নিজস্ব প্রতিবেদক
‘ইসলামী ডেমোক্রেটিক পার্টি−আইডিপি’ নামে প্রকাশ্য রাজনীতি শুরু করল হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী−হুজি। গতকাল শুক্রবার রাজধানীতে ইফতার অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ করল সাবেক আফগান মুজাহিদদের এই সংগঠন আইডিপি।
অবশ্য সংগঠনের আহ্বায়ক মাওলানা শেখ আবদুস সালাম প্রথম আলোকে বলেছেন, “তাঁদের সংগঠন এ দেশে ১৯৯২ সালেই আত্মপ্রকাশ করে হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী বাংলাদেশ নামে। এরপর ১৯৯৮ সালে তা বিলুপ্তি ঘোষণার পর ‘ইসলামী গণ-আন্দোলন’ নামে সংগঠন করেছিলাম। সেই সংগঠন থেকে এখন আইডিপি নামে কাজ করছি।”
গতকাল ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে মাওলানা শেখ আবদুস সালামের সভাপতিত্বে আইডিপির ইফতার ও আলোচনা সভায় সংগঠনের নেতারা ছাড়াও সংগঠনের ভাষায় ‘আন্তসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি উন্নয়নের স্বার্থে আমন্ত্রিত’ ইংরেজি সাপ্তাহিক ব্লিৎজ-এর সম্পাদক সালাহউদ্দিন শোয়েব চৌধুরী, দৈনিক আমার দেশ-এর সহকারী সম্পাদক ও হিউম্যান রাইটস ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব চৌধুরী, বৌদ্ধ কৃষ্টি প্রচার সংঘের পি কে বড়ুয়া, খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি চিত্ত ফ্রান্সিস রিভেরু বক্তব্য দেন।
আলোচনায় অংশ নিয়ে সালাহউদ্দিন শোয়েব চৌধুরী বলেন, আইডিপির আত্মপ্রকাশের মধ্য দিয়ে দেশে নতুন রাজনীতির জন্ন হলো। তিনি বলেন, আইডিপির সঙ্গে হরকাতুল জিহাদের নাম জড়িত। এটা এমন একটি সংগঠন, যার সম্পর্কে নানা আলোচনা রয়েছে। আইডিপিকে যারা সন্ত্রাসী সংগঠন বলে, ওই সব পত্রিকা বিদেশের টাকায় চলে। তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন দেশে নিষিদ্ধ এবং বালিতে বোমা হামলার সঙ্গে জড়িত সত্ত্বেও হিযবুত তাহ্রীরের মতো সংগঠন যদি এ দেশে প্রকাশ্যে রাজনীতি করতে পারে, তাহলে আইডিপি কেন পারবে না। যারা বাংলাদেশকে করদ রাজ্য বানাতে চায়, তারা আইডিপিকে হুমকি মনে করে।
সঞ্জীব চৌধুরী বলেন, ‘আফগানফেরত মুক্তিযোদ্ধাদের মূলধারার সদস্যরা আইডিপি গঠন করেছে। পরিচয়সুত্রে আমি এদের সঙ্গে অনেক কাজ একত্রে করেছি। এ নিয়ে অনেক প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছি। আমরা এই অনুষ্ঠান আরও আগে করতাম, কিন্তু সরকারের সংশ্লিষ্টদের অনুমতি পেতে দেরি হয়েছে। তাতে একদিকে ভালোই হলো। আজ পবিত্র জুমাতুল বিদার দিন আইডিপির প্রথম প্রকাশ্য মাহফিল হচ্ছে।’
আইডিপির উপদেষ্টা ও খেলাফত আন্দোলনের আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক কাজী আজীজুল হক বলেন, তথ্য ও যোগাযোগের ঘাটতির কারণে আইডিপি সম্পর্কে ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। হরকাতুল জিহাদ বিলুপ্ত করার পর প্রথমে ইসলামী দাওয়াতি কাফেলা, তারপর ইসলামী গণ-আন্দোলন এবং এখন আইডিপি নামে সংগঠন হয়েছে। সবার সঙ্গে আলোচনা করেই এটা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য দেন আইডিপির সদস্যসচিব মাওলানা রুহুল আমিন, তিন যুগ্ম আহ্বায়ক কারি হোসাইন আহমদ, মাওলানা আবুল কাশেম রহমানী ও মাওলানা মাহবুবুর রহমান এবং মাওলানা মুফতি কামাল, মাওলানা মীর ইদ্রিস, মুফতি ফজলে এলাহি, মাওলানা মুফতি নোমান, খেলাফত মজলিসের (ইসহাক) নায়েবে আমির এমদাদুল হক আড়াইহাজারী, খেলাফত আন্দোলনের নায়েবে আমির ছফর উল্লাহ খান, জৈনপুরী পীর মাওলানা এহছানুল্লাহ আব্বাসী প্রমুখ। এ ছাড়া মরহুম হাফেজ্জী হুজুরের মেজ ছেলে হাফেজ মাওলানা হামিদুল্লাহ ও মাওলানা আতাউল্লাহ উপস্িথত ছিলেন। ইফতার অনুষ্ঠানে সংগঠনের সহস্রাধিক নেতা-কর্মী উপস্িথত ছিল।
সমাপনী বক্তৃতায় মাওলানা আবদুস সালাম নিজেদের আন্তর্জাতিক মুক্তিযোদ্ধা দাবি করে বলেন, তাঁরা মদিনা সনদের আলোকে একটি অসাম্প্রদায়িক কল্যাণ রাষ্ট্র গড়ে তুলতে চান।
আশির দশকে আফগানিস্তানে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী মুজাহিদ কমান্ডার আবদুস সালাম এর আগে গত ১৭ জুলাই প্রথম আলোকে বলেন, সংগঠনের মজলিশে শুরার সভায় সিদ্ধান্ত নিয়ে তাঁকে আহ্বায়ক করে গত ১৮ মে আইডিপির ১৫ সদস্যবিশিষ্ট আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়।
অনুসন্ধানে জানা যায়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চাপসহ নানা কারণে সংগঠনটি বিভিন্ন সময় নাম পাল্টালেও এর নেতৃত্ব, সাংগঠনিক কাঠামো, মজলিশে শুুরা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ-প্রক্রিয়া প্রায় একই ছিল। ২০০৬ সালের আগস্ট মাসে প্রথম গোপন এই সংগঠনটি ইসলামী গণ-আন্দোলন নামে প্রকাশ্য রাজনীতিতে আসার চেষ্টা করে। এই লক্ষ্যে ওই বছরের ১৮ আগস্ট জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে সচেতন ইসলামী জনতার ব্যানারে বড় একটি সমাবেশ করেছিল। তখন সচেতন ইসলামী জনতার আহ্বায়ক হিসেবে সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন হাফেজ মাওলানা আবু তাহের। এই তাহের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় অভিযোগপত্রভুক্ত আসামি। বর্তমানে তিনি কারাগারে। আবু তাহের হুজির ঢাকা মহানগর সভাপতি ও মজলিশে শুরার সদস্য ছিলেন।
