কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত

bdnews24

মহারথীদের পতন, স্বাধীনতাবিরোধীরা ধরাশায়ী

সমকাল ডেস্ক

এবারের নির্বাচনে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক প্রভাবশালী প্রার্থী হেরে গেছেন। তাদের মধ্যে বেশিরভাগই বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতা। পরাজিতদের মধ্যে আছেন অনেক সাবেক মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী।

সবশেষে পাওয়া খবর অনুযায়ী পরাজিতরা হলেন সাবেক অর্থমন্ত্রী ও বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য এম সাইফুর রহমান, বিএনপি মহাসচিব ও সাবেক চিফ হুইপ খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন, জামায়াতে ইসলামীর আমির ও সাবেক মন্ত্রী মতিউর রহমান নিজামী, সাবেক মন্ত্রী ও বিএনপি নেতা ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিকল্পধারা সভাপতি ডা. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী এম শামসুল ইসলাম, সাবেক উপ-রাষ্ট্রপতি মওদুদ আহমদ,

জামায়াতে ইসলামীর সেত্রেক্রটারি জেনারেল ও সাবেক মন্ত্রী আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, বিএনপির সাবেক মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূঁইয়া (স্বতন্ত্র), সাবেক মন্ত্রী তরিকুল ইসলাম, স্পিকার ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার, সাবেক মন্ত্রী চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলতাফ হোসেন চৌধুরী, সাবেক প্রধানমন্ত্রী কাজী জাফর আহমেদ, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর (স্বতন্ত্র), মহাজোট প্রার্থী সাংবাদিক ইকবাল সোবহান চৌধুরী, জামায়াত নেতা আবদুস সুবহান, ঢাকার মেয়র সাদেক হোসেন খোকা, বিএনপি নেতা মেজর (অব.) হাফিজউদ্দিন আহমেদ, লে. জে. (অব) মাহবুবুর রহমান, জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য রওশন এরশাদ, সাবেক প্রতিমন্ত্রী এহছানুল হক মিলন, সাবেক প্রতিমন্ত্রী ফজলুর রহমান পটল, রাজশাহীর সাবেক মেয়র মিজানুর রহমান মিনু, ডেপুটি স্পিকার আখতার হামিদ, সাবেক প্রতিমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু, মুফতি ফজলুল হক আমিনী, কৃষক শ্রমিক লীগের কাদের সিদ্দিকী প্রমুখ।

স্বাধীনতাবিরোধী প্রার্থীদের মধ্যে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী ছাড়া অন্যরা শোচনীয়ভাবে হেরে গেছেন। তারা হলেন- মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, এটিএম আজহারুল ইসলাম, আবদুস সুবহান, আবদুল খালেক মণ্ডল, রিয়াছাত আলী বিশ্বাস, আবদুল আজিজ, মাওলানা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী প্রমুখ।

সমকাল, ৩০ ডিসেম্বর, ২০০৮

Permalink

জন্মদিন নিয়ে ভণ্ডামী

খালেদা জিয়ার জন্মদিন নিয়ে বিতর্ক আছে। অথচ মানুষের জন্মদিন হলো একটা গুরুত্বপূর্ণ দিন। এই দিন নিয়ে যারা বিতর্ক সৃষ্টি করে, তাদের রুচিবোধ ও ভদ্রতা নিয়ে অনায়াসে প্রশ্ন তোলা যায়।
নিচের ছবিটা দেখুন, বোঝা যাবে অনেক কিছু।

Permalink

মাদ্রাসাছাত্রদের হুমকির মুখে বিমানবন্দরের সামনে নির্মাণাধীন ভাস্কর্য সরিয়ে ফেলা হচ্ছে

ছবি: প্রথম আলো
ছবি: বাংলার চোখ
কওমি মাদ্রাসার কয়েক শ ছাত্রের হুমকির মুখে নির্মাণাধীন ভাস্কর্য সরিয়ে নিচ্ছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ। বিমানবন্দরের সামনে ভাস্কর্য নির্মাণের বিরোধিতা করতে "বিমানবন্দর গোলচত্বর মূর্তি প্রতিরোধ কমিটি"র ব্যানারে মাদ্রাসার ছাত্রদের সংগঠিত করেন খতমে নবুওয়ত আন্দোলনের আমির মুফতি নুর হোসাইন নুরানী।
ভাস্কর মৃণাল হক জানান, স্থানীয় বাবুস সালাম মসজিদ ও মাদ্রাসার আপত্তির মুখে কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তে গতকাল বুধবার দুপুর থেকে তাঁর নির্মিত ভাস্কর্য পাঁচটি কেটে সরিয়ে নেওয়ার কাজ শুরু হয়। দেশীয় বাদ্যযন্ত্র হাতে পাঁচ বাউল এই ভাস্কর্যের মূল চরিত্র।
বিমানবন্দর থানার পুলিশ সুত্র জানায়, ভাস্কর্য সরিয়ে নেওয়ার পরও মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকেরা আগামী ২২ অক্টোবরের সমাবেশের কর্মসুচি প্রত্যাহার করেনি। তারা এখন নতুন দাবি তুলেছে, এখানে হজ মিনার করতে হবে।
মাদ্রাসার কিছু ছাত্র-শিক্ষকের হুমকির মুখে নতি স্বীকার করে ভাস্কর্য সরিয়ে নেওয়ার কথা স্বীকার করতে রাজি নয় বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (সিভিল এভিয়েশন)। সিভিল এভিয়েশনের চেয়ারম্যান এয়ার কমোডর শাকিব ইকবাল খান মজলিস গতকাল দুপুরে প্রথম আলোকে বলেন, "আমরা চেয়েছিলাম বিমূর্ত টাইপের ভাস্কর্য করতে। কিন্তু যেভাবে চেয়েছিলাম, সেভাবে হচ্ছিল না। তাই এটা আজকের মধ্যেই সরিয়ে ফেলছি। কাল-পরশুর মধ্যে এখানে ফোয়ারা বা উঁচু স্তম্ভ (টাওয়ার) ধরনের কিছু একটা বসানোর সিদ্ধান্ত নেব।"
মাদ্রাসার কিছু ছাত্র-শিক্ষকের আন্দোলনের মুখে ভাস্কর্য সরানো হচ্ছে কি না−এই প্রশ্নের জবাবে সিভিল এভিয়েশনের চেয়ারম্যান বলেন, কারও আন্দোলনের মুখে এটা সরানো হচ্ছে না। তিনি বলেন, "কেবল তারাই তো মুসলমান নয়, আমরাও মুসলমান। আমরা নিশ্চয়ই চাইব না, হাজিরা মূর্তি দেখে হজে রওনা হোন।"
সংশ্লিষ্ট সুত্রে জানা যায়, জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রবেশমুখে গোলচত্বরে এর আগে একটি বড় ফোয়ারা ছিল। বিমান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মাহবুব জামিলের উদ্যোগে সৌন্দর্য বর্ধনের অংশ হিসেবে ফোয়ারা ভেঙে সেখানে দেশীয় সংস্কৃতির নিদর্শন হিসেবে বাউলের ভাস্কর্য বসানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেটা তৈরির জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয় ভাস্কর মৃণাল হককে। আগামী ২০ অক্টোবর উদ্বোধন করার কথা ছিল।
মৃণাল হক প্রথম আলোকে বলেন, সিভিল এভিয়েশন ও সড়ক বিভাগের সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি সাড়ে তিন মাস ধরে লালন শাহকে স্নরণে রেখে ভাস্কর্য তৈরির কাজ করেন। এরপর সেগুলোর কাঠামো ১৫ দিন আগে বিমানবন্দর গোলচত্বরে স্থাপন করে বাকি কাজ করা হচ্ছিল। তিনি বলেন, "এর জন্য সিভিল এভিয়েশন বা সড়ক বিভাগকে কোনো অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছিল না। অর্থায়নের জন্য তারা আমাকে বলেছে স্পন্সর জোগাড় করতে। আমি স্পন্সর জোগাড়ও করেছিলাম।"
মৃণাল হক বলেন, স্থানীয় মসজিদ-মাদ্রাসার লোকদের আপত্তির মুখে বিমানবন্দর থানার পুলিশ ও সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ কয়েক দিন ধরে তাঁকে বলে আসছিল, হুবহু লালনের প্রতিকৃতি না করে যেন বিমূর্ত ধরনের কিছু করা হয়। তারপর সেটাও করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু মাদ্রাসা সংশ্লিষ্টদের এক কথা, মানুষ আকৃতির কিছু থাকতে পারবে না। এরপর গতকাল তারা এসে হুমকি দেয় যে সরকার না সরালে তারা নিজেরাই ভাস্কর্য উপড়ে ফেলবে। তাই সরকার এখন এটা সরিয়ে নিচ্ছে।"
স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, খতমে নবুওয়ত আন্দোলন বাংলাদেশের আমির ও ফায়দাবাদ মসজিদের ইমাম মুফতি নুর হোসাইন নুরানীর উদ্যোগে কিছুদিন ধরে আশকোনা, দক্ষিণ খান, গাওয়াইর ও ফায়দাবাদ এলাকার বিভিন্ন মসজিদ ও ছোট ছোট মাদ্রাসায় সভা করে ছাত্র-শিক্ষক ও মুসল্লিদের উত্তেজিত ও সংগঠিত করার চেষ্টা করে। মুফতি নুরানীকে চেয়ারম্যান করে "বিমানবন্দর চত্বর মূর্তি প্রতিরোধ কমিটি" গঠন করা হয়। বিমানবন্দরের সামনের জমেয়া বাবুস সালাম মসজিদ ও মাদ্রাসা কমিটির সভাপতি মুশতাক হোসেন রতন ও অধ্যক্ষ মাওলানা আনিসুর রহমানকে যথাক্রমে প্রতিরোধ কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান ও সদস্য সচিব করা হয়। "ভাস্কর্যবিরোধী আন্দোলনের" কেন্দ্রবিন্দু করা হয় জামেয়া বাবুস সালাম মসজিদ ও মাদ্রাসাকে।
এর আগে আহমদিয়া বিরোধী উগ্র কর্মসুচির মূল কেন্দ্র হিসেবে এই মাদ্রাসাকে ব্যবহার করা হয়েছিল। বর্তমানে এই মাদ্রাসা ও সংলগ্ন মসজিদের সভাপতি মুশতাক হোসেন রতন সিভিল এভিয়েশনের সাবেক গাড়ি চালক। চাকরিচ্যুত হওয়ার পর তাঁর উদ্যোগে সিভিল এভিয়েশনের জমিতে এই মসজিদ ও মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। একই কমপ্লেক্সে তারা মার্কেট করে বেশ কিছু দোকানও ভাড়া দেয়।
স্থানীয় দোকানদাররা জানায়, গত সোমবার কয়েক শ মাদ্রাসাছাত্র গোলচত্বরে এসে হুমকি দিয়ে যায় ভাস্কর্য সরিয়ে নিতে। গতকাল বেলা সাড়ে ১১টার দিকে শখানেক মাদ্রাসাছাত্র এসে আবারও একই হুমকি দেয়। বেলা সাড়ে তিনটার দিকে তারা আবার এসে ভাস্কার্য সরানোর জন্য বাঁধা রশি ধরে টানাটানি করে। তারা সেখানে "বিমানবন্দর গোলচত্বর মূর্তি প্রতিরোধ কমিটি" নামে ব্যানার ঝোলানোর চেষ্টা করে। পুলিশ তা করতে না দিলে পাশের বাবুস সালাম মসজিদের দেয়ালে ব্যানারটি ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। ওই ব্যানারে লেখা আছে−২১ অক্টোবরের মধ্যে ভাস্কর্য সরিয়ে না দিলে মুফতি নুর হোসাইন নুরানীর নেতৃত্বে আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।
বিমানবন্দর থানার পুলিশও দিনভর সেখানে নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিল। সন্ধ্যায় বিমানবন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা খান সিরাজুল ইসলাম বলেন, "গত পরশু মাদ্রাসা থেকে ছাত্র-শিক্ষকেরা এসে ভাস্কর্য নির্মাণ বন্ধের দাবি জানালে ওই দিনই কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়। গতকাল সকাল থেকে সরানোর কাজ শুরু হয়। তিনি বলেন, তিনি নিজে মুফতি নুর হোসেন নুরানী এবং জামিয়া বাবুস সালাম মসজিদ ও মাদ্রাসা কমিটির সভাপতি মোশতাক আহমেদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। আমরা তাদের বলেছি, তবু তারা কর্মসুচি প্রত্যাহার করেনি। তারা এখন দাবি করছে, এখানে হজ মিনার স্থাপন করতে হবে।"
এদিকে "মূর্তি প্রতিরোধ কমিটি"র প্যাডে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ঢাকা মহানগরীর উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন মসজিদের ইমামরা গতকাল মুফতি নুরানীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এলে তিনি তাঁদের উদ্দেশে বলেছেন, রক্ত আর লাশের বিনিময়ে হলেও বিমানবন্দর গোলচত্বর থেকে মূর্তি অপসারণ করা হবে। তিনি আজ সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে কর্মসুচি ঘোষণার কথা জানিয়ে তা ঠিকভাবে বাস্তবায়নের জন্য ইমামদের প্রতি আহ্বান জানান। এ সময় মুশতাক হোসেন রতন ও মাওলানা আনিসুর রহমানও উপস্থিত ছিলেন।

