কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত

bdnews24

নিজামী-মুজাহিদ-সাঈদীসহ শীর্ষ জামায়াত নেতারা পরাজিত

চট্টগ্রাম-১৪, কক্সবাজার-২ আসনে জিতেছে

নিজস্ব প্রতিবেদক

জামায়াতে ইসলামীর আমির মতিউর রহমান নিজামী ও সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মাদ মুহাজিদ নির্বাচনে হেরে গেছেন। পাবনা-১ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী শামসুল ইসলাম এক লাখ ৪৪ হাজার ৯১৪ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন। নিজামী পেয়েছেন এক লাখ ২২ হাজার ৯৪৪ ভোট। তিনি ২১ হাজার ৯৭০ ভোটে হেরেছেন। ফরিদপুর-৩ আসনে মুজাহিদ মাত্র ৩০ হাজার ৮২১ ভোট পেয়ে তৃতীয় হয়েছেন।

দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য দেলাওয়ার হোসেন সাঈদী (পিরোজপুর-১)ও পরাজিত হয়েছেন।

গতরাতে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত কক্সবাজার-২ আসনে জামায়াতের হামিদুর রহমান আযাদ বিজয়ী হয়েছেন বলে বেসরকারিভাবে প্রাপ্ত খবরে জানা গেছে। তিনি নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে ২২ হাজার ৫০০ ভোট বেশি পেয়েছেন। চট্টগ্রাম-১৪ আসনে জামায়াতের প্রার্থী শামশুল ইসলাম জিতেছেন।

আমিরের পাশাপাশি পরাজিত হয়েছেন দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামান (শেরপুর-১) এবং সাতক্ষীরা-২ ও ৪ আসনের প্রার্থীরা। সাতক্ষীরা-৩ আসনের প্রার্থী রিয়াছাত আলীও আছেন পরাজয়ের মুখে।

ঝিনাইদহ-৩ আসনে মতিয়ার রহমান, বাগেরহাট-৩ আসনে আব্দুল ওয়াদুদ শেখ, যশোর-১ আসনে আজিজুর রহমান, খুলনা-৫ আসনে মিয়া গোলাম পরওয়ার হেরেছেন। চুয়াডাঙ্গা-২ আসনেও জামায়াতের প্রার্থী হাবিবুর রহমান পরাজিত হয়েছেন।

পরাজিত হয়েছেন এটিএম আজহারুল ইসলাম (রংপুর-২), আবদুস সুবহান মিয়া (পাবনা-৫)।
স্বাধীনতার বিরোধিতা ও যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ রয়েছে−জামায়াতের এমন শীর্ষ নেতাদের কেউই নির্বাচনে জয় পাওয়ার অবস্থানে আসতে পারেননি। নির্বাচনে জামায়াত ৩৯টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। ৩৪টি আসনে তারা চারদলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে এবং ৫টি আসনে বিএনপি ও মহাজোট প্রার্থীদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে।

প্রথম আলো, ৩০ ডিসেম্বর, ২০০৮

Permalink

অধিকাংশ মন্ত্রী-ভিআইপি ধরাশায়ী

যুগান্তর রিপোর্ট :
রাজনীতির অঙ্গনের বেশকিছু চেনামুখ মন্ত্রী, ভিআইপির পতন হল এবার। নবম সংসদ নির্বাচনে চারদলীয় জোট সরকারের অধিকাংশ সাবেক প্রভাবশালী মন্ত্রীসহ বেশ কয়েকজন ভিআইপি প্রার্থী ধরাশায়ী হয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে দল ও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদ-পদবিতে থাকা এসব জাঁদরেল নেতার অনেককে নবীনদের কাছেও হার মানতে হয়েছে।
পরাজিতদের তালিকায় শীর্ষে রয়েছেন সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিকল্প ধারার চেয়ারম্যান একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, স্পিকার ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার, বিএনপির প্রবীণ নেতা সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী জাফর আহমদ, বিএনপির সাবেক মহাসচিব ও সাবেক এলজিআরডি মন্ত্রী আবদুল মান্নান ভূঁইয়া, জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও সাবেক শিল্পমন্ত্রী মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, বিএনপি মহাসচিব ও সাবেক চিফ হুইপ খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন, সাবেক উপ-প্রধানমন্ত্রী শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ডেপুটি স্পিকার আখতার হামিদ সিদ্দিকী, স্থায়ী কমিটির অপর চার সদস্য ও সাবেক তথ্যমন্ত্রী এম শামসুল ইসলাম, চৌধুরী তানভীর আহমেদ সিদ্দিকী, অ্যাডভোকেট খোন্দকার মাহবুবউদ্দিন আহমাদ, লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আসম হান্নান শাহ, জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সমাজকল্যাণমন্ত্রী আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ। এলডিপির চেয়ারম্যান ও সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ একটি আসনে বিজয়ী হলেও আরেকটি আসনে তার ভরাডুবি হয়েছে।
এছাড়াও এসব সাবেক মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, মেয়র ও ভিআইপির মধ্যে রয়েছেনÑ বিএনপির সহ-সভাপতি ও সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী আলতাফ হোসেন চৌধুরী, সাবেক বন ও পরিবেশমন্ত্রী তরিকুল ইসলাম, সাবেক ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনামন্ত্রী চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ ও সাবেক দফতরবিহীন মন্ত্রী হারুনার রশিদ খান মুন্নু, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের চেয়ারম্যান ও সাবেক নৌমন্ত্রী আসম আবদুর রব, জোট সরকারের সাবেক জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী একেএম মোশাররফ হোসেন, ঢাকার মেয়র ও নগর বিএনপির সাবেক সভাপতি সাদেক হোসেন খোকা, ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান ও সাবেক সাংসদ মুফতি ফজলুল হক আমিনী, জামায়াত নেতা ও সাবেক সাংসদ মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ও জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, সাবেক শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী এহছানুল হক মিলন, সাবেক ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী ফজলুর রহমান পটল, সাবেক প্রতিমন্ত্রী কবির হোসেন, এবায়দুল হক চৌধুরী ও নুরুল হুদা, বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক রাজশাহীর মেয়র মিজানুর রহমান মিনু, সাবেক ত্রাণ উপমন্ত্রী অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলু প্রমুখ।
সোমবার সন্ধ্যার পর থেকে নির্বাচনের ফলাফল জানতে টেলিভিশনের পর্দায় চোখ রাখেন সারাদেশের মানুষ। ফলাফলে বিএনপিসহ চারদলীয় জোট ও অন্যান্য দলের জাতীয় পর্যায়ের নেতাদের ভরাডুবির খবরে হতচকিত হয়ে যান তারা। ফলে এ নিয়ে শুরু করেন চুলচেরা বিশ্লেষণ। কেন তাদের এ পরিণতি হল তা খতিয়ে দেখতে শুরু করেন তারা। একদিকে আওয়ামী লীগসহ মহাজোটের নেতাকর্মীরা উচ্ছ্বসিত হন, অন্যদিকে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। তবে অনেকে এ ফলাফলকে প্রত্যাশিত বলেই মন্তব্য করেছেন। বলেছেন, এটাই তাদের পাওনা। আজকে দুর্নীতিতে বাংলাদেশের নাম শীর্ষে থাকার পেছনে তাদের অনেকের মুখ্য ভূমিকা রয়েছে। আবার অনেকে ওয়ান-ইলেভেন সৃষ্টির নেপথ্যে ভূমিকা রেখেছেন।
মুন্সীগঞ্জ-১ আসনে সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিকল্প ধারার চেয়ারম্যান একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী এবার আওয়ামী লীগের সুকুমার রঞ্জন ঘোষের কাছে এবং ঢাকা-৬ আসনে আওয়ামী লীগের নতুন মুখ মিজানুর রহমান খান দিপুর কাছে ধরাশায়ী হয়েছেন। মুন্সীগঞ্জে তার অবস্থান তৃতীয়। প্রাপ্ত ভোট ৩৪ হাজার ১৪৭। এখানে বিজয়ী সুকুমার রঞ্জন ঘোষ পেয়েছেন ১ লাখ ৪৩ হাজার ১২০ ভোট। দ্বিতীয় হয়েছেন বিএনপির শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন। তার প্রাপ্ত ভোট ৯৮ হাজার ৭৮১। ঢাকা-৬ আসনে বি. চৌধুরী তৃতীয় হয়েছেন। ৬৬ হাজার ৫৭৯ ভোটে বিজয়ী হয়েছেন দিপু। ৪৪ হাজার ৩৪০ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় হয়েছেন বিএনপির সাদেক হোসেন খোকা। অথচ গত নির্বাচনে মুন্সীগঞ্জ-১ আসনে বদরুদ্দোজা চৌধুরী ৯৪ হাজার ৪০৪ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। অন্যদিকে সুকুমার রঞ্জন ঘোষ পেয়েছিলেন ৬৪ হাজার ৯৯৪ ভোট।
পঞ্চগড়-১ আসনে সাবেক স্পিকার জমিরউদ্দিন সরকার মহাজোট প্রার্থী মজাহারুল হক প্রধানের কাছে ধরাশায়ী হয়েছেন। মজাহারুল হক পেয়েছেন ১ লাখ ৫৬ হাজার ৫৫০ ভোট। আর জমিরউদ্দিন পেয়েছেন এক লাখ ৭ হাজার ৭২৬ হাজার ভোট। এখানে তিনি ৪৮ হাজার ৮২৪ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন। অথচ বিগত নির্বাচনে তিনি পেয়েছিলেন ৮১ হাজার ৬৬৪ ভোট এবং নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের মোঃ নূরুল ইসলাম পেয়েছিলেন ৭০ হাজার ১৫৫ ভোট।
কুমিল্লা-১১ আসনে এবার সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী জাফর আহমদকে পরাজিত করেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী মুজিবুল হক। এ আসন থেকে বহুবারের নির্বাচিত সাংসদ কাজী জাফর গত নির্বাচনে অংশ নেননি।
বিএনপির প্রবীণ নেতা ও সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান এবার সিলেট-১ ও মৌলভীবাজার-৩ আসনেই ভরাডুবির পথে। সিলেট-১ আসনে এবার আওয়ামী লীগ নেতা আবুল মাল আবদুল মুহিতের কাছে তিনি অনেক ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন। আবুল মাল আবদুল মুহিত ১ লাখ ৭৮ হাজার ৬৩৬ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। সাইফুর রহমান ১ লাখ ৪০ হাজার ৩৬৭ ভোট পান। মৌলভীবাজার-৩ আসনে তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ৮ হাজার ৮৯২ ভোট। বিজয়ী আওয়ামী লীগের সৈয়দ মহসিন আলী পেয়েছেন ১ লাখ ৪৪ হাজার ৪৩৩ ভোট। বিগত নির্বাচনে সিলেট-১ আসনে তিনি ১ লাখ ৩৩ হাজার ৩১৩ ভোট পেয়েছিলেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আবুল মাল আবদুল মুহিত পেয়েছিলেন ৯৩ হাজার ২১৮ ভোট।
নোয়াখালী-৫ আসনে মহাজোট প্রার্থী আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের কাছে ধরাশায়ী হয়েছেন বিএনপির প্রভাবশালী নেতা সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ। তার প্রাপ্ত ভোট ১ লাখ ১১ হাজার ২০৪। অন্যদিকে ওবায়দুল কাদের পেয়েছেন ১ লাখ ১২ হাজার ৫৭৫ ভোট। গত নির্বাচনে তিনি পেয়েছিলেন ৮৪ হাজার ৫২৪ ভোট। প্রতিদ্বন্দ্বী ওবায়দুল কাদের পেয়েছিলেন ৪৫ হাজার ৯০৬ ভোট।
নরসিংদী-৩ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ও বিএনপির সাবেক মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূঁইয়া এবার মহাজোট প্রার্থী আওয়ামী লীগের জহিরুল হক মোহনের কাছে ধরাশায়ী হলেন। মান্নান ভূঁইয়ার প্রাপ্ত ভোট ৬৬ হাজার ৯৪১ ও মোহনের প্রাপ্ত ভোট ৯৩ হাজার ৭৪৬। অবশ্য এ আসনে তার আরেক প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন একসময়ের তার শিষ্য চারদলীয় জোটের প্রার্থী জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক তোফাজ্জল হোসেন মাস্টার। মান্নান ভূঁইয়া বিগত নির্বাচনে ৬১ হাজার ৪৫৩ ভোট পেয়েছিলেন। ওই সময় তার প্রতিদ্বন্দ্বী মাহবুবুর রহমান ভূঁইয়া পেয়েছিলেন ৪৪ হাজার ৯৬০ ভোট।
মানিকগঞ্জ-১ আসনে একাধিকবারের সাংসদ বিএনপি মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনকে এবার আওয়ামী লীগের এবিএম আনোয়ারুল হকের কাছে হার মানতে হচ্ছে। আনোয়ারুল হক পেয়েছেন ১ লাখ ৪৭ হাজার ৪১৯ ভোট। আর দেলোয়ার পেয়েছেন ১ লাখ ১ হাজার ৯৫৬ ভোট। বিগত নির্বাচনে খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন ৮৫ হাজার ৪৪৫ ভোট পেয়েছিলেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের আবদুস সালাম পেয়েছিলেন ৫৯ হাজার ৫৪১ ভোট।
জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও সাবেক মন্ত্রী মতিউর রহমান নিজামীকে পাবনা-১ আসনে এবার আওয়ামী লীগের শামসুল হক টুকুর কাছে হার মানতে হয়েছে। টুকু পেয়েছেন ১ লাখ ৪৪ হাজার ৯২৪ ভোট। আর নিজামী পেয়েছেন ১ লাখ ২২ হাজার ৯৪৪ ভোট। গত নির্বাচনে মতিউর রহমান নিজামী ১ লাখ ৩৫ হাজার ৯৮২ ভোট পেয়েছিলেন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের আবু সাইয়িদ পেয়েছিলেন ৯৮ হাজার ১১৩ ভোট।
কুমিল্লা-১ আসনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনকে আওয়ামী লীগের সুবিদ আলী ভূঁইয়ার কাছে হার মানতে হয়েছে। অথচ বিগত নির্বাচনে তিনি ১ লাখ ২৮ হাজার ৬৮০ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। ৫৪ হাজার ৬৫১ ভোট পেয়ে পরাজিত হয়েছিলেন আওয়ামী লীগের হাসান জামিল সাত্তার।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক তথ্যমন্ত্রী এম শামসুল ইসলাম মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনে আওয়ামী লীগের এম ইদ্রিস আলীর কাছে পরাজিত হয়েছেন। তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ২০ হাজার ৭৮৫ ভোট। ইদ্রিস আলী ১ লাখ ২০ হাজার ৭৯৯ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন।
চট্টগ্রাম-১৪ আসনে এলডিপির চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ জামায়াতের শামসুল ইসলামের কাছে পরাজিত হলেও চট্টগ্রাম-১৪ আসনে আফসারউদ্দিনের সঙ্গে জয়ী হয়েছেন। শামসুল পেয়েছেন ১ লাখ ২০ হাজার ৩৩৯ ও অলি আহমদ পেয়েছেন ৬৩ হাজার ৪১২ ভোট। চট্টগ্রাম-১৩ আসনে অলি পেয়েছেন ৮২ হাজার ৩৬ ভোট। আফসারউদ্দিন আহমেদ পেয়েছেন ৬১ হাজার ৬৪৬ ভোট। অথচ গত নির্বাচনে তিনি ৭০ হাজার ১৬ ভোট পেয়ে জয়ী হন। তখন তার প্রতিদ্বন্দ্বী আফসারউদ্দিন পেয়েছিলেন ৫৭ হাজার ৭শ’ ভোট। চট্টগ্রাম-১৪ আসনেও ধরা কর্নেল অলি। এ আসনে তিনি আওয়ামী লীগের একেএম সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর কাছে হেরেছেন। অবশ্য বিগত নির্বাচনেও তিনি ওই আসনে ৬৪ হাজার ১৮৪ ভোট পেয়ে পরাজিত হন। ১ লাখ ৬ হাজার ৭৮৯ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন জামায়াতের শাহজাহান চৌধুরী।
ফরিদপুর-৩ আসনে আওয়ামী লীগের খন্দকার মোশাররফ হোসেনের কাছে ধরাশায়ী হয়েছেন জোট সরকারের সাবেক দুই মন্ত্রী বিএনপির সহ-সভাপতি চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ ও জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ। এখানে মোশাররফ হোসেন ১ লাখ ২২ হাজার ৪১৭ ভোট পেয়ে জয়ী হন। আর চৌধুরী কামাল ৭৫ হাজার ৩৬৩ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় এবং মুজাহিদ ২৫ হাজার ১১৭ ভোট পেয়ে তৃতীয় স্থান লাভ করেন।
চারদলীয় জোট সরকারের ডেপুটি স্পিকার আখতার হামিদ সিদ্দিকীর নওগাঁ-৩ আসনে মহাজোট প্রার্থী আকরাম হোসেন চৌধুরীর কাছে ভরাডুবি হয়েছে। তিনি ১ লাখ ১৫ হাজার ৭৪০ ভোট পেয়েছেন। আকরাম হোসেন পেয়েছেন ১ লাখ ৬৭ লাখ ১৫ হাজার ৭৪০ ভোট।
যশোর-৩ আসনে জয়ী হয়েছেন আওয়ামী লীগের খালেদুর রহমান টিটো। সেখানে বিএনপির তরিকুল ইসলাম ১ লাখ ২২ হাজার ৫৩৯ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় স্থানে আছেন। বিজয়ী টিটো ১ লাখ ৬৬ হাজার ১৯২ ভোট পান।
পটুয়াখালী-১ আসনে মহাজোট প্রার্থী অ্যাডভোকেট শাহজাহান মিয়ার কাছে ভরাডুবি হয়েছে বিএনপির সহ-সভাপতি ও সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী আলতাফ হোসেন চৌধুরীর। এখানে শাহজাহান মিয়া পেয়েছেন ১ লাখ ২০ হাজার ১৩২ ভোট। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলতাফ পেয়েছেন ৭৩ হাজার ১৭ ভোট।
ঢাকার মেয়র ও বিএনপির সাবেক নগর সভাপতি সাদেক হোসেন খোকা ঢাকা-৬ আসনে এবার আওয়ামী লীগের তরুণ নেতা মিজানুর রহমান খানের কাছে পরাজিত হলেন। বিগত নির্বাচনে খোকা ১ লাখ ২৩ হাজার ৬৮৬ পেয়ে জয়ী হন। ৯৮ হাজার ২২৯ ভোট পেয়ে পরাজিত হয়েছিলেন মোহাম্মদ সাঈদ খোকন।
ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান সাবেক সাংসদ মুফতি ফজলুল হক আমিনী ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে মহাজোট প্রার্থী জাতীয় পার্টির জিয়াউল হক মৃধার সঙ্গে ধরাশায়ী হয়েছেন। মৃধা পেয়েছেন ৫২ হাজার ৫৬৫ ভোট। আমিনী পেয়েছেন ২২ হাজার ২৪৪ ভোট।

যুগান্তর, ৩০ ডিসেম্বর, ২০০৮

Permalink

স্বাধীনতাবিরোধী প্রার্থী দুই জোটেই

চার দলে ১৭, মহাজোটে দুই, স্বতন্ত্র দুজন

ওয়াসেক বিল্লাহ্

মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সহযোগিতা, গণহত্যা এবং বুদ্ধিজীবী হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত অন্তত ২১ জন আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হচ্ছেন। তাঁদের ১৬ জন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী। বিএনপির একজন। আর দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন বিএনপির আরও দুজন। জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটে মনোনয়ন পেয়েছেন দুজন স্বাধীনতাবিরোধী।

২০০৭ সালের বাতিল হওয়া নির্বাচনেও বেশ কয়েকজন স্বাধীনতাবিরোধী চারদলীয় জোটের মনোনয়ন পেয়েছিলেন। তবে সে সময় মহাজোটে এমন কেউ ছিলেন না। গত ১৬ মে সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের সঙ্গে মতবিনিময়ের পর আওয়ামী লীগের মুখপাত্র সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেছিলেন, স্বাধীনতাবিরোধী কেউ যেন ভবিষ্যতে দলের মনোনয়ন না পান, সে বিষয়ে তাঁরা সতর্ক থাকবেন।
এ বিষয়ে মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার মেজর জেনারেল (অব.) কে এম সফিউল্লাহ্ প্রথম আলোকে বলেন, "আওয়ামী লীগ আমাদের সঙ্গে মতবিনিময়ে ওয়াদা করেছিল, তারা যুদ্ধাপরাধীদের সঙ্গে আঁতাত করবে না, স্বাধীনতাবিরোধীদের মনোনয়ন দেবে না। কিন্তু তারা ওয়াদা ভঙ্গ করেছে। এর জবাব জনগণ দেবে।"
এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর একজন সদস্য প্রথম আলোকে বলেন, বিষয়টি নিয়ে তাঁরা জাতীয় পার্টির সঙ্গে আলোচনা করবেন।

