কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত

bdnews24

তেহরানে উদ্ভট প্রচার

অজয় দাশগুপ্ত

১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড ছিল নারকীয়। কিন্তু জনতার প্রতিক্রিয়া কী ছিল? অভ্যুত্থানের বিষয়ে ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাস ওয়াশিংটনে ১৬ আগস্ট তার ‘প্রাথমিক মন্তব্যে’ জানিয়েছেন : ‘প্রথম ২৪ ঘণ্টার ঘটনাবলি থেকে স্পষ্ট যে অভ্যুত্থান চ্যালেঞ্জ হবে না।’ আর জনগণের প্রতিক্রিয়া কী ছিল? এ প্রসঙ্গে ইউজেন বোস্টারের মন্তব্য : ‘জনগণ মুজিবের পতনে বিশেষ কোনো আনন্দ-উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেনি। বরং তাদের মনোভাব ছিল : শান্তভাবে মেনে নেওয়া এবং সম্ভবত কিছুটা স্বস্তির প্রকাশ। যে তুলনামূলক সহজভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর হয়েছে তা থেকে এটা বলা যায়, মুজিব এবং বাঙালিরা পরস্পর থেকে দূরে সরে গিয়েছিল। বাঙালিরা মুজিবের কাছ থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে নিয়েছিল, কারণ তিনি তাদের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। ডাইন্যাস্টির মনোভাবও তার মধ্যে কাজ করেছে। অন্যদিকে মুজিব জনগণ থেকে দূরে সরে গিয়েছিলেন, কারণ তিনি বাস্তবানুগ পরামর্শ গ্রহণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছিলেন এবং নিজেকে অসীম ক্ষমতাধর শাসক ভাবতে শুরু করেছিলেন।’

[যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের ভাষ্য থেকে স্পষ্ট, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় যে পরিবর্তন সংঘটিত হয় তাতে জনগণের প্রতিক্রিয়ায় আনন্দ-উচ্ছ্বাস ছিল না। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতাসীনরা বিশেষ করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার এবং তার সহকর্মীরা যে খুশি হয়েছিল তাতে সন্দেহ নেই। অসাংবিধানিক উপায়ে রাষ্ট্রপতিকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে খন্দকার মোশতাক আহমদের রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণকে বোস্টার অভিহিত করেছিলেন ‘তুলনামূলক সহজে ক্ষমতা হস্তান্তর’ হিসেবে। তিনি মুজিবের ‘পতন’ শব্দটিও ব্যবহার করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর দেশের শাসনভার যারা গ্রহণ করেছিলেন- খন্দকার মোশতাক আহমদ ও জিয়াউর রহমানসহ, তারা বিভিন্ন সময়ে দৃঢ়তার সঙ্গেই দাবি করছিলেন, ‘মুজিবের পতনে’ বাংলাদেশের জনতা আনন্দ-উল্লাস প্রকাশ করে। এ দাবি যথার্থ ছিল না। এটা ঠিক যে হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক গণবিক্ষোভ ঘটেনি। স্বাধীন দেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতিকে পরিবারের নারী-শিশুসহ নিষ্ঠুর উপায়ে হত্যার পর যে ধরনের প্রতিক্রিয়ার বিষয়ে শগ্ধিকত ছিল যুক্তরাষ্ট্র সেটাও দেখা যায়নি। কিন্তু এ থেকে হত্যাকা- মেনে নেওয়া বোঝায় না।]

অভ্যুত্থানের ২৪ ঘণ্টা পার না হতেই ঢাকাস্থ মার্কিন রাষ্ট্রদূত ওয়াশিংটনে নিশ্চিত খবর পাঠান : ‘এ পর্যন্ত প্রাপ্ত লক্ষণ থেকে ধারণা করা যায়, নতুন সরকারের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক এমনকি মুজিবের সময়ের তুলনায় অধিকতর আন্তরিক ও বন্ধত্বপূর্ণ হবে।’

[ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে ঠিক এটাই ঘটেছিল।]

১৯ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রের ইরানি দূতাবাস ওয়াশিংটনে হেনরি কিসিঞ্জারের কাছে তেহরানের একটি দৈনিকে বাংলাদেশের অভ্যুত্থান প্রসঙ্গে একটি বার্তা প্রেরণ করে। এর কপি ঢাকায় বোস্টারের কাছেও পাঠানো হয়। এর শিরোনাম ছিল : ‘ঢাকায় দক্ষিণপন্থি অভ্যুত্থান ঘটেছিল সোভিয়েতপন্থি অভ্যুত্থানের পর।’

প্রতিবেদনে বলা হয় : “ফারসি ভাষার পত্রিকা ‘কেইহান’ ১৭ আগ¯দ্ব তাদের প্রতিবেদনে দাবি করে, ১৫ আগস্ট বাংলাদেশে প্রকৃতপক্ষে দুটি অভ্যুত্থান ঘটেছিল। একটি শুরু হয় রাত সাড়ে তিনটায়- সোভিয়েতপন্থি এ অভ্যুত্থানে শেখ মুজিব নিহত হন। এরপর সকাল সাড়ে পাঁচটায় দক্ষিণপন্থি পাল্টা অভ্যুত্থান ঘটে, যাতে বামপন্থি অভ্যুত্থানকারীদের মৃত্যু ঘটে। আমাদের ধারণা এ তথ্যের সূত্র হচ্ছে বার্তা সংস্থা এএফপি, তাদের দাবি বাংলাদেশ সরকার এ মত সমর্থন করতে প্রস্তুতি নিচ্ছে। ইরানের অন্য ফারসি ও অন্যান্য ভাষার সংবাদপত্রগুলো ঘটনার এ ধরনের ভাষ্য উল্লেখ করেনি।”

