন্য কৈফিয়ত চাওয়া হয় তার কাছে। পরে জনৈক জামায়াত নেতা সোলায়মান হোসেনের মধ্যস্ট’তায় তিনি মুক্ত হন। ছেড়ে দেওয়ার আগে ওই জামায়াত নেতা জানতে চান, ভবিষ্যতে তাকে মুক্তিযোদ্ধা পরিষদ আমন্ত্রণ জানালে তিনি আসবেন কি-না। উত্তরে তিনি বলেন- ‘আসব, তবে আমি
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চেয়েই যাব। আমার ফাঁসি হলেও এ দাবি করেই যাব।’

জামায়াতে ইসলামীর সমর্থনপুষ্ট এ ধরনের সংগঠনকে একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে কীভাবে দেখছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, খোঁজ নিলে দেখা যাবে এর ভেতরে অনেক যুদ্ধাপরাধী লুকিয়ে আছে। লুকায়িত যুদ্ধাপরাধীদের সম্মেলনে একজন সাবেক প্রধান বিচারপতির অংশগ্রহণ সম্পর্কে তিনি মন্তব্য করেন, শাহ আজিজের মতো রাজাকার প্রধানমন্ত্রী হতে পারলে সাবেক প্রধান বিচারপতি তাদের মিটিংয়ে আসতেই পারেন।

ইটিভির রিপোর্টার ও মুক্তিযোদ্ধাকে আটক সম্পর্কে
সম্মেলনে ইটিভির রিপোর্টার সাজেদ রোমেল ও মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলীকে আটকের ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে সংগঠনের মহাসচিব মোহাম্মদ ইকবাল বলেন, বিষয়টি আমরা জানতামই না। ইটিভির হেড অব নিউজ রাশেদ চৌধুরী আমাদের একজনকে জানান, আমাদের লোকেরা নাকি তার রিপোর্টারকে আটকে রেখেছে। বিষয়টি জেনে আমরা তাকে ফোন করে জানাই, আপনার রিপোর্টার স্বেচ্ছায় বসে আছেন। তিনি তার বন্ধুদের ছাড়া যেতে রাজি নন। মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলীর বিষয়ে তিনি বলেন, আমাদের সম্মেলনে প্রতিনিধি সংখ্যা নির্ধারিত। প্রতিনিধিদের জন্য নির্দিষ্ট কার্ড আছে এবং কারা সম্মেলনে এলেন তারও রেকর্ড আছে। কেউ ইচ্ছা করলেই সম্মেলনের ভেতরে ঢুকতে পারবেন না। তিনি বলেন, মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় দিয়ে মোহাম্মদ আলী কারো ভাড়াটে হিসেবে সে কাজটিই করতে চেয়েছেন।

মুক্তিযোদ্ধা পরিষদ যা বলছে
এদিকে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা পরিষদ সমকালসহ গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদকে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর বলে প্রতিবাদ জানিয়েছে। তারা বলেছে, কতিপয় লোক সম্মেলনের ডেলিগেট কার্ড ছাড়া জোর করে ঢুকতে গেলে স্বেছাসেবকরা কার্ড দেখতে চাইলে তারা অসংলগ্ন কথা বলে। এ সময় ইটিভি সে দৃশ্য ধারণ করে পরিকল্পিতভাবে তাদের সাক্ষাৎকার নেয়। তারা মূল অনুষ্ঠানের সংবাদ পরিবেশন না করে
কতিপয় ভাড়াটে লোক উদ্দেশ্যমূলক এ দৃশ্যের অবতারণা করে প্রতিনিধি সম্মেলনকে ভন্ডুল করার অপচেষ্টা চালায়। কিন্তু তাদের সে অপচেষ্টা ব্যর্থ হয়। তারা দাবি করেন, মুক্তিযোদ্ধা পরিষদ প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠন। এর সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক দলের সংশ্লিষ্টতা নেই।
---------
খবর: সমকাল ১৪ জুলাই