বিভিন্ন নাশকতামূলক ঘটনার পর বাংলাদেশ সরকার ২০০৫ সালের ১৭ অক্টোবর হুজিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ২০০২ সালের ২১ মে বাংলাদেশের হরকাতুল জিহাদকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করে। গত ৫ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী কন্ডোলিৎসা রাইস এক নির্বাহী আদেশে বাংলাদেশের হুজিকে একটি ‘বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন’ এবং একটি ‘বিশেষভাবে চিহ্নিত আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী’ হিসেবে ঘোষণা দেন।
গতকাল ইফতার অনুষ্ঠানে প্রথম আলোর সঙ্গে আলাপকালে মাওলানা সালাম বলেন, ‘কয়েকটি কারণে আমরা হরকাতুল জিহাদ বিলুপ্ত করি। এর মধ্যে মূলত আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কিছু কারণ ছিল। আপনারা জানেন, আমরা যারা হরকাতুল জিহাদ করি, সবাই আফগান মুজাহিদ ছিলাম। সেখানে মুজাহিদদের মধ্যে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হলে তার প্রভাব আমাদের এখানেও পড়ে। তা ছাড়া যে জিহাদি জজবা নিয়ে, আফগানিস্তানে আমরা গিয়েছিলাম, বিশেষ করে সোভিয়েত দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে মুসলমানদের সাহায্য করা ও মানবিকতা পুনরুদ্ধারের জন্য, সেই কাজ হয়ে গেছে। এখন আর সেই নামটি (হরকাতুল জিহাদ) ধরে রাখার কোনো কারণ নেই।’
হুজির সঙ্গে জড়িত মুফতি হান্নানসহ অনেকের বিরুদ্ধে নাশকতার অভিযোগ আছে−এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘১৯৯৮ সালেই মুফতি হান্নানকে আমরা দল থেকে বহিষ্ককার করি। বহিষ্ককারের পর কেউ যদি ওই নামে নাশকতা করে থাকে, তার দায়দায়িত্ব তাদেরই। আমাদের ওপর বর্তায় না। তবে সরকারকে ধন্যবাদ, তাদের ধরেছে। এখন তাদের বিচার চলছে।’
প্রথম আলো, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০০৮
হুজি এবার ‘আইডিপি’ নামে প্রকাশ্য রাজনীতিতে
ইসলামিস্ট মিলিট্যানসি ইন বাংলাদেশ
মৌলবাদী সন্ত্রাসের রাজনৈতিক মানচিত্র
হাসান ফেরদৌস
ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক, একসময় ঢাকার দৈনিক সংবাদ ও পরে বিবিসি বাংলা বিভাগের সাংবাদিক, আলী রীয়াজ ২০০৪ সালে বাংলাদেশে ইসলামি জঙ্গিবাদের উত্থান নিয়ে তাঁর প্রথম বইটি লেখেন। গড উইলিং: দি পলিটিক্স অব ইসলামিজম ইন বাংলাদেশ নামের সে বইটি কিছুটা চটজলদি লেখা হলেও তাতে বাংলাদেশে সহিংস মৌলবাদের উত্থানের মূল বৈশিষ্ট্য ও তার ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিতটি নিরপেক্ষ গবেষকের দৃষ্টিতে তিনি ঠিকই ধরতে পেরেছিলেন। তাঁর যুক্তি ছিল, ইসলামের রাজনীতিকরণের পেছনে তাঁদের যে দায়-দায়িত্ব, দেশের মূলধারাভুক্ত রাজনৈতিক দল ও নেতৃত্ব তা থেকে ছাড় পেতে পারেন না। দেশের প্রতিটি প্রধান রাজনৈতিক দল ও নেতা সর্বগ্রাহ্য কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হয়ে নিজেদের বৈধতা খুঁজতে ধর্মের দিকে হাত বাড়ান। এরই ফলে ক্রমেই ধর্ম ও রাষ্ট্রের ভেতর বিভাজনরেখা বিলুপ্ত হয় এবং রাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানেই বাংলাদেশে ইসলামি রাজনীতির উত্থান ঘটে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি−দুই প্রধান দলই সে অপরাধে অপরাধী। এই দুই মধ্যপন্থী ও আপসকামী দলের পাশাপাশি কোনো প্রগতিশীল সামাজিক-গণতান্ত্রিক দল বা বামঘেষা আন্দোলন বাংলাদেশে দানা বাঁধতে পারেনি। এর ফলে যে শুন্যতার সৃষ্টি হয়, তার নরম ও উর্বর মাটিতেই মৌলবাদী শক্তি নিজেদের সংহত করার উদ্দাম ও সাহস খুঁজে পায়।
তাঁর নতুন বই, ইসলামিস্ট মিলিট্যানসি ইন বাংলাদেশ (রুটলেজ, নিউইয়র্ক, ২০০৮), তাতে রীয়াজ ইসলামবাদীদের উত্থানের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণের পাশাপাশি এর ভু-রাজনৈতিক মানচিত্র খোঁজার চেষ্টা করেছেন। সহিংস ইসলামি রাজনীতি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সম্ভাবনার প্রতি কত বড় হুমকি ও সে হুমকি মোকাবিলার পথ কী, তা নির্দেশের চেষ্টাও করেছেন তিনি। এই বইয়ে আলী রীয়াজ সাংবাদিক নন, তিনি নিয়মনিষ্ঠ রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। পূর্বনির্ধারিত কোনো সিদ্ধান্ত আরোপের বদলে তিনি এখানে তথ্য ও উপাত্তের ভিত্তিতে যৌক্তিক উপসংহারে পৌঁছাতে তাঁর স্পষ্ট আগ্রহ দেখিয়েছেন। তাঁর যুক্তি, বাংলাদেশে সহিংস ইসলামি মৌলবাদের উত্থান মূলত একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া, দেশি ও বিদেশি শক্তিচক্র একযোগে তার পক্ষে কাজ করেছে। ১৯৭৫-পরবর্তী ঘটনাবলির ওপর আলোকপাত করে তিনি এই যৌক্তিক সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতর মৌলবাদ ও মৌলবাদী রাজনীতি সমর্থন ও আশ্রয় পাওয়ার ফলেই এই সহিংস মৌলবাদ এত দ্রুত প্রসার লাভ করেছে। তাঁর সবচেয়ে নির্দয় সমালোচনার লক্ষ্য ২০০১ থেকে ২০০৬-এর বিএনপির নেতৃত্বে চারদলীয় জোট সরকার। এই পাঁচ বছরে রাষ্ট্র ও রাষ্ট্র-বহির্ভুত শক্তিসমূহ (স্টেট ও নন-স্টেট অ্যাকটর্স) একে অপরের সঙ্গে হাত মিলিয়ে কাজ করেছে, একে অপরকে ব্যবহার করেছে। শুধু তাদের রাজনৈতিক ও আদর্শগত উদ্দেশ্য সাধনই সেই সহযোগিতার লক্ষ্য নয়, তাদের দীর্ঘমেয়াদি রণকৌশলের অংশ হিসেবেও এই আঁতাত কাজ করেছে।