জামায়াতের স্বাধীনতাবিরোধী প্রার্থীরা: পাবনা-১ আসনে প্রার্থী হয়েছেন জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামী। তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় পূর্ব পাকিস্তান আলবদর বাহিনীর সর্বাধিনায়ক ছিলেন (সুত্র: এ এস এম সামছুল আরেফিনের মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ব্যক্তির অবস্থান, পৃ-৪২৭)। ১৯৭১ সালের ১৪ নভেম্বর জামায়াতের মুখপত্র দৈনিক সংগ্রাম-এ "বদর দিবস: পাকিস্তান ও আলবদর" শিরোনামে একটি উপসম্পাদকীয়তে তিনি লিখেছিলেন, "...শুধু পাকিস্তান রক্ষার আত্মরক্ষামূলক প্রচেষ্টা চালিয়েই এ পাকিস্তানকে রক্ষা করা যাবে না।"
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ আলবদর বাহিনীর কেন্দ্রীয় সংগঠক ছিলেন। তিনি এবার ফরিদপুর-৩ আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। ১৯৭১ সালের ১৭ অক্টোবর রংপুরে পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘের এক সভায় তিনি আলবদর বাহিনী গড়ে তুলতে দলীয় নেতা-কর্মীদের নির্দেশ দেন (সুত্র: ফোর্টনাইটলি সিক্রেট রিপোর্ট অন দ্য সিচুয়েশন ইন ইস্ট পাকিস্তান)।

শেরপুর-১ আসনে জামায়াতের প্রার্থী হয়েছেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মোহাম্মদ কামারুজ্জামান। ১৯৭১ সালের ১৬ আগস্ট দৈনিক সংগ্রাম-এর একটি প্রতিবেদনে তাঁকে ময়মনসিংহ জেলা আলবদর বাহিনীর প্রধান সংগঠন হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

রংপুর-২ আসনের প্রার্থী জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি এ টি এম আজহারুল ইসলাম আলবদর বাহিনীর রাজশাহী জেলা শাখার প্রধান ছিলেন। ফোর্টনাইটলি সিক্রেট রিপোর্ট অন দ্য সিচুয়েশন ইন ইস্ট পাকিস্তানে এ টি এম আজহার মুক্তিযোদ্ধাদের শায়েস্তা করতে তৎপর ছিলেন বলে উল্লেখ আছে।

নির্বাহী পরিষদের সদস্য পাবনা-৫ আসনে চার দলের প্রার্থী মাওলানা মোহাম্মদ সুবহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাবনার শান্তি কমিটির প্রধান ছিলেন (মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ব্যক্তির অবস্থান, পৃ-৪১১)। পাবনার একাধিক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার জানান, একাত্তরের জুন মাসে মাওলানা সুবহানের নেতৃত্বে পাবনায় মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক মাওলানা কাসিমউদ্দিনকে হত্যা করে শান্তি কমিটি। তাঁরা জানান, স্বাধীনতার ৩৫ বছর পরও মাওলানা সুবহানকে তাঁরা ভয় করেন।

নির্বাহী পরিষদের সদস্য মীর কাসেম আলী চট্টগ্রাম জেলা আলবদর বাহিনীর প্রধান রাজাকার বাহিনীর প্রধান ও আলবদর বাহিনীর কেন্দ্রীয় সংগঠক ছিলেন। তিনি ঢাকা-৮ আসনে জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। ২ আগস্ট চট্টগ্রামের মুসলিম হলে এক সমাবেশে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্দেশ করে বলেন, "গ্রামগঞ্জের প্রতিটি এলাকায় খুঁজে খুঁজে শত্রুর শেষচিহ্ন মুছে ফেলতে হবে (সুত্র: দৈনিক সংগ্রাম)।"
পিরোজপুর-১ আসনে জামায়াতের প্রার্থী (নির্বাহী কমিটির সদস্য) দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীও স্বাধীনতাবিরোধী একজন চিহ্নিত ব্যক্তি।

আমাদের গাইবান্ধা প্রতিনিধি জানান, গাইবান্ধা-১ আসনে জামায়াতের প্রার্থী ও সুন্দরগঞ্জ উপজেলার রাজাকার বাহিনীর সদস্য আবু সালেহ মোহাম্মদ আবদুল আজিজ মিয়া রাজাকার বাহিনীর সদস্য ছিলেন বলে প্রথম আলোকে জানিয়েছেন সুন্দরগঞ্জ উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার লায়েক আলী খান। পাকিস্তান সেনাবাহিনী তাঁকে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে গাইবান্ধা-সুন্দরগঞ্জ সড়কের মাঠের হাটসংলগ্ন সেতু পাহারা দেওয়ার সময় মুক্তিযোদ্ধা মনে করে একটি ঘোড়াকে গুলি করে মেরে ফেলেন। এর পর থেকে এলাকায় তাঁর নাম হয় "ঘোড়া মারা আজিজ"।
সাতক্ষীরার জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের আহ্বায়ক এনামুল হক বিশ্বাস প্রথম আলোকে জানিয়েছেন, সাতক্ষীরা-২ আসনের প্রার্থী মোহাম্মদ আবদুল খালেক নৃসংশতার জন্য "জল্লাদ খালেক" বলে পরিচিত ছিলেন। এপ্রিল মাসে আবদুল আজিজ সাতক্ষীরা শহরে পুলিন বিহারী ব্যানার্জির বাড়ি দখল করে নেন। যুদ্ধের পর তিনি পালিয়ে যান।
সাতক্ষীরা-৩ আসনে জামায়াতের প্রার্থী এম রিয়াসত আলী বিশ্বাস ছিলেন আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর ইউনিয়নের শান্তি কমিটির সেক্রেটারি। আশাশুনি উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মতিয়ার রহমান বলেন, "একাত্তরের আগস্ট মাসে তাঁকে ধরে আনেন এলাকার মুক্তিযোদ্ধারা। কিন্তু রোজার মাস হওয়ায় আমি তাঁকে হত্যা না করে বাসায় দিয়ে এসেছিলাম। তখন সে কথা দিয়েছিল আর রাজাকার থাকবে না; কিন্তু ওই কথা রাখেনি।"

শান্তি কমিটি ও রাজাকার বাহিনীর কেন্দ্রীয় সংগঠক শাহ্ মোহাম্মদ রুহুল কুদ্দুস (মুক্তিযুদ্ধে ব্যক্তির অবস্থান, পৃ-৪২৮) মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন খুলনা-৬ আসনে। ঠাকুরগাঁওয়ের আলবদর বাহিনীর সদস্য মাওলানা আবদুল হাকিম মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন ঠাকুরগাঁও-২ আসনে।

চুয়াডাঙ্গা-২ আসনের জামায়াতের প্রার্থী মাওলানা হাবিবুর রহমানও শান্তি কমিটির সদস্য ছিলেন বলে চুয়াডাঙ্গার গেরিলা কমান্ডার আবদুল হান্নানের স্বাধীনতা যুদ্ধে বৃহত্তর কুষ্টিয়া বইয়ের ১৯১ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে।
সিলেট বিভাগীয় মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার সুব্রত চক্রবর্তী জুয়েল প্রথম আলোকে জানান, সিলেট-৫ আসনে জামায়াতের প্রার্থী ফরিদউদ্দিন চৌধুরী আলবদর বাহিনীর সদস্য ছিলেন। সিলেট-৬ আসনে জামায়াতের প্রার্থী হাবীবুর রহমান তখন জামায়াতের ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘ করতেন।

কক্সবাজার-১ আসনে জামায়াতের প্রার্থী এনামুল হক মঞ্জু মুক্তিযুদ্ধের সময় চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ ইসলামী ছাত্রসংঘের সভাপতি ছিলেন ও আলবদরের প্লাটুন কমান্ডার ছিলেন (সুত্র: একাত্তরের ঘাতক ও দালালরা কে কোথায়, পৃ-১৪৬)।

বিএনপির তিনজন: চট্টগ্রাম-৬ আসনে বিএনপির প্রার্থী সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরী একাত্তরের ১৩ এপ্রিল চট্টগ্রামের বিশিষ্ট সমাজসেবী নতুন চন্দ্র সিংহ হত্যাকান্ডে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ আছে। সেদিন নতুন চন্দ্রকে তাঁর বাড়ি কুন্ডেশ্বরী ভবন থেকে টেনেহিঁচড়ে বাইরে নিয়ে আসেন সাকা চৌধুরী। এরপর পাকিস্তান বাহিনীর একজন মেজর তাঁকে গুলি করেন। পরে সাকা চৌধুরী তাঁকে তিনটি গুলি করেন। একাত্তরের ঘাতক ও দালালরা কে কোথায় বইয়ে এ তথ্য রয়েছে।

বিএনপির মনোনয়ন না পেয়ে জয়পুরহাট-১ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন আবদুল আলীম। তাঁর বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের সময় বাঙালিদের সারিতে দাঁড় করিয়ে নিজের হাতে গুলি করে মারার অভিযোগ আছে। তিনি ছিলেন শান্তি কমিটির অন্যতম সংগঠক ও জয়পুরহাট মহকুমার চেয়ারম্যান ( সুত্র: একাত্তরের ঘাতক দালালরা কে কোথায়)। গত ৪ নভেম্বর সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের অভিযুক্ত যুদ্ধাপরাধীর তালিকাতেও আবদুল আলীমের নাম আছে।

ভোলা-১ আসনে বিএনপির মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন মোশারেফ হোসেন শাজাহান। তিনি "৭০-এ প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত হয়েও মুক্তিযুদ্ধের সময় দলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন।

মহাজোটের দুজন ও আরেকজনকে নিয়ে প্রশ্ন: পিরোজপুর-৩ থেকে মহাজোটের মনোনয়ন পেয়েছেন জাতীয় পার্টির আবদুল জব্বার। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি মঠবাড়িয়ায় শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন বলে প্রথম আলোকে জানিয়েছেন মঠবাড়িয়া মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার এ ইউ এম নাছিরউদ্দিন। তিনি জানান, মুক্তিযুদ্ধের পর পর জব্বার এলাকা থেকে পালিয়ে যান। সে সময় তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে মামলাও হয়। তাঁর মনোনয়ন বদলের দাবিতে মঠবাড়িয়ায় মুক্তিযোদ্ধা সংসদ মানববন্ধনসহ নানা কর্মসুচি পালন করেছে।
যশোর-৬ (কেশবপুর) আসনে মহাজোটের মনোনয়ন পেয়েছেন জাতীয় পার্টির মাওলানা সাখাওয়াত হোসেন। তিনি ১৯৯১ সালে জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে এ আসন থেকে জয়ী হন। কেশবপুর মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার কাজী রফিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, "সাখাওয়াত হোসেন একজন কুখ্যাত রাজাকার। মুক্তিযুদ্ধের সময় সে কেশবপুরের মানুষের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে, লুট করেছে।" সাখাওয়াতের মনোনয়ন বদলের দাবিতেও কেশবপুরে মুক্তিযোদ্ধারা প্রতিবাদ সমাবেশ করেছেন।

নীলফামারী-৩ (জলঢাকা) আসনে জাতীয় পার্টি ও মহাজোটের প্রার্থী ফারুক কাদেরের প্রয়াত বাবা মুসলিম লীগের নেতা কাজী কাদের স্বাধীনতাবিরোধীদের অন্যতম সংগঠক ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের পর বঙ্গবন্ধুর সরকার তাঁর নাগরিকত্ব বাতিল করেছিল। সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের সন্দেহভাজন যুদ্ধাপরাধীর তালিকায় কাজী কাদেরের নাম আছে। তাঁর ছেলেকে মহাজোটের মনোনয়ন দেওয়ায় সিদ্ধান্ত বদলের দাবিতে মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের স্বজনেরা কালীগঞ্জ বধ্যভুমির সামনে মানববন্ধন করেছেন।
প্রথম আলো, ০৬ ডিসেম্বর, ২০০৮

Permalink

সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম এর দেয়া ৫০ যুদ্ধাপরাধীর তালিকা

সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম এর দেয়া ৫০ যুদ্ধাপরাধীর তালিকা

১. গোলাম আজম
২. মওলানা এ কে এম ইউসুফ
৩. মতিউর রহমান নিজামী
৪. দেলোয়ার হোসাইন সাঈদী
৫. মো: কামরুজ্জামান
৬. মওলানা আব্দুর রহিম
৭. আব্বাস আলী খান
৮. আলী আহসান মোহাম্মদ মোজাহিদ
৯. আব্দুল কাদের মোল্লা
১০. মোহাম্মদ হামিদুল হক চৌধুরী
১১. খাজা খায়রুদ্দিন
১২. মোহাম্মদ আলী
১৩. মোহাম্মদ আব্দুল আলীম
১৪. এএমএস সোলায়মান
১৫. সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী
১৬. ফজলুল কাদের চৌধুরী
১৭. জুলমত আলী খান
১৮. কাজী কাদের
১৯. খান আব্দুস সবুর খান
২০. মওলানা ফরিদ আহমেদ
২১. শাহ্ মোহাম্মদ আজিজুর রহমান
২২. মাওলানা আব্দুল মান্নান
২৩. ডা: আবু মোতালেব মালেক
২৪. মোহাম্মদ ইউনুস
২৫. এবিএম খালেক মজুমদার
২৬. এএন এম ইউসুফ
২৭. নুরুল আমিন
২৮. এ কিউ এম শফিউল ইসলাম
২৯. আবদুল মতিন
৩০. এড. মোহাম্মদ আইনুদ্দিন
৩১. মাওলানা নুরুজ্জামান (আইআরপি)
৩২. মাওলানা মোহাম্মদ ইসহাক
৩৩. গোলাম সরোয়ার
৩৪. মোহাম্মদ আকতার উদ্দিন আহমেদ
৩৫. মাওলানা আবদুস সোবাহান
৩৬. ক্যাপ্টেন (অব: ) আব্দুল বাছেদ
৩৭. আবদুল মতিন ভূঁইয়া
৩৮. মোহাম্মদ আবুল কাশেম
৩৯. ওবায়দুল্লাহ মজুমদার
৪০. মীর কাশেম আলী
৪১. ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল জব্বার
৪২. মাওলানা আবুল কালাম আজাদ
৪৩. মোহাম্মদ আবদুল হান্নান
৪৪. ব্যারিস্টার কোরবান আলী
৪৫. আশরাফ হোসাইন
৪৬. এড. আনসার আলী
৪৭. মোহাম্মদ কায়সার
৪৮. আবদুল মজিদ তালুকদা
৪৯. নওয়াজেস আহমেদ
৫০. একে মোশাররফ হোসেন।

Permalink

জামায়াতের গঠনতন্ত্র এখনো সংবিধান পরিপন্থী

জামায়াতের গঠনতন্ত্র এখনো সংবিধান পরিপন্থী
সহযোগী সংগঠন নিয়ে আ’লীগের মতো সমস্যা বিএনপিতেও
হারুন আল রশীদ

সংবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে গঠনতন্ত্র সংশোধনের কথা বলা হলেও জামায়াতে ইসলামীর গঠনতন্ত্র এখনো সংবিধান পরিপন্থীই রয়ে গেছে। নিবন্ধনের জন্য আবেদন করে জামায়াত সংশোধিত গঠনতন্ত্রের যে খসড়া নির্বাচন কমিশনে (ইসি) জমা দিয়েছে, তাতে সংসদ কর্তৃক প্রণীত আইন ও গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থাকে অবজ্ঞা করা হয়েছে, যা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এসব ধারাকে সংবিধানের উপযোগী করে তোলার জন্য জামায়াতকে অনুরোধ জানাবে ইসির গঠনতন্ত্র পর্যালোচনা কমিটি।

সূত্র জানিয়েছে, বিএনপির সংশোধিত গঠনতন্ত্রও নিবন্ধন আইনের শর্তবিরোধী। আওয়ামী লীগের মতো তারাও গঠনন্ত্রে সহযোগী সংগঠন রাখার বিধান রেখেছে। গঠনতন্ত্রের এ বিধানটি সংশোধন করে দেওয়ার জন্য ইসির গঠনতন্ত্র পর্যালোচনা কমিটি বিএনপির সঙ্গে বৈঠক করবে। মঙ্গলবার ফরম জমা দেওয়ার শেষ দিনে জামায়াত ও বিএনপি নিবন্ধনের জন্য আবেদন করে। গতকাল ইসির দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, ওইদিনই রাতের বেলায় গঠনতন্ত্র পর্যালোচনা কমিটির সদস্যরা দুটি দলের গঠনতন্ত্রের খুঁটিনাটি বিষয়গুলো পড়ে দেখেন। এ থেকে তাদের মনে হয়েছে, জামায়াত ও বিএনপি নিবন্ধন আইনের শর্ত পূরণে ব্যর্থ হয়েছে।

গণপ্রতিনিধিন্ত্র আদেশের ৯০-সি (১/এ) ধারায় রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনের শর্তে বলা হয়েছে, দলীয় গঠনতন্ত্রের উদ্দেশ্যসমহৃহ সংবিধানের পরিপন্থী হতে পারবে না।
৯০-সি (১/বি) ধারার বলা হয়েছে, রাজনৈতিক দলের গঠনতন্ত্রে ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, ভাষা ও লিঙ্গ ভেদে কোনো বৈষম্য থাকতে পারবে না।
জামায়াত ইসির সঙ্গে অনুষ্ঠিত সংলাপে এ দুটি ধারাই গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ থেকে বাতিল করার দাবি জানায়। একই সঙ্গে হাইকোর্টে দায়ের করা রিট আবেদনে তারা ৯০-সি (১/বি) ধারাটি বাতিলের দাবি জানায়।
জামায়াতের সংশোধিত গঠনতন্ত্রের ২ ধারার ৫ উপ-ধারায় বলা হয়েছে, ‘আল্লাহ ব্যতীত অপর কাহাকেও বাদশাহ, রাজাধিরাজ ও সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক মানিয়া লইবে না, কাহাকেও নিজস্বভাবে আদেশ ও নিষেধ করিবার অধিকারী মনে করিবে না, কাহাকেও স্বয়ংসম্পূর্ণ বিধানদাতা ও আইন প্রণেতা মানিয়া লইবে না এবং আল্লাহর আনুগত্য ও তাঁহার দেওয়া আইন পালনের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত নয় এমন সকল আনুগত্য মানিয়া লইতে অস্বীকার করিবে। কেননা সমগ্র রাজ্যের নিরঙ্কুশ মালিকানা ও সৃষ্টিলোকের সার্বভৌমত্বের অধিকারী আল্লাহ ব্যতীত অপর কাহারো আসলেই নেই।’

ইসির পর্যালোচনা কমিটির মতে, এ ধারার মাধ্যমে জনগণের রায়ে নির্বাচিত সংসদের আইন প্রণয়নের ক্ষমতাকে অবজ্ঞা করা হয়েছে।
গঠনতন্ত্রের ৫ ধারার ৩ উপধারায় জামায়াতের দাওয়াত সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টার মাধ্যমে বাংলাদেশে ইসলামের সুবিচারপূর্ণ শাসন কায়েম করিয়া সমাজ হইতে সকল প্রকার জুলুম, শোষণ, দুর্নীতি ও অবিচারের অবসান ঘটানোর আহ্বান।’

ইসির পর্যালোচনা কমিটির মতে, বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী দেশ গণতান্ত্রিক রীতিতে পরিচালিত হবে। এখানে ইসলামের সুবিচারপূর্ণ শাসনব্যবস্থা কায়েমের কোনো সুযোগ নেই।
এছাড়াও গঠনতন্ত্রের ৩ ধারার ১ উপ-ধারায় জামায়াতের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘ইসলামী মূল্যবোধের উজ্জীবন ও জাতীয় ঐক্য সৃষ্টির মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বকে সর্বপ্রকার অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক হুমকি এবং বিশৃঙ্খলা হইতে রক্ষা করিবার প্রচেষ্টা চালানো।’