Permalink

কুৎসিত জামায়াত শিবির

এই কুৎসিত জামায়াতী ইসলামের নেতাকে চিনে রাখুন। তার মুখে থু থু দিন।
রে কুলাঙ্গার জামায়াত শিবির তোদের দিন ফুরিয়ে গেছে। পিপিলীকার পাখা গজায় মরিবার তরে। তোরা ভুলে গেছিস কি সে কথা? তোর মরণ অতি সন্নিকটে। তোদের আর কোন ক্ষমা নাই।

এই অপরাধীকে চিহ্নিত করার পরেও সরকার নীরব কেন? কোথায় তাদের সমস্যা? কেন সরকার এই হিংস্র নরপশুকে এখনও গ্রেফতার করছে না। সরকার এই প্রসঙ্গে চুপ করে আছে কেন?

Permalink

জামায়াতী কাণ্ড

বিএনপি'র আমলের সাবেক বিচারপতি মোদাচ্ছির এ কি কথা বললেন? তিনি বলেছেন- জামায়াতের এই আয়োজনে শরিক হতে পেরে তিনি গর্বিত। ছি! ছি! বিচারপতি, তোকে ছি! তোর মুখে থু থু দেই। তোর মত নরাধমকে বিএনপি বিচারপতি বানিয়েছিল, এটাই স্বাভাবিক।

এই জামায়াত নেতাকে চিনে রাখুন। এই সেই নোংরা, কুৎসিত, কদর্য চেহারা। এই সেই হিংস্র, নরাধম জামায়াতে ইসলামীর নেতা। এই সেই পাপীষ্ঠ যে বাংলা মায়ের শ্রেষ্ঠ সন্তান মুক্তিযোদ্ধার পবিত্র শরীরে লাথি মারে।