প্রথম আলো, ১৬ অক্টোবর, ২০০৮

Permalink

২৫ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ পাচ্ছে র‌্যাংগস

নজরুল ইসলাম
রাজধানীতে বিজয় সরণি-তেজগাঁও সংযোগ সড়কের মুখ আগলে গড়ে ওঠা ২২ তলা র‌্যাংগস ভবনের বৈধ অংশ ও এর অধিগ্রহণ করা জায়গার জন্য র‌্যাংগস কর্তৃপক্ষকে ২৫ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দিয়েছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ−রাজউক। এর মধ্যে অধিগ্রহণ করা ২১ কাঠা জমির দাম নয় কোটি এবং বৈধ ছয় তলার জন্য ১৬ কোটি টাকা দেওয়া হয়। প্রতি কাঠা জমির জন্য র‌্যাংগসকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে ৪২ লাখ ৮৫ হাজার ৭১৪ টাকা।
রাজউকের পরিচালক (ভুমি) সৈয়দ নজরুল ইসলাম বলেন, দলিলে উল্লিখিত জমির দামের সঙ্গে ৫০ শতাংশ টাকা যোগ করে ক্ষতিপূরণের জন্য জমির বর্তমান মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে একই পদ্ধতিতে মূল্য নির্ধারণ করা হলেও র‌্যাংগস ভবনের পেছনের জমির মালিকেরা কাঠাপ্রতি পেয়েছেন ১২ লাখ টাকা করে।
পুরো ২২ তলা ভবনটি চট্টগ্রামের জাহাজ ভাঙার প্রতিষ্ঠান সিক্স স্টার করপোরেশনের কাছে রাজউক বিক্রি করেছে এক কোটি ৩৫ লাখ টাকায়। ভবনের ভাঙা ইট-সুরকি আর রড বিক্রি করে এই টাকা তুলে লাভ করতে পারবে বলে আশা করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি।
রাজউকের প্রধান প্রকৌশলী শাহ আলম প্রথম আলোকে জানান, সিক্স স্টার ইতিমধ্যে ৭০ লাখ টাকা পরিশোধ করেছে। বাকি টাকাও শিগগিরই পাওয়া যাবে। তিনি জানান, র‌্যাংগস ভবনের মালিককে ক্ষতিপূরণ দিতে ২৫ কোটি টাকা ইতিমধ্যে ঢাকার জেলা প্রশাসকের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তবে ক্ষতিপূরণের ২৫ কোটি টাকা র‌্যাংগস কর্তৃপক্ষ এখনো গ্রহণ করেনি।
গত বৃহস্পতিবার ভবনটি মাঝখান দিয়ে ভেঙে চারতলা বরাবর নামিয়ে আনা হয়েছে। ভবনটির দুই দিকের এখন কেবল লিফট বসানোর অবকাঠামো কঙ্কালের মতো দাঁড়িয়ে আছে। গতকাল চার তলায় কলামের সংযোগ দেয়াল গ্যাসচালিত কাটার দিয়ে ভাঙা হচ্ছিল। বৃহস্পতিবার ভেঙে দেওয়া কলামগুলো নিচে নামিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে ৮০ ফুট উচ্চতার এই ভবন সম্পুর্ণ সরিয়ে ফেলা সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।
রাজউক সুত্র জানায়, ২২ তলা ভবনটির ছয় তলা পর্যন্ত বৈধ ছিল। বাকি ১৬ তলা অবৈধ। রাজধানীর একটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ সড়কের পাশে এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পাশে সরকারের সব কটি কর্তৃপক্ষের চোখের সামনে ১৯ বছর ধরে গড়ে ওঠে ভবনটি। এই ভবনের কারণে বিজয় সরণি থেকে তেজগাঁও পর্যন্ত সড়ক নির্মাণ প্রকল্পও আটকে ছিল এত বছর। কিন্তু যাদের অবহেলা ও উদাসীনতার কারণে এ অবৈধ ভবন গড়ে উঠেছিল, তাদের চিহ্নিত করারই কোনো উদ্যোগ এখন পর্যন্ত নেওয়া হয়নি।
বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা নেওয়ার পর গত বছর এ ভবনটির ১৬ তলা অবৈধ আখ্যা দিয়ে ভেঙে ফেলার কাজ শুরু করে রাজউক। এ কাজ করতে গিয়ে দুর্ঘটনায় ১১ জন গরিব শ্রমিক এবং আরেকজন র‌্যাংগস ভবনের নিরাপত্তা কর্মী প্রাণ হারিয়েছেন। এঁদের প্রত্যেকের পরিবারকে রাজউক ইতিপূর্বে এক লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দিয়েছে।
বিজয় সরণি-তেজগাঁও সংযোগ সড়কের প্রকল্প পরিচালক ও রাজউকের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আনোয়ার হোসেন জানান, আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে র‌্যাংগস ভবন ভেঙে মাটির সমতলে নামিয়ে আনা হবে। সিক্স স্টার করপোরেশনের প্রকৌশলী বি এম ফয়েজউদ্দিন বলেন, কার্যাদেশ অনুযায়ী আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে ভবন ভাঙার কাজ শেষ করা সম্ভব।
রাজউকের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে থাকা একই প্রতিষ্ঠানের সদস্য (পরিকল্পনা) গোলাম কিবরিয়া এ প্রসঙ্গে বলেন, বুয়েটের পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশনায় নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নিয়ে ভবনটি ভাঙা হচ্ছে। এটি দ্রুত ভাঙতে সাধ্যমতো চেষ্টা করা হচ্ছে।
ভাঙার কাজ তত্ত্বাবধানকারী রাজউকের সহকারী প্রকৌশলী হারুন এ মজিদ প্রথম আলোকে জানান, বুয়েটের বিশেষজ্ঞদের তদারকিতে প্রতিদিন দিনের পালায় চারজন ও রাতের পালায় রাজউকের দুজন প্রকৌশলীর নেতৃত্বে ৮২ জন শ্রমিক ও ১৫ জন টেকনিশিয়ান কাজ করছে। তিনি জানান, ১৫ অক্টোবরের মধ্যে উত্তর ও দক্ষিণ দিকের ৮০ ফুট উচ্চতার লিফট বসানোর অবকাঠামোও ভেঙে চার তলার সমানে নামিয়ে আনা হবে। শুধু ঈদের দিন কাজ বন্ধ থাকবে।
সিক্স স্টার করপোরেশন ভবনের ভাঙা ইট-সুরকি বিভিন্ন লোকজনের কাছে বিক্রি করছে। তারা এই ইট-সুরকি কিনে নিয়ে ঢাকা ও ঢাকার বাইরের নিচু জায়গা ভরাট করছে। প্রকৌশলী ফয়েজ দাবি করেন, প্রতিদিন শ্রমিকের পেছনে তাঁদের ৮২ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। তবে বাকি রড ও ইট-সুরকি বিক্রি করলে তাঁরা লাভের মুখ দেখবেন।
গত বছরের ১১ জানুয়ারি পটপরিবর্তনের পর দেশে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান শুরুর প্রথম থেকেই আলোচনায় আসে র‌্যাংগস ভবন। অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের প্রতীক হয়ে ওঠা ভবনটি নিয়ে আবার পত্রিকায় লেখালেখি শুরু হয়। এ পরিস্থিতিতে গত বছরের ২১ এপ্রিল প্রধান উপদেষ্টা ড. ফখরুদ্দীন আহমদের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের সভায় র‌্যাংগস ভবনের অবৈধ অংশ ভেঙে ফেলার নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়। গত ২ আগস্ট সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি মো. ফজলুল করিমের নেতৃত্বাধীন একটি বেঞ্চ ভবনটির অবৈধভাবে নির্মিত ১৬ তলা ভাঙার নির্দেশ দেন। এরপর রাজউকের পক্ষ থেকে দরপত্র আহ্বান করা হয়।
ভবনটি উচ্ছেদ শুরুর পর সরকার এখন তেজগাঁও-বিজয় সরণি সম্প্রসারিত সড়ক প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে।