‘এ ভাষ্যে বলা হয়, মুজিব যেসব মস্কোপন্থি বামপন্থিকে মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দিয়েছিলেন তারাই কয়েক মাস ধরে অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা আঁটছিলেন। এদের মধ্যে ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ [সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রী], আবদুস সামাদ আজাদ [বঙ্গবন্ধু তাকে মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দেননি, তবে তার পরিবর্তে ড. কামাল হোসেনকে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব দিয়ে তাকে কৃষি মন্ত্রণালয় দেওয়া হয়], মোহাম্মদ সোহরাব হোসেন, কামারুজ্জামান [আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করায় তার মন্ত্রিসভায় স্থান পাওয়ার সুযোগ ছিল না। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু দল ও সরকার পরিচালনায় ভিন্ন ব্যক্তি রাখার পক্ষে বলিষ্ঠ অবস্থান নিয়েছিলেন। পঞ্চাশের দশকে পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ মন্ত্রিসভা গঠনের পরও তিনি দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। তবে ১৯৭৫ সালের ৭ জুন বাকশাল গঠনের সময় তিনি এ অবস্থান থেকে সরে আসেন- তিনি একই সঙ্গে দেশের রাষ্ট্রপতি এবং দলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন], আবদুর রব [সম্ভবত আবুদর রব সেরনিয়াবাত, তাকে মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দেওয়া হয়নি। ১৫ আগস্ট তাকে পরিবারের কয়েকজন সদস্যসহ হত্যা করা হয়], কোরবান আলী [তাকে মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দেওয়া হয়নি। তিনি দলে বামপন্থি হিসেবেও পরিচিত ছিলেন না। বরং যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ হিসেবে তাকে মনে করা হতো। আশির দশকে তিনি এইচএম এরশাদের জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়ে ডেপুটি স্পিকারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন] এবং মস্কোয় নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত শামসুল হক। মুজিবের দু’জন কাজিন শহীদ ও মনির বামপন্থিদের সঙ্গে সহযোগিতা করেন। [প্রকৃতপক্ষে ভাগ্নে, মনির নয়, শেখ ফজলুল হক মনিকে বোঝানো হয়েছে। তিনি বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ ছিলেন। কিন্তু তাকে কেউই বামপন্থি মনে করত না। তাজউদ্দীন আহমদের বিরুদ্ধে তার অবস্থানও সুবিদিত। শেখ শহীদুল ইসলাম ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সময় তিনি ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্রলীগের সমন্বয়ে গঠিত একক ছাত্র সংগঠন জাতীয় ছাত্রলীগের সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর কোনো প্রতিবাদী আন্দোলন গড়ে তোলায় উদ্যোগী হননি। আশির দশকে তিনি সামরিক শাসক এইচএম এরশাদের মন্ত্রিসভায় যোগ দেন।] তেহরানের পত্রিকাটির দাবি : ‘সাবেক উপরাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামও বামপন্থিদের সঙ্গে ছিলেন। বামপন্থি এ গ্রুপের শঙ্কা ছিল, মুজিব পাশ্চাতের দিকে ঝুঁকে পড়বেন। দক্ষিণপন্থিরাও আগস্টের শেষদিকে একটি অভ্যুত্থান সংগঠনের পরিকল্পনা করছিলেন। কিন্তু তাদের লক্ষ্য ছিল শেখ মুজিবকে প্রতীকী ক্ষমতায় রেখেই এগিয়ে যাওয়া। খন্দকার মোশতাক ছাড়াও তাদের সঙ্গে আরো ছিলেন ট্রেড ইউনিয়ন নেতা আবদুল মান্নান [শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক], আবু সাঈদ চৌধুরী [সাবেক রাষ্ট্রপতি- ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করায় তাকে রাষ্ট্রপতি নিযুক্ত করা হয়। ১৯৭৪ সালে পদত্যাগ করেন। খন্দকার মোশতাক আহমদ তাকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিয়োগ করেছিলেন], অধ্যাপক ইউসুফ আলী [মুজিব মন্ত্রিসভার শিক্ষামন্ত্রী]। যখন তারা ১৪ আগস্ট দিবাগত গভীর রাতে বামপন্থিদের অভ্যুত্থানের খবর পান (সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যেসব গোয়েন্দা কাজ করছিল তাদের মাধ্যমে) তারা সঙ্গে সঙ্গে ঢাকা রেডিও সেন্টার দখল করে নেয় এবং অভ্যুত্থানের খবর প্রচার করে। তবে এ সময় মুজিবের হত্যাকাণ্ড বিষয়ে কিছুই বলা হয়নি। তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন সৈন্যরা তখন ধানমণ্ডি এবং অফিসার্স ক্লাবের আশপাশে লড়াইয়ে নিয়োজিত ছিল। এতে উভয়পক্ষে ব্যাপক সংখ্যক সৈন্য নিহত হয়। মস্কোপন্থি অভ্যুত্থানকারীরা ঢাকা আক্রমণের জন্য হাজার হাজার সশস্ত্র লোককে প্রস্তুত রেখেছিল কিন্তু দক্ষিণপন্থিরা রাজধানীকে ঘিরে ফেলে সামরিক আইন জারি করে এ পরিকল্পনা ব্যর্থ করে দেয়।’