এ ধারার ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, ‘সার্বভৌম শব্দটি ভৌগোলিক অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। ইসলামে আইনগত সার্বভৌমত্বের অধিকারী একমাত্র আল্লাহ।’
৬ ধারার ৪ উপ-ধারায় জামায়াতের কর্মসূচি সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘ইসলামের পূর্ণাঙ্গ প্রতিষ্ঠাকল্পে গোটা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় বাঞ্ছিত সংশোধন আনয়নের উদ্দেশ্যে নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় সরকার পরিবর্তন এবং সমাজের সর্বস্তরে সৎ ও খোদাভীরু নেতৃত্ব কায়েমের চেষ্টা করা।’

পর্যালোচনা কমিটির মতে, এ দুটি ধারাও বাংলাদেশের সংবিধানের মূল চেতনার পরিপন্থী।
সূত্র জানিয়েছে, এ ধারাগুলো ছাড়াও জামায়াতের গঠনতন্ত্রে আরো একাধিক ধারা রয়েছে, যা নিবন্ধন আইনের বিভিন্ন শর্তের পরিপন্থী।

জামায়াত ছাড়াও বিএনপি সংশোধিত গঠনতন্ত্রও নিবন্ধনের শর্ত পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ৯০-বি/বি/৩ ধারা মোতাবেক ছাত্র, শিক্ষক ও শ্রমিকদের সমন্বয়ে রাজনৈতিক দলের কোনো ধরনের অঙ্গ বা সহযোগী সংগঠন না করার বিধান দলের গঠনতন্ত্রে থাকতে হবে। কিন্তু বিএনপির সংশোধিত গঠনতন্ত্রে বলা হয়েছে, ছাত্র-শিক্ষক-শ্রমিকদের নিয়ে কোনো অঙ্গসংগঠন থাকবে না। তবে ছাত্র-শিক্ষক-শ্রমিকসহ অন্যান্য পেশাজীবী, যারা বিএনপির আদর্শে বিশ্বাসী, তারা নিজ নিজ গঠনতন্ত্র দ্বারা পরিচালিত হয়ে সংগঠন করতে পারবে। এসব সংগঠন বিএনপির সহযোগী সংগঠন হিসেবে বিবেচিত হবে।

ইসির পর্যালোচনা কমিটির মতে, এ ধারা নিবন্ধন শর্তের পরিপন্থী। বিএনপির সঙ্গে আলোচনা করে বিষয়টির নিষ্পত্তি করা হবে বলে ইসি সহৃত্র জানিয়েছে। একই কারণে আওয়ামী লীগের সঙ্গে ইসির পর্যালোচনা কমিটি আজ আরেকদফা বসতে পারে। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ব্যাংক স্টেটমেন্টের মূলকপিও আজ ইসির কাছে জমা দেওয়া হবে।
সমকাল, ২২ অক্টোবর, ২০০৮

Permalink

কাগজে-কলমে বদলেছে জামায়াত

* গঠনতন্ত্রে আল্লাহ্র আইন ও সৎ লোকের শাসন বাদ
* প্রচ্ছদে আল্লাহ্ ও আক্বিমুদ্দীন নেই
* অমুসলিমরা সহযোগী সদস্য হতে পারবে
* দলের নাম পরিবর্তন ও নারী সদস্য থাকবে
- ওয়াসেক বিল্লাহ্
নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধনের জন্য জামায়াতে ইসলামী তাদের গঠনতন্ত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। জামায়াতের গঠনতন্ত্রের প্রচ্ছদে "আল্লাহ্" ও "আক্বিমুদ্দীন", অর্থাৎ "তোমরা দ্বীন (ইসলাম) প্রতিষ্ঠা কর"−এই লেখাসংবলিত লোগো ছিল। কিন্তু গতকাল নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া সংশোধিত গঠনতন্ত্রে এটি বাদ দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিনের আদর্শিক অবস্থান ত্যাগ করে অমুসলিমদেরও দলে নেওয়ার নীতি নিয়েছে দলটি।
এ ছাড়া দলের নাম জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ থেকে "বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী" করা হয়েছে।
দলের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হিসেবে একটি অনুচ্ছেদও বাদ দেওয়া হয়েছে গঠনতন্ত্র থেকে। আগের গঠনতন্ত্রের ধারা ৩-এর ব্যাখ্যায় বলা ছিল, "জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ-এর দৃষ্টিতে দ্বীন ও ইসলামী জীবন বিধান একই অর্থবোধক পরিভাষা। তাই ইসলামী জীবন বিধান কায়েম করাই কুরআন মজীদে ব্যবহূত "ইকামাতে দ্বীন" পরিভাষাটির সঠিক অর্থ।" নতুন গঠনতন্ত্রে এই ব্যাখ্যা নেই।

সংশোধিত গঠনতন্ত্রে আল্লাহ্র আইন ও সৎ লোকের শাসন কায়েমের বিষয়টি বাদ দেওয়া হয়েছে। আগের গঠনতন্ত্রের ৫ ধারার ৩ উপধারায় ছিল, "সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টার মাধ্যমে আল্লাহ্র আইন ও সৎ লোকের শাসন কায়েম করিয়া সমাজ হইতে সকল প্রকার জুলুম, শোষণ ও অবিচারের অবসান ঘটানোর আহ্বান।"

সংশোধিত গঠনতন্ত্রে একই ধারায় বলা হয়েছে, "সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টার মাধ্যমে বাংলাদেশে ইসলামের সুবিচারপূর্ণ শাসন কায়েম করিয়া সমাজ হইতে সকল প্রকার জুলুম, শোষণ, দুর্নীতি ও অবিচারের অবসান ঘটানোর আহ্বান।"
গঠনতন্ত্রের ধারা-৬(২) থেকে "জাহিলিয়াতের যাবতীয় চ্যালেঞ্জের মুকাবিলায় ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ" বাক্যাংশটিও বাদ দিয়েছে জামায়াত।

গঠনতন্ত্রে গণতন্ত্র ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব কথাগুলো একাধিক জায়গায় সংযুক্ত করা হয়েছে। আগের গঠনতন্ত্রে শব্দ দুটি ছিল না।

এত দিন জামায়াতের কোনো কমিটিতেই নারী সদস্যদের না রাখা হলেও নিবন্ধনের জন্য নির্বাচন কমিশনের শর্ত মেনে সব কমিটিতে ২০২০ সালের মধ্যে ৩৩ শতাংশ নারী সদস্য সম্পৃক্ত করারও ঘোষণা দিয়েছে দলটি। এর মধ্যেই কেন্দ্রীয়, জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন এবং পৌরসভা পর্যায়ে অধিকাংশ কমিটিতে প্রায় ২৫ শতাংশ নারী সদস্য সম্পৃক্ত করা হয়েছে বলেও সংশোধিত গঠনতন্ত্রের পরিশিষ্টে উল্লেখ করা আছে।

তবে নির্বাচন কমিশনের বিধান অনুযায়ী নিবন্ধনের জন্য গঠনতন্ত্রে যেসব বিধানের উল্লেখ থাকতে হবে, সেগুলোর সব শর্ত দলটি পূরণ করতে পারেনি। নির্বাচন কমিশনের বিধান অনুযায়ী দলের সব পর্যায়ের কমিটি নির্বাচিত হতে হবে। কিন্তু সংশোধিত গঠনতন্ত্রে কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরা ও মহিলা বিভাগের কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরায় সদস্য মনোনয়নে দলের আমিরের ক্ষমতা বহাল রাখা হয়েছে।

নিবন্ধন আইন ও গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশের সঙ্গে দলীয় গঠনতন্ত্রের অসামঞ্জস্য খুঁজে বের করতে গত ঈদের পর থেকে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদের নেতৃত্বে একটি কমিটি কাজ করে। কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী একটি খসড়া গঠনতন্ত্র গতকাল নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধনের আবেদনের সঙ্গে জমা দেওয়া হয়েছে। এই গঠনতন্ত্রের পরিশিষ্টে বলা আছে, "৯ম জাতীয় সংসদ অধিবেশন বসার পর ছয় মাসের মধ্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নির্ধারিত ফোরামে উক্ত প্রস্তাবনা বিবেচনা করিয়া অনুমোদন করা হইবে।"
তবে গঠনতন্ত্র সংশোধনে শুধু দল নিবন্ধনের বিষয়টিই প্রাধান্য পায়নি; দলের নাম পরিবর্তন করা হয়েছে এবং মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

সবকিছুতেই পরিবর্তনের ছোঁয়া: দলের সংশোধিত গঠনতন্ত্রের প্রচ্ছদের রং পরিবর্তন করা হয়েছে। অন্তত ১৩টি ধারায় সংশোধন, কয়েকটি ধারা ও অনুচ্ছেদ সংযোজন ও বিয়োজন করা হয়েছে।

সংশোধিত গঠনতন্ত্রে ধারা ১-এ দলের নাম বদলে "বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী" করা হয়েছে। নাম নিয়ে এক ধরনের সমালোচনার জন্য এটা করা হয়েছে বলে দলের একজন কেন্দ্রীয় নেতা প্রথম আলোকে জানিয়েছেন।
অবিভক্ত ভারতে ১৯৪০-এর দশকের শুরুতে জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠা। দেশভাগের পর পাকিস্তানে "জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তান" এবং ভারতে "জামায়াতে ইসলামী ইনডিয়া" নামে দুটি দল কাজ করে। জর্ডানেও জামায়াতে ইসলামী নামে দল আছে। বাংলাদেশে কাজ শুরু করে "জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ" নামে।

অভিযোগ আছে, জামায়াতে ইসলামী একটি আন্তর্জাতিক সংগঠন এবং বাংলাদেশের জামায়াত তারই শাখা। এই সমালোচনা বন্ধ করতেই নাম পাল্টানো হলো।

আবার সংশোধিত গঠনতন্ত্রের ভুমিকাতে একটি অনুচ্ছেদ সংযুক্ত করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, "যেহেতু স্বাধীন বাংলাদেশ বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশ এবং বাংলাদেশের জনগণ ও মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামের মধ্য দিয়া বাংলাদেশ বিশ্বের মানচিত্রে স্বাধীন-সার্বভৌম জাতি রাষ্ট্রের মর্যাদা লাভ করিয়াছে; সেহেতু এই মৌলিক বিশ্বাস ও চেতনার ভিত্তিতে ইসলামী সমাজ গঠনের মহান উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী−এর এই গঠনতন্ত্র প্রণীত ও প্রবর্তিত হইল।"

অমুসলিমেরাও সদস্য হতে পারবে: সংশোধিত গঠনতন্ত্রে ধারা ১০-এ বলা হয়েছে, "বাংলাদেশের যে কোনো নাগরিক বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য ও কর্মসুচীর সহিত একমত পোষণ করিলে তিনি জামায়াতের সহযোগী সদস্য হইতে পারিবেন।"

জামায়াতের গঠনতন্ত্রে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনের একটি করা হয়েছে ধারা ১১-তে। এই ধারার ১ উপধারায় বলা হয়েছে, "বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি ও অর্থনৈতিক কর্মসুচীর সহিত একমত পোষণ করিলে যে কোনো অমুসলিম নাগরিক ইহার সহযোগী সদস্য হইতে পারিবেন।"

তবে এ জন্য তিনটি শর্ত রেখেছে দলটি। এগুলো হলো: দলের নিয়মশৃঙ্খলা বা সিদ্ধান্তসমূহ নিষ্ঠার সঙ্গে মেনে চলা, দলের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া এবং দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য একনিষ্ঠ ভুমিকা পালন।

আগের গঠনতন্ত্রের ধারা ১১-তে বলা ছিল, "...তিনি দ্বীন ইসলাম কায়েমের প্রচেষ্টায় শরীক হওয়ার উদ্দেশ্যে জামায়াতের সহযোগী সদস্যরূপে কাজ করিতে পারিবেন।"

স্থায়ী কর্মনীতি ও উদ্দেশ্যে পরিবর্তন: আগের গঠনতন্ত্রের ধারা ৪-এ দলের তিনটি স্থায়ী কর্মনীতির উল্লেখ ছিল। এর তৃতীয়টিতে বলা ছিল, "জামায়াত উহার বাঞ্ছিত সংশোধন ও বিপ্লব কার্যকর করিবার জন্য নিয়মতান্ত্রিক পন্থা অবলম্বন করিবে।" এই বাক্যে নিয়মতান্ত্রিক শব্দের পর "গণতান্ত্রিক" শব্দটি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আবার "বাংলাদেশকে একটি কল্যাণ রাষ্ট্রে পরিণত করিবার লক্ষ্যে" এই বাক্যাংশ সংযোজন করা হয়েছে।

সংশোধিত গঠনতন্ত্রে দলের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হিসেবে একটি অনুচ্ছেদ সংযোজন করা হয়েছে। এতে বলা আছে, "সর্বশক্তিমান আল্লাহ্র ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস, গণতন্ত্র, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুবিচারের আদর্শ সমুন্নত রাখা এবং ধর্ম-বর্ণ-সম্প্রদায় নির্বিশেষে মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তার বিধান এবং সর্ব শ্রেণীর মানুষের জন্য খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা, জানমাল ইজ্জতের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, সম্পদের সুষম বণ্টন, জাতীয় আয় ও উৎপাদন বৃদ্ধি এবং মানুষের জীবনমান উন্নতকরণের মাধ্যমে শোষণ, দুর্নীতি, সন্ত্রাসমুক্ত, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো।"

ধারা ৯-এ সদস্যদের (রুকন) দায়িত্ব ও কর্তব্য হিসেবে একটি উপধারার সংযোজন করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, "দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত থাকিবেন।"

কমিটি নির্বাচিত হবে: সংশোধিত গঠনতন্ত্রের ২৩(ক) ধারা অনুযায়ী কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের প্রয়োজনীয় সংখ্যক সদস্য এবং ১৫ জনের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য মজলিশে শুরার সদস্যদের দ্বারা নির্বাচিত হবেন। আবার এখন থেকে কেন্দ্রীয় মহিলা কর্মপরিষদের সদস্যরা জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের সদস্য হবেন। আগের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরার সঙ্গে পরামর্শ করে জামায়াতের আমির দলের এই দুই কমিটি গঠন করতেন।

সব শর্ত মানা হয়নি: দল নিবন্ধন আইনে বলা হয়েছে, "নিবন্ধনে আগ্রহী রাজনৈতিক দলের দলীয় গঠনতন্ত্রে এইরূপ সুষ্কপষ্ট বিধান থাকিতে হইবে যে, ক. গণতান্ত্রিক রীতি ও পদ্ধতি অনুযায়ী দল পরিচালনার জন্য নির্দিষ্ট সময় অন্তর কেন্দ্রীয় কমিটিসহ সকল পর্যায়ের কমিটির সদস্য নির্বাচিত হইবে।"

কিন্তু জামায়াতের সংশোধিত গঠনতন্ত্রের ১৮ [৪(চ)] ধারায় বলা আছে, "আমীরে জামায়াত কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরার সহিত পরামর্শ করিয়া প্রয়োজনীয় সংখ্যক সদস্যকে (রুকন) কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরার সদস্য মনোনীত করিতে পারিবেন, যাহাদের মোট সংখ্যা কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরার নির্বাচিত সদস্যগণের ১৫% এর অধিক হইবে না।"

আবার ৫৩[ক(৪)] ধারায় বলা আছে, "আমীরে জামায়াত মহিলা মজলিসে শুরার সহিত পরামর্শ করিয়া মহিলা মজলিসে শুরার সদস্য মনোনীত করিতে পারিবেন যাহাদের সংখ্যা নির্বাচিত সদস্যগণের শতকরা ২৫ ভাগের বেশি হইবে না।"
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জামায়াতের সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল এ টি এম আজহারুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, নির্বাচিত কমিটিতে মনোনয়ন দিলে সমস্যা কোথায়। যদি থাকে সেটি নির্বাচন কমিশন দেখবে।
অন্যান্য: আগের গঠনতন্ত্রে "বাইতুল মাল" শিরোনামে ষষ্ঠ অধ্যায়ে দলের তহবিলের চারটি উৎসের কথা বলা ছিল। কিন্তু সংশোধিত গঠনতন্ত্রে তহবিলের উৎস হিসেবে রাখা হয়েছে তিনটিকে। "জামায়াতের মালিকানাধীন সম্পত্তির আয়"কে এখন থেকে দলের আয়ের উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হবে না।

আবার আগের গঠনতন্ত্রের ধারা ১৮-তে ছিল, "আমীরে জামায়াতকে সহযোগিতা ও পরামর্শদানের জন্য একটি মজলিসে শুরা থাকিবে।" এটি সংশোধন করে বলা হয়েছে, "নীতি নির্ধারণ ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য একটি মজলিসে শুরা থাকিবে।"
প্রথম আলো, ২১ অক্টোবর, ২০০৮

Permalink

বিএনপি-জামায়াতের ত্রিমুখী আচরণ

হারুন আল রশীদ

নির্বাচনী আইন সংশোধন প্রসঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর অবস্থান তিন ধরনের। আদালতে মামলা দায়েরের সময়ে এক রকম, নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কাছে আরেক রকম এবং প্রকাশ্যে একবারে অন্যরকম। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, জামায়াতের যে ত্রিমূর্তি আচরণ, তার অন্ধ অনুসারী হয়ে পড়েছে বিএনপি।

বিএনপি ও জামায়াত সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনা প্রবাহের মধ্যে সরকার, আদালত ও নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কাছে যেসব দাবি-দাওয়া পেশ করেছে, সেসব দাবির একটির সঙ্গে অন্যটির কোনো মিল নেই। তারা আদালত এবং ইসির কাছে সংশোধিত গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের সুনির্দিষ্ট কিছু বিধান বাতিলের দাবি জানালেও বাইরে সংশোধিত গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের সব বিধান বাতিলের দাবি জানিয়ে যাচ্ছে। ১৮ ডিসেম্বর নির্বাচন করতে আপাতত সংশোধিত আইন বাতিল বা এ আইনে নতুন করে সংশোধনী আনা সম্ভব নয় জানার পরও তারা সরকার ও ইসির সঙ্গে দরকষাকষির চেষ্টা করে যাচ্ছে। একই সঙ্গে তারা বর্তমান সরকারের আইন সংশোধনের এখতিয়ার নিয়েও প্রশু তুলেছে। ইসির মতে, বিএনপি ও জামায়াত আসলে কী চায় তা তাদের কাছে স্পষ্ট নয়। যে কারণে বর্তমানে বিএনপি ও জামায়াতের দাবি-দাওয়া তাদের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে।

জামায়াত ২৮ আগস্ট গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ সংশোধনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট আবেদন দাখিল করে। এতে ২০২০ সালের মধ্যে দলের কেন্দ্রীয় কমিটিসহ সব পর্যায়ের কমিটিতে ৩৩ ভাগ নারীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা (ধারা ৯০-বি/১/বি/২), ছাত্র-শিক্ষক-শ্রমিক সমন্বয়ে অঙ্গ বা সহযোগী সংগঠন না করার বিধান (ধারা ৯০-বি/বি/৩), প্রবাসে দলের শাখা সংগঠন না রাখার বিধান (৯০-সি/ডি) এবং গঠনতন্ত্রে ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, ভাষা ও লিঙ্গ ভেদে কোনো বৈষম্য না রাখার বিধান (৯০-সি (১/বি) বাতিলের দাবি জানায়। একই সঙ্গে তারা সংবিধানের ৫৮-ঘ/১ অনুচ্ছেদের উল্লেখ এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আইন সংশোধনের এখতিয়ার নিয়েও প্রশ্ন তোলে।

এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার মুহাম্মদ ছহুল হোসাইন সমকালকে বলেন, ‘জামায়াত গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ধর্ম, বর্ণ সংক্রান্ত (৯০-সি ১/বি) বিধান বাতিলের যে দাবি জানিয়েছে, তা সংবিধানের সঙ্গে মিল আছে বলেই আমরা গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে অন্তর্ভুক্ত করেছি। একই বিধান সংবিধানের ২৮ অনুচ্ছেদেও রয়েছে।’

ইসির তৃতীয় দফা সংলাপ শুরু হওয়ার পর ৭ সেপ্টেম্বর বিএনপি এবং ৮ সেপ্টেম্বর জামায়াত ও ইসলামী ঐক্যজোট ইসিকে চিঠি দিয়ে জানিয়েছিল, অর্থহীন সংলাপে তারা অংশ নেবে না। খালেদা জিয়ার মুক্তির পর হঠাৎ করেই বিএনপি তাদের মত পাল্টে সংলাপে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। বিএনপির এ সিদ্ধান্তেরর পর জামায়াত এবং ইসলামী ঐক্যজোটেরও সুর পাল্টে যায়। তারাও সংলাপে অংশ নেওয়ার আগ্রহ জানিয়ে ইসিকে চিঠি দেয়।

২০ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত সংলাপে জামায়াত এবং ইসলামী ঐক্যজোট ইসির কাছে লিখিত প্রস্তাব দাখিল করলেও বিএনপির পক্ষ থেকে তা করা হয়নি। ইসির কাছে মৌখিক প্রস্তাব দিয়েছে তারা। তবে তিনটি দলেরই প্রস্তাব ছিল অভিন্ন।

ইসিতে দাখিল করা জামায়াতের লিখিত দাবির সঙ্গে ২৮ আগষ্ট আদালতে দাখিল করা দাবির কিছুটা অমিল রয়েছে। বিএনপি, জামায়াত ও ইসলামী ঐক্যজোট সুস্পষ্টভাবে গণপ্রতনিধিত্ব আদেশের তিনটি বিশেষ ধারাসহ আরো একাধিক ধারা বাতিল অথবা ক্ষেত্রবিশেষ সংশোধনের দাবি জানায়। বিশেষ তিনটি ধারা হলো- ধারা ৯০-বি/১/বি/২, ৯০-সি (১/এ) ও ৯০-সি (১/বি)।

৯০-বি/১/বি/২ ধারা মতে, রাজনৈতিক দলের সব স্তরের কমিটিতে ৩৩ ভাগ নারীর প্রতিনিধিত্ব আগামী ২০২০ সালের মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে।

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ৯০-সি (১/এ) ধারায় রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনের শর্তে বলা হয়েছে, দলীয় গঠনতন্ত্রের উদ্দেশ্যসমূহ সংবিধানের পরিপন্থী হতে পারবে না।

৯০-সি (১/বি) ধারায় বলা হয়েছে, রাজনৈতিক দলের গঠনতন্ত্রে ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, ভাষা ও লিঙ্গভেদে কোনো বৈষম্য থাকতে পারবে না।

কিন্তু ওইদিন সংলাপ শেষে তিনটি দলই বাইরে অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের জানায়, তারা সংশোধিত গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ পুরোটাই বাতিলের দাবি জানিয়েছে। যার পরিপ্রেক্ষিতে একজন নির্বাচন কমিশনার ক্ষোভের সঙ্গে বলেছিলেন, ‘সবই যদি বাতিল করতে হয়, তাহলে সংলাপে বসে অহেতুক আমাদের সময় নষ্ট করা হলো কেন?’