Permalink

আসামিরা কে কোথায়

বিশেষ প্রতিনিধি

জেলহত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকা একমাত্র আসামি এবং যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পাওয়া ৮ জনই বর্তমানে পলাতক। সাজা কার্যকর করার জন্য যাদের কারাগারে বন্দি রাখা হয়েছিল, গতকাল হাইকোর্টের রায়ে তারা এই হত্যাকাণ্ডের দায় থেকে এখন মুক্ত।

২০০৪ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকা মহানগর দায়রা জজ মতিউর রহমান জেলহত্যা মামলার রায়ে তাদের অভিযুক্ত করেন। সে রায়ে চার নেতার ঘাতক হিসেবে রিসালদার মোসলেহ উদ্দিন, দফাদার শরাফত আলী ও আবুল হোসেন মৃধাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। নেপথ্যের নায়ক হিসেবে এছাড়াও ১২ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

মৃত্যুদণ্ড পাওয়া তিন আসামিই ঘটনার পর থেকে পলাতক।

নিম্ন আদালতে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয় লে. কর্নেল (বরখাস্ত.) সৈয়দ ফারুক রহমান, কর্নেল (অব.) সৈয়দ শাহরিয়ার রশীদ, মেজর (অব.) বজলুল হুদা, লে. কর্নেল খন্দকার আবদুর রশীদ (বরখাস্ত), লে. কর্নেল (অব.) শরিফুল হক ডালিম, লে. কর্নেল (অব.) এমএইচএমবি নূর চৌধুরী, লে. কর্নেল (অব.) একেএম মহিউদ্দিন আহম্মদ এসি, লে. কর্নেল (অব.) এএম রাশেদ চৌধুরী, মেজর (অব্যাহতি) আহাম্মদ শরিফুল হোসেন, ক্যাপ্টেন (অব.) আবদুল মাজেদ, ক্যাপ্টেন (অব্যাহতি) মোঃ কিসমত হোসেন ও ক্যাপ্টেন (অব.) নাজমুল হোসেন আনসারের।

যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত ১২ আসামির চারজন আপিল করেন। বর্তমানে জেলে বন্দি এই চারজনকেই আদালত খালাস দিয়েছেন। যদিও বঙ্গবন্ধু হত্যামামলায় মৃত্যুদ- হওয়ায় তাদের এখনো কারাগারেই থাকতে হবে। এরা হচ্ছেন লে. কর্নেল (বরখাস্ত) সৈয়দ ফারুক রহমান, কর্নেল (অব.) সৈয়দ শাহরিয়ার রশীদ, মেজর (অব.) বজলুল হুদা ও লে. কর্নেল (অব.) একেএম মহিউদ্দিন আহমেদ।

হাইকোর্টের রায়ে অপর ৮ জন সম্পর্কে কিছুই বলা হয়নি। তাদের আপিল না থাকায় নিম্ন আদালতের রায়ই এখনো তাদের জন্য বহাল রয়েছে বলে আইনজীবীরা জানিয়েছেন।

ঘটনার পর থেকেই এরা বিদেশে পলাতক। লে. কর্নেল (অব.) খন্দকার আবদুর রশীদ বর্তমানে বেলজিয়ামে। তবে তিনি লিবিয়ায় বসবাস করেন বলেও কেউ কেউ দাবি করছেন। লিবিয়ার নেতা গাদ্দাফির ছোট ভাইয়ের ব্যবসায়িক অংশীদার হিসেবে ইতালির মিলান শহরেও রশীদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছিল। ১৯৯৮ সালে সে দেশের সরকারের সহযোগিতা নিয়ে ওই প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা হয়। তারপর থেকে তার আবাস যেখানেই হোক না কেন, নিয়মিত ইউরোপ এবং মধ্যপ্রাচ্যে যাতায়াত আছে তার।

লে. কর্নেল (অব.) শরিফুল হক ডালিম অধিকাংশ সময় থাকেন হংকং। পাকিস্তান, লিবিয়া ও কেনিয়ায় তার একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আছে।

লে. কর্নেল (অব.) এএম রাশেদ চৌধুরী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে অন্যত্র চলে গেছেন বলে বছর দুই আগে খবর প্রকাশিত হয়।

লে. কর্নেল (অব.) এমএইচএমবি নূর চৌধুরী বর্তমানে কানাডায়।
ক্যাপ্টেল্টন (অব.) আবদুল মাজেদ ভারতে থাকলেও অনেকদিন ধরে তার কোনো খবর নেই। একই অবস্থা মেজর (অব্যাহতি) আহাম্মদ শরিফুল হোসেন, ক্যাপ্টেন (অব্যাহতি) মোঃ কিসমত হোসেন ও ক্যাপ্টেন (অব.) নাজমুল হোসেন আনসারেরও।

সমকাল, ২৯ আগস্ট, ২০০৮

Permalink

ওরা সবাই খালাস


বিশেষ প্রতিনিধি

হাইকোর্ট ঐতিহাসিক জেলহত্যা মামলায় শুধু পলাতক আসামি রিসালদার মোসলেমউদ্দিন ওরফে হিরন খানের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন। নিম্ন আদালতের বিচারে মৃত্যুদন্ড পাওয়া অপর দু’জন এবং কারাগারে আটক যাবজ্জীবন কারাদন্ডের চার আসামিকেই খালাস দেওয়া হয়েছে। নিম্ন আদালত তিনজনকে মৃত্যুদন্ড এবং ১২ জনকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দিয়েছিলেন।

অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত না হওয়ায় মৃত্যুদন্ড থেকে অব্যাহতি পেয়েছে পলাতক দুই আসামি দফাদার মারফত আলী শাহ এবং এলডি দফাদার মোঃ আবুল হাসেম মৃধা। সন্দেহের সুবিধায় আরো খালাস পেয়েছে লে. কর্নেল (বরখাস্ত) সৈয়দ ফারুক রহমান, কর্নেল (অব.) সৈয়দ শাহরিয়ার রশীদ, মেজর (অব.) বজলুল হুদা ও লে. কর্নেল (অব.) একেএম মহিউদ্দিন আহমেদ।

কারাগারে বন্দি মাত্র এই চার আসামিই নিম্ন আদালতের দেওয়া যাবজ্জীবন কারাদন্ডের বিরুদ্ধে আপিল করেছিল। এ মামলায় খালাস পেলেও বঙ্গবন্ধ হত্যা মামলায় মৃত্যুদন্ড হওয়ায় এখনো তাদের কারাগারেই থাকতে হবে। অপরদিকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড পাওয়া পলাতক অপর আট আসামির সম্পর্কে হাইকোর্ট কোনো মতামত না দেওয়ায় তাদের দন্ড বহাল রয়েছে বলে আইনজীবীদের ব্যাখ্যা পাওয়া গেছে।

বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি আতাউর রহমান খান সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ গতকাল বৃহস্পতিবার নিম্ন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আসামিদের চারটি আপিল ও রাষ্ট্রপক্ষের ডেথ রেফারেন্স নিস্পত্তি করে এ রায় দেন। রায়ে আদালত বলেছেন, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা খুনির সঙ্গীদের চিহ্নিত করতে পারেননি। ভুল ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছিল।

হাইকোর্টের রায়ের পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি আনিসুল হক সর্বোচ্চ আদালতে আপিল করার ঘোষণা দিয়ে বলেছেন, ‘আইনের নামে এ প্রহসন দুঃখজনক। স্বাধীনতার জন্য যারা রক্ত দিয়েছেন এবং আমরা যারা রক্ত দিতে দেখেছি তারা এ রায়ে মর্মাহত।’

অপরদিকে নিম্ন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে দুই আপিলকারীর কৌঁসুলি ব্যারিষ্টার আবদুল্লাহ আল মামুন সমকালকে বলেন, হাইকোর্টের রায়ে প্রমাণ হলো বাংলাদেশে নির্দোষ ব্যক্তি আর ফাঁসিতে ঝুলবে না। এদেশে আইনের শাসন আছে।

তবে অপর এক খালাসপ্রাপ্ত আসামির কৌঁসুলি প্রবীণ আইনজীবী আবদুর রেজাক খান বলেন, এ মামলার তদন্ত যথাযথ হয়নি বলেই প্রকৃত আসামিরা চিহ্নিত হয়নি। একই কারণে কারো বিরুদ্ধে সন্দেহাতীতভাবে অপরাধ প্রমাণ করা সম্ভব হয়নি।

নিম্ন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে কারাগারে আটক যাবজ্জীবন কারাদন্ডপ্রাপ্ত চার আসামির আপিল ও রাষ্ট্রপক্ষের ডেথ রেফারেন্সর ওপর হাইকোর্ট দীর্ঘ ২৬ কার্যদিবস শুনানি গ্রহণ করেন এবং ৮ কার্যদিবসে রায় ঘোষণা শেষ করেন। আপিল ও ডেথ রেফারেন্সের এ শুনানি দীর্ঘ চার বছর পর গত ১৩ জুলাই হাইকোর্টে শুরু হয়।
নিম্ন আদালত যে পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন হাইকোর্টের রায়ে তার আংশিক পরিবর্তন হয়েছে। নিম্ন আদালতের রায়ের ভিত্তি ছিল, ১৫ আগষ্টের পট পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরাই একই বছর ২ নভেম্বরে খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থানে পরাজিত হওয়ার মুখে জেলহত্যা ঘটিয়েছে। এ সিদ্ধান্তের জন্য যে তথ্যকে গুরুত্ব দেওয়া হয় তা ছিল, বঙ্গভবন থেকে টেলিফোনে খুনিদের কারাগারে প্রবেশ করতে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। ১৫ আগস্টের পর থেকে তারা বঙ্গভবনেই থাকত। কিন্তু হাইকোর্ট খুনিদের কারাগারে প্রবেশ করতে টেলিফোনে দেওয়া নির্দেশের বিষয়টি সন্দেহাতীতভাবে বিশ্বাস করেননি।