Permalink

জামায়াতের হিংস্রতা

প্রথম আলো’র নিউজঃ

‘জামায়াতের এ সমস্ত নেতারা পিস কমিটির (শান্তি কমিটি) সদস্য ছিল। যারা রাজাকার, আলবদর ছিল তারা গণহত্যা, নির্যাতন, ধর্ষণ করেছে। এখনই তাদের বিচার করতে হবে। আমার বিবেচনায়, তাদের এখনই ফাঁসি দিতে হবে।…’
তাঁর বক্তব্য শেষ হয়নি। সাংবাদিকেরা তাঁর নামটিও জানার সুযোগ পাননি। এর আগেই বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের ক্যামেরার সামনে থেকে বর্ষীয়ান এ মুক্তিযোদ্ধাকে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হয়। একজন তাঁর পিঠে লাথি বসিয়ে দেয়।
গতকাল শুক্রবার সকালে রাজধানীর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে ‘জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা পরিষদ’-এর প্রতিনিধি সম্মেলনে এ ঘটনা ঘটে। জামায়াতের উদ্যোগে গড়া সংগঠনটির গতকালের সম্মেলনে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করে ছাত্রশিবিরের কর্মীরা। তাদের হাতেই লাঞ্ছিত হন ওই মুক্তিযোদ্ধা। তারা একুশে টেলিভিশনের প্রতিবেদক সাজেদ রোমেলকেও প্রায় এক ঘণ্টা আটকে রাখে।
জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা পরিষদের সহসভাপতি ইঞ্জিনিয়ার আবদুর রবের কাছে মুক্তিযোদ্ধা লাঞ্ছনা ও সাংবাদিককে আটকে রাখার বিষয়ে জানতে চাইলে প্রথমে তিনি দাবি করেন, এমন কিছু হতেই পারে না। নির্যাতনের ছবি টেলিভিশনের ক্যামেরায় ধারণ করা আছে জানালে তিনি মুহুর্তেই সুর পাল্টে বলেন, ‘এসব সাবোটাজ (অন্তর্ঘাতমূলক কাজ)। আমাদের সংগঠনের লোকেরা এসব করতে পারে না।’
সংগঠনটির জাতীয় সম্মেলনের প্রধান অতিথি ছিলেন সাবেক প্রধান বিচারপতি সৈয়দ জে আর মোদাচ্ছির হোসেন। জামায়াত-সংশ্লিষ্টদের অনুষ্ঠানে আসার বিষয়ে সাংবাদিকেরা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এসবের কিছুই তিনি জানেন না।
তবে আলোচনা অনুষ্ঠানে জে আর মোদাচ্ছির বলেছেন, এখন স্বাধীনতার চেতনার নাম দিয়ে জাতিকে বিভাজন না করে সুন্দর দেশ গড়ার জন্য কাজ করতে হবে।
বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের জ্বালানি উপদেষ্টা মাহমুদুর রহমান বলেন, গত ২৬ মার্চ ভারতীয় জেনারেলকে এনে স্বাধীনতার চেতনার অবমাননা করা হয়েছে।
বিডিআরের সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) ফজলুর রহমান বলেন, ভারতীয় আগ্রাসনের প্রতিবাদ ও ষড়যন্ত্রের মোকাবিলা করতে ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়া এখন সময়ের দাবি।
উইং কমান্ডার (অব.) হামিদুল্লাহ খান বলেন, কতিপয় সেক্টর কমান্ডার জাতিকে বিভ্রান্ত করে দেশবাসীকে অপমানিত করার জন্য কথিত যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের হুমকি দিয়েছেন। সম্মেলনে কয়েকজন বক্তা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চাওয়ায় মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডারদের শাস্তি দাবি করেছেন।
ঢাকার বাইরে থেকে আসা মুক্তিযোদ্ধারা এসব বক্তব্য শুনে হতভম্ব হয়ে পড়েন। পাবনা থেকে আসা মুক্তিযোদ্ধা মকবুল হোসেন ক্ষুব্ধ হয়ে সম্মেলনকক্ষ থেকে বেরিয়ে যান। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘তারা যেসব মন্তব্য করেছে, সেগুলো মোটেও ভালো লাগেনি। এ কারণে আমি অনুষ্ঠান থেকে বের হয়ে এসেছি। এসব অসহনীয় বক্তব্য। এরা বলে, সেক্টর কমান্ডারদের বিচার হতে হবে। এরা আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে নানা কথা বলেছে। কিন্তু আমরা তো আওয়ামী লীগের ডাকে মুক্তিযুদ্ধ করেছি।’
জামায়াত-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মুক্তিযোদ্ধা সংগঠন তৈরি ও জাতীয় সম্মেলন করাকে ভন্ডামি আখ্যা দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সামরিক নেতারা প্রথম আলোকে বলেন, যারা যুদ্ধের সময় এ দেশের মানুষের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছে, পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে গণহত্যা, লুন্ঠন ও ধর্ষণে সহায়তা করেছে, এখন তারা মুক্তিযোদ্ধা সাজার চেষ্টা করছে। তারা দেশের সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতারিত করার চেষ্টা করছে। এদের প্রতি ঘৃণা ছাড়া আর কিছুই থাকতে পারে না।
মুক্তিযুদ্ধের উপপ্রধান সেনাপতি এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) এ কে খন্দকার প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা সভ্য দেশে বাস করছি, এখানে এসব অসভ্যতা চলতে পারে না। এদের ব্যাপারে কী করা যায় আমরা শিগগিরই বসে সিদ্ধান্ত নেব।’
৮ নম্বর সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) আবু ওসমান চৌধুরীও বলেছেন, ‘ওরা যা-ই বলুক না কেন, মানুষের কাছে এসবের কোনো মূল্য নেই। মানুষ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চায়।’
গত ২৬ জানুয়ারি ‘জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা পরিষদ’ গঠন করা হয়। প্রথমে এ/১১ শ্যামলী হাউজিং, আদাবরে একটি বাড়িতে ও পরের মাসে ১১৬/২ নয়াপল্টনে (জামান কনস্ট্রাকশন ভবনের দোতলায়) জামায়াতের পল্টন থানা শাখার সাবেক আমির এ টি এম সিরাজুল হকের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে এর কেন্দ্রীয় কার্যালয় স্থাপন করা হয়। সেখানকার পল্টন মানবশিক্ষা উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের একটি কক্ষ সাবলেট (ভাড়াটের কাছ থেকে ভাড়া নেওয়া) নিয়ে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় কার্যালয় স্থাপন করা হয়েছে। এ টি এম সিরাজুল হক ওই প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম দেশব্যাপী আন্দোলন শুরু করলে এ সংগঠন আত্মপ্রকাশ করে। ফোরাম যে দলগুলোর বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ আনছে, এগুলোর অন্যতম হচ্ছে জামায়াত। ফোরামের আন্দোলনকে বিতর্কিত করার মানসে ‘জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা পরিষদ’ নামে এ সংগঠন গড়ে তোলা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন। স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে গত ২২ মার্চ রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে ও ২৬ মার্চ ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে আলোচনা সভায় যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের উদ্যোগ নেওয়ায় সেক্টর কমান্ডারদের বিরুদ্ধে দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রের অভিযোগ এনেছিল জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা পরিষদ। গতকালের সম্মেলনেও একই ধরনের বক্তব্য দেওয়া হয়।
পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি প্রকৌশলী মোসলেম উদ্দিনের সভাপতিত্বে গতকালের সম্মেলনে বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউটের সাবেক মহাপরিচালক রেজোয়ান সিদ্দিকী, নিউ নেশন-এর সম্পাদক মোস্তফা কামাল মজুমদার, ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক রুহুল আমিন গাজী, সাংবাদিক আমানুল্লাহ কবীর প্রমুখ।