[ইরানি সংবাদপত্রটির ভাষ্য ছিল একেবারেই আষাঢ়ে গল্প। কিন্তু ওই সময়ের দেশি-বিদেশি সংবাদপত্রে এ ধরনের অনেক খবর প্রকাশিত হয়। এতে যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের নামি-দামি অনেক সংবাদপত্রও অংশ নেয়। বিশেষভাবে এর লক্ষ্য ছিল শেখ মুজিবকে হেয় প্রতিপন্ন করা। তাকে হত্যা ব্যতীত যে কোনো উপায় ছিল না, সেটাও বলা হতে থাকে। ওই সময়ে ঘাতকরা প্রচার করেছিল, মুজিব চেয়েছিলেন তার পুত্র শেখ জামালকে সেনাবাহিনী প্রধান নিযুক্ত করা। শেখ ফজলুল হক মনি হবেন প্রধানমন্ত্রী এবং শেখ কামালকে দেওয়া হবে ছাত্র সংগঠনের দায়িত্ব। অভ্যুত্থান চলাকালে হতাহত নিয়ে গুজব থাকতেই পারে। যেমন- ১৫ আগস্ট গুজব ছিল, প্রধানমন্ত্রী মনসুর আলী নিহত হয়েছেন। অভ্যুত্থানের পেছনে তাজউদ্দীন আহমদ ছিলেন, এমন রটনাও প্রথমদিকে ছিল। এটা পরিকল্পিত হওয়ারই সম্ভাবনা। খন্দকার মোশতাক আহমদ ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালেই পাকিস্তানের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা চালান। তার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতরের যোগসাজশ ছিল। এটা ব্যর্থ করে দেওয়ার পেছনে মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের সক্রিয় তৎপরতা সুবিদিত। খন্দকার মোশতাক আহমদ ক্ষমতা দখল করার পর তাজউদ্দীন আহমদকে গ্রেফতার করে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রাখা হয়। ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্ভর সৈয়দ নজরুল ইসলাম, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী এবং আবু হেনা মোহাম্মদ কামারুজ্জামানের সঙ্গে তাকেও ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়।]

সমকাল, ২২ আগস্ট, ২০০৮

Permalink

একাত্তরে যে সুযোগ হারিয়েছি আবার তা হারানো চলবে না

‘একাত্তরে যে সুযোগ হারিয়েছি আবার তা হারানো চলবে না’
- বোস্টারকে মোশতাক
’৭৫ এর ট্র্যাজেডি ॥ মার্কিন দলিলে -৩
অজয় দাশগুপ্ত

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পঞ্চম দিন ২০ আগস্ট বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ইউজিন বোস্টার রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এ প্রসঙ্গে ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাস থেকে ওয়াশিংটনে যেসব গোপনীয় বার্তা পাঠানো হয় তা ছিল নিম্নরূপ :
শিরোনাম : নতুন রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আমার (বোস্টার) প্রথম বৈঠক
বোস্টার : আমাকে মাত্র এক ঘণ্টার নোটিশে আজ বিকেল ৩টায় বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মোশতাকের অফিসে ডেকে পাঠানো হয়। এ ভবনে আগে রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদউল্লাহ থাকতেন। যদিও আমি রাজনৈতিক কাউন্সিলরকে সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলাম, কিন্তু রাষ্ট্রপতি একান্ত বৈঠকের অনুরোধ করেন। তিনি প্রথমেই জানতে চাইলেন : আমি কবে ওয়াশিংটন চলে যাচ্ছি [অভ্যুত্থানের আগের সস্পাহে তার সঙ্গে ডিনারে আমি তাকে জানিয়েছিলাম, আমি এ মাসের শেষদিকে সিলেকশন বোর্ডে দায়িত্ব পালনের জন্য চলে যাচ্ছি]। আমি তাকে জানাই, আমি কিছু সময় আগে জেনেছি, আমার ওই দায়িত্ব প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং আমাকে ঢাকাতেই রেখে দেওয়া হচ্ছে। রা®দ্ব্রপতি বলেন, এ খবরে তিনি আনন্দিত হয়েছেন এবং তিনি এটা আশা করছিলেন।
বোস্টার : এরপর রাষ্ট্রপতি আন্তরিকতার সঙ্গে কথা বলতে থাকেন। বারবার তিনি আমার হাত চেপে ধরছিলেন। দেশে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা চাইছিলেন। তিনি বলেন, কী ধরনের সাহায্য প্রয়োজন তার তালিকা তিনি তৈরি করেননি। কিন্তু এটা জোর দিয়ে বলেন, ১৯৭১ সালে যে সুযোগ আমরা হারিয়েছি, আবার তা হারানো চলবে না। এ প্রসঙ্গে তিনি আমার সঙ্গে গত মে মাসে তার আলোচনার কথা স্মরণ করিয়ে দেন। ১৯৭১ সালে তিনি কলকাতায় যুক্তরাষ্ট্রে কর্মকর্তাদের সঙ্গে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে আপসের বিষয়ে চেষ্টা করেছিলেন, যা সফল হয়নি। তিনি বলেন, বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান আমাদের উপলব্ধি করতে হবে। এ প্রসঙ্গে তিনি তার বিরুদ্ধে ভারতীয় সংবাদপত্রে যে অবন্ধুসুলভ খবর প্রকাশ হচ্ছে তার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তিনি বলেন, দেশে রক্তপাত ছাড়াই পরিস্থিতি সামাল দিয়েছেন। কিন্তু যদি ভারত স্থলপথে কিংবা আকাশপথে বিশেষভাবে আকাশপথে যদি অভিযান চালায় তাহলে তিনি প্রতিরক্ষাহীন হয়ে পড়বেন। তিনি বলেন, অসন্তুষ্ট বাঙালিদের শরণার্থী অভ্যর্থনা কেন্দ্রগুলোতে জড়ো করা হচ্ছে বলে তার কাছে খবর রয়েছে এবং তার আশঙ্কা, ১৯৭১ সালে ভারতীয় ও বাঙালিরা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যে কৌশল অনুসরণ করে সফল হয়েছে এখন সেটাই বাংলাদেশের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করা হতে পারে। আমি তাকে এখানে যা ঘটছে তা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার বলে ভারতের বিবৃতির কথা স্মরণ করিয়ে দেই এবং এটাও বলি, ভারত অন্য কোনো পদক্ষেপ নেবে না। তিনি বলেন, তিনি এটা আশা করেন।