বিশ্বাস না করার ক্ষেত্রে তিনজন সাক্ষীর সাক্ষ্যকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছে। খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল এমন একজন সাক্ষী কর্নেল শাফায়াত জামিল এ মামলায় সাক্ষ্য দিতে গিয়ে বলেছেন, ১৯৭৫ সালের ২ নভেম্বর মধ্যরাতেই তারা কেন্দ্রীয় টেলিফোন এক্সচেঞ্জের নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব নিজেদের হাতে নিয়েছিলেন।

অপর সাক্ষী রাষ্ট্রপতির তৎকালীন এডিসি কমান্ডার রাব্বানী তার সাক্ষ্যে বলেছেন, ২ নভেম্বর রাত ১১টার দিকেই তিনি ঘুমিয়েছেন। রাত ২টার দিকে রাষ্ট্রপতি তাকে মেসেঞ্জার পাঠিয়ে ডেকে আনেন। তার কক্ষেই টেলিফোন ছিল।

হাইকোর্ট এক্ষেত্রে আসামি পক্ষের কৌঁসুলিদের যুক্তিকে বিবেচনায় নিয়েছেন। তাদের যুক্তি হচ্ছে, বঙ্গভবনের টেলিফোন সচল থাকলে মেসেঞ্জার পাঠিয়ে এডিসিকে ডেকে আনার প্রয়োজন হতো না।

এ পর্যবেক্ষণ সম্পর্কে আদালত আরো নিশ্চত হয়েছেন নিহত জাতীয় নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলামের বোনের ছেলে সেনা কর্মকর্তা আনিসুজ্জামানের সাক্ষ্য থেকে। এ সাক্ষ্যে উল্লেখ রয়েছে, তিনি সে রাতে সদরঘাট এলাকায় দায়িত্ব পালন করছিলেন। উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে টেলিফোনে কেন্দ্রীয় কারাগারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি। একজন হাবিলদার পাঠিয়ে কারাগারে খবর নিয়ে জানতে পারেন বাসা থেকে পাঠানো নাশতা ফেরত গেছে। তিনিই সেদিন কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে সৈয়দ নজরুল ইসলামের লাশ গ্রহণ করেছিলেন।

হাইকোর্টের রায়ে এসব সাক্ষ্যের ভিত্তিতে সেই রাতে বঙ্গভবন থেকে টেলিফোন করে খুনিদের কারাগারে প্রবেশ করতে দেওয়ার তথ্যকে গুরুত্ব দেওয়ার বিপক্ষে মত প্রকাশ করা হয়েছে। আর এ সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই পারিপার্শিকতার আলোকে সরাসরি জড়িত ছিলেন না এমনসব অপরাধীকে সন্দেহাতীতভাবে চিহ্নিত করা যায়নি বলে আদালতের কাছে প্রতীয়মান হয়েছে।

আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, তদন্তকারী কর্তৃপক্ষ প্রকৃত হত্যাকারীদের খুঁজে বের করতে ব্যর্থ হয়েছে। কেবল তিনজন সাক্ষী ছাড়া অন্যরা মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি দফাদার মারফত আলী ও দফাদার আবুল হাসেম মৃধার বিরুদ্ধে জোরালো কোনো সাক্ষ্য দেয়নি। ফলে প্রত্যক্ষদর্শী নয় এমন তিন সাক্ষীর সাক্ষ্যের ওপর ভিত্তি করে হত্যা মামলায় কারো মৃত্যুদন্ড দেওয়া যৌক্তিক নয়।

আরো বলা হয়, যেসব সাক্ষী বঙ্গভবন ও কারাগারে উপস্টি’ত ছিলেন বলে সাক্ষ্য দিয়েছেন তা অবিশ্বাস্য। বঙ্গভবনের যেসব কর্মচারী সাক্ষ্য দিয়েছেন তাদের সাক্ষ্যও বিশ্বাসযোগ্য নয়। কারণ সে রাতে তারা কেন সেখানে উপস্থিত ছিলেন তারও কোনো বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখ্যা নেই।

হাইকোর্টের রায়ে আরো বলা হয়েছে, বঙ্গভবন ও কেন্দ্রীয় কারাগারে আগমন ও প্রস্থানের নিবন্ধন বই নিম্ন আদালতে উপস্থাপন করে হত্যাকারীদের বিষয়টি প্রমাণ করা হয়নি। তাছাড়া সেদিন বঙ্গভবনে সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের আসা-যাওয়া থেকে তাদের উদ্দেশ্য কী ছিল তা প্রমাণ হয় না।

আদালত বলেন, আসামিদের চিহ্নিত করার বিষয়টিও অসামঞ্জস্যপূর্ণ। সাক্ষীদের কেউ কেউ বলেছেন কারাগারে প্রবেশ করা সেনাবাহিনীর সদস্যরা খাকি পোশাক পরা ছিল। আবার কেউ বলেছেন কালো পোশাকের কথা। সব সাক্ষীর বক্তব্য ও মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী কর্নেল শাফায়াত জামিলের সাক্ষ্যের অসামঞ্জস্যতা এ মামলায় বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
হাইকোর্টে রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি আনিসুল হককে শুনানিতে সহায়তা করেন অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলাম সুজন, অ্যাডভোকেট মোশাররফ হোসেন কাজল, অ্যাডভোকেট এসএম রেজাউল করিম, ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস, অ্যাডভোকেট মমতাজ উদ্দিন মেহেদী এবং অ্যাডভোকেট মোতাহার হোসেন সাজু।

আসামি সাবেক সেনা কর্মকর্তা কর্নেল শাহরিয়ারের পক্ষে সাবেক অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল আবদুর রেজাক খান, মেজর মহিউদ্দিন এবং মেজর বজলুল হুদার পক্ষে ব্যারিস্টার আবদুল্লাহ আল মামুন, কর্নেল ফারুক রহমানের পক্ষে অ্যাডভোকেট সৈয়দ মিজানুর রহমান ছাড়াও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক তিন আসামি রিসালদার মোসলেম উদ্দিন, দফাদার মারফত আলী এবং দফাদার আবুল হাসেম মৃধার পক্ষে নিযুক্ত স্টেট ডিফেন্স অ্যাডভোকেট আবদুল হান্নান শুনানি পরিচালনা করেন।

বঙ্গবন্ধ শেখ মুজিবুর রহমান হত্যার পর ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, মনসুর আলী ও এএইচএম কামরুজ্জামানকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে হত্যা করা হয়। মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রবাসী সরকারের চার প্রধান ব্যক্তিত্বকে খুন করার পরদিন লালবাগ থানায় তৎকালীন কারাপুলিশের ডিআইজি কাজী আবদুল আওয়াল আসামি মোসলেমউদ্দিনসহ চারজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। মামলাটি পরবর্তীতে সরকারিভাবেই স্থগিত করা হয়। দীর্ঘ ২৩ বছর পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতা গ্রহণের পর মামলাটি পুনরুজ্জীবিত করে ১৯৯৮ সালের ১৫ অক্টোবর আসামি মোসলেমউদ্দিন, লে. কর্নেল সৈয়দ ফারুক রহমানসহ ২৩ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়।

দীর্ঘ ৬ বছরে মামলার বিচার প্রক্রিয়া শেষ করে ২০০৪ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকা মহানগর দায়রা জজ মোঃ মতিউর রহমান রায় দেন। রায়ে আদালত মোসলেমউদ্দিন, দফাদার মারফত আলী ও দফাদার আবুল হাসেম মৃধাকে মৃত্যুদন্ড দেন। নিল্ফু আদালতে ১২ জনের যাবজ্জীবন কারাদন্ড হয়।

হাইকোর্ট থেকে খালাস পাওয়া চারজন ছাড়াও যাবজ্জীবন পাওয়া অন্যরা হলো লে. কর্নেল খন্দকার আবদুর রশীদ (বরখাস্ত), লে. কর্নেল শরিফুল হক ডালিম, লে. কর্নেল (অব.) এমএইচএমবি নূর চৌধুরী, লে. কর্নেল (অব.) এএম রাশেদ চৌধুরী, মেজর (অব্যাহতি) আহাম্মদ শরিফুল হোসেন, ক্যাপ্টেল্টন (অব.) আবদুল মাজেদ, ক্যাপ্টেন (অব্যাহতি) মোঃ কিসমত হোসেন এবং ক্যাপ্টেন (অব.) নাজমুল হোসেন আনসার। রায়ের পরপরই দন্ডাদেশপ্রাপ্তরা আপিল করে। ল্যান্সার মহিউদ্দিন গত বছর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফেরত পাঠানোর পর জেল আপিল করে।

নিম্ন আদালতের বিচারে মেজর মোঃ খায়রুজ্জামান, কেএম ওবায়দুর রহমান, শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, নুরুল ইসলাম মঞ্জুর ও তাহেরউদ্দিন ঠাকুরকে এ হত্যাকান্ডের দায় থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি আপিল করবেন

রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি অ্যাডভোকেট আনিসুল হক হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবেন। তিনি সমকালকে বলেন, ‘রায়ে কোর্ট কী লিখবেন সেটা পরীক্ষা করে আইনি প্রতিকার চাইব। রায় সম্পর্কে এ মুহূর্তে শুধু এ কথাই বলতে পারি, আইনের নামে এটা প্রহসন। যা দুঃখজনক। বাস্তবতাকে অস্বীকার করা এই রায় বিচারের প্রতি সাময়িকভাবে হতাশাব্যঞ্জক হলেও শেষ পর্যন্ত ন্যায়বিচার পাওয়া যাবে বলে আমি বিশ্বাস করি। বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের ওপর আমার অগাধ বিশ্বাস আছে। তাই আইনি লড়াই চালিয়ে যাব।’
তিনি আরো বলেন, ‘এর আগেও হাইকোর্টের কিছু কিছু বিচারপতির ব্যবহার আমরা দেখেছি। কিন্তু পরবর্তীতে আপিল বিভাগ তা ঠিক করে দিয়েছেন। এখনো আপিল বিভাগের ওপর আমার বিশ্বাস ও আস্থা রয়েছে।’