Permalink

ব্রেকফাস্ট টেবিলে একহাতে কাঁটাচামচ আরেক হাতে ৭৭ মুক্তিযোদ্ধা অফিসারের ফাঁসির নির্দেশে স্বাক্ষর দেন জিয়াউর রহমান

খবর সূত্র: ভোরের কাগজ

ব্রেকফাস্ট টেবিলে একহাতে কাঁটাচামচ আরেক হাতে ৭৭ মুক্তিযোদ্ধা অফিসারের ফাঁসির নির্দেশে স্বাক্ষর দেন জিয়াউর রহমান

নিউইয়র্কে সংবাদ সম্মেলনে সাবেক সেনা প্রধান হারুন

নিউইয়র্ক থেকে এনা : শাসক জিয়া মুক্তিযোদ্ধা জিয়ার সঙ্গে বিট্রে (বিশ্বাসঘাতকতা)করেছেন। ব্রেকফাস্টের টেবিলে বসে একহাতে কাঁটাচামচ, আরেক হাতে ৭৭ মুক্তিযোদ্ধা অফিসারের ফাঁসির নির্দেশে স্বাক্ষর দেন জিয়াউর রহমান। গত ২৬ মে নিউইয়র্কে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সাবেক সেনাপ্রধান লে. জেনারেল (অব) হারুন-অর রশীদ বীরপ্রতীক এ কথা বলেন। সংবাদ সম্মেলনে তিনি ১৯৭৫-এর পট পরিবর্তনের পর জিয়াউর রহমানের শাসনামলে কতোটি ক্যুর চেষ্টা হয়েছিল, আর সেগুলো ব্যর্থ হওয়ার পর বিদ্রোহের দায় চাপিয়ে মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের কিভাবে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়- তার বিস্তারিত বর্ণনা দেন।

লে. জেনারেল (অব) হারুন-অর রশীদ বলেন, জিয়াউর রহমানের আমলে অর্থাৎ ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে নৃশংসভাবে হত্যার পর থেকে ১৯৮১ সালের ৩০ মে তিনি নিহত হওয়ার আগ পর্যন্ত সেনাবাহিনীতে ২৬টি ক্যু হয়েছে, যার একটিও সফল হয়নি। এসব ক্যুর জন্য শত শত মুক্তিযোদ্ধা অফিসারকে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়েছে।