একই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ড. এটিএম শামসুল হুদা ২২ সেপ্টেম্বর দুঃখ ও বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছিলেন, ‘হায় আল্লাহ... ইয়া রাহমানুর রাহিম, পবিত্র মাহে রমজানে জামায়াত ও ইসলামী ঐক্যজোটের হুজুরদের মুখে এ আমি কী শুনিতে পাইলাম!’ বিস্ময়ের কারণ, আগের দুটি সংলাপে জামায়াত ও ইসলামী ঐক্যজোট আমাদের সিংহভাগ সংস্কার প্রস্তাবের সঙ্গে একমত পোষণ করলেও তৃতীয় দফা সংলাপে তারা সব ধরনের সংস্কারই নাকচ করে দিয়েছে।

ইসির মতে সংবিধানের ৯৩/১ অনুচ্ছেদ অনুসারে বর্তমান সরকারের আইন প্রণয়ন এবং সংশোধন করার এখতিয়ার রয়েছে। সংবিধানের ৯৩/১ অনুচ্ছেদে বলা আছে- ‘সংসদ ভাঙ্গিয়া যাওয়া অবস্থায় অথবা উহার অধিবেশন ব্যতীত কোন সময়ে রাষ্ট্রপতির নিকট আশু ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় পরিস্টি’তি বিদ্যমান রহিয়াছে বলিয়া সন্তোষজনকভাবে প্রতীয়মান হইলে, তিনি উক্ত পরিস্থিতিতে যেরূপ প্রয়োজনীয় বলিয়া মনে করিবেন, সেইরূপ অধ্যাদেশ প্রণয়ন ও জারি করিতে পারিবেন এবং জারি হইবার সময় হইতে অনুরূপভাবে প্রণীত অধ্যাদেশ সংসদ আইনের ন্যায় ক্ষমতাসম্পন্ন হইবে।’

ইসি ২০০১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার কর্তৃক গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে সংশোধনের বিষয়টিকেও নজির হিসেবে দেখছে। ২০০১ সালের ৮ আগস্ট গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২ সংশোধন করে গেজেট জারি করা হয়। তখন বিএনপি ও জামায়াত ওই সংশোধনীকে সাধুবাদ জানিয়েছিল। অপরদিকে আপত্তি জানিয়েছিল আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগ ১২ আগস্ট তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা লতিফুর রহমান, ১৩ আগস্ট সিইসি এম সাঈদ এবং ১৪ আগস্ট রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দীন আহমেদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ সংশোধন সংক্রান্ত গেজেট বাতিলের দাবি জানায়। কিন্তু রাষ্ট্রপক্ষ তা আমলে নেয়নি।

নির্বাচন কমিশনারদের মতে, ২০০১ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকার আইন সংশোধন করতে পারলে বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকার পারবে না কেন? যে কারণে বিএনপি-জামায়াতের দাবিকে তারা পুরোপুরি অযৌক্তিক বলে মনে করছেন।

আদালত এবং ইসির বাইরে বিএনপি ও জামায়াত সরকারের সঙ্গে যে ধরনের দরকষাকষি করে যাচ্ছে তাকেও অযৌক্তিক বলে মনে করছে ইসি। সরকারের কাছে তারা যেসব দাবি-দাওয়া রেখে যাচ্ছে, তার সঙ্গে আদালত ও ইসির কাছে রাখা দাবির যথেষ্ট অমিল রয়েছে। যে কারণে ইসি মনে করে বিএনপি ও জামায়াতের দাবি সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট নয়।

এ অবস্থায় ইসি আপাতত বিএনপি ও জামায়াতের দাবি আমলে না নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। সূত্র জানিয়েছে, এ বিষয়ে ইসি থেকে সরকার পক্ষকে সুস্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, ১৮ ডিসেম্বর নির্বাচন এবং ১ অথবা ২ নভেম্বর নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করতে হলে নির্বাচনী আইনে আর কোনো ধরনের সংশোধনী আনা সম্ভব নয়। একই সঙ্গে নির্বাচনে অংশ নিতে হলে বিএনপি-জামায়াতসহ তাদের অন্য দুই শরিক দলকে আগামীকালের মধ্যেই দলের নাম নিবন্ধনের জন্য আবেদন করতে হবে।

Permalink

মুজাহিদের বাসভবনে পুলিশের এক ঘণ্টার ব্যর্থ অভিযান

হুলিয়া মাথায় নিয়ে তিনি চার দলের সমাবেশে বক্তৃতা করছেন, জামায়াতে ইসলামীর প্রতিনিধিদলের সদস্য হিসেবে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে সরকারের সঙ্গে সংলাপেও অংশ নিয়েছেন, তার পরও পুলিশ তাঁকে খুঁজে পায়নি। গতকাল শনিবার বিকেলে জামায়াতের এ নেতাকে ধরতে তাঁর উত্তরার বাসায় চার গাড়ি পুলিশ দিয়ে এক ঘণ্টার অভিযান চালায় উত্তরা থানা।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে উত্তরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদকে ধরতে গতকাল তাঁরা অভিযান চালান। তাঁকে না পেয়ে বাসায় তল্লাশি চালানো হয়। অন্য কোনো স্থানে পাওয়া গেলে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হবে বলে তিনি জানান।

থানা সুত্র জানায়, গতকাল বিকেল সাড়ে চারটার দিকে উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের ১০ নম্বর সড়কের ৫ নম্বর বাড়ি ‘মিশন তামান্না’য় অভিযান চালানো হয়। এ বাড়িতে বাস করেন জনাব মুজাহিদ। আদালত থেকে পাওয়া পরোয়ানার ভিত্তিতে তাঁরা এ অভিযান চালান।

বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি দুর্নীতি মামলার জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদসহ পলাতক আট আসামিকে আদালতে হাজির হওয়ার জন্য ১২ অক্টোবর বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ ও প্রচারের আদেশ দেন আদালত। একই সঙ্গে এসব আসামির প্রত্যেকের বাসভবনে লটকিয়ে বিজ্ঞপ্তি জারির আদেশ দেওয়া হয়। আদালতের নির্দেশে গত বুধবার বেলা ১১টায় মুজাহিদের উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের ১০ নম্বর সড়কের ৫ নম্বর বাড়ি মিশন তামান্নার মূল ফটকে এ বিজ্ঞপ্তি সাঁটিয়ে দেওয়া হয়। তবে সন্ধ্যায় ওই বাড়ির ফটকে কোনো বিজ্ঞপ্তি পাওয়া যায়নি।
প্রথম আলো, ১৯ অক্টোবর, ২০০৮

ভণ্ডামী আর কাকে বলে?

Permalink

উগ্রবাদীদের প্রতিবাদে অপসারিত হলো লালনের ভাস্কর্য

সমকাল প্রতিবেদক

উগ্র ধর্মীয় গোষ্ঠীর প্রতিবাদের মুখে অবশেষে অপসারণ করা হলো জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সামনের গোল চত্বরে নির্মাণাধীন ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি’ শীর্ষক লালন শাহর ভাস্কর্যটি। মূলত বাঙালির লোকসংস্কৃতিকে তুলে ধরা হয়েছিল এ স্থাপত্যটিতে। কয়েকদিন ধরে তারা ভাস্কর্যটিকে অপসারণের জন্য আন্দোলন করে আসছিল। আন্দোলন চলছিল খতমে নবুওয়াত আন্দোলনের নেতৃত্বে।

বিমানবন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা খান মোঃ সিরাজুল ইসলাম সমকালকে জানান, ভাস্কর্যটি অপসারণ করা হচ্ছে। বুধবার দুপুর থেকে অপসারণের কাজ শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে ভাস্কর্য নির্মাণের কাজ প্রায় ৭০ ভাগ সম্পন্ন হয়েছিল।

তবে মৌলবাদীদের দাবির মুখেই তা অপসারণ করা হচ্ছে- এ রকমটি স্বীকার করেননি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড প্ল্যান) গ্রুপ ক্যাপ্টেন নাইম হাসান। তিনি বলেন, মূলত নকশা পছন্দ না হওয়ায় তা অপসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আরো নকশা পছন্দ করা আছে, প্রয়োজনে সেগুলো ব্যবহার করা হতে পারে।

পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, কয়েকদিন ধরে মৌলবাদীরা নির্মাণাধীন ভাস্কর্যটির পেছনে লাগে। আন্দোলনকারী মৌলবাদীরা দলবেঁধে সেখানে হাজির হয়ে শ্রমিকদের কাজও বন্ধ করতে বলে। গতকালও কয়েকজন সেখানে গিয়ে ভাস্কর্যটি টেনে উপড়ে ফেলার চেষ্টা করে। এছাড়া তারা নুর হোসেন নুরানীর নেতৃত্বে মূর্তি প্রতিরোধ নামে একটি কমিটিও গঠন করে। কয়েকদিন আগে ইসলামী ঐক্যজোটসহ বেশ কয়েকটি মৌলবাদী রাজনৈতিক দল এ ব্যাপারে একটি বিবৃতি দেয়।

বিমানবন্দর সড়ক থেকে জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রবেশের মুখে গোল চত্বরে ৪৫ ফুট উঁচু নির্মাণাধীন ভাস্কর্যটির শিল্পী মৃণাল হক। ৩ মাস আগে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের অনুমোদন পাওয়ার পর শিল্পী বাড়িতে বসে কাঠামো তৈরির কাজ শেষ করেন। ঈদের ৪ দিন আগে তা গোল চত্বরে বসানো হয়। এখন এতে ঘষামাজার কাজ চলছিল। লালন ছাড়াও সেখানে একতারা এবং আরো ৪ বাউলশিল্পীর মুখায়ব স্থাপন করা হয়েছিল। ভাস্কর্যটিতে শিল্পী লালন শাহের প্রতিকৃতি ও একতারা ছাড়া লোক সংস্কৃতির বিভিন্ন চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়। কিন্তু মৌলবাদীরা ভাস্কর্যটিকে মূর্তি আখ্যা দিয়ে তা অপসারণের দাবি তোলে। তাদের যুক্তি, হজক্যাম্পের পাশে ওই ধরনের মুখায়বসম্পন্ন ভাস্কর্যের কারণে সেখানে আসা হাজিদের সমস্যায় পড়তে হবে। এখানে মিনার স্থাপন করতে হবে।

সমকাল, ১৬ অক্টোবর, ২০০৮

Permalink

মাদ্রাসাছাত্রদের হুমকির মুখে বিমানবন্দরের সামনে নির্মাণাধীন ভাস্কর্য সরিয়ে ফেলা হচ্ছে

ছবি: প্রথম আলো
ছবি: বাংলার চোখ
কওমি মাদ্রাসার কয়েক শ ছাত্রের হুমকির মুখে নির্মাণাধীন ভাস্কর্য সরিয়ে নিচ্ছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ। বিমানবন্দরের সামনে ভাস্কর্য নির্মাণের বিরোধিতা করতে "বিমানবন্দর গোলচত্বর মূর্তি প্রতিরোধ কমিটি"র ব্যানারে মাদ্রাসার ছাত্রদের সংগঠিত করেন খতমে নবুওয়ত আন্দোলনের আমির মুফতি নুর হোসাইন নুরানী।
ভাস্কর মৃণাল হক জানান, স্থানীয় বাবুস সালাম মসজিদ ও মাদ্রাসার আপত্তির মুখে কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তে গতকাল বুধবার দুপুর থেকে তাঁর নির্মিত ভাস্কর্য পাঁচটি কেটে সরিয়ে নেওয়ার কাজ শুরু হয়। দেশীয় বাদ্যযন্ত্র হাতে পাঁচ বাউল এই ভাস্কর্যের মূল চরিত্র।
বিমানবন্দর থানার পুলিশ সুত্র জানায়, ভাস্কর্য সরিয়ে নেওয়ার পরও মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকেরা আগামী ২২ অক্টোবরের সমাবেশের কর্মসুচি প্রত্যাহার করেনি। তারা এখন নতুন দাবি তুলেছে, এখানে হজ মিনার করতে হবে।
মাদ্রাসার কিছু ছাত্র-শিক্ষকের হুমকির মুখে নতি স্বীকার করে ভাস্কর্য সরিয়ে নেওয়ার কথা স্বীকার করতে রাজি নয় বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (সিভিল এভিয়েশন)। সিভিল এভিয়েশনের চেয়ারম্যান এয়ার কমোডর শাকিব ইকবাল খান মজলিস গতকাল দুপুরে প্রথম আলোকে বলেন, "আমরা চেয়েছিলাম বিমূর্ত টাইপের ভাস্কর্য করতে। কিন্তু যেভাবে চেয়েছিলাম, সেভাবে হচ্ছিল না। তাই এটা আজকের মধ্যেই সরিয়ে ফেলছি। কাল-পরশুর মধ্যে এখানে ফোয়ারা বা উঁচু স্তম্ভ (টাওয়ার) ধরনের কিছু একটা বসানোর সিদ্ধান্ত নেব।"
মাদ্রাসার কিছু ছাত্র-শিক্ষকের আন্দোলনের মুখে ভাস্কর্য সরানো হচ্ছে কি না−এই প্রশ্নের জবাবে সিভিল এভিয়েশনের চেয়ারম্যান বলেন, কারও আন্দোলনের মুখে এটা সরানো হচ্ছে না। তিনি বলেন, "কেবল তারাই তো মুসলমান নয়, আমরাও মুসলমান। আমরা নিশ্চয়ই চাইব না, হাজিরা মূর্তি দেখে হজে রওনা হোন।"
সংশ্লিষ্ট সুত্রে জানা যায়, জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রবেশমুখে গোলচত্বরে এর আগে একটি বড় ফোয়ারা ছিল। বিমান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মাহবুব জামিলের উদ্যোগে সৌন্দর্য বর্ধনের অংশ হিসেবে ফোয়ারা ভেঙে সেখানে দেশীয় সংস্কৃতির নিদর্শন হিসেবে বাউলের ভাস্কর্য বসানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেটা তৈরির জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয় ভাস্কর মৃণাল হককে। আগামী ২০ অক্টোবর উদ্বোধন করার কথা ছিল।
মৃণাল হক প্রথম আলোকে বলেন, সিভিল এভিয়েশন ও সড়ক বিভাগের সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি সাড়ে তিন মাস ধরে লালন শাহকে স্নরণে রেখে ভাস্কর্য তৈরির কাজ করেন। এরপর সেগুলোর কাঠামো ১৫ দিন আগে বিমানবন্দর গোলচত্বরে স্থাপন করে বাকি কাজ করা হচ্ছিল। তিনি বলেন, "এর জন্য সিভিল এভিয়েশন বা সড়ক বিভাগকে কোনো অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছিল না। অর্থায়নের জন্য তারা আমাকে বলেছে স্পন্সর জোগাড় করতে। আমি স্পন্সর জোগাড়ও করেছিলাম।"
মৃণাল হক বলেন, স্থানীয় মসজিদ-মাদ্রাসার লোকদের আপত্তির মুখে বিমানবন্দর থানার পুলিশ ও সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ কয়েক দিন ধরে তাঁকে বলে আসছিল, হুবহু লালনের প্রতিকৃতি না করে যেন বিমূর্ত ধরনের কিছু করা হয়। তারপর সেটাও করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু মাদ্রাসা সংশ্লিষ্টদের এক কথা, মানুষ আকৃতির কিছু থাকতে পারবে না। এরপর গতকাল তারা এসে হুমকি দেয় যে সরকার না সরালে তারা নিজেরাই ভাস্কর্য উপড়ে ফেলবে। তাই সরকার এখন এটা সরিয়ে নিচ্ছে।"
স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, খতমে নবুওয়ত আন্দোলন বাংলাদেশের আমির ও ফায়দাবাদ মসজিদের ইমাম মুফতি নুর হোসাইন নুরানীর উদ্যোগে কিছুদিন ধরে আশকোনা, দক্ষিণ খান, গাওয়াইর ও ফায়দাবাদ এলাকার বিভিন্ন মসজিদ ও ছোট ছোট মাদ্রাসায় সভা করে ছাত্র-শিক্ষক ও মুসল্লিদের উত্তেজিত ও সংগঠিত করার চেষ্টা করে। মুফতি নুরানীকে চেয়ারম্যান করে "বিমানবন্দর চত্বর মূর্তি প্রতিরোধ কমিটি" গঠন করা হয়। বিমানবন্দরের সামনের জমেয়া বাবুস সালাম মসজিদ ও মাদ্রাসা কমিটির সভাপতি মুশতাক হোসেন রতন ও অধ্যক্ষ মাওলানা আনিসুর রহমানকে যথাক্রমে প্রতিরোধ কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান ও সদস্য সচিব করা হয়। "ভাস্কর্যবিরোধী আন্দোলনের" কেন্দ্রবিন্দু করা হয় জামেয়া বাবুস সালাম মসজিদ ও মাদ্রাসাকে।
এর আগে আহমদিয়া বিরোধী উগ্র কর্মসুচির মূল কেন্দ্র হিসেবে এই মাদ্রাসাকে ব্যবহার করা হয়েছিল। বর্তমানে এই মাদ্রাসা ও সংলগ্ন মসজিদের সভাপতি মুশতাক হোসেন রতন সিভিল এভিয়েশনের সাবেক গাড়ি চালক। চাকরিচ্যুত হওয়ার পর তাঁর উদ্যোগে সিভিল এভিয়েশনের জমিতে এই মসজিদ ও মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। একই কমপ্লেক্সে তারা মার্কেট করে বেশ কিছু দোকানও ভাড়া দেয়।
স্থানীয় দোকানদাররা জানায়, গত সোমবার কয়েক শ মাদ্রাসাছাত্র গোলচত্বরে এসে হুমকি দিয়ে যায় ভাস্কর্য সরিয়ে নিতে। গতকাল বেলা সাড়ে ১১টার দিকে শখানেক মাদ্রাসাছাত্র এসে আবারও একই হুমকি দেয়। বেলা সাড়ে তিনটার দিকে তারা আবার এসে ভাস্কার্য সরানোর জন্য বাঁধা রশি ধরে টানাটানি করে। তারা সেখানে "বিমানবন্দর গোলচত্বর মূর্তি প্রতিরোধ কমিটি" নামে ব্যানার ঝোলানোর চেষ্টা করে। পুলিশ তা করতে না দিলে পাশের বাবুস সালাম মসজিদের দেয়ালে ব্যানারটি ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। ওই ব্যানারে লেখা আছে−২১ অক্টোবরের মধ্যে ভাস্কর্য সরিয়ে না দিলে মুফতি নুর হোসাইন নুরানীর নেতৃত্বে আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।
বিমানবন্দর থানার পুলিশও দিনভর সেখানে নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিল। সন্ধ্যায় বিমানবন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা খান সিরাজুল ইসলাম বলেন, "গত পরশু মাদ্রাসা থেকে ছাত্র-শিক্ষকেরা এসে ভাস্কর্য নির্মাণ বন্ধের দাবি জানালে ওই দিনই কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়। গতকাল সকাল থেকে সরানোর কাজ শুরু হয়। তিনি বলেন, তিনি নিজে মুফতি নুর হোসেন নুরানী এবং জামিয়া বাবুস সালাম মসজিদ ও মাদ্রাসা কমিটির সভাপতি মোশতাক আহমেদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। আমরা তাদের বলেছি, তবু তারা কর্মসুচি প্রত্যাহার করেনি। তারা এখন দাবি করছে, এখানে হজ মিনার স্থাপন করতে হবে।"
এদিকে "মূর্তি প্রতিরোধ কমিটি"র প্যাডে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ঢাকা মহানগরীর উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন মসজিদের ইমামরা গতকাল মুফতি নুরানীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এলে তিনি তাঁদের উদ্দেশে বলেছেন, রক্ত আর লাশের বিনিময়ে হলেও বিমানবন্দর গোলচত্বর থেকে মূর্তি অপসারণ করা হবে। তিনি আজ সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে কর্মসুচি ঘোষণার কথা জানিয়ে তা ঠিকভাবে বাস্তবায়নের জন্য ইমামদের প্রতি আহ্বান জানান। এ সময় মুশতাক হোসেন রতন ও মাওলানা আনিসুর রহমানও উপস্থিত ছিলেন।

প্রথম আলো, ১৬ অক্টোবর, ২০০৮

Permalink

‘পলাতক’ মুজাহিদের সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার বৈঠক!