সমকাল, ২৯ আগস্ট, ২০০৮

Permalink

তারেকের আঘাত গুরুতর নয়

২৬ আগস্ট, ২০০৮
সমকাল প্রতিবেদক

বিএনপির কারাবন্দি সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব তারেক রহমান হাসপাতালের বাথরুমে পড়ে গিয়ে মাথায় আঘাত পেয়েছেন। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং চিকিৎসকরা বলেছেন, আঘাতটি গুরুতর নয়। তাৎক্ষণিকভাবে তাকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। তারপরও তাকে ৪৮ ঘণ্টার পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। তিনি স্বাভাবিক আছেন।
এদিকে তারেক রহমানের আহত হওয়ার খবরকে ব্যবহার করে গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক অপপ্রচার শুরু হয়। বলা হয়, তারেক রহমান হাসপাতালের বাথরুমে পড়ে গিয়ে মাথায় গুরুতর আঘাত পাওয়ায় মারা গেছেন। বিভিন্ন এলাকা থেকে সমকাল অফিসে টেলিফোন করে ‘তারেক রহমান মারা গেছেন কি-না’ জানতে চাওয়া হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তারেকের আঘাত পাওয়ার খবর শুনে মেডিকেল বোর্ডের চিকিৎসকরা তখনই তার কেবিনে ছুটে যান। সেখানে তারা তার স্বাস্থ্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন ও তাৎক্ষণিকভাবে চিকিৎসা দেন। প্রাথমিকভাবে গুরুতর কিছু ধরা পড়েনি এবং আঘাতটি গুরুতর নয় বলে তারা মত দেন। চিকিৎসকরা জানান, আঘাতের স্থানটি ফুলে ওঠায় সেখানে ব্যান্ডেজ করা হয়েছে। গুরুতর কিছু হলো কি-না, তা পরীক্ষার জন্য আজ-কালের মধ্যে তার মাথার সিটিস্ক্যান করার পরামর্শ দিয়েছেন বোর্ডের চিকিৎসকরা।
এ ব্যাপারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সোমবার লিখিত বক্তব্য দিয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, ‘সোমবার দুপুর ১২টার সময় তারেক রহমান বাথরুমে পড়ে গিয়ে তার মাথার সম্মুখভাগে আঘাতপ্রাপ্ত হন এবং আঘাতের স্থানের ছাল উঠে যায়। তিনি অজ্ঞান হননি এবং বমিও করেননি। বর্তমানে তার পুরো জ্ঞান রয়েছে। তিনি স্বাভাবিক কথাবার্তা বলছেন। তবু তাকে সর্বোচ্চ চিকিৎসা দেওয়ার স্বার্থে তার সিটিস্ক্যান করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।’

তারেক রহমানের প্যানেল চিকিৎসক অর্থোপেডিক সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. কাজী মাজহারুল ইসলাম সমকালকে বলেন, তারেক রহমান কোমর, হাঁটু ও পায়ের গোড়ালিতেও আঘাত পেয়েছেন।
মহা কারাপরিদর্শক মেজর শামসুল হায়দার ছিদ্দিকী সমকালকে বলেন, ‘খবর পেয়ে হাসপাতালে তারেক রহমানকে দেখতে যাই। তখন তিনি ঘুমাচ্ছিলেন। তার মাথায় ব্যান্ডেজ করা হয়েছে। চিকিৎসকরা তার আঘাত গুরুতর নয় বলে অবহিত করেছেন।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মেডিকেল বোর্ডের এক চিকিৎসক জানান, অসাবধানতার কারণেই তারেক রহমান বাথরুমে পড়ে যান। তার বিছানা থেকে বাথরুমের দরজা পর্যন্ত একটি হাতল লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। বাথরুমের ভেতর বেসিনেও শক্ত হাতল রয়েছে। সেই হাতল ধরেই তিনি আসা-যাওয়া করেন। সম্ভবত সেই হাতল ধরতে না পারায় শরীরের ভারসাম্য হারিয়ে তিনি পড়ে যান।
এদিকে তারেক রহমানের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব) আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাকে বিদেশে পাঠানোর দাবি জানিয়েছে। সোমবার ড্যাবের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ডা. রফিকুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ দাবি জানানো হয়।
স্বাস্থ্য বুলেটিন প্রকাশ করা হবে
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কারাবন্দি তারেক রহমানের শারীরিক অবস্থা নিয়ে জটিলতা এড়াতে স্বাস্থ্য বুলেটিন প্রকাশের সিন্ধান্ত নিয়েছে। সোমবার তারেক রহমানের স্বাস্থ্যের প্রকৃত তথ্য সংবলিত এক লিখিত বক্তব্যে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানায়, এখন থেকে প্রয়োজন হলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তার স্বাস্থ্য সম্পর্কে প্রতিবেদন প্রকাশ করবে।

Permalink

তারেক বাথরুমে পড়ে গিয়েছিলেন, আঘাত গুরুতর নয়

প্রথম আলো, ২৬ আগস্ট, ২০০৮
নিজস্ব প্রতিবেদক
সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমান গতকাল বাথরুমে পড়ে গিয়ে মাথায় আঘাত পেয়েছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়− বিএসএমএমইউ কর্তৃপক্ষ বলেছে, মাথায় আঘাত পেলেও তা গুরুতর নয়। তিনি অজ্ঞান হননি, বমিও করেননি। স্বাভাবিক কথাবার্তা বলছেন। প্রয়োজন হলে কর্তৃপক্ষ তারেক রহমানের স্বাস্থ্য সম্পর্কে প্রতিবেদন প্রকাশ করবে।
গত বছরের ৭ মার্চ গ্রেপ্তার হওয়ার পর এ বছরের ৩১ জানুয়ারি চিকিৎসার জন্য তারেক রহমানকে বিএসএমএমইউতে নেওয়া হয়। তখন থেকে বিএসএমএমইউয়ের ডি ব্লকের চারতলার একটি কক্ষে তিনি চিকিৎসাধীন। মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. তাহির বেলা দুইটায় সাংবাদিকদের বলেন, দুপুর ১২টার দিকে তারেক রহমান তাঁর কেবিন-সংলগ্ন বাথরুমে পড়ে যান। তিনি মাথার সামনের দিকে আঘাত পেয়েছেন। তবে আঘাত গুরুতর নয়। তিনি আরও বলেন, ‘সর্বোচ্চ চিকিৎসা দেওয়ার স্বার্থে জরুরি ভিত্তিতে তাঁর সিটি স্ক্যান করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।’
বিকেল পাঁচটায় কারা প্রশাসনের উপমহাপরিদর্শক মেজর সামসুল হায়দার ছিদ্দিকী বিশ্ববিদ্যালয়ে উপস্িথত সাংবাদিকদের জানান, তিনি তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করেছেন, কথা বলেছেন। চিকিৎসকেরা ৪৮ ঘণ্টা তাঁর অবস্থা পর্যবেক্ষণ করবেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থোপেডিক সার্জারি বিভাগের চিকিৎসক ডা. ইদ্রিস আলীর অধীনে তারেকের চিকিৎসা চলছে। তাঁর শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, তারেক রহমানের মেরুদন্ডে সমস্যা আছে। ডান পায়ে পুরো ভর দিয়ে হাঁটতে পারেন না।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, একই বিভাগের চিকিৎসক অধ্যাপক সিরাজউদ্দিন আহম্মেদ, ডা. আব্দুল আওয়াল, ডা. কাজী মাযহারুল ইসলাম দোলন ও ডা. শহীদ ইসলাম খান আহত তারেক রহমানের চিকিৎসার ব্যাপারে ডা. ইদ্রিস আলীকে সহযোগিতা করেন। তবে এখন কোনো বোর্ড নেই বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন উপাচার্য।
কয়েক দিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক চিকিৎসক তারেক রহমানের শারীরিক অবস্থা নিয়ে বক্তব্য দিচ্ছেন। এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ লিখিত বক্তব্যে বলেছে, এটি সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের ব্যক্তিগত অভিমত। প্রয়োজন হলে কর্তৃপক্ষ তারেক রহমানের স্বাস্থ্য সম্পর্কে প্রতিবেদন প্রকাশ করবে।

Permalink

বঙ্গবন্ধু বাঁচালেন ভুট্টোকে, ভুট্টো বদলা নিলেন একাত্তরে

ইতিপূর্বে সমকাল (১৩ আগস্ট ২০০৮) পত্রিকায় সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন গোপন দলিলে প্রাপ্ত তথ্য নিয়ে অজয় দাশগুপ্তের একটি মূল্যবান লেখা প্রকাশিত হয়েছিল। এতে বঙ্গবন্ধু হত্যাকালীন সময়ে আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরী কিসিঞ্জার ও তার স্টাফ অফিসারদের কথোপকথনের কিছু ব্যাখ্যা রয়েছে।

সমকাল পত্রিকার ১৪ আগস্ট সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে আর একটি বিষয় নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ রচনা। সমকাল পত্রিকার এই লেখায় বঙ্গবন্ধুর প্রতি পাকিস্তানী রাষ্ট্রনায়ক জুলফিকার আলী ভুট্টোর মনোভঙ্গী সম্পর্কে স্বচ্ছ প্রতিচ্ছবি প্রকাশিত হয়েছে।

বঙ্গবন্ধু বাঁচালেন ভুট্টোকে, ভুট্টো বদলা নিলেন একাত্তরের
’৭৫ এর ট্র্যাজেডি। মার্কিন দলিল -২
অজয় দাশগুপ্ত

১৯৭৪ সালের ৩০ অক্টোবর ঢাকায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে সফররত মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারের আলোচনা চলছে। সেখানে আলোচনা প্রসঙ্গে এলো একাত্তর সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্কের প্রশ্ন। মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের সদ্য প্রকাশিত গোপন দলিলে বৈঠকের এ সংক্রান্ত অংশের বিররণ তুলে ধরা হয়েছে এভাবে :