আলী রীয়াজ তাঁর গ্রন্থে প্রায় গোড়া থেকেই ইসলামিক দলগুলোর রাজনৈতিক ক্ষমতার বিষয়ে যে ‘মিথ’ চালু রয়েছে, তা ভাঙার চেষ্টা করেছেন। ১৯৯১-এর নির্বাচনের সময় থেকে জামায়াত ও অন্য ইসলামি দলগুলো বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘কিং-মেকার’-এর ভুমিকা নেয়, অথচ তাদের নীতি ও আদর্শের প্রতি দেশের জনসমর্থন বরাবরই নামমাত্র। জামায়াতে ইসলামী একমাত্র ইসলামবাদী রাজনৈতিক দল, যাদের কোনো অর্থবহ জনসমর্থন রয়েছে। কিন্তু সেই সমর্থনও গত ১৫ বছরে ক্রমাগত নিম্নমুখী হয়েছে। যেমন, ১৯৯১ সালের নির্বাচনে এই দল মোট ভোটের ১২ দশমিক ১৩ শতাংশ অর্জন করে। পরবর্তী প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনেই তাদের বাক্সে ভোটের পরিমাণ ক্রমেই কমে আসে। ২০০১ সালের নির্বাচনে তাদের প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক পরিমাণ দাঁড়ায় ৪ দশমিক ২৯ শতাংশ। অন্য কথায়, এক দশকে জামায়াতে ইসলামীর সমর্থন−ভোটপ্রাপ্তি ও জনসমর্থনের নিক্তিতে ৪১ শতাংশ হ্রাস পায়। তার পরেও দল হিসেবে জামায়াতের রাজনৈতিক সমর্থন আদায়ে দেশের দুই প্রধান দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি যে উদগ্র আগ্রহ দেখিয়েছে, তা থেকে এই অব্যাহত পতনের কোনো ইঙ্গিত পাওয়া অসম্ভব।
রাজনীতির যে ইসলামিকরণ, তার ফল বাংলাদেশে প্রকাশিত হয়েছে নানাভাবে। সহিংসতা তার একটি প্রধান ও চুড়ান্ত প্রকাশ, কিন্তু তার অন্য প্রকাশও রয়েছে। যেমন, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর ক্রমাগত বৈষম্য ও সহিংসতা, নাগরিক সংস্কৃতির বিজাতিকরণ এবং মাদ্রাসা শিক্ষার উল্লম্ফন। আলী রীয়াজ তাঁর গ্রন্েথ এই শেষ বিষয়টি, অর্থাৎ মাদ্রাসা শিক্ষার প্রসার নিয়ে তথ্যভিত্তিক দীর্ঘ বিশ্লেষণ করেছেন। ইসলামি মৌলবাদীদের উত্থানের সঙ্গে মাদ্রাসা-ব্যবস্থার অবিশ্বাস্য প্রসার যে গুণগতভাবে সম্পৃক্ত, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ জাগে না, যখন আমরা এই তথ্যের মুখোমুখি হই যে ১৯৭২ থেকে ২০০৪ সালের ভেতর বাংলাদেশে উত্তর-প্রাথমিক মাদ্রাসার সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে ৭৩২ শতাংশ। কোনো সন্দেহ নেই, আওয়ামী লীগের আমলেও মাদ্রাসা-ব্যবস্থা জোরদার হয় এবং আওয়ামী সরকার মাদ্রাসা-ব্যবস্থার প্রতি সমর্থন তাদের নির্বাচনী রণকৌশলের অঙ্গীভুত করে। কিন্তু বিএনপির জোটের শেষ পাঁচ বছরে মাদ্রাসার যে প্রসার ও তার সহিংস পরিবর্তন ঘটে, পূর্ববর্তী যেকোনো সময়কে তা হার মানায়। ২০০১−২০০৫ সালে দেশের সাধারণ শিক্ষা খাতে বৃদ্ধি যেখানে ৯ দশমিক ৭৪ শতাংশ, সেখানে মাদ্রাসা খাতের সম্প্রসারণ দাঁড়ায় ২২ দশমিক ২২ শতাংশ। একই সময়ে সাধারণ শিক্ষা খাতে মোট শিক্ষার্থীর পরিমাণ বৃদ্ধি পায় ৩৩ শতাংশ, কিন্তু মাদ্রাসা ছাত্রদের সংখ্যা বৃদ্ধি পায় ৫৮ শতাংশ।
মাদ্রাসাগুলো, বিশেষ করে বেসরকারি কওমি মাদ্রাসার অনেকাংশ যে সন্ত্রাসী তৎপরতার সঙ্গে জড়িত, সে কথা পত্র-পত্রিকায় নানা সময়ে লেখা হলেও তার অকাট্য প্রমাণ মেলেনি। সে প্রমাণ মিলল ১৭ আগস্ট ২০০৫ সালে দেশজুড়ে সন্ত্রাসী বোমাবাজির পর। নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে আটক অনেক সন্ত্রাসীই পরে স্বীকার করেছে, তারা বিভিন্ন মাদ্রাসাকে প্রশিক্ষণ ও সদস্য সংগ্রহের কাজে ব্যবহার করেছে। ‘আহলে হাদিস আন্দোলন বাংলাদেশ’ ও ‘মাহাদুত তারবিয়ালতিল ইসলামিয়া মাদ্রাসা’ এই কাজে অগ্রণী ভুমিকা পালন করে। গোয়েন্দা সুত্রের তথ্য উদ্ধৃত করে আলী রীয়াজ জানিয়েছেন, সরকারিভাবে এ পর্যন্ত ২৩৩টি মাদ্রাসা চিহ্নিত করা হয়েছে, যেখানে সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো।
বিএনপির আমলে ২০০১−২০০৬-এর ভেতর সহিংস ইসলামপন্থীদের তৎপরতা যে আশ্চর্য রকম বেড়ে যায়, তার প্রধান কারণ সরকারের ভেতরেই ইসলামপন্থী নীতিনির্ধারকের ভুমিকা গ্রহণ করে। এই নীতিনির্ধারকেরা বাংলাদেশে ইসলামি সন্ত্রাসের অস্তিত্ব এক কথায় কেবল নাকচই করে দেননি, অনেক ক্ষেত্রে সন্ত্রাসীদের সহযোগী হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করেন। আলী রীয়াজ সে ধরনের বেশ কিছু প্রামাণিক উদাহরণ দিয়েছেন। হারকাতুল জিহাদ নামে যে সংগঠনটি পরে সন্ত্রাসী হিসেবে আন্তর্জাতিক কালো তালিকাভুক্ত হয়, তার অন্যতম নেতা আতাউর রহমান খান−যিনি বিন লাদেন বাহিনীর সদস্য হিসেবে আফগান-যুদ্ধে অংশ নেন−১৯৯১ সালে বিএনপির সদস্য হিসেবে আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হন। মুফতি শহিদুল ইসলাম, যিনি ১৯৯৮ সালে বিন লাদেনের সঙ্গে বৈঠক করেন বলে নিজেই স্বীকার করেছেন, ২০০১ সালে বিএনপির সমর্থিত ইসলামী ঐক্যজোটের ব্যানারে আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হন। কুখ্যাত বাংলা ভাইয়ের ‘জাগ্রত মুসলিম জনতা’ রাজশাহীর বাগমারায় প্রথম যে প্রকাশ্য জনসভা করে, তাতে অন্যতম বক্তা ছিলেন স্থানীয় বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। ২০০৪ সালের মে মাসে রাজশাহীতে বাংলা ভাই যখন তাঁর সন্ত্রাসী অভিযানের শীর্ষে, সে সময় রাজশাহীর বিভাগীয় পুলিশের ইনস্পেক্টর জেনারেল নুর মোহাম্মদ সাংবাদিকদের জানান, সরকারি আইন প্রয়োগকারী বাহিনী বাংলা ভাইকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজে সাহায্য করছে। ১৮ আগস্ট ২০০৬ সালে ঢাকায় ‘সচেতন ইসলামি জনতা’ এই ব্যানারে যে প্রকাশ্য জনসভা করে, তাতেও নিষিদ্ধ ‘হুজি’র একাধিক নেতা (যেমন, মুফতি শফিকুর রহমান, মৌলানা মোহাম্মদুল্লাহ) এবং চারদলীয় জোটের একাধিক নেতা (যেমন, শাইখুল হাদিস) অংশ নেন।
রাষ্ট্র নিজেই যখন সন্ত্রাসের লালন ও পালন করে, তখন সে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন না হয়ে উপায় থাকে না। বুদ্ধিজীবীদের একাংশ এ ব্যাপারে বিপদঘণ্টি বাজানোর চেষ্টা করেছে, সরকারি ঢਆা-নিনাদে তা সহজেই ঢাকা পড়ে যায়। কিন্তু থলের বেড়াল বেরোয়, যখন খোদ বাংলা ভাই সে কথা ফাঁস করে দেন। ২০০৬ সালের শেষ মাথায় আদালতের বিচারে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর তিনি সক্ষোভে বলেন, সরকারই তাঁদের ইসলামি হুকুমাত কায়েমের জন্য কাজ করতে উৎসাহিত করেছিল। এখন তারাই সে কাজের জন্য মানুষের তৈরি আইনে তাঁকে শাস্তি দিচ্ছে। তিনি প্রশ্ন করেন, ‘এ অবস্থায় এই সরকারের কি শাস্তি পাওয়া উচিত?’
সরকারের গোয়েন্দা বিভাগের ভেতরও ইসলামি জঙ্গিদের সহযোগী রয়েছে, তারাও সরাসরি বা অপ্রত্যক্ষভাবে ইসলামি জঙ্গিদের তৎপরতার সঙ্গে যুক্ত, এই দাবির সপক্ষে রীয়াজ একটি আগ্রহোদ্দীপক তথ্য দিয়েছেন। গোপন নথিপত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেছেন, ১৯৯৯ সালে এক প্রতিবেদনে গোয়েন্দা বিভাগ জানায় যে দক্ষিণ আফ্রিকাভিত্তিক ‘সারভেন্টস অব সাফারিং হিউম্যানিটি’ নামের একটি ইসলামি সাহায্য সংস্থার সঙ্গে বাংলাদেশের ইসলামি জঙ্গিদের যোগসাজশ রয়েছে, তারা সন্ত্রাসী তৎপরতার সঙ্গে যুক্ত, এই অভিযোগে ১৯৯৯ সালের ২৫ জানুয়ারি দুজন বিদেশিসহ পাঁচ সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করা হয়। কিন্তু ইসলামী ঐক্যজোটের এক নেতা, যিনি ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির সমর্থনে আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হন, তাঁর হস্তক্ষেপে তিন বাংলাদেশিকেই মুক্তি দেওয়া হয়। সন্ত্রাস ও রাজনীতির এই সহাবস্থানে তিক্ত এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা সে সময়ে তাঁর সরকারি প্রতিবেদনে লেখেন: ‘আমাদের কাছে স্পষ্ট প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও দুর্নীতির কারণে ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার যোগসাজশে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তৎপরতায় নিয়োজিত লোকদের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান অর্থহীন হয়ে পড়ছে। তাদের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় সন্ত্রাসীরা নতুন করে বলীয়ান হবে। বিদেশি শক্তিসমূহও উপলব্ধি করবে, সন্ত্রাসীদের চাপের মুখে সরকার কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থাই গ্রহণ করবে না।’
১/১১-এর পট পরিবর্তনের পর রাষ্ট্র ও ইসলামি সন্ত্রাসের এই যোগসাজশের বিষয়টি আমাদের কাছে আরও খোলামেলাভাবে ধরা পড়ে। আলী রীয়াজ অতি সম্প্রতি প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে এই দুইয়ের যে আন্তসম্পর্ক, তার একটি তাত্ত্বিক কাঠামো প্রস্তুত করেছেন। তার ওপর ন্যস্ত ভুমিকা পালনে রাষ্ট্রের ব্যর্থতাকে রীয়াজ ‘রাষ্ট্রের অনুপস্িথতি’ বলে চিহ্নিত করেছেন। ‘অনুপস্িথত রাষ্ট্র’ যখন দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর স্বার্থ তুলে ধরার বদলে শুধু একটি ক্ষুদ্র দল বা গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষা করে, তখন এক ধরনের শুন্যতার জন্ন নেয়। এই শুন্যতার সুযোগেই বাম ও ডান উভয়পক্ষের চুড়ান্তবাদী গ্রুপসমূহ চাঙা হয় এবং কাজ করার জায়গা খুঁজে নেয়। দেশের উত্তরাঞ্চল, যা সবচেয়ে অনুন্নত ও অবহেলিত অঞ্চলের অন্তর্গত, সেখানে এই দুই ধরনের চুড়ান্তবাদীরাই তাদের তৎপরতার ক্ষেত্র নির্বাচন করে। ২০০১−২০০৬ সালে যে চারদলীয় জোট ক্ষমতা গ্রহণ করে, তারা সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক বিবেচনা থেকেই ডানপন্থী গ্রুপসমূহ অর্থাৎ ইসলামি জঙ্গিদের সঙ্গে হাত মেলায়। তাদের জন্য এর পেছনে যেমন আদর্শিক চাপ ছিল, তেমনি ছিল নির্বাচনী রণকৌশলগত বিবেচনা।