বোস্টার : তিনি এরপর আমার কাছে যুক্তরাষ্ট্রের স্বীকৃতির প্রসঙ্গ তোলেন। আমি তার সরকারের সঙ্গে আমাদের স্বাভাবিক সম্পর্ক বজায় রাখার প্রসঙ্গ তুলে ধরি এবং স্বীকৃতির’ বিষয়টিকে কম গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলি। তিনি বলেন, আপনাদের অবস্থান আমি বুঝি কিন্তু স্বীকৃতির মনস্তাত্ত্বিক তাৎপর্য রয়েছে। স্বাভাবিক অবস্থা বজায় রাখা এবং ভারতের পদক্ষেপের বিরুদ্ধে রক্ষাকবচের জন্য স্বীকৃতি এ মুহূর্তে- ‘আজই’ দেওয়া প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেন। আমি তার এ অবস্থান ওয়াশিংটনে জানিয়ে দেব বলে তাকে জানাই।
তার সরকারের নতুন কার্যক্রম বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ৬১ জেলায় পুরনো প্রশাসন ফিরিয়ে আনা হয়েছে। তিনি বলেন, এ ব্যবস্থা [জেলায় গভর্নর নিয়োগ] একদলীয় বাকশালের অংশ। তিনি বলেন, মাকে হত্যা করে সন্তানকেও হত্যা করতে তিনি সক্ষম হবেন। আমি তার কাছে জানতে চাই, এর দ্বারা তিনি একদলীয় বাকশালের পরিবর্তে বহুদলীয় ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়া বোঝাতে চান কি-না। তিনি হ্যাঁ-সূচক জবাব দেন।
বোস্টার বলেন, আমি তার নতুন দায়িত্বে সাফল্য কামনা করি। আমি তাকে যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হোসেন আলীর সঙ্গে আমাদের সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী আথারটনের আলোচনা প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলি, আমরা অর্থনৈতিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখব এবং এটা সহায়ক হবে। তিনি উপসংহারে আমাকে যে কোনো সময়ে তার সঙ্গে আমার সাক্ষাতে সমস্যা নেই বলে জানান।