কিসিঞ্জার : আপনি [মুজিব] কখন স্বাধীনতা অর্জনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন? আপনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে পারতেন!
শেখ মুজিব : অবশ্যই। আইয়ুব খান আমাকে গোলটেবিল বৈঠকে [রাওয়ালপিন্ডি, মার্চ ১৯৬৯] এ প্রস্তাব দিয়েছিলেন। আমি দীর্ঘদিন পাকিস্তানের নেতৃস্থানীয় রাজনীতিক ছিলাম।
কিসিঞ্জার : পাকিস্তান তার বর্তমান রাজনৈতিক সমস্যা কাটিয়ে উঠতে পারবে বলে মনে করেন?
শেখ মুজিব : বলপ্রয়োগে সমাধান নেই। সেনাবাহিনী পাঞ্জাবের। তারা বেলুচিস্তানকে দমিয়ে রাখতে পারবে না। কিন্তু ভুট্টো [জুলফিকার আলি] একজন রাজনীতিবিদ এবং তিনি এভাবেই সমস্যা মোকাবেলার চেষ্টা করবেন। আমি সব পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দিকে ছেড়ে দিতে সম্ভত হয়েছি, কারণ আমি ভুট্টোকে সাহায্য করতে চেয়েছি। আমি এটা ইচ্ছাকৃতভাবে করেছি। যদি আমি না করতাম তাহলে পাকিস্তানে আবার সামরিক বাহিনী ক্ষমতায় আসত।
কিসিঞ্জার : এটা আপনার দূরদৃষ্টি।

বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীকে বাঁচালেন এভাবে। কিন্তু তিনি কী করলেন? একাত্তরে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী যে গণহত্যা অভিযান পরিচালনা করে তার প্ররোচনাদানকারীদের মধ্যে ছিলেন জুলফিকার আলি ভুট্টো। একাত্তরের ডিসেম্বরের প্রথমদিকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের চূড়ান্ত পর্যায়ে পাকিস্তান এবং যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘের মাধ্যমে যুদ্ধবিরতির অপচেষ্টা চালায়। নিরাপত্তা পরিষদে এ সংক্রান্ত আলোচনায় পাকিস্তান প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন ভুট্টো। তিনি তখন কথা বলেন পাকিস্তানের জান্তার পক্ষ হয়ে। বঙ্গবন্ধু অতীতের তিক্ততা ভুলে পাকিস্তানের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক চেয়েছিলেন। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট প্রত্যুষে দেখা গেল ভুট্টো একটুও বদলাননি। তিনি একাত্তরের মতোই রয়ে গেছেন বাঙালিবিদ্বেষী, মুজিববিদ্বেষী। একাত্তরে বলপ্রয়োগে পাকিস্তানি সেনারা বাঙালির কণ্ঠ চিরতরে রোধ করতে চেয়েছিল। পঁচাত্তরে হত্যা করা হলো আমাদের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতাকে। আর এর সঙ্গে ভুট্টোর সংশ্লিষ্টতা তিনি নিজেই গোপন রাখতে চাননি।

মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের সদ্য প্রকাশিত গোপন দলিলে ১৬ আগস্ট, ১৯৭৫ পাকিস্তানের মার্কিন দূতাবাস ওয়াশিংটনে যে বার্তা পাঠিয়েছে তাতে বাংলাদেশের অভ্যুত্থানের ব্যাপারে পাকিস্তানের প্রাথমিক প্রতিত্রিক্রয়া তুলে ধরা হয়েছে। এতে দেখা যায়, পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আগাশাহী নতুন বাংলাদেশ সরকারকে স্বীকৃতি প্রদানের বিষয়ে তাদের সরকারের সিদ্ধান্ত প্রকাশের আগেই যুক্তরাষ্ট্রকে অবহিত করেছেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খন্দকার মোশতাকের কাছে যে বার্তা পাঠিয়েছেন তা বাংলাদেশের কাছে এ পর্যন্ত পাঠানো পাকিস্তান সরকারের বার্তাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উষ্ণ। বার্তায় উল্কেèখ করা হয়, ‘বাংলাদেশের ভ্রাতৃপ্রতিম জনগণের জন্য প্রাথমিক ও স্বতঃস্ফুর্ত শুভেচ্ছা হিসেবে আমি অনতিবিলম্বে পাকিস্তানি জনগণের পক্ষ থেকে বাংলাদেশকে ৫০ হাজার টন চাল, ১ কোটি গজ লং ক্লথ কাপড় এবং ৫০ লাখ গজ ব্লিচড কাপড় পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এটা হচ্ছে বাংলাদেশের ভাইদের প্রয়োজনে সামান্য উপহার।’ ভুট্টো তার বার্তায় দু’দেশের অবিনাশী সংহতি, যা ১৯৭১ সালের বিয়োগান্তক ঘটনাতেও ছিন্ন হয়ে যায়নি, সেটাও খন্দকার মোশতাককে স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি বলেন, বিশ্ব জানুক, আমরা সুখে-দুঃখে একসঙ্গে আছি।

জুলফিকার আলি ভুট্টোর বার্তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে : ‘আমরা শ্রদ্ধার সঙ্গে ইসলামী সম্মেলন সংস্থার সদস্যদের ইসলামী রিপাবলিক অব বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদানের আবেদন জানাচ্ছি।’
কেন এ আবেদন? তার কারণ তিনি বলেছেন এভাবে : ‘আমাদের দেশকে একটি আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের প্রেক্ষাপটে পরিচালিত আগ্রাসন দ্বারা বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে।’

ভুট্টোর কাছে একাত্তরে বাংলাদেশে পাকিস্তানি জান্তার গণহত্যা কিংবা স্বাধীনতা অর্জনে বাঙালিদের বীরত্বপূর্ণ সংগ্রাম কোনো বিষয় ছিল না!

ভুট্টো বাংলাদেশকে ‘ইসলামী প্রজাতন্ত্র হিসেবে উল্লেখ করেন। কিন্তু এমনকি ১৫ আগষ্টের বিয়োগান্তক পরিবর্তনের পরও বাংলাদেশের নাম ছিল গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ। পাকিস্তানের শাসকরা আমাদের দেশের নাম কেন বদলে দিলেন? ১৭ আগস্ট ঢাকাস্থ মার্কিন রাষ্ট্রদূত ওয়াশিংটনে যে বার্তা পাঠান তাতে বলা হয়, ‘বাংলাদেশকে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করা হয়েছে, এমন কোনো ঘোষণা ঢাকা থেকে দেওয়া হয়নি। ১৬ আগস্ট পররাষ্ট্র দফতরের সার্কুলারেও গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ উল্লেখ করা হয়েছে।’

১৫ আগস্ট অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসীন খন্দকার মোশতাক কেমন ব্যক্তি সেটা জানা গেছে ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের প্রতিবেদনে। এতে বলা হয় : ‘পাকিস্তান সরকার তাকে মধ্যপন্থি, তীক্ষ্ণবুদ্ধির [নাকি ধূর্ত], ঠাণ্ডমাথার রাজনৈতিক নেতা মনে করে। তারা মুজিবনগর সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে পাকিস্তানের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে তিনি যে ফয়সালা চেয়েছিলেন সেটাও এ প্রসঙ্গে স্মরণ করে।’
বাংলাদেশের অভ্যুত্থানের পর যুক্তরাষ্ট্র সরকার তাৎক্ষণিক স্বীকৃতি প্রদান করবে না বলে সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু একই সঙ্গে ১৫ আগষ্ট ২১ ঘণ্টা ৫২ মিনিটে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক গোপন বার্তায় এটাও জানিয়ে দেয় যে, ‘আমরা তাদের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক স্থাপনে প্রস্তুত।’

কিসিঞ্জার ১৫ আগস্ট সকালে তার স্টাফ সভায় যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের সম্পর্কের ওপর বাংলাদেশে পরিবর্তনের প্রভাব পড়বে বলে মন্তব্য করেন।

১৬ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্র পররাষ্ট্র দফতর ইসলামাবাদে তাদের দূতাবাসে যে বার্তা পাঠায় তাতে বলা হয় : ‘যেহেতু পাকিস্তান সরকার বাংলাদেশের চলতি ঘটনাবলির বিষয়ে গভীরভাবে আগ্রহী, এ কারণে পাকিস্তানের কর্মকর্তাদের জানা থাকা দরকার যে, আমরা তাদের সঙ্গে অব্যাহতভাবে মতামত বিনিময়ে আগ্রহী। আমরা ওয়াশিংটনে পাকিস্তান দূতাবাসের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছি এবং তাদের অপরিহার্য তথ্যাদি জানাচ্ছি।’
১৭ আগস্ট ইসলামাবাদের মার্কিন দহৃতাবাস থেকে ওয়াশিংটন পররাষ্ট্র দফতরে বার্তা যায়। এর বিষয়বস্তু ছিল আফগানিস্তান ও বাংলাদেশ বিষয়ে সোভিয়েত রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে তার আলোচনা এবং বাংলাদেশের নতুন সরকার সম্পর্কে তার মূল্যায়ন। আগের রাতে (১৬ আগস্ট) ভুট্টো এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে কথা বলেন। তার ভিত্তিতেই এ প্রতিবেদন পাঠানো হয়। ভুট্টো শুরুতেই মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে বলেছিলেন, ‘আপনারা মন্দ লোক নন এবং বাংলাদেশে অভ্যুত্থান ঘটানোর সঙ্গে ছিলেন না। তবে সোভিয়েতরা অন্যভাবে মনে করে।’ এর জবাবে মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলেন, যখনই জেনেছি বাংলাদেশের নতুন প্রেসিডেন্ট পাশ্চাত্যপন্থি হিসেবে পরিচিত, তখনই সোভিয়েত তরফ থেকে এ অভিযোগ উঠবে বলে ধরে নিয়েছি। যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত বার্তায় লিখেছেন : ‘আমি কৌতুক করে বলেছি যে, ভুট্টো বাংলাদেশের নতুন সরকারকে এত দ্রুত স্বীকৃতি দিয়েছেন যে, এতে সন্দেহ সৃষ্টি হতে পারে।’ বার্তা থেকে ধারণা করা যায়, খন্দকার মোশতাকের সরকারকে পাকিস্তানের আগে যে সৌদি আরব ও লিবিয়ার মতো দেশ স্বীকৃতি দিয়ে কৃতিত্ব নিতে না পারে সেজন্য ভুট্টো এত দ্রুত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেন।