তাঁর প্রথম গ্রন্েথ রীয়াজ বাংলাদেশে ইসলামবাদের উত্থানকে প্রধানত একটি ‘বাংলাদেশি ঘটনা’ বলে প্রমাণে আগ্রহী ছিলেন। এই গ্রন্েথ তিনি সে বিশ্লেষণ কিছুটা বদলে নিয়েছেন। বাংলাদেশে ইসলামি জঙ্গিবাদের উত্থানের পেছনে মধ্যপ্রাচ্য থেকে ওয়াহাবি ইসলাম রপ্তানি যেমন এক ধরনের ভুমিকা রেখেছে, তেমনি পরিবর্তিত ভু-রাজনৈতিক বাস্তবতাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে উপমহাদেশের দেশসমূহের ঐতিহ্যিক বৈরিতা ও প্রভাব-বলয় নির্মাণের প্রতিযোগিতা। এই প্রতিযোগিতায় ভারত ও পাকিস্তানের ‘স্যাটেলাইট’ হিসেবে ব্যবহূত হয়েছে বাংলাদেশ। রীয়াজ ভারত ও পাকিস্তান একে অপরের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি প্রভাবিত করার লক্ষ্যে কীভাবে বাংলাদেশ, বিশেষ করে তার সহিংস দলসমূহকে ব্যবহার করেছে, তার তথ্যপূর্ণ বিবরণ দিয়েছেন। বিদেশি অর্থ, বিশেষত মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন এনজিওর মাধ্যমে পাঠানো অর্থ, কীভাবে সন্ত্রাসীকাজে ব্যবহূত হয়েছে, সে কথাও তিনি জানিয়েছেন। তাঁর হিসাবে, ২০০৬ সাল নাগাদ বাংলাদেশে ৩৪টির মতো ইসলামি এনজিও তৎপর ছিল, যাদের মাধ্যমে সেখানে বছরে ২০০ কোটি টাকার হাতবদল হয়। বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিরাও জেনে বা না জেনে অর্থ প্রদানের মাধ্যমে সন্ত্রাসী কাজে মদদ দিয়েছে।
ইসলামি সন্ত্রাসীরা তাদের প্রয়োজনে ‘পপুলার কালচার’, যেমন সংগীত ও নাটককে ব্যবহার করে থাকে, মৌলবাদী উত্থানের সম্পুরক কারণ হিসেবে সম্পুর্ণ নতুন এই দিকটির প্রতি আলী রীয়াজ তাঁর এই গ্রন্েথ আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। ওয়াজ-মাহফিলের মাধ্যমে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ও অন্যরা ধর্মের নামে সহিংসতার পক্ষে উসকানি দিয়েছেন, তা কোনো গোপন কথা নয়। টেপ ও সিডিতে তাঁর ভাষণ দেশের ভেতর যেমন, দেশের বাইরেও এন্তার মেলে। আটককৃত একাধিক সন্ত্রাসী স্বীকার করেছেন, সাঈদীর ভাষণ শুনেই তাঁরা অনুপ্রাণিত হয়েছেন (যেমন, চট্টগ্রামের জেএমবির নেতা জাবেদ ইকবাল)। ইসলামি মৌলবাদীদের আয়োজিত ওয়াজ-মাহফিলের পর সহিংসতা ঘটেছে, এমন ঘটনাও অজ্ঞাত নয়। যেমন, ব্র্যাক অফিস জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে, গ্রামীণ ব্যাংক আক্রান্ত হয়েছে। নব্বইয়ের গোড়া থেকেই এসব ঘটনা ঘটেছে, কিন্তু বাংলাদেশে আমরা কখনোই খুব গুরুত্বের সঙ্গে দুয়ে দুয়ে চার মিলিয়ে দেখিনি। এর সঙ্গে যে জঙ্গিবাদ যুক্ত, তাও ভেবে দেখিনি।
ইসলামি সংগঠনগুলো তাদের উগ্র ধর্মীয় মতাদর্শ প্রচারে কীভাবে সংগীতের ব্যবহার করে থাকে, আলী রীয়াজ তার প্রতিও আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। এ ব্যাপারে অগ্রণী ভুমিকা পালন করেছে ইসলামী ছাত্র শিবিরের সাংস্কৃতিক অঙ্গসংগঠন সাইমুম শিল্পীগোষ্ঠী। তাদের নেতৃত্বে ২০টি ইসলামি সাংস্কৃতিক দল নিয়ে যে জাতীয় সাংস্কৃতিক জোট গঠিত হয় ২০০৫ সালের ২৩ আগস্ট, তারা প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে একটি ‘ইসলামিক কনসার্ট’-এর আয়োজন করে। কনসার্ট শব্দটি বিজাতীয়, অনৈসলামিক, তা সত্ত্বেও এর ব্যবহার থেকে স্পষ্ট তরুণ ও যুবকদের আকর্ষিত করাই এই ‘সাংস্কৃতিক’ আক্রমণের লক্ষ্য। আলী রীয়াজ রণাঙ্গন শিল্পীগোষ্ঠী নামের আরেক ইসলামি দলের কথাও জানিয়েছেন। এই দল শুধু ২০০৪ সালেই ২০টি ইসলামি গানের সিডি প্রকাশ করে। তালিবান নামে যে অ্যালবাম তারা প্রকাশ করে, তার ভুমিকা হিসেবে এই ভাষ্যটি রয়েছে (আমি রীয়াজের উদ্ধৃত ইংরেজি থেকে বাংলায় রূপান্তর করছি): ‘ওসামা বিন লাদেন বিশ শতকের এক মহান মুজাহিদের নাম। আমেরিকা তাঁর নামে কেঁপে ওঠে। আজ সমগ্র বিশ্বে ওসামা বিন লাদেন বীরের সম্মানে ভুষিত। আমেরিকাকে টুকরো টুকরো করে ফেলতে হলে আমাদের দরকার ওসামা। ওসামা, মুসলিম বিশ্বের তুমি নেতা, সারা বিশ্বের মুজাহিদিনদের কাছে তুমি সবচেয়ে প্রিয়। তুমিই আমাদের জিহাদের অগ্রনায়ক।’
আলী রীয়াজের বক্তব্য অনুসারে, বাংলাদেশে ইসলামি সন্ত্রাসবাদ ঠেকাতে হলে একটা প্রধান কাজ হবে সন্ত্রাসী কারা তা চিহ্নিত করা এবং তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ। ইসলামবাদীদের দাবি উদ্ধৃত করে তিনি বলেছেন, বাংলাদেশে ইসলামি সন্ত্রাসীর মোট সংখ্যা ১০ থেকে ১৫ হাজার হবে। ‘আফগান মুজাহিদ’ শুধু এমন সন্ত্রাসীর সংখ্যাই তাঁর হিসাবমতে, দুই হাজার ৮০০। নির্ঘণ্ট হিসেবে আলী রীয়াজ বাংলাদেশের প্রধান ইসলামি জঙ্গি দল ও তাদের প্রধান নেতাদের একটি তালিকা ও বিবরণ সংযুক্ত করেছেন। সন্ত্রাসীদের নেটওয়ার্ক ও তাদের অর্থ ও অস্ত্রের উৎস খুঁজে বের করা ও উৎস নির্মুল করা তাঁর বিবেচনায়, বাংলাদেশের নিজের স্বার্থে অগ্রাধিকারের সঙ্গে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। তিনি শিক্ষা সংস্কারের পাশাপাশি দেশের দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারের ওপরও জোর দিয়েছেন। তাঁর প্রস্তাব, সন্ত্রাসীদের ঠেকাতে হলে বাংলাদেশের মানুষ ও সরকারকে একযোগে কাজ করতে হবে। এই কাজটা সবার, কোনো এক দলের বা গ্রুপের নয়, সে কথা তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন।
২.