বোস্টারের মন্তব্য : মোশতাকের সঙ্গে সাক্ষাৎ প্রসঙ্গে বোস্টার প্রতিবেদনে বলেছেন : আমার কাছে মনে হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি নতুন সরকারের প্রতি আমাদের সহানুভূতির মনোভাব প্রকাশের সবচেয়ে কার্যকর ও সহজ উপায় হতে পারে। বাংলাদেশের নতুন রাষ্ট্রপতি যুক্তরাষ্ট্র যেসব নীতিগত পরিবর্তন দেখতে চায় তা করতে আগ্রহী বলেই মনে হয়। আমি এ কারণে জরুরিভিত্তিতে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদানের জন্য অনুরোধ জ্ঞাপন করছি।
কে এই মোশতাক : ১৫ আগস্ট অভ্যুত্থানের পরপরই ঢাকাস্থ যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস ওয়াশিংটনে খন্দকার মোশতাকের পরিচিতি জানায়। এতে বলা হয়, তিনি সবসময়ই মার্কিনপন্থি হিসেবে পরিচিত। ভারতবিরোধী ও সোভিয়েতবিরোধী হিসেবেও তার সুনাম রয়েছে। বেখোটো ও রোগা দেখতে মোশতাককে বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্বের মানুষ মনে হয় না। শেখ মুজিবের যে ক্যারিশমা সেটাও তার নেই। তিনি তাজউদ্দিন আহমদের বিরোধী। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পদ হারানোর জন্য তিনি এ প্রভাবশালী নেতা এবং ভারতীয় নেতৃত্বকে দায়ী মনে করেন।
১৯৭২ সালে তিনি ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের কর্মকর্তাদের বলেন, তিনি বাংলাদেশে ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মাত্রাতিরিক্ত প্রভাবের সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বিগ্ন। তিনি সে সময়ে আশা প্রকাশ করেন, যুক্তরাষ্ট্র সোভিয়েত ও ভারতের প্রভাবের বিরুদ্ধে পাল্টা ভারসাম্য বজায় রাখায় সহায়তা করবে। ১৯৭৪ সালে ঢাকায় রাষ্ট্রদূত বোস্টারের সঙ্গে এক সৌজন্য সাক্ষাৎকালে তিনি নিজেকে বাংলাদেশ সরকারে মার্কিনপন্থি সদস্য হিসেবে উল্লেখ করেন। সে সময়ে তিনি মুজিবকে আরো সহায়তা করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি অনুরোধ করেন যাতে তিনি বামপন্থার প্রতি ঝুঁকে না পড়েন। ১৯৭৫ সালের ১০ আগস্ট ঢাকায় এক ডিনার পার্টিতে, যেখানে রাষ্ট্রদূত বোস্টার উপস্টি’ত ছিলেন- খন্দকার মোশতাক আহমদ বলেন, ‘বাংলাদেশে এখন কেউ ভোট দেয় না।’
২২ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ইউজেন বোস্টার বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও সাবেক রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর সঙ্গে কিছু সময় কথা বলেন। তিনি ১৯৭১ সালে তার যুক্তরাষ্ট্র সফরের উল্লেখ করে বলেন, সে সময় তাকে ৫ বছরের ভিসা দেওয়া হয়েছিল। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি সর্বদা কৃতজ্ঞ থাকবেন বলেও জানান। আমি তাকে আমাদের অব্যাহত সাহায্যের কথা জানাই।
বোস্টার ওয়াশিংটনে পাঠানো তার প্রতিবেদনে বলেন, মোশতাকের সঙ্গে যে অনুষ্ঠানে আবু সাঈদ চৌধুরী ছিলেন সেখানে যুক্তরাষ্ট্রে নবনিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এম আর সিদ্দিকীও উপষ্থিত ছিলেন। তিনি আমাকে জানান, রাষ্ট্রপতি চাচ্ছেন তিনি যত দ্রুত সম্ভব ওয়াশিংটনে গিয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করুন।
বোস্টারের প্রতিবেদনে ২৩ আগস্ট বাংলাদেশের জাতীয় টুপি প্রসঙ্গও স্থান পেয়েছে। তিনি লিখেছেন : এ পর্যন্ত কেবল খন্দকার মোশতাক আহমদই এ টুপি ব্যবহার করতেন। আজকের অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবু সাঈদ চৌধুরী এবং এম আর সিদ্দিকী দু’জনেই যে টুপি পরেছিলেন তা ছিল একেবারে নতুন বানানো। বোঝাই যাচ্ছে, টুপি বানিয়ে বাংলাদেশের দর্জিরা আগামী কিছুদিন ভালো ব্যবসা করবে।

সংগ্রহ করা হয়েছে সমকাল পত্রিকা থেকে।

Permalink

বঙ্গবন্ধু বাঁচালেন ভুট্টোকে, ভুট্টো বদলা নিলেন একাত্তরে

ইতিপূর্বে সমকাল (১৩ আগস্ট ২০০৮) পত্রিকায় সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন গোপন দলিলে প্রাপ্ত তথ্য নিয়ে অজয় দাশগুপ্তের একটি মূল্যবান লেখা প্রকাশিত হয়েছিল। এতে বঙ্গবন্ধু হত্যাকালীন সময়ে আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরী কিসিঞ্জার ও তার স্টাফ অফিসারদের কথোপকথনের কিছু ব্যাখ্যা রয়েছে।

সমকাল পত্রিকার ১৪ আগস্ট সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে আর একটি বিষয় নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ রচনা। সমকাল পত্রিকার এই লেখায় বঙ্গবন্ধুর প্রতি পাকিস্তানী রাষ্ট্রনায়ক জুলফিকার আলী ভুট্টোর মনোভঙ্গী সম্পর্কে স্বচ্ছ প্রতিচ্ছবি প্রকাশিত হয়েছে।

বঙ্গবন্ধু বাঁচালেন ভুট্টোকে, ভুট্টো বদলা নিলেন একাত্তরের
’৭৫ এর ট্র্যাজেডি। মার্কিন দলিল -২
অজয় দাশগুপ্ত

১৯৭৪ সালের ৩০ অক্টোবর ঢাকায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে সফররত মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারের আলোচনা চলছে। সেখানে আলোচনা প্রসঙ্গে এলো একাত্তর সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্কের প্রশ্ন। মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের সদ্য প্রকাশিত গোপন দলিলে বৈঠকের এ সংক্রান্ত অংশের বিররণ তুলে ধরা হয়েছে এভাবে :