পলাতক আসামি জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ প্রধান উপদেষ্টা ড. ফখরুদ্দীন আহমদের সঙ্গে তার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সংলাপে অংশ নিলেন।

গতকাল মঙ্গলবার সরকার ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে অনুষ্ঠিত সংলাপে জামায়াতের আমির মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর নেতৃত্বে ১১ সদস্যের প্রতিনিধি দলে আলী আহসান মুজাহিদও উপস্থিত ছিলেন।
একজন পলাতক আসামি কীভাবে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠক করলেন- সাংবাদিকদের এ প্রশ্নের জবাব প্রেস ব্রিফিংয়ে উপস্টি’ত উপদেষ্টাদের কাছ থেকে পাওয়া যায়নি। তবে আলী আহসান মুজাহিদের আইনজীবী ও জামায়াত নেতা ব্যারিষ্টার আবদুর রাজ্জাক একটি বিভ্রান্তিকর জবাব দেন।

সংলাপে দলের আমির ও সেক্রেটারি জেনারেল ছাড়াও কেন্দ্রীয় নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, আবদুল কাদের মোল্লা, ব্যারিষ্টার আবদুর রাজ্জাক, অ্যাডভোকেট জসিমউদ্দিন, আবদুস সুবহান, রফিকউল ইসলাম খান, মকবুল আহমেদ, মোহাম্মদ কামারুজ্জামান ও এটিএম আজাহারুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন। সরকারের পক্ষে শিক্ষা ও বাণিজ্য উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান, যোগাযোগ উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) গোলাম কাদের, আইন উপদেষ্টা হাসান আরিফ ও স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আনোয়ারুল ইকবাল উপস্থিত ছিলেন।
সংলাপে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবরের ঘটনার বিচারসহ ১০ দফা দাবি তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে গ্যাটকো, নাইকো ও বড়পুকুরিয়া কয়লাখনিসহ সব রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহার, গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশের কতিপয় ধারা সংশোধন, আগের সীমানা অনুযায়ী নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত করা এবং মরহুম প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকী ৩১ মে জাতীয় শোক দিবস হিসেবে ঘোষণা দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে বলে জানা গেছে।

বিকেলে প্রায় দুই ঘণ্টা দীর্ঘ সংলাপ শেষে প্রেস ব্রিফিংয়ের শুরুতেই মাগরিবের নামাজের সময়ের কথা উল্লেখ করে জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামী তার বক্তব্য সংক্ষিপ্ত করার ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, সরকারের সঙ্গে অত্যন্ত আন্তরিক পরিবেশে আলোচনা হয়েছে। আলোচনাকালে আমরা নির্বাচনের আগে জরুরি আইন প্রত্যাহারসহ উপজেলা নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার কথা বলেছি। সেইসঙ্গে জামায়াতে ইসলামীসহ জেলে আটক জোট নেতাদের মুক্তি এবং তাদের ওপর থেকে মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছি।

প্রেস ব্রিফিংয়ে শিক্ষা উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, জামায়াতের সঙ্গে অত্যন্ত ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। তারা দেশে অবাধ এবং সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে সরকারের কাছে বেশ ক’টি প্রস্তাব উপস্থাপন করেছেন। এর মধ্যে নির্বাচনের আগে জরুরি আইন প্রত্যাহার, উপজেলা নির্বাচনের তারিখ কিছুটা পিছিয়ে দেওয়া। এসব বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। দেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে তাদের আগ্রহের কথাও তুলে ধরা হয়।

তিনি বলেন, সরকার দেশে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়ে বদ্ধপরিকর। এ ব্যাপারে যে কোনো ধরনের উদ্যোগ নিতে সরকার পিছপা হবে না। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোসহ সবার আন্তরিক সহযোগিতার প্রয়োজন রয়েছে। তাদের কাছ থেকে সে সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। রোডম্যাপ অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ অন্য দলগুলোর সঙ্গে প্রয়োজনে আরো আলোচনা হবে।

জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামী মাগরিবের নামাজের কথা বলে তার বক্তব্য সংক্ষিপ্ত করেন। একইভাবে শিক্ষা উপদেষ্টা তার বক্তব্য শেষে প্রশ্নোত্তর পর্বে মাত্র একটি প্রশ্ন করার সুযোগ দেওয়ার কথা ঘোষণা দেন। এ সময় সাংবাদিকরা সমস্বরে প্রতিবাদ জানান। জরুরি আইন প্রত্যাহারের সুনির্দিষ্ট কোনো দিন ঘোষণা করা হয়েছে কি-না। এ প্রশ্নের জবাবে শিক্ষা উপদেষ্টা বলেন, জামায়াতের পক্ষ থেকে জরুরি আইন প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়েছে। বিষয়টি সরকার পর্যালোচনা করছে।

এরপর জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল পলাতক আসামি, তিনি কী করে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে সংলাপে অংশ নিলেন- এ প্রশ্ন করা হলে জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামী দলের সেক্রেটারি জেনারেল এবং পুলিশের খাতায় পলাতক আসামি আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের আইনজীবী ব্যারিষ্টার আবদুর রাজ্জাককে দেখিয়ে দিয়ে তাকে প্রশ্নের জবাব দিতে বলেন।

ব্যারিষ্টার আবদুর রাজ্জাক বলেন, তার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ রয়েছে তার স্বপক্ষে উচ্চ আদালতে একটি আবেদন আছে, যা আগামী ১৬ অক্টোবর শুনানি হবে। যেহেতু বিষয়টি উচ্চ আদালতের বিবেচনাধীন আছে সেহেতু তার পক্ষে সংলাপে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে আইনগত কোনো বাধা নেই। তিনি মুক্ত মানুষ এবং জামায়াতের সেত্রেক্রটারি জেনারেল হিসেবেই সংলাপে অংশ নিয়েছেন।

আবদুর রাজ্জাকের এ জবাবের পর সরকারি ভাষ্য জানতে শিক্ষা উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান এবং আইন উপদেষ্টা হাসান আরিফের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তারা পলাতক আসামি আলী আহসান মুজাহিদকে নিয়ে দ্রুত ব্রিফিং কক্ষ ত্যাগ করেন।

Permalink

সরকারের সঙ্গে পলাতক আসামি মুজাহিদের বৈঠক, নানা প্রশ্ন

গ্রেপ্তারি পরোয়ানা মাথায় নিয়ে সরকারের সঙ্গে বৈঠক করলেন পলাতক আসামি জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ। গতকাল মঙ্গলবার প্রধান উপদেষ্টা ড. ফখরুদ্দীন আহমদ ও চার উপদেষ্টার সঙ্গে সংলাপে জামায়াতের প্রতিনিধিদলে তিনিও ছিলেন।
বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি দুর্নীতির মামলায় জনাব মুজাহিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পর পুলিশ তাঁকে পলাতক দেখিয়ে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করে। এর পরও তিনি কীভাবে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে গিয়ে সরকারের সঙ্গে সংলাপে অংশ নেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সংলাপ শেষে যৌথ সংবাদ ব্রিফিংয়ে সরকারের চার উপদেষ্টার সঙ্গে মুজাহিদও যোগ দেন। ব্রিফিংয়ে বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেন, একটির বেশি প্রশ্ন করা যাবে না। তার পরও সাংবাদিকেরা জোরাজুরি করে আরেকটি প্রশ্ন করেন। প্রশ্নটি হলো, পুলিশ আদালতকে জানিয়েছে, জনাব মুজাহিদ পলাতক, তাঁকে পাওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু তিনি সরকারের সঙ্গে সংলাপ করলেন, এখন কোনটা সঠিক? সাংবাদিকদের এ প্রশ্নের জবাব না দিয়ে বাণিজ্য উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান মাইক ঠেলে দেন জামায়াতের আমির মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর দিকে। জনাব নিজামী মাইক ঠেলে দেন মুজাহিদের দিকে। জনাব মুজাহিদ বলেন, এ প্রশ্নের জবাব দেবেন ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক। জনাব রাজ্জাক বলেন, এ দেশের অনেক রাজনীতিবিদের বিরুদ্ধে মামলা আছে। সাবেক দুই প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধেও মামলা আছে। জনাব মুজাহিদ এই মামলায় হাইকোর্টে জামিন আবেদন করেছিলেন, সেটির নিষ্পত্তি হয়নি। তবে আদালত ১৬ তারিখ পর্যন্ত সময় দিয়েছেন। তাই মুজাহিদের আজকের সংলাপে যোগ দেওয়াটা বেআইনি হয়নি।
এ পর্যায়ে সাংবাদিকেরা সরকারের বক্তব্য জানতে বারবার প্রশ্ন করলেও কোনো জবাব না দিয়ে চার উপদেষ্টা এ এফ হাসান আরিফ, হোসেন জিল্লুর রহমান, আনোয়ারুল ইকবাল ও গোলাম কাদের তড়িঘড়ি করে উঠে চলে যান।
বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি দুর্নীতির মামলায় জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ আদালত গত ৬ অক্টোবর জামায়াতের নেতা আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ, বিএনপির নেতা ব্যারিস্টার আমিনুল হকসহ নয়জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। ১২ অক্টোবর পুলিশ সাইফুর রহমান ছাড়া অপর আটজনকে পলাতক উল্লেখ করে তাঁদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি বলে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করে।
গ্রেপ্তারি পরোয়ানা তামিল বিষয়ে উত্তরা থানা পুলিশের প্রতিবেদনে বলা হয়, "গ্রেপ্তার অভিযান চালানো হয়েছে। পলাতক থাকায় গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয় নাই।"
১২ অক্টোবর বিকেলে যখন পুলিশ এই প্রতিবেদন আদালতে জমা দেয়, ওই সময় জামায়াতের নেতা জনাব মুজাহিদ ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে চলা চারদলীয় জোটের সমাবেশে বক্তৃতা করেন।
পুলিশের ওই প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত ১৬ অক্টোবরের মধ্যে আলোচ্য আসামিদের আদালতে হাজির হতে পত্রিকায় গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দেন।
আদালতের এরূপ নির্দেশ দেওয়ার পর জনাব মুজাহিদ ছাড়া অন্যদের প্রকাশ্যে দেখা যায়নি।
দন্ডবিধির ২২০, ২২১ ও ২২২ ধারা মোতাবেক আদালতের এরূপ নির্দেশ উপেক্ষা করা হলে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মচারী সাত বছর কারাদন্ড বা অর্থদন্ড বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবেন।
গতকাল এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পুলিশের মহাপরিদর্শক নুর মোহাম্মদ কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শাহ্দীন মালিক প্রথম আলোকে বলেন, এ ধরনের কার্যক্রম স্পষ্টত প্রমাণ করে, সরকারের রাজনৈতিক ইচ্ছার কাছে আইন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নতজানু হয়ে পড়েছে। এ মামলার আসামিরা কে কোথায় আছেন, কোন অনুষ্ঠানে যাচ্ছেন, সেসব অনুষ্ঠানের আয়োজনকারীসহ সবার কাছেই তা জানা। তিনি বলেন, একদিকে আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করছেন, অন্যদিকে ঘটনাপ্রবাহে মনে হচ্ছে, সরকারের পক্ষ থেকে বলে দেওয়া হচ্ছে গ্রেপ্তার না করার জন্য। অর্থাৎ এ সরকারও আগের সরকারের মতো আইন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করছে।
সংশ্লিষ্ট একটি সুত্র জানায়, জনাব মুজাহিদকে সংলাপে যোগ দেওয়া থেকে বিরত রাখতে সরকারের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা সফল হয়নি। মুজাহিদকে ছাড়া জামায়াত সংলাপে যোগ দিতে রাজি হয়নি। তা ছাড়া বিএনপির সঙ্গে সমঝোতায় সরকারের পক্ষ থেকে জনাব মুজাহিদকে দুতিয়ালির কাজে লাগানোয় এ ক্ষেত্রে জামায়াত সে সুযোগ কাজে লাগিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সরকারি উচ্চপর্যায়ের সুত্র বলছে।
জামায়াতের বক্তব্য: জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে গত রাতে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জনাব মুজাহিদের আইনজীবী ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাকের মতামত পাঠানো হয়।
এতে বলা হয়, মহানগর জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজের আদালত থেকে আলী আহসান মুজাহিদকে আগামী ১৬ অক্টোবরের মধ্যে আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তা ছাড়া তাঁর জামিনের জন্য হাইকোর্টে আবেদন করা হয়েছে। তাঁর বিষয়টি বিচারাধীন আছে। এমতাবস্থায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা সমীচীন নয়। দেশের একজন নাগরিক ও জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে তিনি সরকারের সঙ্গে সংলাপে অংশগ্রহণ করেছেন। এ ব্যাপারে তাঁর ও সরকারের জন্য আইনগত কোনো বাধা নেই।
এই সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ব্যারিস্টার রাজ্জাক গ্রেপ্তারি পরোয়ানার কথা উল্লেখ না করলেও গত ১৩ অক্টোবর জামায়াতে ইসলামীর মুখপত্র দৈনিক সংগ্রামসহ অন্যান্য জাতীয় দৈনিকে পরোয়ানা জারির খবর ঠিকই ছাপা হয়েছে।

প্রথম আলো, ১৫ অক্টোবর, ২০০৮

Permalink

সৌদি রাষ্ট্রদুতের ইফতার পার্টি


সৌদি রাষ্ট্রদুতের ইফতার পার্টি
জামায়াতের সঙ্গে অংশ নিলেন আওয়ামী লীগের নেতারা

নিজস্ব প্রতিবেদক
জামায়াতে ইসলামীর উপস্স্থিতিতে কোনো বৈঠকে অংশ না নেওয়ার ব্যাপারে আওয়ামী লীগের নীতিগত সিদ্ধান্ত থাকলেও গতকাল শুক্রবার ঢাকায় সৌদি আরবের রাষ্ট্রদুতের বাসায় ইফতার পার্টিতে জামায়াতের নেতাদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা অংশ নিয়েছেন।
বার্তা সংস্থা ইউএনবি পরিবেশিত খবরে বলা হয়, গতকাল ঢাকার গুলশানে সৌদি রাষ্ট্রদুত ড. আবদুল্লাহ বিন নাসের আল বুসাইরির বাসভবনে আয়োজিত ইফতার পার্টিতে জামায়াতের কেন্দ্রীয় আমির মতিউর রহমান নিজামীর পাশাপাশি আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জিল্লুর রহমান, সভাপতিমন্ডলীর সদস্য আমির হোসেন আমু, ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামসহ বিএনপির মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ, বায়তুল মোকাররম মসজিদের ভারপ্রাপ্ত খতিব মুফতি মো. নুরউদ্দিন, কয়েকটি দৈনিকের সম্পাদক, সাবেক উপদেষ্টা ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা অংশ নেন।
তবে প্রথম আলোর অনুসন্ধানে জানা যায়, তত্ত্বাবধায়ক সরকার রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপের ক্ষেত্রে প্রথম দিকে সব দলের সঙ্গে একত্রে আলোচনার চিন্তাভাবনা করেছিল। তখন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে কেন্দ্রীয় নেতারা বলেছিলেন, জামায়াত থাকলে আওয়ামী লীগ কোনো সংলাপে যাবে না। এর আগে গত ১৫ জুলাই বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদুত জেমস এফ মরিয়ার্টির সঙ্গে তাঁর গুলশানের বাসভবনে এক বৈঠকে আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক আসাদুজ্জামান নুর, বিএনপির সহসভাপতি চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ ও যুগ্ম মহাসচিব নজরুল ইসলাম খান, জামায়াতে ইসলামীর জ্যেষ্ঠ সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামানসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা অংশ নেন। তখনো জামায়াত নেতাদের সঙ্গে একই বৈঠকে আওয়ামী লীগের নেতাদের অংশগ্রহণ নিয়ে বিতর্ক উঠেছিল।

ওই বৈঠকের খবর পত্রিকায় প্রকাশ হওয়ার পরদিনই আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের পক্ষ থেকে দলের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক আসাদুজ্জামান নুর মার্কিন দুতাবাসের রাজনৈতিক শাখার একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে চিঠি দিয়ে আপত্তি জানান। তাতে তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামীর উপস্স্থিতিতে কোনো বৈঠকে অংশ না নেওয়ার ব্যাপারে আওয়ামী লীগের নীতিগত অবস্থান রয়েছে। ভবিষ্যতে এ রকম বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানোর সময় এ বিষয়টি ভাবনায় রাখার জন্য দুতাবাসের কর্মকর্তাকে অনুরোধ জানানো হয়।
এত কিছুর পরও গতকাল জামায়াত নেতাদের সঙ্গে একই অনুষ্ঠানে যাওয়ার বিষয়ে প্রথম আলোর পক্ষ থেকে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা আমির হোসেন আমু বলেন, "এ রকম কোনো সিদ্ধান্ত বা মার্কিন দুতাবাসে চিঠি দেওয়া সম্পর্কে আমি কিছু জানি না।
তবে আওয়ামী লীগের নেতা আসাদুজ্জামান নুর প্রথম আলোকে বলেন, জামায়াতের নেতাদের সঙ্গে কোনো অনুষ্ঠানেই আওয়ামী লীগের নেতাদের না যাওয়ার ব্যাপারে দলীয় সিদ্ধান্ত রয়েছে।

প্রথম আলো, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০০৮

Permalink

ইসলামিস্ট মিলিট্যানসি ইন বাংলাদেশ

ইসলামিস্ট মিলিট্যানসি ইন বাংলাদেশ
মৌলবাদী সন্ত্রাসের রাজনৈতিক মানচিত্র
হাসান ফেরদৌস

ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক, একসময় ঢাকার দৈনিক সংবাদ ও পরে বিবিসি বাংলা বিভাগের সাংবাদিক, আলী রীয়াজ ২০০৪ সালে বাংলাদেশে ইসলামি জঙ্গিবাদের উত্থান নিয়ে তাঁর প্রথম বইটি লেখেন। গড উইলিং: দি পলিটিক্স অব ইসলামিজম ইন বাংলাদেশ নামের সে বইটি কিছুটা চটজলদি লেখা হলেও তাতে বাংলাদেশে সহিংস মৌলবাদের উত্থানের মূল বৈশিষ্ট্য ও তার ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিতটি নিরপেক্ষ গবেষকের দৃষ্টিতে তিনি ঠিকই ধরতে পেরেছিলেন। তাঁর যুক্তি ছিল, ইসলামের রাজনীতিকরণের পেছনে তাঁদের যে দায়-দায়িত্ব, দেশের মূলধারাভুক্ত রাজনৈতিক দল ও নেতৃত্ব তা থেকে ছাড় পেতে পারেন না। দেশের প্রতিটি প্রধান রাজনৈতিক দল ও নেতা সর্বগ্রাহ্য কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হয়ে নিজেদের বৈধতা খুঁজতে ধর্মের দিকে হাত বাড়ান। এরই ফলে ক্রমেই ধর্ম ও রাষ্ট্রের ভেতর বিভাজনরেখা বিলুপ্ত হয় এবং রাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানেই বাংলাদেশে ইসলামি রাজনীতির উত্থান ঘটে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি−দুই প্রধান দলই সে অপরাধে অপরাধী। এই দুই মধ্যপন্থী ও আপসকামী দলের পাশাপাশি কোনো প্রগতিশীল সামাজিক-গণতান্ত্রিক দল বা বামঘেষা আন্দোলন বাংলাদেশে দানা বাঁধতে পারেনি। এর ফলে যে শুন্যতার সৃষ্টি হয়, তার নরম ও উর্বর মাটিতেই মৌলবাদী শক্তি নিজেদের সংহত করার উদ্দাম ও সাহস খুঁজে পায়।

তাঁর নতুন বই, ইসলামিস্ট মিলিট্যানসি ইন বাংলাদেশ (রুটলেজ, নিউইয়র্ক, ২০০৮), তাতে রীয়াজ ইসলামবাদীদের উত্থানের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণের পাশাপাশি এর ভু-রাজনৈতিক মানচিত্র খোঁজার চেষ্টা করেছেন। সহিংস ইসলামি রাজনীতি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সম্ভাবনার প্রতি কত বড় হুমকি ও সে হুমকি মোকাবিলার পথ কী, তা নির্দেশের চেষ্টাও করেছেন তিনি। এই বইয়ে আলী রীয়াজ সাংবাদিক নন, তিনি নিয়মনিষ্ঠ রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। পূর্বনির্ধারিত কোনো সিদ্ধান্ত আরোপের বদলে তিনি এখানে তথ্য ও উপাত্তের ভিত্তিতে যৌক্তিক উপসংহারে পৌঁছাতে তাঁর স্পষ্ট আগ্রহ দেখিয়েছেন। তাঁর যুক্তি, বাংলাদেশে সহিংস ইসলামি মৌলবাদের উত্থান মূলত একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া, দেশি ও বিদেশি শক্তিচক্র একযোগে তার পক্ষে কাজ করেছে। ১৯৭৫-পরবর্তী ঘটনাবলির ওপর আলোকপাত করে তিনি এই যৌক্তিক সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতর মৌলবাদ ও মৌলবাদী রাজনীতি সমর্থন ও আশ্রয় পাওয়ার ফলেই এই সহিংস মৌলবাদ এত দ্রুত প্রসার লাভ করেছে। তাঁর সবচেয়ে নির্দয় সমালোচনার লক্ষ্য ২০০১ থেকে ২০০৬-এর বিএনপির নেতৃত্বে চারদলীয় জোট সরকার। এই পাঁচ বছরে রাষ্ট্র ও রাষ্ট্র-বহির্ভুত শক্তিসমূহ (স্টেট ও নন-স্টেট অ্যাকটর্স) একে অপরের সঙ্গে হাত মিলিয়ে কাজ করেছে, একে অপরকে ব্যবহার করেছে। শুধু তাদের রাজনৈতিক ও আদর্শগত উদ্দেশ্য সাধনই সেই সহযোগিতার লক্ষ্য নয়, তাদের দীর্ঘমেয়াদি রণকৌশলের অংশ হিসেবেও এই আঁতাত কাজ করেছে।
আলী রীয়াজ তাঁর গ্রন্থে প্রায় গোড়া থেকেই ইসলামিক দলগুলোর রাজনৈতিক ক্ষমতার বিষয়ে যে ‘মিথ’ চালু রয়েছে, তা ভাঙার চেষ্টা করেছেন। ১৯৯১-এর নির্বাচনের সময় থেকে জামায়াত ও অন্য ইসলামি দলগুলো বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘কিং-মেকার’-এর ভুমিকা নেয়, অথচ তাদের নীতি ও আদর্শের প্রতি দেশের জনসমর্থন বরাবরই নামমাত্র। জামায়াতে ইসলামী একমাত্র ইসলামবাদী রাজনৈতিক দল, যাদের কোনো অর্থবহ জনসমর্থন রয়েছে। কিন্তু সেই সমর্থনও গত ১৫ বছরে ক্রমাগত নিম্নমুখী হয়েছে। যেমন, ১৯৯১ সালের নির্বাচনে এই দল মোট ভোটের ১২ দশমিক ১৩ শতাংশ অর্জন করে। পরবর্তী প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনেই তাদের বাক্সে ভোটের পরিমাণ ক্রমেই কমে আসে। ২০০১ সালের নির্বাচনে তাদের প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক পরিমাণ দাঁড়ায় ৪ দশমিক ২৯ শতাংশ। অন্য কথায়, এক দশকে জামায়াতে ইসলামীর সমর্থন−ভোটপ্রাপ্তি ও জনসমর্থনের নিক্তিতে ৪১ শতাংশ হ্রাস পায়। তার পরেও দল হিসেবে জামায়াতের রাজনৈতিক সমর্থন আদায়ে দেশের দুই প্রধান দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি যে উদগ্র আগ্রহ দেখিয়েছে, তা থেকে এই অব্যাহত পতনের কোনো ইঙ্গিত পাওয়া অসম্ভব।
রাজনীতির যে ইসলামিকরণ, তার ফল বাংলাদেশে প্রকাশিত হয়েছে নানাভাবে। সহিংসতা তার একটি প্রধান ও চুড়ান্ত প্রকাশ, কিন্তু তার অন্য প্রকাশও রয়েছে। যেমন, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর ক্রমাগত বৈষম্য ও সহিংসতা, নাগরিক সংস্কৃতির বিজাতিকরণ এবং মাদ্রাসা শিক্ষার উল্লম্ফন। আলী রীয়াজ তাঁর গ্রন্েথ এই শেষ বিষয়টি, অর্থাৎ মাদ্রাসা শিক্ষার প্রসার নিয়ে তথ্যভিত্তিক দীর্ঘ বিশ্লেষণ করেছেন। ইসলামি মৌলবাদীদের উত্থানের সঙ্গে মাদ্রাসা-ব্যবস্থার অবিশ্বাস্য প্রসার যে গুণগতভাবে সম্পৃক্ত, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ জাগে না, যখন আমরা এই তথ্যের মুখোমুখি হই যে ১৯৭২ থেকে ২০০৪ সালের ভেতর বাংলাদেশে উত্তর-প্রাথমিক মাদ্রাসার সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে ৭৩২ শতাংশ। কোনো সন্দেহ নেই, আওয়ামী লীগের আমলেও মাদ্রাসা-ব্যবস্থা জোরদার হয় এবং আওয়ামী সরকার মাদ্রাসা-ব্যবস্থার প্রতি সমর্থন তাদের নির্বাচনী রণকৌশলের অঙ্গীভুত করে। কিন্তু বিএনপির জোটের শেষ পাঁচ বছরে মাদ্রাসার যে প্রসার ও তার সহিংস পরিবর্তন ঘটে, পূর্ববর্তী যেকোনো সময়কে তা হার মানায়। ২০০১−২০০৫ সালে দেশের সাধারণ শিক্ষা খাতে বৃদ্ধি যেখানে ৯ দশমিক ৭৪ শতাংশ, সেখানে মাদ্রাসা খাতের সম্প্রসারণ দাঁড়ায় ২২ দশমিক ২২ শতাংশ। একই সময়ে সাধারণ শিক্ষা খাতে মোট শিক্ষার্থীর পরিমাণ বৃদ্ধি পায় ৩৩ শতাংশ, কিন্তু মাদ্রাসা ছাত্রদের সংখ্যা বৃদ্ধি পায় ৫৮ শতাংশ।
মাদ্রাসাগুলো, বিশেষ করে বেসরকারি কওমি মাদ্রাসার অনেকাংশ যে সন্ত্রাসী তৎপরতার সঙ্গে জড়িত, সে কথা পত্র-পত্রিকায় নানা সময়ে লেখা হলেও তার অকাট্য প্রমাণ মেলেনি। সে প্রমাণ মিলল ১৭ আগস্ট ২০০৫ সালে দেশজুড়ে সন্ত্রাসী বোমাবাজির পর। নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে আটক অনেক সন্ত্রাসীই পরে স্বীকার করেছে, তারা বিভিন্ন মাদ্রাসাকে প্রশিক্ষণ ও সদস্য সংগ্রহের কাজে ব্যবহার করেছে। ‘আহলে হাদিস আন্দোলন বাংলাদেশ’ ও ‘মাহাদুত তারবিয়ালতিল ইসলামিয়া মাদ্রাসা’ এই কাজে অগ্রণী ভুমিকা পালন করে। গোয়েন্দা সুত্রের তথ্য উদ্ধৃত করে আলী রীয়াজ জানিয়েছেন, সরকারিভাবে এ পর্যন্ত ২৩৩টি মাদ্রাসা চিহ্নিত করা হয়েছে, যেখানে সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো।
বিএনপির আমলে ২০০১−২০০৬-এর ভেতর সহিংস ইসলামপন্থীদের তৎপরতা যে আশ্চর্য রকম বেড়ে যায়, তার প্রধান কারণ সরকারের ভেতরেই ইসলামপন্থী নীতিনির্ধারকের ভুমিকা গ্রহণ করে। এই নীতিনির্ধারকেরা বাংলাদেশে ইসলামি সন্ত্রাসের অস্তিত্ব এক কথায় কেবল নাকচই করে দেননি, অনেক ক্ষেত্রে সন্ত্রাসীদের সহযোগী হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করেন। আলী রীয়াজ সে ধরনের বেশ কিছু প্রামাণিক উদাহরণ দিয়েছেন। হারকাতুল জিহাদ নামে যে সংগঠনটি পরে সন্ত্রাসী হিসেবে আন্তর্জাতিক কালো তালিকাভুক্ত হয়, তার অন্যতম নেতা আতাউর রহমান খান−যিনি বিন লাদেন বাহিনীর সদস্য হিসেবে আফগান-যুদ্ধে অংশ নেন−১৯৯১ সালে বিএনপির সদস্য হিসেবে আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হন। মুফতি শহিদুল ইসলাম, যিনি ১৯৯৮ সালে বিন লাদেনের সঙ্গে বৈঠক করেন বলে নিজেই স্বীকার করেছেন, ২০০১ সালে বিএনপির সমর্থিত ইসলামী ঐক্যজোটের ব্যানারে আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হন। কুখ্যাত বাংলা ভাইয়ের ‘জাগ্রত মুসলিম জনতা’ রাজশাহীর বাগমারায় প্রথম যে প্রকাশ্য জনসভা করে, তাতে অন্যতম বক্তা ছিলেন স্থানীয় বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। ২০০৪ সালের মে মাসে রাজশাহীতে বাংলা ভাই যখন তাঁর সন্ত্রাসী অভিযানের শীর্ষে, সে সময় রাজশাহীর বিভাগীয় পুলিশের ইনস্পেক্টর জেনারেল নুর মোহাম্মদ সাংবাদিকদের জানান, সরকারি আইন প্রয়োগকারী বাহিনী বাংলা ভাইকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজে সাহায্য করছে। ১৮ আগস্ট ২০০৬ সালে ঢাকায় ‘সচেতন ইসলামি জনতা’ এই ব্যানারে যে প্রকাশ্য জনসভা করে, তাতেও নিষিদ্ধ ‘হুজি’র একাধিক নেতা (যেমন, মুফতি শফিকুর রহমান, মৌলানা মোহাম্মদুল্লাহ) এবং চারদলীয় জোটের একাধিক নেতা (যেমন, শাইখুল হাদিস) অংশ নেন।
রাষ্ট্র নিজেই যখন সন্ত্রাসের লালন ও পালন করে, তখন সে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন না হয়ে উপায় থাকে না। বুদ্ধিজীবীদের একাংশ এ ব্যাপারে বিপদঘণ্টি বাজানোর চেষ্টা করেছে, সরকারি ঢਆা-নিনাদে তা সহজেই ঢাকা পড়ে যায়। কিন্তু থলের বেড়াল বেরোয়, যখন খোদ বাংলা ভাই সে কথা ফাঁস করে দেন। ২০০৬ সালের শেষ মাথায় আদালতের বিচারে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর তিনি সক্ষোভে বলেন, সরকারই তাঁদের ইসলামি হুকুমাত কায়েমের জন্য কাজ করতে উৎসাহিত করেছিল। এখন তারাই সে কাজের জন্য মানুষের তৈরি আইনে তাঁকে শাস্তি দিচ্ছে। তিনি প্রশ্ন করেন, ‘এ অবস্থায় এই সরকারের কি শাস্তি পাওয়া উচিত?’
সরকারের গোয়েন্দা বিভাগের ভেতরও ইসলামি জঙ্গিদের সহযোগী রয়েছে, তারাও সরাসরি বা অপ্রত্যক্ষভাবে ইসলামি জঙ্গিদের তৎপরতার সঙ্গে যুক্ত, এই দাবির সপক্ষে রীয়াজ একটি আগ্রহোদ্দীপক তথ্য দিয়েছেন। গোপন নথিপত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেছেন, ১৯৯৯ সালে এক প্রতিবেদনে গোয়েন্দা বিভাগ জানায় যে দক্ষিণ আফ্রিকাভিত্তিক ‘সারভেন্টস অব সাফারিং হিউম্যানিটি’ নামের একটি ইসলামি সাহায্য সংস্থার সঙ্গে বাংলাদেশের ইসলামি জঙ্গিদের যোগসাজশ রয়েছে, তারা সন্ত্রাসী তৎপরতার সঙ্গে যুক্ত, এই অভিযোগে ১৯৯৯ সালের ২৫ জানুয়ারি দুজন বিদেশিসহ পাঁচ সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করা হয়। কিন্তু ইসলামী ঐক্যজোটের এক নেতা, যিনি ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির সমর্থনে আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হন, তাঁর হস্তক্ষেপে তিন বাংলাদেশিকেই মুক্তি দেওয়া হয়। সন্ত্রাস ও রাজনীতির এই সহাবস্থানে তিক্ত এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা সে সময়ে তাঁর সরকারি প্রতিবেদনে লেখেন: ‘আমাদের কাছে স্পষ্ট প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও দুর্নীতির কারণে ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার যোগসাজশে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তৎপরতায় নিয়োজিত লোকদের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান অর্থহীন হয়ে পড়ছে। তাদের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় সন্ত্রাসীরা নতুন করে বলীয়ান হবে। বিদেশি শক্তিসমূহও উপলব্ধি করবে, সন্ত্রাসীদের চাপের মুখে সরকার কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থাই গ্রহণ করবে না।’
১/১১-এর পট পরিবর্তনের পর রাষ্ট্র ও ইসলামি সন্ত্রাসের এই যোগসাজশের বিষয়টি আমাদের কাছে আরও খোলামেলাভাবে ধরা পড়ে। আলী রীয়াজ অতি সম্প্রতি প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে এই দুইয়ের যে আন্তসম্পর্ক, তার একটি তাত্ত্বিক কাঠামো প্রস্তুত করেছেন। তার ওপর ন্যস্ত ভুমিকা পালনে রাষ্ট্রের ব্যর্থতাকে রীয়াজ ‘রাষ্ট্রের অনুপস্িথতি’ বলে চিহ্নিত করেছেন। ‘অনুপস্িথত রাষ্ট্র’ যখন দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর স্বার্থ তুলে ধরার বদলে শুধু একটি ক্ষুদ্র দল বা গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষা করে, তখন এক ধরনের শুন্যতার জন্ন নেয়। এই শুন্যতার সুযোগেই বাম ও ডান উভয়পক্ষের চুড়ান্তবাদী গ্রুপসমূহ চাঙা হয় এবং কাজ করার জায়গা খুঁজে নেয়। দেশের উত্তরাঞ্চল, যা সবচেয়ে অনুন্নত ও অবহেলিত অঞ্চলের অন্তর্গত, সেখানে এই দুই ধরনের চুড়ান্তবাদীরাই তাদের তৎপরতার ক্ষেত্র নির্বাচন করে। ২০০১−২০০৬ সালে যে চারদলীয় জোট ক্ষমতা গ্রহণ করে, তারা সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক বিবেচনা থেকেই ডানপন্থী গ্রুপসমূহ অর্থাৎ ইসলামি জঙ্গিদের সঙ্গে হাত মেলায়। তাদের জন্য এর পেছনে যেমন আদর্শিক চাপ ছিল, তেমনি ছিল নির্বাচনী রণকৌশলগত বিবেচনা।
তাঁর প্রথম গ্রন্েথ রীয়াজ বাংলাদেশে ইসলামবাদের উত্থানকে প্রধানত একটি ‘বাংলাদেশি ঘটনা’ বলে প্রমাণে আগ্রহী ছিলেন। এই গ্রন্েথ তিনি সে বিশ্লেষণ কিছুটা বদলে নিয়েছেন। বাংলাদেশে ইসলামি জঙ্গিবাদের উত্থানের পেছনে মধ্যপ্রাচ্য থেকে ওয়াহাবি ইসলাম রপ্তানি যেমন এক ধরনের ভুমিকা রেখেছে, তেমনি পরিবর্তিত ভু-রাজনৈতিক বাস্তবতাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে উপমহাদেশের দেশসমূহের ঐতিহ্যিক বৈরিতা ও প্রভাব-বলয় নির্মাণের প্রতিযোগিতা। এই প্রতিযোগিতায় ভারত ও পাকিস্তানের ‘স্যাটেলাইট’ হিসেবে ব্যবহূত হয়েছে বাংলাদেশ। রীয়াজ ভারত ও পাকিস্তান একে অপরের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি প্রভাবিত করার লক্ষ্যে কীভাবে বাংলাদেশ, বিশেষ করে তার সহিংস দলসমূহকে ব্যবহার করেছে, তার তথ্যপূর্ণ বিবরণ দিয়েছেন। বিদেশি অর্থ, বিশেষত মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন এনজিওর মাধ্যমে পাঠানো অর্থ, কীভাবে সন্ত্রাসীকাজে ব্যবহূত হয়েছে, সে কথাও তিনি জানিয়েছেন। তাঁর হিসাবে, ২০০৬ সাল নাগাদ বাংলাদেশে ৩৪টির মতো ইসলামি এনজিও তৎপর ছিল, যাদের মাধ্যমে সেখানে বছরে ২০০ কোটি টাকার হাতবদল হয়। বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিরাও জেনে বা না জেনে অর্থ প্রদানের মাধ্যমে সন্ত্রাসী কাজে মদদ দিয়েছে।
ইসলামি সন্ত্রাসীরা তাদের প্রয়োজনে ‘পপুলার কালচার’, যেমন সংগীত ও নাটককে ব্যবহার করে থাকে, মৌলবাদী উত্থানের সম্পুরক কারণ হিসেবে সম্পুর্ণ নতুন এই দিকটির প্রতি আলী রীয়াজ তাঁর এই গ্রন্েথ আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। ওয়াজ-মাহফিলের মাধ্যমে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ও অন্যরা ধর্মের নামে সহিংসতার পক্ষে উসকানি দিয়েছেন, তা কোনো গোপন কথা নয়। টেপ ও সিডিতে তাঁর ভাষণ দেশের ভেতর যেমন, দেশের বাইরেও এন্তার মেলে। আটককৃত একাধিক সন্ত্রাসী স্বীকার করেছেন, সাঈদীর ভাষণ শুনেই তাঁরা অনুপ্রাণিত হয়েছেন (যেমন, চট্টগ্রামের জেএমবির নেতা জাবেদ ইকবাল)। ইসলামি মৌলবাদীদের আয়োজিত ওয়াজ-মাহফিলের পর সহিংসতা ঘটেছে, এমন ঘটনাও অজ্ঞাত নয়। যেমন, ব্র্যাক অফিস জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে, গ্রামীণ ব্যাংক আক্রান্ত হয়েছে। নব্বইয়ের গোড়া থেকেই এসব ঘটনা ঘটেছে, কিন্তু বাংলাদেশে আমরা কখনোই খুব গুরুত্বের সঙ্গে দুয়ে দুয়ে চার মিলিয়ে দেখিনি। এর সঙ্গে যে জঙ্গিবাদ যুক্ত, তাও ভেবে দেখিনি।
ইসলামি সংগঠনগুলো তাদের উগ্র ধর্মীয় মতাদর্শ প্রচারে কীভাবে সংগীতের ব্যবহার করে থাকে, আলী রীয়াজ তার প্রতিও আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। এ ব্যাপারে অগ্রণী ভুমিকা পালন করেছে ইসলামী ছাত্র শিবিরের সাংস্কৃতিক অঙ্গসংগঠন সাইমুম শিল্পীগোষ্ঠী। তাদের নেতৃত্বে ২০টি ইসলামি সাংস্কৃতিক দল নিয়ে যে জাতীয় সাংস্কৃতিক জোট গঠিত হয় ২০০৫ সালের ২৩ আগস্ট, তারা প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে একটি ‘ইসলামিক কনসার্ট’-এর আয়োজন করে। কনসার্ট শব্দটি বিজাতীয়, অনৈসলামিক, তা সত্ত্বেও এর ব্যবহার থেকে স্পষ্ট তরুণ ও যুবকদের আকর্ষিত করাই এই ‘সাংস্কৃতিক’ আক্রমণের লক্ষ্য। আলী রীয়াজ রণাঙ্গন শিল্পীগোষ্ঠী নামের আরেক ইসলামি দলের কথাও জানিয়েছেন। এই দল শুধু ২০০৪ সালেই ২০টি ইসলামি গানের সিডি প্রকাশ করে। তালিবান নামে যে অ্যালবাম তারা প্রকাশ করে, তার ভুমিকা হিসেবে এই ভাষ্যটি রয়েছে (আমি রীয়াজের উদ্ধৃত ইংরেজি থেকে বাংলায় রূপান্তর করছি): ‘ওসামা বিন লাদেন বিশ শতকের এক মহান মুজাহিদের নাম। আমেরিকা তাঁর নামে কেঁপে ওঠে। আজ সমগ্র বিশ্বে ওসামা বিন লাদেন বীরের সম্মানে ভুষিত। আমেরিকাকে টুকরো টুকরো করে ফেলতে হলে আমাদের দরকার ওসামা। ওসামা, মুসলিম বিশ্বের তুমি নেতা, সারা বিশ্বের মুজাহিদিনদের কাছে তুমি সবচেয়ে প্রিয়। তুমিই আমাদের জিহাদের অগ্রনায়ক।’
আলী রীয়াজের বক্তব্য অনুসারে, বাংলাদেশে ইসলামি সন্ত্রাসবাদ ঠেকাতে হলে একটা প্রধান কাজ হবে সন্ত্রাসী কারা তা চিহ্নিত করা এবং তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ। ইসলামবাদীদের দাবি উদ্ধৃত করে তিনি বলেছেন, বাংলাদেশে ইসলামি সন্ত্রাসীর মোট সংখ্যা ১০ থেকে ১৫ হাজার হবে। ‘আফগান মুজাহিদ’ শুধু এমন সন্ত্রাসীর সংখ্যাই তাঁর হিসাবমতে, দুই হাজার ৮০০। নির্ঘণ্ট হিসেবে আলী রীয়াজ বাংলাদেশের প্রধান ইসলামি জঙ্গি দল ও তাদের প্রধান নেতাদের একটি তালিকা ও বিবরণ সংযুক্ত করেছেন। সন্ত্রাসীদের নেটওয়ার্ক ও তাদের অর্থ ও অস্ত্রের উৎস খুঁজে বের করা ও উৎস নির্মুল করা তাঁর বিবেচনায়, বাংলাদেশের নিজের স্বার্থে অগ্রাধিকারের সঙ্গে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। তিনি শিক্ষা সংস্কারের পাশাপাশি দেশের দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারের ওপরও জোর দিয়েছেন। তাঁর প্রস্তাব, সন্ত্রাসীদের ঠেকাতে হলে বাংলাদেশের মানুষ ও সরকারকে একযোগে কাজ করতে হবে। এই কাজটা সবার, কোনো এক দলের বা গ্রুপের নয়, সে কথা তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন।