১৮ আগস্ট ইসলামাবাদ থেকে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ওয়াশিংটনে যে বার্তা পাঠান তাতে এমন দ্রুততার সঙ্গে স্বীকৃতির ভিন্ন ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়, বাংলাদেশের অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে ভারত ও সোভিয়েত সরকারের কী প্রতিক্রিয়া হয় সে বিষয়ে পাকিস্তানের সরকারি মহলে উদ্বেগ ছিল। বিশেষ করে ভারতের সশস্ত্র হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা তারা বিবেচনায় রেখেছে। আর এটাই এত দ্রুত স্বীকৃতি প্রদান এবং অন্যান্য ইসলামী দেশকে একই পথ অনুসরণের আহ্বানের কারণ হতে পারে। তারা আশা করেছিল, এভাবে ভারতীয় সামরিক পদক্ষেপের শঙ্কা কমবে।

১৮ আগস্ট ইসলামাবাদের মার্কিন দূতাবাসের আরেক বার্তায় দেখা যায়, বাংলাদেশকে ইসলামী প্রজাতন্ত্র হিসেবে পাকিস্তান সরকার প্রচার করলেও বাংলাদেশের তরফে এ ধরনের কোনো ঘোষণা না আসায় পাকিস্তান সরকারের কর্মকর্তাদের মধ্যে হতাশা রয়েছে। অথচ বাংলাদেশ ইসলামী প্রজাতন্ত্র হয়ে গেছে- এটা ধরে নিয়েই ভুট্টো এত দ্রুত মোশতাক সরকারকে স্বীকৃতি দিয়েছেন। তিনি মনে করেছেন, একাত্তরে যে দ্বিজাতিতত্ত্বকে (হিন্দু-মুসলমান) বাংলাদেশে মৃত ঘোষণা করে ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ ঘোষণা করা হয়েছে তা ঢাকায় টিকে আছে। ঢাকায় অভ্যুত্থানের পর পাকিস্তানের বিভিন্ন সংবাদপত্রের সম্পাদকীয় মন্তব্যে ‘মুসলিম বাংলা’ ব্যবহার করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের মন্তব্য : যদি বাংলাদেশের নাম পরিবর্তন করা না হয় [অর্থাৎ ইসলামী প্রজাতন্ত্র না হয়] তাহলে পাকিস্তান সরকারের কী প্রতিক্রিয়া হয়, সেটা দেখার বিষয়।

Permalink

অভ্যুত্থান চলাকালেই কিসিঞ্জার খবর পাচ্ছিলেন, বঙ্গবন্ধু তখনো বেঁচে

সমকাল ১৩ আগস্ট ২০০৮ সংখ্যায় আমেরিকা সরকারের বিভিন্ন গোপন দলিলে প্রাপ্ত তথ্য নিয়ে অজয় দাশগুপ্তের এক মূল্যবান লেখা প্রকাশিত হয়েছে। এই লেখায় বঙ্গবন্ধু হত্যাকালীন সময়ে আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরী কিসিঞ্জার ও তার স্টাফ অফিসারদের মধ্যে কথোপকথনের বর্ণনা রয়েছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতির নানা গোপন কাহিনী সমৃদ্ধ এই লেখাটি সমকাল পত্রিকা থেকে নেয়া হয়েছে।

অভ্যুত্থান চলাকালেই কিসিঞ্জার খবর পাচ্ছিলেন, বঙ্গবন্ধু তখনো বেঁচে
৭৫ এর ট্রাজেডি মার্কিন দলিলে

অজয় দাশগুপ্ত

[যে কোনো বৃহৎ শক্তির কূটনৈতিক কর্মকান্ডে বিস্তর লিখিত দলিল চালাচালি হয়। আর এতে থাকে আপাতভাবে তুচ্ছ থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার আনুপূর্ব বিবরণ। তাৎক্ষণিক প্রয়োজন তো আছেই, আরেকটি উদ্দেশ্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য শিক্ষণীয় রেখে যাওয়া। বাংলাদেশের ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট ট্র্যাজেডি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। বঙ্গবন্ধু হত্যা-কান্ডে তাদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ সুবিদিত। এর সত্যতা অনুসন্ধানে গবেষকরা নিরন্তর চেষ্টা চালা-চ্ছেন। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতরের শত শত দলিলে ওই সময়ের ঘটনাবলির রয়েছে লিখিত বিবরণ। ঘটনার ৩০ বছর পর অতি গোপনীয় ও গোপনীয় নথি প্রকাশের বিষয়ে আইন প্রণয়নের কারণে এসব দলিল এখন শুধু ওই দেশের নাগরিক নয়, বিশ্ববাসীও জানতে পারছে। তবে নথি প্রকাশ করার আগে তা পর্যালোচনা-পরীক্ষা করে দেখবেন অরিজিনেটিং এজেন্সির প্রধান। তিনি যদি কোনো বিষয় প্রকাশ না করার সিদ্ধান্ত দেন তবে তা অনির্দিষ্টকাল আলোর মুখ দেখবে না। ১৫ আগষ্ট ট্র্যাজেডির সঙ্গে প্রত্যক্ষ সংশ্লিষ্টতা ছিল তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারের। এখনো তিনি বেঁচে আছেন। তাই গোপনীয় ও অতি গোপনীয় হিসেবে চিহ্নিত মার্কিন পররাষ্ট মন্ত্রণালয়ের দলিল প্রকাশের আগে তার মতামত নেওয়া হয়েছে এবং তিনি বেশকিছু দলিল সংশোধিত আকারে প্রকাশের সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। আর এ কারণেই বাংলাদেশের ইতিহাসের বিয়োগান্ত ও সুদূরপ্রসারী তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়ের কিছু অংশ আপাতত থেকে যাচ্ছে অন্ধকারে। কে জানে, হয়তোবা চিরকালের জন্যই।]

১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট। শুত্রক্রবার। ওয়াশিংটন সময় সকাল ৮টা। বাংলাদেশে তখন ১৫ আগষ্ট, রাত ১০টা। এদিন প্রত্যুষে বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার তার স্টাফ সভায় বসেছেন কয়েকজন কর্মকর্তা নিয়ে। এখানে কী আলোচনা হয়েছে তার বিবরণ
পররাষ্ট্র দফতরের অনেক দলিলে, যার সংশোধন করা হয়েছে। অর্থাৎ পূর্ণ বিবরণ আপাতত জানার অবকাশ নেই।
বৈঠকের শুরুতেই কিসিঞ্জার বলেন, আমরা এখন বাংলাদেশ প্রসঙ্গে কথা বলব।
নিকট প্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী আথারটন : এটা হচ্ছে সুপরিকল্কিপ্পত ও নিখুঁতভাবে বাস্তবায়ন করা অভ্যুত্থান।
কিসিঞ্জার : মুজিবুর কি জীবিত না মৃত?
আথারটন : মুজিব মৃত। তার অনেক ঘনিষ্ঠ সহচর, পরিবারের সদস্য, ভাই, ভাগ্নে নিহত হয়েছেন।
কিসিঞ্জার : আমি ব্যুরো অব ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড রিসার্চ (আইএনআর) থেকে ভালো পরামর্শ পেয়েছি [তিনি এ কর্মকর্তার সঙ্গে ওয়াশিংটনে আগেই কথা বলেছেন। তবে এটা ফোনে নাকি সরাসরি, সেটা স্পষ্ট নয়]।
হিল্যান্ড (ব্যুরো পরিচালক) : আমি যখন আপনার সঙ্গে কথা বলেছি তখন তিনি মৃত ছিলেন না।
কিসিঞ্জার : আচ্ছা? তারা কি কিছু সময় পর তাকে হত্যা করেছে?

এ আলোচনা থেকে স্পষ্ট, ১৫ আগষ্ট অভ্যুত্থান চলাকালেই কিসিঞ্জার অবহিত হচ্ছিলেন [১৫ আগষ্ট ঢাকার যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস প্রেরিত বার্তায় বলা হয় : ঢাকার সময় বিকেল চারটা পর্যন্ত দেখা যায়, অভ্যুত্থান সফল হচ্ছে বলেই প্রতীয়মান হয়। কোনো সক্রিয় প্রতিরোধ দেখা যাচ্ছে না]।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্টাফ বৈঠকে কিসিঞ্জারের প্রথম প্রশ্নও সন্দেহ সৃষ্টি করে। তিনি প্রথমেই জানতে চেয়েছেন, মুজিব জীবিত নাকি মৃত। এ ধরনের ঘটনায় প্রথম প্রশ্ন হওয়ার কথা, মুজিব ক্ষমতায় আছেন কি নেই। কিন্তু প্রভাবশালী মার্কিন নেতা জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি বেঁচে আছেন কি-না। ১০ ঘণ্টা আগে অভ্যুত্থান চলাকালেই তিনি ঘটনার বিবরণ পাচ্ছিলেন হিল্যান্ডের কাছ থেকে। এ অভ্যুত্থান রোধে তাদের কিছু করণীয় প্রতিকারের কথা ভাবেননি। বরং যেন মনে হয়, তিনি অপেক্ষা করে ছিলেন একটি দেশের রাষ্ট্রপতির মৃত্যু সংবাদের জন্য!