কিসিঞ্জার : আপনি [মুজিব] কখন স্বাধীনতা অর্জনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন? আপনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে পারতেন!
শেখ মুজিব : অবশ্যই। আইয়ুব খান আমাকে গোলটেবিল বৈঠকে [রাওয়ালপিন্ডি, মার্চ ১৯৬৯] এ প্রস্তাব দিয়েছিলেন। আমি দীর্ঘদিন পাকিস্তানের নেতৃস্থানীয় রাজনীতিক ছিলাম।
কিসিঞ্জার : পাকিস্তান তার বর্তমান রাজনৈতিক সমস্যা কাটিয়ে উঠতে পারবে বলে মনে করেন?
শেখ মুজিব : বলপ্রয়োগে সমাধান নেই। সেনাবাহিনী পাঞ্জাবের। তারা বেলুচিস্তানকে দমিয়ে রাখতে পারবে না। কিন্তু ভুট্টো [জুলফিকার আলি] একজন রাজনীতিবিদ এবং তিনি এভাবেই সমস্যা মোকাবেলার চেষ্টা করবেন। আমি সব পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দিকে ছেড়ে দিতে সম্ভত হয়েছি, কারণ আমি ভুট্টোকে সাহায্য করতে চেয়েছি। আমি এটা ইচ্ছাকৃতভাবে করেছি। যদি আমি না করতাম তাহলে পাকিস্তানে আবার সামরিক বাহিনী ক্ষমতায় আসত।
কিসিঞ্জার : এটা আপনার দূরদৃষ্টি।

বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীকে বাঁচালেন এভাবে। কিন্তু তিনি কী করলেন? একাত্তরে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী যে গণহত্যা অভিযান পরিচালনা করে তার প্ররোচনাদানকারীদের মধ্যে ছিলেন জুলফিকার আলি ভুট্টো। একাত্তরের ডিসেম্বরের প্রথমদিকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের চূড়ান্ত পর্যায়ে পাকিস্তান এবং যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘের মাধ্যমে যুদ্ধবিরতির অপচেষ্টা চালায়। নিরাপত্তা পরিষদে এ সংক্রান্ত আলোচনায় পাকিস্তান প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন ভুট্টো। তিনি তখন কথা বলেন পাকিস্তানের জান্তার পক্ষ হয়ে। বঙ্গবন্ধু অতীতের তিক্ততা ভুলে পাকিস্তানের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক চেয়েছিলেন। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট প্রত্যুষে দেখা গেল ভুট্টো একটুও বদলাননি। তিনি একাত্তরের মতোই রয়ে গেছেন বাঙালিবিদ্বেষী, মুজিববিদ্বেষী। একাত্তরে বলপ্রয়োগে পাকিস্তানি সেনারা বাঙালির কণ্ঠ চিরতরে রোধ করতে চেয়েছিল। পঁচাত্তরে হত্যা করা হলো আমাদের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতাকে। আর এর সঙ্গে ভুট্টোর সংশ্লিষ্টতা তিনি নিজেই গোপন রাখতে চাননি।

মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের সদ্য প্রকাশিত গোপন দলিলে ১৬ আগস্ট, ১৯৭৫ পাকিস্তানের মার্কিন দূতাবাস ওয়াশিংটনে যে বার্তা পাঠিয়েছে তাতে বাংলাদেশের অভ্যুত্থানের ব্যাপারে পাকিস্তানের প্রাথমিক প্রতিত্রিক্রয়া তুলে ধরা হয়েছে। এতে দেখা যায়, পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আগাশাহী নতুন বাংলাদেশ সরকারকে স্বীকৃতি প্রদানের বিষয়ে তাদের সরকারের সিদ্ধান্ত প্রকাশের আগেই যুক্তরাষ্ট্রকে অবহিত করেছেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খন্দকার মোশতাকের কাছে যে বার্তা পাঠিয়েছেন তা বাংলাদেশের কাছে এ পর্যন্ত পাঠানো পাকিস্তান সরকারের বার্তাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উষ্ণ। বার্তায় উল্কেèখ করা হয়, ‘বাংলাদেশের ভ্রাতৃপ্রতিম জনগণের জন্য প্রাথমিক ও স্বতঃস্ফুর্ত শুভেচ্ছা হিসেবে আমি অনতিবিলম্বে পাকিস্তানি জনগণের পক্ষ থেকে বাংলাদেশকে ৫০ হাজার টন চাল, ১ কোটি গজ লং ক্লথ কাপড় এবং ৫০ লাখ গজ ব্লিচড কাপড় পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এটা হচ্ছে বাংলাদেশের ভাইদের প্রয়োজনে সামান্য উপহার।’ ভুট্টো তার বার্তায় দু’দেশের অবিনাশী সংহতি, যা ১৯৭১ সালের বিয়োগান্তক ঘটনাতেও ছিন্ন হয়ে যায়নি, সেটাও খন্দকার মোশতাককে স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি বলেন, বিশ্ব জানুক, আমরা সুখে-দুঃখে একসঙ্গে আছি।