আলী রীয়াজের এই গ্রন্থটি আমার বিবেচনায় বাংলাদেশে ইসলামি জঙ্গিবাদের ওপর লেখা এ যাবৎকালের মধ্যে সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ বই। এখানে তিনি কেবল জঙ্গিবাদ নামের অসুখের লক্ষণ ও গতি-প্রকৃতি চিহ্নিত করেননি, কীভাবে সে রোগের নিরাময় সম্ভব তার প্রতিও আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন। তাঁর বিবেচনায়, যে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে বাংলাদেশের লালন, সেখানে ধর্মের নামে সহিংসতার কোনো স্থান কোনো কালেই ছিল না। রাষ্ট্রের মদদ ছাড়া এই জঙ্গিবাদের উত্থান সেখানে অসম্ভব ছিল।
ক্ষীণদৃষ্টি রাজনীতিক তাঁদের আশু স্বার্থ উদ্ধার করতে সাধ করে এই সর্বনাশ ডেকে এনেছেন, রীয়াজের এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে আমি একমত, কিন্তু এই অপরাধে আমি শুধু রাজনীতিককে একা দায়ী করতে রাজি নই। আমরা সবাই কমবেশি সে অপরাধে অপরাধী। ইসলামিবাদের প্রধান বহির্লক্ষণ সন্ত্রাস হতে পারে, কিন্তু বাংলাদেশে জঙ্গিদের হাতে বোমাবাজি একমাত্র সমস্যা নয়, এমনকি তা প্রধান সমস্যাও নয়। বোমাবাজির যে সমস্যা, তা আইনশৃঙ্খলার সঙ্গে জড়িত। দেশের আইন ও বিচার বিভাগ চাইলে সে সমস্যা নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে। কোনো কোনো জঙ্গির বিচার ও ফাঁসির ভেতর দিয়ে সে কথার প্রমাণও মিলেছে। কিন্তু বাংলাদেশে ধর্মীয় প্রশ্নে যে অসহিষ্ণুতা ক্রমেই জন্ন নিচ্ছে ও প্রসারিত হচ্ছে, সহিংস ও জঙ্গি সংস্কৃতির সেটিই প্রধান আশ্রয়স্থল। তাদের নিজস্ব ধর্মীয় প্রেসক্রিপশনে ধরা না পড়লে যেকোনো ধরনের সাংস্কৃতিক কাজকেই অনৈসলামিক বলে ইসলামি জঙ্গিরা তার ওপর চড়াও হচ্ছে। তারা যা দাবি করছে, অল্প-স্বল্প প্রতিবাদের পর আমরাও তা মেনে নিচ্ছি। আর একবার যা মেনে নেওয়া হচ্ছে, তাই ‘নর্ম’ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
এর একটা প্রধান কারণ, দেশের মূলধারাভুক্ত দলসমূহ প্রায় বিনা বাক্য ব্যয়ে মৌলবাদী রাজনীতি ও সংস্কৃতির এজেন্ডা নিজেদের এজেন্ডা বলে তার আত্তীকরণ করে ফেলেছে। ফলে মৌলবাদী সংস্কৃতি দেশের প্রধান সংস্কৃতিতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সংখ্যালঘুদের প্রতি অব্যাহত আক্রমণ ও মেয়েদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণের ভেতর এই সংস্কৃতির প্রকাশ এখনো ঘটছে হরহামেশা। মধ্যরাতে শহরের রাস্তায় মেয়েরা আক্রান্ত হলে সব দোষ মেয়েদের, এ কথা বলতে সমাজের দায়িত্বসম্পন্ন লোকেরাও দ্বিধা করেন না। আহমদিয়াদের বিরুদ্ধে ‘কাফন মিছিল’ খুব পুরোনো কোনো ঘটনা নয়। পত্রিকার পাতায় নিরীহ কার্টুনকে উপলক্ষ করে সেকুলার তথ্য-মাধ্যমের ওপর আক্রমণ হচ্ছে প্রকাশ্যে, কার্যত প্রশাসনিক সমর্থনে। আমাদের দৃষ্টির গোচরে বাংলা ভাষার ওপরও আক্রমণ চলছে। ব্রাਜ਼ণ্যবাদের বিরুদ্ধে জাগরণ বলে কেউ কেউ বাংলা ভাষার ইসলামিকরণের বস্তাপচা যুক্তি এখনো তুলে ধরছেন। এর কোনোটাই তুচ্ছ বলে অগ্রাহ্য করার উপায় নেই।
ইসলামি জঙ্গিদের ঠেকাতে হলে তাই প্রতিরোধটা হতে হবে দুমুখো। একদিকে তা হতে হবে রাজনৈতিক, অন্য দিকে সাংস্কৃতিক। সংস্কৃতি বরাবরই বাঙালিদের রাজনৈতিক অধিকার অর্জনে হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছে। ’৫২ থেকে ’৭১−এই দীর্ঘ সময়ের সব পর্যায়েই আমাদের সামগ্রিক আন্দোলনে অবিভাজ্য উপাদান হয়ে থেকেছে সংস্কৃতি। এখন আবার প্রয়োজন সেই হাতিয়ারকে সামনে আনা, তাকে ছাতার মতো তুলে ধরা। বাঙালিদের নিজস্ব সংস্কৃতি যত প্রবল ও ব্যাপকভাবে আমাদের দৈনন্দিন সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার অবিভাজ্য উপাদানে পরিণত হবে, জঙ্গিদের প্রভাব তত হ্রাস পাবে। ক্লাসে হিজাব পরে আসার দাবি জানান বিশ্ববিদ্যালয়ের যে শিক্ষক, বাহবা পাওয়ার বদলে তিনি তাহলে ধিਆারের সম্মুখীন হবেন। জঙ্গিদের বিরুদ্ধে সেটিই হবে প্রকৃত বিজয়।