২.
আলী রীয়াজের এই গ্রন্থটি আমার বিবেচনায় বাংলাদেশে ইসলামি জঙ্গিবাদের ওপর লেখা এ যাবৎকালের মধ্যে সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ বই। এখানে তিনি কেবল জঙ্গিবাদ নামের অসুখের লক্ষণ ও গতি-প্রকৃতি চিহ্নিত করেননি, কীভাবে সে রোগের নিরাময় সম্ভব তার প্রতিও আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন। তাঁর বিবেচনায়, যে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে বাংলাদেশের লালন, সেখানে ধর্মের নামে সহিংসতার কোনো স্থান কোনো কালেই ছিল না। রাষ্ট্রের মদদ ছাড়া এই জঙ্গিবাদের উত্থান সেখানে অসম্ভব ছিল।
ক্ষীণদৃষ্টি রাজনীতিক তাঁদের আশু স্বার্থ উদ্ধার করতে সাধ করে এই সর্বনাশ ডেকে এনেছেন, রীয়াজের এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে আমি একমত, কিন্তু এই অপরাধে আমি শুধু রাজনীতিককে একা দায়ী করতে রাজি নই। আমরা সবাই কমবেশি সে অপরাধে অপরাধী। ইসলামিবাদের প্রধান বহির্লক্ষণ সন্ত্রাস হতে পারে, কিন্তু বাংলাদেশে জঙ্গিদের হাতে বোমাবাজি একমাত্র সমস্যা নয়, এমনকি তা প্রধান সমস্যাও নয়। বোমাবাজির যে সমস্যা, তা আইনশৃঙ্খলার সঙ্গে জড়িত। দেশের আইন ও বিচার বিভাগ চাইলে সে সমস্যা নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে। কোনো কোনো জঙ্গির বিচার ও ফাঁসির ভেতর দিয়ে সে কথার প্রমাণও মিলেছে। কিন্তু বাংলাদেশে ধর্মীয় প্রশ্নে যে অসহিষ্ণুতা ক্রমেই জন্ন নিচ্ছে ও প্রসারিত হচ্ছে, সহিংস ও জঙ্গি সংস্কৃতির সেটিই প্রধান আশ্রয়স্থল। তাদের নিজস্ব ধর্মীয় প্রেসক্রিপশনে ধরা না পড়লে যেকোনো ধরনের সাংস্কৃতিক কাজকেই অনৈসলামিক বলে ইসলামি জঙ্গিরা তার ওপর চড়াও হচ্ছে। তারা যা দাবি করছে, অল্প-স্বল্প প্রতিবাদের পর আমরাও তা মেনে নিচ্ছি। আর একবার যা মেনে নেওয়া হচ্ছে, তাই ‘নর্ম’ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
এর একটা প্রধান কারণ, দেশের মূলধারাভুক্ত দলসমূহ প্রায় বিনা বাক্য ব্যয়ে মৌলবাদী রাজনীতি ও সংস্কৃতির এজেন্ডা নিজেদের এজেন্ডা বলে তার আত্তীকরণ করে ফেলেছে। ফলে মৌলবাদী সংস্কৃতি দেশের প্রধান সংস্কৃতিতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সংখ্যালঘুদের প্রতি অব্যাহত আক্রমণ ও মেয়েদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণের ভেতর এই সংস্কৃতির প্রকাশ এখনো ঘটছে হরহামেশা। মধ্যরাতে শহরের রাস্তায় মেয়েরা আক্রান্ত হলে সব দোষ মেয়েদের, এ কথা বলতে সমাজের দায়িত্বসম্পন্ন লোকেরাও দ্বিধা করেন না। আহমদিয়াদের বিরুদ্ধে ‘কাফন মিছিল’ খুব পুরোনো কোনো ঘটনা নয়। পত্রিকার পাতায় নিরীহ কার্টুনকে উপলক্ষ করে সেকুলার তথ্য-মাধ্যমের ওপর আক্রমণ হচ্ছে প্রকাশ্যে, কার্যত প্রশাসনিক সমর্থনে। আমাদের দৃষ্টির গোচরে বাংলা ভাষার ওপরও আক্রমণ চলছে। ব্রাਜ਼ণ্যবাদের বিরুদ্ধে জাগরণ বলে কেউ কেউ বাংলা ভাষার ইসলামিকরণের বস্তাপচা যুক্তি এখনো তুলে ধরছেন। এর কোনোটাই তুচ্ছ বলে অগ্রাহ্য করার উপায় নেই।
ইসলামি জঙ্গিদের ঠেকাতে হলে তাই প্রতিরোধটা হতে হবে দুমুখো। একদিকে তা হতে হবে রাজনৈতিক, অন্য দিকে সাংস্কৃতিক। সংস্কৃতি বরাবরই বাঙালিদের রাজনৈতিক অধিকার অর্জনে হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছে। ’৫২ থেকে ’৭১−এই দীর্ঘ সময়ের সব পর্যায়েই আমাদের সামগ্রিক আন্দোলনে অবিভাজ্য উপাদান হয়ে থেকেছে সংস্কৃতি। এখন আবার প্রয়োজন সেই হাতিয়ারকে সামনে আনা, তাকে ছাতার মতো তুলে ধরা। বাঙালিদের নিজস্ব সংস্কৃতি যত প্রবল ও ব্যাপকভাবে আমাদের দৈনন্দিন সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার অবিভাজ্য উপাদানে পরিণত হবে, জঙ্গিদের প্রভাব তত হ্রাস পাবে। ক্লাসে হিজাব পরে আসার দাবি জানান বিশ্ববিদ্যালয়ের যে শিক্ষক, বাহবা পাওয়ার বদলে তিনি তাহলে ধিਆারের সম্মুখীন হবেন। জঙ্গিদের বিরুদ্ধে সেটিই হবে প্রকৃত বিজয়।
সংস্কৃতির মতো রাজনীতিতেও জঙ্গিদের অনুপ্রবেশ ঘটেছে ধীরে ধীরে। গুটি গুটি পায়ে ঢুকে এখন তারা কার্যত রাজনীতির একটি প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে। প্রথমে বিরোধী রাজনীতির ছত্রচ্ছায়ায় এবং পরে সরকারের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় জঙ্গিরা রাজনৈতিক ‘লেজিটিমেসি’ও অর্জন করেছে। তাদের এখন আর অবৈধ বা বে-আইনি বলে বাতিল করা যাবে না। এসব দলের বিরুদ্ধে একাত্তরের কথা বলে যত গালই দিই না কেন, আজকের বাংলাদেশে তাদের রাজনৈতিকভাবে মার্জিনাল ভাবাও মোটেই বুদ্ধিমানের কাজ নয়। নির্বাচনের ভেতর দিয়ে দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অন্তর্ভুক্ত হয়েছে তারা। ঠিক সে কারণে এসব দলকে ‘মডারেট ইসলামিক পার্টি’ বলে স্বীকৃতিও দিয়েছে আমাদের কোনো কোনো বিদেশি অভিভাবক। এখন তাদের ঠেকানোর একমাত্র উপায় হলো, এসব দলকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করে তাদের সেই লেজিটিমেসিটুকু ছিনিয়ে আনা। আমি জামায়াত বা ইসলামি দলগুলো নিষিদ্ধ হোক সে দাবি তুলছি না, কিন্তু মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলো মৌলবাদ প্রতিহত করার লক্ষ্যে যদি ন্যুনতম একটি কর্মসুচিতে একমত হয়, তাহলে জামায়াত-জাতীয় দলগুলোকে একঘরে করা কঠিন নয়।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে যাঁরা ভাবেন, এমন সবাইকে সে দাবিটি তুলতে হবে, জোরে, আরও জোরে।
ইসলামিস্ট মিলিট্যানসি ইন বাংলাদেশ−আলী রীয়াজ, রুটলেজ, নিউইয়র্ক ২০০৮
নিউইয়র্ক, ২ জুলাই ২০০৮

প্রথম আলো, ২২ আগস্ট, ২০০৮

Permalink

আজ রক্তাক্ত ২১ আগস্ট


২০০৪ সালের ২১ আগস্টের বিকেল। বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের সামনে সমবেত হাজার হাজার মানুষ। খোলা ট্রাকের ওপর দাঁড়িয়ে বক্তৃতা করছেন দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনা। তাঁর বক্তৃতা শেষ হওয়ার পরপরই শুরু হবে সন্ত্রাসবিরোধী শোভাযাত্রা।
ঘড়ির কাঁটায় ঠিক পাঁচটা ২২ মিনিট। “জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু” বলে বক্তৃতা শেষ করে শেখ হাসিনা হাতে থাকা একটি কাগজ ভাঁজ করতে করতে এগোতে থাকলেন মঞ্চের সিঁড়ির দিকে। মুহুর্তেই বিকট শব্দে বিস্কোরিত হতে লাগল একের পর এক গ্রেনেড। আর জীবন্ত বঙ্গবন্ধু এভিনিউ মুহুর্তেই পরিণত হলো মৃত্যুপুরীতে।
আজ সেই বিভীষিকাময় একুশে আগস্ট। আওয়ামী লীগের সমাবেশে মর্মান্তিক গ্রেনেড হামলার চতুর্থ বার্ষিকী। এ হামলায় শেখ হাসিনা অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা পান। দলের কেন্দ্রীয় মহিলাবিষয়ক সম্পাদক আইভি রহমানসহ নিহত হন দলের ২২ জন নেতা-কর্মী। তবে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে এ ঘটনায় ২৪ জন নিহত হন বলে দাবি করা হয়। আর আহত হন দলের অধিকাংশ জ্যেষ্ঠ নেতাসহ পাঁচ শতাধিক নেতা-কর্মী। আইভি রহমানের স্বামী আওয়ামী লীগের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জিল্লুর রহমানও এ ঘটনায় আহত হন।
দেশে জরুরি অবস্থা থাকায় আজ সীমিত পরিসরে ২১ আগস্ট পালন করতে হচ্ছে। তবে গ্রেনেড হামলার সময় বিকেল পাঁচটা ২২ মিনিটে ঘটনাস্থলে এবার কর্মসুচি থাকছে। দীর্ঘ ১১ মাস কারাভোগের পর আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা সরকারি নির্বাহী আদেশে মুক্তি পান। বর্তমানে তিনি কানাডায় অবস্থান করছেন।
বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়ে এই নারকীয় ঘটনার কোনো সুষ্ঠু তদন্ত হয়নি। তদন্তের নামে এ ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে এ ঘটনা পুনরায় তদন্ত করে ২২ জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়।
যাঁরা নিহত হন: আইভি রহমান, শেখ হাসিনার দেহরক্ষী ল্যান্স করপোরাল (অব.) মাহবুবুর রহমান, হাসিনা মমতাজ, রিজিয়া বেগম, রফিকুল ইসলাম (আদা চাচা), রতন শিকদার, মোহাম্মদ হানিফ ওরফে মুক্তিযোদ্ধা হানিফ, মোশতাক আহমেদ সেন্টু, লিটন মুনশি ওরফে লিটু, আবদুল কুদ্দুছ পাটোয়ারী, বিল্লাল হোসেন, আব্বাছ উদ্দিন শিকদার, আতিক সরকার, মামুন মৃধা, নাসিরউদ্দিন, আবুল কাসেম, আবুল কালাম আজাদ, আবদুর রহিম, আমিনুল ইসলাম, জাহেদ আলী, মোতালেব ও সুফিয়া বেগম।
জিল্লুর রহমানের বাণী: দলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জিল্লুর রহমান এ উপলক্ষে দেওয়া বাণীতে সুষ্ঠু তদন্ত না করার জন্য বিএনপি-জামায়াত জোটকে দায়ী করেন। তবে নতুন করে তদন্ত করার জন্য তিনি বর্তমান সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। তিনি বলেন, সরকার এ ঘটনার অনেক রহস্য উন্েনাচন করেছে। তিনি ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তির ব্যবস্থা করতে সরকারের কাছে দাবি জানান।
কর্মসুচি: আওয়ামী লীগের কর্মসুচির মধ্যে রয়েছে আজ বিকেল পাঁচটা ২২ মিনিটে বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের দলীয় কার্যালয়ের সামনে ঘটনাস্থলে দুই মিনিট দাঁড়িয়ে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো এবং শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন। পাঁচটা ২৬ মিনিটে প্রতিবাদ সমাবেশ। প্রতীকীভাবে এ কর্মসুচি সারা দেশে পালিত হবে।

খবর: প্রথম আলো। ছবি: সমকাল

Permalink

জঙ্গি সংগঠনগুলোর নতুন তৎপরতা

গোয়েন্দা সংস্থার কঠোর নজরদারি দরকার

তিন বছর আগে দেশের ৬৩টি জেলায় একযোগে বোমা হামলার পর জঙ্গিদের সশস্ত্র তৎপরতা রোধে কঠোর আইন প্রয়োগের যে প্রত্যাশা ছিল, তা অনেকাংশে পূরণ হয়নি। সেই ভয়াবহ বোমা হামলার পর সারা দেশে যে ১৬৯টি মামলা দায়ের করা হয়, তার মধ্যে মাত্র ৩৭টি মামলার বিচার শেষ হয়েছে। বাকি ১৩২টি মামলার অধিকাংশই বিচারাধীন; কিছু মামলার তদন্ত শেষই হয়নি। তিক্ত বাস্তবতা হলো, পাঁচটি মামলার রায়ে অভিযুক্ত সব আসামি খালাস পেয়েছে। যেখানে সরকার থেকে শুরু করে দেশের সব মানুষ একবাক্যে জঙ্গি তৎপরতার বিরুদ্ধে একজোট, সেখানে তিন বছরেও অধিকাংশ মামলার নিষ্কপত্তি না হওয়া, মামলার তদন্ত শেষ না হওয়া, অভিযুক্তদের অনেকের বেকসুর খালাস প্রভৃতি ঘটনা প্রমাণ করে যে এ ব্যাপারে সরকারের উদ্যোগে ঘাটতি রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সুত্রের খবরে জানা গেছে, জেএমবির শীর্ষ নেতা শায়খ আবদুর রহমান, সিদ্দিকুল ইসলাম বাংলা ভাইসহ ছয় জঙ্গিনেতার ফাঁসির পর বোমা হামলাসংক্রান্ত মামলাগুলোর বিচার-প্রক্রিয়ায় শিথিলতা এসেছে। এটা কাম্য নয়। জঙ্গি তৎপরতার বিরুদ্ধে আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণে শিথিলতার কোনো সুযোগ নেই। এসব ক্ষেত্রে নির্লিপ্ত মনোভাব মানে জঙ্গিবাদীদের উৎসাহিত করা। বাস্তবে তা-ই হয়েছে। এরই মধ্যে জঙ্গিদের সংগঠিত হওয়ার খবর আসছে। সম্প্রতি গ্রেপ্তার হওয়ার পর একজন জঙ্গিনেতার বক্তব্যে এর সত্যতা পাওয়া গেছে। জানা গেছে, জেএমবি নতুন উদ্যোগ নিতে শুরু করেছে। ইতিমধ্যে তারা কয়েকটি বৈঠক করেছে।
এখন থেকে সরকারপক্ষকে সতর্ক হতে হবে। মামলার তদন্তে যেন কোনো ফাঁক না থাকে তা নিশ্চিত করা দরকার। দেখা গেছে, একজনকে একাধিক মামলায় প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী করা হয়। এতে মামলা দুর্বল হয়ে যায়, আসামির সাজা নিশ্চিত করা যায় না। এসব ব্যাপারে সরকারের নিস্পৃহ থাকার কোনো উপায় নেই। মামলার দ্রুত নিষ্কপত্তিতেও সরকারপক্ষকে উদ্যোগী হতে হবে। অনেক সময় সাক্ষী হাজির না হওয়ার কারণে মামলা পিছিয়ে যায়। অথচ বেশির ভাগ মামলায় সাক্ষী হচ্ছেন পুলিশ বা সরকারি কর্মকর্তা। তাঁরা যদি মামলায় হাজির না থাকেন তাহলে চলবে কেন? কারাগারে আটক আসামিকে সময়মতো আদালতে হাজির না করানোর কারণেও অনেক মামলায় বিচারকাজ বিলম্বিত হচ্ছে। এদিকে সরকারকে মনোযোগী হতে হবে। অন্যদিকে আটক অভিযুক্তরা কারাগারের ভেতর থেকে বাইরের জঙ্গিদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে, সে ব্যাপারেও প্রয়োজনীয় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। কারাগারের ভেতর অভিযুক্ত জঙ্গিদের আলাদা সেলে রাখা ও তাদের গতিবিধির ওপর নজর রাখা একান্ত দরকার। কারাগারের ভেতর যেন তারা অন্যদের জঙ্গি-প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ করতে না পারে, সে জন্য সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার।