বাংলাদেশের স্থপতির প্রতি কিসিঞ্জারের বিরাগ ছিল ১৯৭১ সাল থেকেই। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই বৈঠকে তিনি মুজিব সম্পর্কে যে মন্তব্য করেছিলেন তাতেও ওই বিদ্বেষের প্রতিফলন : হি ওয়াজ ওয়ান অব দ্য ওয়ার্ল্ড’স প্রাইজ ফুলস।
১৯৭৪ সালের ৩০ অক্টোবর কিসিঞ্জার এসেছিলেন বাংলাদেশে। তিনি বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে। এ সফরের মাত্র তিনদিন আগে ২৭ অক্টোবর অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ পদত্যাগ করেন। মুক্তিযুদ্ধকালে দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকালে তিনি চমকপ্রদ দক্ষতা ও যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখেন। তাকে অপসারণের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের চাপ ছিল বলে ধারণা করা হয়। কিসিঞ্জাসের সফরের প্রাক্কালে তাকে অপসারণ কাকতালীয় নাকি এর পেছনে কোনো বিশেষ কারণ ছিল, সেটা ইতিহাসের গবেষণার বিষয় হতে পারে। তাজউদ্দীনের অনমনীয় মনোভাবের কারণে একাত্তর সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের পরিকল্পনা মেনে নেওয়ার জন্য খন্দকার মোশতাকের চক্রান্ত সফল হতে পারেনি।
১৯৭৪ সালের বন্যার পরপরই দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। এ সময়ে খাদ্যের ঘাটতি ছিল ব্যাপক এবং তা পহৃরণে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বাংলাদেশ সহায়তা চাইছিল।
কিসিঞ্জার বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বৈঠকে বলেন, ‘আপনার তো দেখছি চারদিক থেকেই সমস্যা।’
বঙ্গবন্ধু বন্যা সমস্যা, খাদ্য সমস্যা, রাসায়নিক সারের ঘাটতি, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পদ বণ্টন এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন শিবিরে অবস্থানকারী পাকিস্তানি নাগরিকদের তাদের দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রসঙ্গ তুললে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী সম্ভবত ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করেই ‘আপনার তো দেখছি চারদিক থেকেই সমস্যা’ বলেছিলেন। কারণ বৈঠকে তোলা প্রতিটি বিষয়েই তার অবস্থান ছিল বাংলাদেশের বিপক্ষে।
কিসিঞ্জারের বাংলাদেশ সফরের কিছুদিন আগে বঙ্গবন্ধু জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দিয়েছিলেন। ওই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ডের সঙ্গে তার বৈঠক হয়। কিসিঞ্জারের সঙ্গে ঢাকায় আলোচনাকালে বঙ্গবন্ধু ফোর্ডকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানিয়ে বলেন, তিনি ভারতে তার আসন্ন সফরের সঙ্গে মিল রেখে ঢাকা আসতে পারেন। এর জবাবে কিসিঞ্জারের মন্তব্য ছিল কূটনৈতিক শিষ্টাচারের পরিপন্থী। তিনি ঢাকায় বঙ্গবন্ধুকে বলেন, ‘ফোর্ড ভারত সফরের সময়ে বাংলাদেশে আসতে পারেন। তবে আমরা মনে করি না বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের তরফে ভারতের অনুমতি গ্রহণের প্রয়োজন রয়েছে।’
কিসিঞ্জার ওয়াশিংটনে ফোর্ডের সঙ্গেও বঙ্গবন্ধুর বৈঠকের প্রসঙ্গ তোলেন। তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট আপনার সঙ্গে আলোচনায় সন্তুষ্ট। ণড়ঁ নধসনড়ড়ুষবফ যরস! এ বাক্যের অর্থ হতে পারে, আপনি তাকে মুগ্ধ করেছেন। আবার, আপনি তাকে কথার জাদুমালা আর ব্যক্তিত্ব দিয়ে ভুলিয়েছেন বলেও ধরে নেওয়া যায়। কিন্তু ধুরন্ধর কূটনীতিক যদি নধসনড়ড়ুষবফ শব্দের আক্ষরিক অর্থ ‘প্রতারণা’ বুঝিয়ে থাকেন?
ঢাকার বৈঠকে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কাছে বাংলাদেশের ন্যায্য পাওয়ার প্রসঙ্গ তোলেন। তিনি বলেন, আমরা সম্পর্ক স্থাপনের জন্য অনেক কিছু করেছি। যুদ্ধবন্দিদের ছেড়ে দিয়েছি। পাকিস্তানের বৈদেশিক সম্পদের দায়দেনার যতটা আমাদের ওপর বর্তায় তা বহনের কথা জানিয়েছি। কিন্তু পাকিস্তান কেবল কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনে আগ্রহী।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতর যে গোপনীয় দলিল সংশোধন করে প্রকাশ করেছে তাতে দেখা যায়, কিসিঞ্জার এ প্রশ্নে পাকিস্তানের বক্তব্যই তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, আমি পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আজিজ আহমদের সঙ্গে কথা বলেছি। তিনি দায়দায়িত্ব গ্রহণের বিষয়ে আপনাদের অনাগ্রহের কথা জানিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী মুজিব : আমি ইতিমধ্যেই দায়দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। আমরা এ বিষয়ে ঋণদাতাদের সঙ্গে চুক্তি করেছি। কিন্তু কেন আমি সম্পদের ভাগ পাব না?
মুজিব : আমরা এক বা দুই বছর খাদ্য সহায়তা চাই। আমি দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার জন্য ব্যাপক সহায়তা চাই। আমরা শিল্পের কাঁচামাল চাই। আমাদের পাটের জন্য ভালো দাম চাই।
এর জবাবেই কিসিঞ্জার বলেন, আপনার তো দেখি চারদিক থেকেই সমস্যা।
বঙ্গবন্ধু চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক স্থাপনে আগ্রহের কথাও বলেন। এ প্রসঙ্গে কিসিঞ্জারের বক্তব্য : তারা হয়তো আপনাদের সঙ্গে পাকিস্থানের সম্পর্ক স্থাপন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে চাইবে।

হ্যাঁ, পাকিস্তান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছিল ১৫ আগষ্ট বঙ্গবন্ধুকে নৃশংসভাবে হত্যার পর। চীনও সম্পর্ক স্থাপন করে এ বিয়োগান্ত ঘটনার পর।
কিসিঞ্জার কি ১৫ আগষ্টের ঘটনা আগেই জানতেন?
বঙ্গবন্ধু বন্যায় খাদ্যশস্য বিনষ্ট হওয়া এবং বিশ্ববাজারে খাদ্যের দাম অনেক বেড়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সাহায্য চাইলে কিসিঞ্জার বলেন, ‘আমাদের সমস্যা হচ্ছে, আমাদের কাছে উদ্বৃত্ত খাদ্য নেই। ... সাহায্য প্রসঙ্গে আমাদের কংগ্রেসের সঙ্গেও সমস্যা রয়েছে। আগামী মঙ্গলবার আমাদের কংগ্রেসের (প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট) নির্বাচন। তবে ১৯৭০ সালে আপনি যেভাবে জিতেছিলেন তেমন সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রশাসন আশা করে না।
জবাবে বঙ্গবন্ধু রসিকতা করে বলেন, ‘নির্বাচনে অত বেশি আসন পাবেন না। আপনারা জানেন, আমি বিপুলভাবে জয়ী হওয়ার পর কী ঘটেছিল : পাকিস্তানিরা এখানে সবকিছু ধ্বংস করে দেয়। আমাকে গ্রেফতার করে। আমার পাঁচ বছরের ছেলেও বলে, আর নির্বাচনে দাঁড়াবে না।’
এর জবাবে কিসিঞ্জার বলেন, ‘আপনি নিশ্চয়ই কিছু সময়ের জন্য আপনার দেশে নির্বাচন এড়াতে চাইবেন না!’
বঙ্গবন্ধু যে কোনো সময়েই নির্বাচন এড়াতে চাননি সেটা কিসিঞ্জার সম্ভবত জানতেন না।
১৫ আগষ্ট ওয়াশিংটনের সকালের বৈঠকে ফিরে তাকানো যাক।
বৈঠকে আথারটন জানান, অভ্যুত্থানকারীরা মুজিবকে হত্যার জন্যই এসেছিল। তারা বাড়িটি ঘেরাও করে এবং ভেতরে গিয়ে তাকে মেরে ফেলে।
আগেও তাকে হত্যার চক্রান্ত প্রসঙ্গ তুলে
কিসিঞ্জার বলেন : তাকে কি গত বছর আমরা এ বিষয়ে কিছু বলিনি?
আথারটন : গত মার্চে এ বিষয়ে আমরা অনেক ইঙ্গিত পাচ্ছিলাম।
কিসিঞ্জার : তাকে কি আমরা কিছু জানাইনি?
আথারটন : তাকে সে সময়ে জানিয়েছি।
কিসিঞ্জার : কারা এর পেছনে, সে বিষয়ে কি মোটামুটি কিছু ধারণা দিয়েছি?
আথারটন : কারা জড়িত সেসব নাম তাকে বলেছি কি-না, সেটা পরীক্ষা করে দেখতে হবে।
হিল্যান্ড : আমরা এ বিষয়ে ঠিক যথাযথ ধারণা দিইনি।
আথারটন : তিনি বিশ্বাস করেননি। তিনি বলেছেন, কেউ তাকে এ ধরনের কিছু করবে না।
বাংলাদেশের অভ্যুত্থান ‘সফল’ হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতরের কাছে খবর পৌঁছে যায় : ‘যারা অভ্যুত্থান করেছে তাদের মধ্যে রয়েছে সামরিক অফিসার, মধ্য পর্যায় ও সিনিয়র অফিসার- যাদের সাধারণভাবে পূর্ববর্তী শাসকদের তুলনায় কম ভারতপন্থি, সোভিয়েতবিরোধী এবং মার্কিনপন্থি হিসেবে গণ্য করা যায়।
কিসিঞ্জার : এটাই হতে হবে।
আথারটন : তারা দেশের নাম পরিবর্তন করে ইসলামী প্রজাতন্ত্র রেখেছে।
কিসিঞ্জার : তারা যুক্তরাষ্ট্রপন্থি হবে, এটা অপরিহার্য নয়। প্রকৃতপক্ষে পথপরিক্রমায় তারা চীনাপন্থি এবং ভারতবিরোধী হবে বলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি। আমি সবসময়ই জানতাম, ভারত বাংলাদেশকে স্বাধীন করার জন্য একদিন অনুতাপ করবে। এ ভবিষ্যদ্বাণী আমি একাত্তর সালেই করেছি।
আথারটন : আমাদের বড় সমস্যা হবে বাংলাদেশের নতুন শাসকদের সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠতা বা মাখামাখি পরিহার করা।
কিসিঞ্জার : কেন তারা আমাদের প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন বলে?
ঝানু কূটনীতিক কিসিঞ্জার ঠিকই বুঝেছিলেন স্বাধীন দেশের স্থপতিকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে যারা রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছে তারা তাদের বন্ধু এবং বৈঠকেই তিনি জানিয়ে দেন : ‘তারা আমাদের কাছ থেকে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ পাবে। আমরা তাদের স্বীকৃতি দেব।’
১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট বাংলাদেশ তার ইতিহাসের কঠিনতম পথে যাত্রা শুরু করে। এর পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা ছিল ৩০ লাখ শহীদের রক্তে অর্জিত বাংলাদেশের জনগণের জন্য অগ্রহণযোগ্য এবং অবশ্যই ক্ষতিকর। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতরের যেসব গোপনীয় দলিল প্রকাশ করা হচ্ছে, তা থেকেও এ সাক্ষ্য মেলে।

Permalink

BBC Asia-Pacific

CNN.com - Asia