সংস্কৃতির মতো রাজনীতিতেও জঙ্গিদের অনুপ্রবেশ ঘটেছে ধীরে ধীরে। গুটি গুটি পায়ে ঢুকে এখন তারা কার্যত রাজনীতির একটি প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে। প্রথমে বিরোধী রাজনীতির ছত্রচ্ছায়ায় এবং পরে সরকারের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় জঙ্গিরা রাজনৈতিক ‘লেজিটিমেসি’ও অর্জন করেছে। তাদের এখন আর অবৈধ বা বে-আইনি বলে বাতিল করা যাবে না। এসব দলের বিরুদ্ধে একাত্তরের কথা বলে যত গালই দিই না কেন, আজকের বাংলাদেশে তাদের রাজনৈতিকভাবে মার্জিনাল ভাবাও মোটেই বুদ্ধিমানের কাজ নয়। নির্বাচনের ভেতর দিয়ে দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অন্তর্ভুক্ত হয়েছে তারা। ঠিক সে কারণে এসব দলকে ‘মডারেট ইসলামিক পার্টি’ বলে স্বীকৃতিও দিয়েছে আমাদের কোনো কোনো বিদেশি অভিভাবক। এখন তাদের ঠেকানোর একমাত্র উপায় হলো, এসব দলকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করে তাদের সেই লেজিটিমেসিটুকু ছিনিয়ে আনা। আমি জামায়াত বা ইসলামি দলগুলো নিষিদ্ধ হোক সে দাবি তুলছি না, কিন্তু মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলো মৌলবাদ প্রতিহত করার লক্ষ্যে যদি ন্যুনতম একটি কর্মসুচিতে একমত হয়, তাহলে জামায়াত-জাতীয় দলগুলোকে একঘরে করা কঠিন নয়।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে যাঁরা ভাবেন, এমন সবাইকে সে দাবিটি তুলতে হবে, জোরে, আরও জোরে।
ইসলামিস্ট মিলিট্যানসি ইন বাংলাদেশ−আলী রীয়াজ, রুটলেজ, নিউইয়র্ক ২০০৮
নিউইয়র্ক, ২ জুলাই ২০০৮
প্রথম আলো, ২২ আগস্ট, ২০০৮ Permalink
আজ রক্তাক্ত ২১ আগস্ট

২০০৪ সালের ২১ আগস্টের বিকেল। বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের সামনে সমবেত হাজার হাজার মানুষ। খোলা ট্রাকের ওপর দাঁড়িয়ে বক্তৃতা করছেন দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনা। তাঁর বক্তৃতা শেষ হওয়ার পরপরই শুরু হবে সন্ত্রাসবিরোধী শোভাযাত্রা।
ঘড়ির কাঁটায় ঠিক পাঁচটা ২২ মিনিট। “জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু” বলে বক্তৃতা শেষ করে শেখ হাসিনা হাতে থাকা একটি কাগজ ভাঁজ করতে করতে এগোতে থাকলেন মঞ্চের সিঁড়ির দিকে। মুহুর্তেই বিকট শব্দে বিস্কোরিত হতে লাগল একের পর এক গ্রেনেড। আর জীবন্ত বঙ্গবন্ধু এভিনিউ মুহুর্তেই পরিণত হলো মৃত্যুপুরীতে।
আজ সেই বিভীষিকাময় একুশে আগস্ট। আওয়ামী লীগের সমাবেশে মর্মান্তিক গ্রেনেড হামলার চতুর্থ বার্ষিকী। এ হামলায় শেখ হাসিনা অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা পান। দলের কেন্দ্রীয় মহিলাবিষয়ক সম্পাদক আইভি রহমানসহ নিহত হন দলের ২২ জন নেতা-কর্মী। তবে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে এ ঘটনায় ২৪ জন নিহত হন বলে দাবি করা হয়। আর আহত হন দলের অধিকাংশ জ্যেষ্ঠ নেতাসহ পাঁচ শতাধিক নেতা-কর্মী। আইভি রহমানের স্বামী আওয়ামী লীগের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জিল্লুর রহমানও এ ঘটনায় আহত হন।
দেশে জরুরি অবস্থা থাকায় আজ সীমিত পরিসরে ২১ আগস্ট পালন করতে হচ্ছে। তবে গ্রেনেড হামলার সময় বিকেল পাঁচটা ২২ মিনিটে ঘটনাস্থলে এবার কর্মসুচি থাকছে। দীর্ঘ ১১ মাস কারাভোগের পর আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা সরকারি নির্বাহী আদেশে মুক্তি পান। বর্তমানে তিনি কানাডায় অবস্থান করছেন।
বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়ে এই নারকীয় ঘটনার কোনো সুষ্ঠু তদন্ত হয়নি। তদন্তের নামে এ ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে এ ঘটনা পুনরায় তদন্ত করে ২২ জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়।
যাঁরা নিহত হন: আইভি রহমান, শেখ হাসিনার দেহরক্ষী ল্যান্স করপোরাল (অব.) মাহবুবুর রহমান, হাসিনা মমতাজ, রিজিয়া বেগম, রফিকুল ইসলাম (আদা চাচা), রতন শিকদার, মোহাম্মদ হানিফ ওরফে মুক্তিযোদ্ধা হানিফ, মোশতাক আহমেদ সেন্টু, লিটন মুনশি ওরফে লিটু, আবদুল কুদ্দুছ পাটোয়ারী, বিল্লাল হোসেন, আব্বাছ উদ্দিন শিকদার, আতিক সরকার, মামুন মৃধা, নাসিরউদ্দিন, আবুল কাসেম, আবুল কালাম আজাদ, আবদুর রহিম, আমিনুল ইসলাম, জাহেদ আলী, মোতালেব ও সুফিয়া বেগম।
জিল্লুর রহমানের বাণী: দলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জিল্লুর রহমান এ উপলক্ষে দেওয়া বাণীতে সুষ্ঠু তদন্ত না করার জন্য বিএনপি-জামায়াত জোটকে দায়ী করেন। তবে নতুন করে তদন্ত করার জন্য তিনি বর্তমান সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। তিনি বলেন, সরকার এ ঘটনার অনেক রহস্য উন্েনাচন করেছে। তিনি ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তির ব্যবস্থা করতে সরকারের কাছে দাবি জানান।