জঙ্গিরা যেন নতুনভাবে সংগঠিত হতে না পারে সে জন্য একদিকে যেমন গোয়েন্দা নজরদারি বাড়াতে হবে, অন্যদিকে তেমনি তারা যেন নিরীহ তরুণদের ধর্মের নামে উগ্রতার দিকে নিয়ে যেতে না পারে, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে এ কাজে ব্যবহার করতে না পারে, সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় উদ্যোগও নিতে হবে। এ জন্য উদার দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন প্রকৃত ধর্মীয় নেতাদের ব্যাপক প্রচার একটি অন্যতম উপায়। গণতান্ত্রিক, দায়িত্বশীল নাগরিক সমাজের সোচ্চার ভুমিকাও এ ক্ষেত্রে অপরিহার্য। দেশে ধর্মীয়-সহিষ্ণুতা সমুন্নত রাখার জন্য সরকারকে এ ধরনের বহুমুখী উদ্যোগ নিতে হবে।

প্রথম আলো, ১৮ আগস্ট ২০০৮

Permalink

ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর ভেলকিবাজি

বদরুদ্দীন উমর

বাংলাদেশে ইসলামী মৌলবাদী নামে পরিচিত জামায়াতে ইসলামী সংগঠন ও এর নেতাদের সঙ্গে আফগানিস্তানের তালেবান ও মধ্যপ্রাচ্যের ইসলামী মৌলবাদীদের একটা বড় পার্থক্য এই যে, শোষোক্তরা ধর্মীয় মৌলবাদী হিসেবে প্রতিক্রিয়াশীল হলেও তারা একটা দৃঢ় আদর্শগত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে এবং এদিক দিয়ে তারা সৎ। কিন্তু বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামী এবং এদের মতো ধর্মীয় সংগঠনগুলোর সেরকম কোন দৃঢ় আদর্শ নেই। ঘোষিত আদর্শ অবশ্যই আছে, কিন্তু বাস্তবত সেরকম কিছু নেই। এরা সুবিধাবাদী এবং সে কারণে এদের দ্বারা অনেক কিছুই সম্ভব এবং অনেক কিছুই হয়ে থাকে যার ফলে বোঝা যায় যে, এরা সুবিধাবাদী এবং অসৎ। নিজেদের স্বার্থের কারণে এরা এমন সব কাজ করে থাকে যার সঙ্গে এদের ঘোষিত আদর্শগত অবস্থানের সম্পর্ক সামান্য অথবা নেই বললেই চলে।


এরা মিথ্যাবাদী। এদের মিথ্যাবাদিতা ও প্রতারক চরিত্র এরা নিজেরাই জনগণের কাছে এখন তুলে ধরছে ভাষা আন্দোলন এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় এদের নিজেদের ভূমিকা নিয়ে যে প্রচারণা এরা শুরু করেছে তার মধ্যে। বিষয়টি চরিত্রের দিক দিয়ে এত কদর্য যে এর উল্লেখ করা এক বড় সামাজিক ও রাজনৈতিক দায়িত্ব।
নব্বই দশকের প্রথমদিকে যখন যুদ্ধাপরাধী হিসেবে গোলাম আযমের শাস্তির দাবিতে জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে আন্দোলন চলছিল, তখন ঢাকার দেয়ালে দেয়ালে গোলাম আযমকে ‘ভাষাসৈনিক’ হিসেবে আখ্যায়িত করে চিকা মারা হয়েছিল। সে সময় আমরা এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে এর মিথ্যা চরিত্র জনগণের কাছে তুলে ধরেছিলাম। আমরা বলেছিলাম, শুধু ইসলামের নাম নিয়ে এখন নিজেদের রাজনৈতিকভাবে রক্ষা করা সম্ভব না হওয়ার কারণে তারা ভাষা আন্দোলনের মতো একটি গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ আন্দোলনে তাদের নিজেদের সম্পর্ক জাহির করে বাঁচার চেষ্টা করছে।


এ কাজ তারা এখন আবার নতুন করে শুরু করেছে। সম্প্রতি তারা ‘ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস’ নামে একটি ভিডিও ক্যাসেট প্রকাশ করেছে। এতে সিডির কভারে লেখা আছে ‘মাতৃভাষা বাংলা ভাষা খোদার সেরা দান’। সবকিছু ছেড়ে দিয়ে এরা এখন মাতৃভাষাকে খোদার ‘সেরা দান’ হিসেবে জনগণের কাছে উপস্থিত করার চেষ্টা করছে। এদের নেতাদের বক্তৃতায় এবং এদের সমগোত্রীর লোকদের ওয়াজের মধ্যে খোদার ‘সেরা দান’ বলে যেসব বিষয়ের উল্লেখ করা হয় তার সঙ্গে বাংলা ভাষার কোন সম্পর্ক থাকে না। এর কোন উল্লেখ করা হয় না।
যাই হোক, ক্যাসেটটিতে ভাষা আন্দোলনের ওপর কিছু কথাবার্তা থাকলেও বিশেষভাবে লক্ষণীয় হল জামায়াতে ইসলামীর নেতা গোলাম আযমের দু’দফা সাক্ষাৎকার, যাতে তিনি নিজেকে ভাষা আন্দোলনের একজন সক্রিয় নেতা হিসেবে জাহির করার চেষ্টা করেছেন। এই প্রচেষ্টা যে কত অসৎ ও হীন এর একটা প্রমাণ হচ্ছে, এ ক্যাসেট তৈরির সময় তথ্য সহায়তা যারা করেছেন তাদের মধ্যে আমার নাম উল্লেখ। এ কাজ করার উদ্দেশ্য যে এই প্রতারণাপূর্ণ ব্যাপারটির প্রামাণ্যতা নিশ্চিত করা এতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু আমার তথ্য সরবরাহ করার বিষয়টি সর্বৈব মিথ্যা ছাড়া আর কিছুই নয়। এক বন্ধু ক্যাসেটটি দেখার জন্য আমাকে দেয়ার আগে এ বিষয়ে আমি কিছুই জানতাম না। ভাষা আন্দোলনে গোলাম আযমের ভূমিকা সম্পর্কে প্রচার কাজে আমি তথ্য দিয়ে জামায়াতে ইসলামীকে সহায়তা করেছি এটা প্রচার করা থেকে বড় ধৃষ্টতা আর কি হতে পারে? কতখানি নৈতিক অধঃপতন ঘটলে এ কাজ কোন ব্যক্তির পক্ষে সম্ভব, সেটা বলাই বাহুল্য।


আমি আমার ভাষা আন্দোলনের বইটির প্রথম খণ্ডে একবারই মাত্র গোলাম আযমের উল্লেখ করেছি। ১৯৪৮ সালের নভেম্বর মাসে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান পূর্ব পাকিস্তান সফরে আসেন। ২৭ নভেম্বর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের এক সমাবেশে ভাষণ দেন। সেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ইউনিয়নের পক্ষ থেকে তাকে একটি মানপত্র দিয়ে তাতে বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানানো হয়। এ মানপত্রটি পাঠ করেন ইউনিয়নের তৎকালীন সেক্রেটারি গোলাম আযম। আসলে এটি পাঠ করার কথা ছিল ইউনিয়নের ভাইস প্রেসিডেন্ট অরবিন্দ বোসের। কিন্তু লিয়াকত আলীকে ভাষা আন্দোলনের দাবি সংবলিত মানপত্র পাঠ একজন হিন্দু ছাত্রকে দিয়ে করালে তার মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হবে এবং মুসলিম লীগ সরকার এ নিয়ে নানা প্রকার বিরূপ প্রচার শুরু করবেÑ এ আশংকা থেকেই একজন মুসলমান ছাত্র হিসেবে সেক্রেটারি গোলাম আযমকে সেটা পাঠ করতে দেয়া হয়েছিল। এই হল ভাষা আন্দোলনে গোলাম আযমের ‘বিরাট’ ভূমিকা। যাই হোক, এ বিষয়টি আমি আমার ভাষা আন্দোলনের ওপর লেখা বইটিতে স্বাভাবিকভাবেই উল্লেখ করেছি। বইটি থেকে অন্যান্য তথ্যের মতো এ তথ্যও যে কোন লোক ব্যবহার করতে পারে। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, আমি গোলাম আযমকে ভাষা আন্দোলনের একজন নায়ক হিসেবে উপস্থিত করার জন্য জামায়াতে ইসলামীর এই প্রতারণাপূর্ণ প্রচেষ্টার ক্ষেত্রে কোন তথ্য সহায়তা প্রদান করেছি। মানুষ হিসেবে এদের চরিত্র কত কলুষিতÑ এই প্রতারণা তার এক প্রামাণ্য দৃষ্টান্ত।


এ তো গেল বিষয়টির একটি দিক। এর অন্যদিক হল, মহামান্য গোলাম আযম সাহেব ভাষা আন্দোলনে বীরত্বপূর্ণ ও নায়কোচিত ভূমিকা পালন করা সত্ত্বেও তাতে নিজের এই অংশগ্রহণকে সুবিধাবাদী কারণে অস্বীকার করতেও দ্বিধাবোধ করেননি। আজ নয়, পাকিস্তানি আমলে ১৯৭০ সালের জুন মাসে, পশ্চিম পাকিস্তানের শুক্কুর শহরে এক বক্তৃতা প্রসঙ্গে এই জামায়াত নেতা ‘খোদার সেরা দান’ বাংলা ভাষা ও ভাষা আন্দোলনের বিরোধিতা করতে গিয়ে বলেন, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এক মারাÍক রাজনৈতিক ভুল এবং তিনি নিজে এই আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত থাকার জন্য দুঃখিত। গোলাম আযম ভাষা আন্দোলনের বিরুদ্ধে বিষোদগার করতে গিয়ে বলেন, উর্দু হচ্ছে এমন একটা ভাষা যার মাধ্যমে ইসলামী শিক্ষার উপযুক্ত প্রচার ও প্রসার সম্ভব। কারণ ‘উর্দু পাক-ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানদের সাধারণ ভাষা এবং এতে তাদের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় সম্পদ সংরক্ষিত রয়েছে।’ নিজের ভ্রান্ত ভূমিকা সম্পর্কে খেদোক্তি করতে গিয়ে গোলাম আযম আরও বলেন, বাংলা ভাষা আন্দোলন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দৃষ্টিকোণ থেকে মোটেই সঠিক কাজ হয়নি। (দৈনিক আজাদ, ২০ জুন, ১৯৭০) শুক্কুরে দেয়া গোলাম আযমের এই বক্তৃতা পত্রিকায় প্রকাশের পর আমি আমার সম্পাদিত সাপ্তাহিক ‘গণশক্তি’ পত্রিকায় এর ওপর লিখেছিলাম। (২১.৬.১৯৭০) গোলাম আযম এসব কথা বলছিলেন এমন এক সময়ে যার অনেক আগে ভাষা আন্দোলনের দাবি অনুযায়ী ১৯৫৬ সালের পাকিস্তান সংবিধানে বাংলা অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃত হয়েছিল।


দেখা যাচ্ছে, জামায়াত নেতা গোলাম আযম সাহেবের কথাবার্তার ভেল্কিবাজি ও নৈতিক অধঃপতনের তুলনা নেই। ভাষা আন্দোলনে তার অংশগ্রহণের কাহিনী, তারপর ১৯৭০ সালে তাতে অংশগ্রহণে দুঃখ প্রকাশ ও ভাষা আন্দোলনকে বেঠিক কাজ হিসেবে আখ্যায়িত করা, ১৯৯২ সালে নিজেকে ‘ভাষাসৈনিক’ হিসেবে প্রচার করা এবং এখন আবার বাংলা ভাষাকে ‘খোদার সেরা দান’ হিসেবে গৌরবান্বিত করার জন্য মিথ্যায় পরিপূর্ণ ক্যাসেট বের করাÑ সবই হল জামায়াতে ইসলামীর জাদুর খেলা। এর সঙ্গে যে প্রকৃত ইসলামী নৈতিকতার কোন সম্পর্ক নেই একথা বলাই বাহুল্য।


শুধু ভাষা আন্দোলনই নয়, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ নিয়েও জামায়াতে ইসলামী এখন একটা জাদুর খেলা দেখাচ্ছে। ১৯৭১ সালে তারা স্বাধীনতা যুদ্ধের সম্পূর্ণ বিরোধিতা করে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর সঙ্গে নানা চক্রান্তে লিপ্ত ছিল। তারা সামরিক বাহিনীর সহায়ক শক্তি হিসেবে এমন ক্রিমিনাল কাজ নেই যা করেনি, ডিসেম্বর মাসে তারা এদেশের অনেক গুণী বুদ্ধিজীবীকে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল। সে সময়ে এদের অপকীর্তি ও গণশত্র“তার শেষ নেই। অথচ এরাই এখন মাঠে নেমেছে নিজেদের একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধের সৈনিক হিসেবে প্রমাণ করার জন্য। এ উদ্দেশ্যে এরা কিছুসংখ্যক বেইমানকে দিয়ে গঠন করেছে এক মুক্তিযোদ্ধা সংসদ।
এই সংক্ষিপ্ত লেখা শেষ করার আগে এটা অবশ্যই বলা দরকার, জামায়াতে ইসলামী এখন ‘বিশুদ্ধ ইসলামী লাইনের’ বাইরে এসে ভাষা আন্দোলন ও স্বাধীনতা আন্দোলনে নিজেদের ভূমিকা প্রমাণ করার চেষ্টার মূল কারণ, ইসলাম দিয়ে এখন আর তাদের বড় বেশি সুবিধা হচ্ছে না। এজন্য এ দেশের প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সঙ্গে নিজেদের সম্পর্ক, মিথ্যার ভিত্তিতে হলেও প্রচার করে, এরা নিজেদের পায়ের নিচে মাটি খোঁজার চেষ্টা করছে। কিন্তু যে মাটি তাদের পায়ের তলায় নেই, সেটা খোঁজ করে কোন লাভ নেই। জামায়াতে ইসলামীর মতো প্রতিক্রিয়াশীল ধর্মীয় রাজনৈতিক দলের ভবিষ্যৎ বাংলাদেশে অনেক আগেই ঐতিহাসিকভাবে নির্ধারিত হয়ে গেছে।

দৈনিক যুগান্তর । ২৭ জুলাই ২০০৮

Permalink

জামাতী পেইড ব্লগার চেনার উপায় কি?

জামাতী পেইড ব্লগার চেনার উপায় কি?
১৪ ই ডিসেম্বর, ২০০৭ সন্ধ্যা ৬:৫৬
লিখেছেন: সুশান্ত সামহোয়ার ইন ব্লগ

এই নিয়ে একটা লেখা দিয়েছিলাম , ভালো রেসপন্স পাওয়া গেছে। এখানে দেখুন:

১। সুরা-আয়াত কপি পেস্ট করে
২। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কে বা-আ-ল বলে ডাকে
৩। হাসিনা কে হাছিনা বলে
৪। ১৯৭১ রিলেটেড পোস্ট এ লুকিয়ে ১ মার্কিং করে
৫। প্রথম হল এরা বলবে অতীত ঘাটতে গেলে অনৈক্য হবে দেশে।
৬। ত্রিশ না তিন লক্ষ সেটা নিয়ে চেচাঁবে
৭। বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ।
৮। পশ্চিম দিকে মুখ করে সিজদা দেয় কারন পাকিস্তান পশ্চিমে, কাবাঘরের জন্য নয়।
৯। শেখ মুজিব আর জিয়াকে একি কাতারের নেতা বানাবে। শেখ মুজিবের স্বাধীনতা পরবর্তী ভুলকে স্বাধীনতা সংগ্রমের নেতৃত্বের চেয়ে বড় করে দেখাবে।
১০। যুদ্ধাপরাধীর বিচার চাইনা সেটা বলবেনা, বলবে বিচার চাই, কিন্তু আদালত ঠিক করবে কে যুদ্ধাপরাধী।
১১। রবীন্দ্রনাথ আর নজরুল নিয়ে প্যাঁচ লাগাবে, বলবে নজরুলের নোবেল পাওয়া উচিত ছিল। অথচ এরাই নজরুলকে মুরতাদ ঘোষণা করেছিল।
১২। গালাগালি করা হলো পৃথিবীর সবচেয়ে জঘন্যতম অপরাধ ।
১৩। ৭১ কে গন্ডগোল বলবে, অথবা সিভিল ওয়ার।
১৪ । গোআ'কে বলবে ভাষা সৈনিক।
১৫ । বংগবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা চাননি। বলবে বংগবন্ধু আরো আগে স্বাধীনতা ঘোষণা দিলে এত রক্ত ঝরতনা।
১৬ । আওয়ামীলীগাররা যুদ্ধের সময় ভারতে পালাইছিল। বলবে শেখ মুজিব পাকিস্তানিদের হাতে বন্দি ছিল, তাই সে মুক্তিযুদ্ধা না।
১৭ । জামাতের বিরুদ্ধ বললে বলবে ইসলামের বিরুদ্ধে বলতেছে।
১৮ । মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কথা বললে বলবে ভারতের দালাল।
১৯ । বাংলাদেশ-পাকিস্তান ক্রিকেট ম্যাচে পাকিস্তানকে সাপোর্ট করবে, পাকিস্তান হেরে গেলে বলবে ওরা ইচ্ছে করেই হেরেছে, অথবা বলবে জুয়ারিদের হাত ছিল।
২০। মওদুদীকে বলবে এশিয়ার সবচাইতে বড় ইসলামিক স্কলার।
২১ । মাদ্রাসা শিক্ষা বন্ধ করতে বললে বলবে মাদ্রাসা থিকায় আলোকিত(!) মানুষ বের হয়। বলবে থানায় গিয়ে খোঁজ নেন কয়জন মাদ্রাসার ছাত্রের ক্রিমিনাল রেকর্ড আছে।
২২ । সাইদীর মত বলবে আওয়ামীলীগকে ভোট দিলে ঈমান থাকবেনা।
২৩ । ইসলামের নাম দিয়ে সুদকে হালাল বানাবে।
২৪ । সাইমুম সিরিজ পড়বে, নয়াদিগন্ত থিকা রেফারেন্স দিবে।
২৫। রাজাকারের নাম জানতে চাইলেই লগ অফ করবে।
২৬। গু আযম'র ছবির পোষ্টের এগেনেষ্টে পর্ণো ছবি পুষ্টাইলে কইবে আমারে ধর্ষন করছে। তখন তারে ৭১ এর ধর্ষন সম্পক্কে জিগাইলে ১৯ বছরের নাবালিকা কইয়া সহানুভুতি পাইতে চেষ্টা করিবে। পর্ন ছবি পোষ্ট নিয়া দিনের পর দিন কানবো মাগার লক্ষ লক্ষ মা বোনের ৭১ এর ধর্ষন কে ইসলামের গনিমতের মাল বইলা চালাইবো।
২৭। বাংলা বিকৃত করে পাকি ভাষায় বলবে যেমন শয়তান না বলে দুশমন, শত্রু না বলে জালিম........
২৮। বাংলাদেশে সুশীল পর্নোগ্রাফি ধারনার প্রবর্তক শফিক রেহমআন কে অতীব পছন্দ করিবে।
২৯ । ওগো আইডিতে ফুল,আলপোনা এগুলার ছবি বেশি থাকে।
৩০ । কথায় কথায় কোরআন শরীফ থেইকা অর্ধেক লাইন উদ্ধৃত করব, পুরাটা কইব না।
৩১ । অতীত ভুলে সামনে এগিয়ে যেতে হবে ডায়লগ দেয় ।
৩২। ওসমানী কেন আত্নসমর্পন অনুষ্ঠানে ছিল না এইটা লইয়া জল ঘোলা করার চেষ্টা করবে।

কোন কিছু মিস্ হয়ে গেলে জানাবেন।

Permalink

BBC Asia-Pacific

CNN.com - Asia