জুলফিকার আলি ভুট্টোর বার্তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে : ‘আমরা শ্রদ্ধার সঙ্গে ইসলামী সম্মেলন সংস্থার সদস্যদের ইসলামী রিপাবলিক অব বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদানের আবেদন জানাচ্ছি।’
কেন এ আবেদন? তার কারণ তিনি বলেছেন এভাবে : ‘আমাদের দেশকে একটি আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের প্রেক্ষাপটে পরিচালিত আগ্রাসন দ্বারা বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে।’

ভুট্টোর কাছে একাত্তরে বাংলাদেশে পাকিস্তানি জান্তার গণহত্যা কিংবা স্বাধীনতা অর্জনে বাঙালিদের বীরত্বপূর্ণ সংগ্রাম কোনো বিষয় ছিল না!

ভুট্টো বাংলাদেশকে ‘ইসলামী প্রজাতন্ত্র হিসেবে উল্লেখ করেন। কিন্তু এমনকি ১৫ আগষ্টের বিয়োগান্তক পরিবর্তনের পরও বাংলাদেশের নাম ছিল গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ। পাকিস্তানের শাসকরা আমাদের দেশের নাম কেন বদলে দিলেন? ১৭ আগস্ট ঢাকাস্থ মার্কিন রাষ্ট্রদূত ওয়াশিংটনে যে বার্তা পাঠান তাতে বলা হয়, ‘বাংলাদেশকে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করা হয়েছে, এমন কোনো ঘোষণা ঢাকা থেকে দেওয়া হয়নি। ১৬ আগস্ট পররাষ্ট্র দফতরের সার্কুলারেও গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ উল্লেখ করা হয়েছে।’

১৫ আগস্ট অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসীন খন্দকার মোশতাক কেমন ব্যক্তি সেটা জানা গেছে ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের প্রতিবেদনে। এতে বলা হয় : ‘পাকিস্তান সরকার তাকে মধ্যপন্থি, তীক্ষ্ণবুদ্ধির [নাকি ধূর্ত], ঠাণ্ডমাথার রাজনৈতিক নেতা মনে করে। তারা মুজিবনগর সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে পাকিস্তানের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে তিনি যে ফয়সালা চেয়েছিলেন সেটাও এ প্রসঙ্গে স্মরণ করে।’
বাংলাদেশের অভ্যুত্থানের পর যুক্তরাষ্ট্র সরকার তাৎক্ষণিক স্বীকৃতি প্রদান করবে না বলে সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু একই সঙ্গে ১৫ আগষ্ট ২১ ঘণ্টা ৫২ মিনিটে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক গোপন বার্তায় এটাও জানিয়ে দেয় যে, ‘আমরা তাদের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক স্থাপনে প্রস্তুত।’

কিসিঞ্জার ১৫ আগস্ট সকালে তার স্টাফ সভায় যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের সম্পর্কের ওপর বাংলাদেশে পরিবর্তনের প্রভাব পড়বে বলে মন্তব্য করেন।

১৬ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্র পররাষ্ট্র দফতর ইসলামাবাদে তাদের দূতাবাসে যে বার্তা পাঠায় তাতে বলা হয় : ‘যেহেতু পাকিস্তান সরকার বাংলাদেশের চলতি ঘটনাবলির বিষয়ে গভীরভাবে আগ্রহী, এ কারণে পাকিস্তানের কর্মকর্তাদের জানা থাকা দরকার যে, আমরা তাদের সঙ্গে অব্যাহতভাবে মতামত বিনিময়ে আগ্রহী। আমরা ওয়াশিংটনে পাকিস্তান দূতাবাসের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছি এবং তাদের অপরিহার্য তথ্যাদি জানাচ্ছি।’
১৭ আগস্ট ইসলামাবাদের মার্কিন দহৃতাবাস থেকে ওয়াশিংটন পররাষ্ট্র দফতরে বার্তা যায়। এর বিষয়বস্তু ছিল আফগানিস্তান ও বাংলাদেশ বিষয়ে সোভিয়েত রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে তার আলোচনা এবং বাংলাদেশের নতুন সরকার সম্পর্কে তার মূল্যায়ন। আগের রাতে (১৬ আগস্ট) ভুট্টো এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে কথা বলেন। তার ভিত্তিতেই এ প্রতিবেদন পাঠানো হয়। ভুট্টো শুরুতেই মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে বলেছিলেন, ‘আপনারা মন্দ লোক নন এবং বাংলাদেশে অভ্যুত্থান ঘটানোর সঙ্গে ছিলেন না। তবে সোভিয়েতরা অন্যভাবে মনে করে।’ এর জবাবে মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলেন, যখনই জেনেছি বাংলাদেশের নতুন প্রেসিডেন্ট পাশ্চাত্যপন্থি হিসেবে পরিচিত, তখনই সোভিয়েত তরফ থেকে এ অভিযোগ উঠবে বলে ধরে নিয়েছি। যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত বার্তায় লিখেছেন : ‘আমি কৌতুক করে বলেছি যে, ভুট্টো বাংলাদেশের নতুন সরকারকে এত দ্রুত স্বীকৃতি দিয়েছেন যে, এতে সন্দেহ সৃষ্টি হতে পারে।’ বার্তা থেকে ধারণা করা যায়, খন্দকার মোশতাকের সরকারকে পাকিস্তানের আগে যে সৌদি আরব ও লিবিয়ার মতো দেশ স্বীকৃতি দিয়ে কৃতিত্ব নিতে না পারে সেজন্য ভুট্টো এত দ্রুত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেন।