কর্মসুচি: আওয়ামী লীগের কর্মসুচির মধ্যে রয়েছে আজ বিকেল পাঁচটা ২২ মিনিটে বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের দলীয় কার্যালয়ের সামনে ঘটনাস্থলে দুই মিনিট দাঁড়িয়ে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো এবং শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন। পাঁচটা ২৬ মিনিটে প্রতিবাদ সমাবেশ। প্রতীকীভাবে এ কর্মসুচি সারা দেশে পালিত হবে।
খবর: প্রথম আলো। ছবি: সমকাল
জঙ্গি সংগঠনগুলোর নতুন তৎপরতা
গোয়েন্দা সংস্থার কঠোর নজরদারি দরকার
তিন বছর আগে দেশের ৬৩টি জেলায় একযোগে বোমা হামলার পর জঙ্গিদের সশস্ত্র তৎপরতা রোধে কঠোর আইন প্রয়োগের যে প্রত্যাশা ছিল, তা অনেকাংশে পূরণ হয়নি। সেই ভয়াবহ বোমা হামলার পর সারা দেশে যে ১৬৯টি মামলা দায়ের করা হয়, তার মধ্যে মাত্র ৩৭টি মামলার বিচার শেষ হয়েছে। বাকি ১৩২টি মামলার অধিকাংশই বিচারাধীন; কিছু মামলার তদন্ত শেষই হয়নি। তিক্ত বাস্তবতা হলো, পাঁচটি মামলার রায়ে অভিযুক্ত সব আসামি খালাস পেয়েছে। যেখানে সরকার থেকে শুরু করে দেশের সব মানুষ একবাক্যে জঙ্গি তৎপরতার বিরুদ্ধে একজোট, সেখানে তিন বছরেও অধিকাংশ মামলার নিষ্কপত্তি না হওয়া, মামলার তদন্ত শেষ না হওয়া, অভিযুক্তদের অনেকের বেকসুর খালাস প্রভৃতি ঘটনা প্রমাণ করে যে এ ব্যাপারে সরকারের উদ্যোগে ঘাটতি রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সুত্রের খবরে জানা গেছে, জেএমবির শীর্ষ নেতা শায়খ আবদুর রহমান, সিদ্দিকুল ইসলাম বাংলা ভাইসহ ছয় জঙ্গিনেতার ফাঁসির পর বোমা হামলাসংক্রান্ত মামলাগুলোর বিচার-প্রক্রিয়ায় শিথিলতা এসেছে। এটা কাম্য নয়। জঙ্গি তৎপরতার বিরুদ্ধে আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণে শিথিলতার কোনো সুযোগ নেই। এসব ক্ষেত্রে নির্লিপ্ত মনোভাব মানে জঙ্গিবাদীদের উৎসাহিত করা। বাস্তবে তা-ই হয়েছে। এরই মধ্যে জঙ্গিদের সংগঠিত হওয়ার খবর আসছে। সম্প্রতি গ্রেপ্তার হওয়ার পর একজন জঙ্গিনেতার বক্তব্যে এর সত্যতা পাওয়া গেছে। জানা গেছে, জেএমবি নতুন উদ্যোগ নিতে শুরু করেছে। ইতিমধ্যে তারা কয়েকটি বৈঠক করেছে।
এখন থেকে সরকারপক্ষকে সতর্ক হতে হবে। মামলার তদন্তে যেন কোনো ফাঁক না থাকে তা নিশ্চিত করা দরকার। দেখা গেছে, একজনকে একাধিক মামলায় প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী করা হয়। এতে মামলা দুর্বল হয়ে যায়, আসামির সাজা নিশ্চিত করা যায় না। এসব ব্যাপারে সরকারের নিস্পৃহ থাকার কোনো উপায় নেই। মামলার দ্রুত নিষ্কপত্তিতেও সরকারপক্ষকে উদ্যোগী হতে হবে। অনেক সময় সাক্ষী হাজির না হওয়ার কারণে মামলা পিছিয়ে যায়। অথচ বেশির ভাগ মামলায় সাক্ষী হচ্ছেন পুলিশ বা সরকারি কর্মকর্তা। তাঁরা যদি মামলায় হাজির না থাকেন তাহলে চলবে কেন? কারাগারে আটক আসামিকে সময়মতো আদালতে হাজির না করানোর কারণেও অনেক মামলায় বিচারকাজ বিলম্বিত হচ্ছে। এদিকে সরকারকে মনোযোগী হতে হবে। অন্যদিকে আটক অভিযুক্তরা কারাগারের ভেতর থেকে বাইরের জঙ্গিদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে, সে ব্যাপারেও প্রয়োজনীয় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। কারাগারের ভেতর অভিযুক্ত জঙ্গিদের আলাদা সেলে রাখা ও তাদের গতিবিধির ওপর নজর রাখা একান্ত দরকার। কারাগারের ভেতর যেন তারা অন্যদের জঙ্গি-প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ করতে না পারে, সে জন্য সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার।
জঙ্গিরা যেন নতুনভাবে সংগঠিত হতে না পারে সে জন্য একদিকে যেমন গোয়েন্দা নজরদারি বাড়াতে হবে, অন্যদিকে তেমনি তারা যেন নিরীহ তরুণদের ধর্মের নামে উগ্রতার দিকে নিয়ে যেতে না পারে, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে এ কাজে ব্যবহার করতে না পারে, সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় উদ্যোগও নিতে হবে। এ জন্য উদার দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন প্রকৃত ধর্মীয় নেতাদের ব্যাপক প্রচার একটি অন্যতম উপায়। গণতান্ত্রিক, দায়িত্বশীল নাগরিক সমাজের সোচ্চার ভুমিকাও এ ক্ষেত্রে অপরিহার্য। দেশে ধর্মীয়-সহিষ্ণুতা সমুন্নত রাখার জন্য সরকারকে এ ধরনের বহুমুখী উদ্যোগ নিতে হবে।
প্রথম আলো, ১৮ আগস্ট ২০০৮