লে. জেনারেল হারুন সে সব দিনের দুঃসহ স্মৃতিচারণ করে আরো বলেন, ব্রেকফাস্টের টেবিলে বসে একহাতে কাঁটাচামচ ধরে, আরেক হাতে কলম তুলে ফাঁসির নির্দেশে স্বাক্ষর করেছেন জিয়াউর রহমান। একদিন সকালে এভাবে মোট ৭৭ জনের ফাঁসির আদেশে স্বাক্ষর দেন তিনি।
হারুন-অর রশীদ বলেন, ১৯৮২ থেকে ১৯৯০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত জেনারেল এরশাদের আমলে ৭ বার ক্যুর চেষ্টা করা হয়। এরশাদ ১৪ জন মুক্তিযোদ্ধা অফিসারকে বিনাবিচারে ফাঁসিতে ঝুলিয়েছেন জেনারেল জিয়াউর রহমানের ঘাতক হিসেবে। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর জেল হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে এবং মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার খালেদ মোশাররফকে হত্যা করা হয়েছে। আরেক সেক্টর কমান্ডার যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা কর্নেল আবু তাহেরকেও একইভাবে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়েছে। মোট কথা ১৯৭৫-এর পট পরিবর্তনের পর নানা অজুহাতে মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক এবং মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের নির্বিচারে হত্যা করা হয় ।

সাবেক সেনাপ্রধান বলেন, এসব ঘটনা দেশবাসীকে জানতে হবে। অপর এক প্রশ্নের জবাবে সাবেক সেনাপ্রধান ও সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের প্রধান সমন্বয়কারী হারুন-অর রশীদ বলেন, ক্যু, পাল্টা ক্যু ইত্যাদির ষড়যন্ত্র হয়েছে বাইরে এবং তার বাস্তবায়ন ঘটানো হয় ক্যান্টনমেন্ট থেকে এবং প্রতিটি ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছেন মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তারা। তিনি বলেন, এহেন পরিস্থিতির অবসানে সত্যিকারের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য নির্ভেজাল গণতন্ত্র অপরিহার্য। তবে সে গণতন্ত্র যেন দলীয় স্বার্থে জিম্মি হয়ে না পড়ে সেদিকেও সংশ্লিষ্টদের খেয়াল রাখতে হবে।

সংবাদ সম্মেলনে অপর এক প্রশ্নের জবাবে সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের সমন্বয়কারী মেজর জেনারেল (অব) জামিল ডি আহসান বীরপ্রতীক বলেন, সেনা শাসন প্রলম্বিত হয় রাজনীতিকদের কারণে। কিছুসংখ্যক রাজনীতিক সেনা শাসনকে সমর্থন দেন নিজেদের স্বার্থে।
প্রসঙ্গত, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবিতে সোচ্চার প্রবাসের বিভিন্ন সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত ‘ফেডারেশন অব অর্গানাইজেশনস এগেইনস্ট বাংলাদেশ ওয়ার ক্রিমিনালস’ এবং ‘বাংলা হলোকাস্ট এন্ড নাৎসি রিসার্চ সেন্টার’-এর যৌথ উদ্যোগে জ্যাকসন হাইটসের বাংলাদেশ প্লাজা মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এ সংবাদ সম্মেলনে সাবেক এয়ার ভাইস মার্শাল ও সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের আহ্বায়ক এ কে খন্দকারও সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন।

এ কে খন্দকার বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবিতে চলমান আন্দোলনের সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতৃবৃন্দ। আমেরিকানরাও মানবাধিকারকে অধিক গুরুত্ব দেন। তাই প্রতিটি প্রবাসীকে নিজ নিজ এলাকার সিনেটর-কংগ্রেসম্যানের সঙ্গে লবিং চালাতে হবে।
আয়োজক সংগঠনের আহ্বায়ক ড. নূরন্নবী এবং সৈয়দ মুহম্মদ উল্লাহ ও ডা. মিনা ফারাহ ছাড়াও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কেন জরুরি সে আলোকে বক্তব্য উপস্থাপন করেন সীতাংশু গুহ এবং ড. মহসিন আলী। এ সময় ডা. মিনা ফারাহর লেখা ‘হিটলার থেকে জিয়া’ গ্রন্থটির একটি কপি উপহার দেওয়া হয় সেক্টর কমান্ডারস ফোরামকে।

সংবাদ সম্মেলনের পর তারা বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশার প্রতিনিধিত্বকারী লোকজনের সঙ্গে চলমান আন্দোলনের ব্যাপারে মতবিনিময় করেন।

Permalink

BBC Asia-Pacific

CNN.com - Asia