১৮ আগস্ট ইসলামাবাদ থেকে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ওয়াশিংটনে যে বার্তা পাঠান তাতে এমন দ্রুততার সঙ্গে স্বীকৃতির ভিন্ন ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়, বাংলাদেশের অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে ভারত ও সোভিয়েত সরকারের কী প্রতিক্রিয়া হয় সে বিষয়ে পাকিস্তানের সরকারি মহলে উদ্বেগ ছিল। বিশেষ করে ভারতের সশস্ত্র হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা তারা বিবেচনায় রেখেছে। আর এটাই এত দ্রুত স্বীকৃতি প্রদান এবং অন্যান্য ইসলামী দেশকে একই পথ অনুসরণের আহ্বানের কারণ হতে পারে। তারা আশা করেছিল, এভাবে ভারতীয় সামরিক পদক্ষেপের শঙ্কা কমবে।

১৮ আগস্ট ইসলামাবাদের মার্কিন দূতাবাসের আরেক বার্তায় দেখা যায়, বাংলাদেশকে ইসলামী প্রজাতন্ত্র হিসেবে পাকিস্তান সরকার প্রচার করলেও বাংলাদেশের তরফে এ ধরনের কোনো ঘোষণা না আসায় পাকিস্তান সরকারের কর্মকর্তাদের মধ্যে হতাশা রয়েছে। অথচ বাংলাদেশ ইসলামী প্রজাতন্ত্র হয়ে গেছে- এটা ধরে নিয়েই ভুট্টো এত দ্রুত মোশতাক সরকারকে স্বীকৃতি দিয়েছেন। তিনি মনে করেছেন, একাত্তরে যে দ্বিজাতিতত্ত্বকে (হিন্দু-মুসলমান) বাংলাদেশে মৃত ঘোষণা করে ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ ঘোষণা করা হয়েছে তা ঢাকায় টিকে আছে। ঢাকায় অভ্যুত্থানের পর পাকিস্তানের বিভিন্ন সংবাদপত্রের সম্পাদকীয় মন্তব্যে ‘মুসলিম বাংলা’ ব্যবহার করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের মন্তব্য : যদি বাংলাদেশের নাম পরিবর্তন করা না হয় [অর্থাৎ ইসলামী প্রজাতন্ত্র না হয়] তাহলে পাকিস্তান সরকারের কী প্রতিক্রিয়া হয়, সেটা দেখার বিষয়।

Permalink

অভ্যুত্থান চলাকালেই কিসিঞ্জার খবর পাচ্ছিলেন, বঙ্গবন্ধু তখনো বেঁচে

সমকাল ১৩ আগস্ট ২০০৮ সংখ্যায় আমেরিকা সরকারের বিভিন্ন গোপন দলিলে প্রাপ্ত তথ্য নিয়ে অজয় দাশগুপ্তের এক মূল্যবান লেখা প্রকাশিত হয়েছে। এই লেখায় বঙ্গবন্ধু হত্যাকালীন সময়ে আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরী কিসিঞ্জার ও তার স্টাফ অফিসারদের মধ্যে কথোপকথনের বর্ণনা রয়েছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতির নানা গোপন কাহিনী সমৃদ্ধ এই লেখাটি সমকাল পত্রিকা থেকে নেয়া হয়েছে।

অভ্যুত্থান চলাকালেই কিসিঞ্জার খবর পাচ্ছিলেন, বঙ্গবন্ধু তখনো বেঁচে
৭৫ এর ট্রাজেডি মার্কিন দলিলে

অজয় দাশগুপ্ত

[যে কোনো বৃহৎ শক্তির কূটনৈতিক কর্মকান্ডে বিস্তর লিখিত দলিল চালাচালি হয়। আর এতে থাকে আপাতভাবে তুচ্ছ থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার আনুপূর্ব বিবরণ। তাৎক্ষণিক প্রয়োজন তো আছেই, আরেকটি উদ্দেশ্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য শিক্ষণীয় রেখে যাওয়া। বাংলাদেশের ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট ট্র্যাজেডি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। বঙ্গবন্ধু হত্যা-কান্ডে তাদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ সুবিদিত। এর সত্যতা অনুসন্ধানে গবেষকরা নিরন্তর চেষ্টা চালা-চ্ছেন। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতরের শত শত দলিলে ওই সময়ের ঘটনাবলির রয়েছে লিখিত বিবরণ। ঘটনার ৩০ বছর পর অতি গোপনীয় ও গোপনীয় নথি প্রকাশের বিষয়ে আইন প্রণয়নের কারণে এসব দলিল এখন শুধু ওই দেশের নাগরিক নয়, বিশ্ববাসীও জানতে পারছে। তবে নথি প্রকাশ করার আগে তা পর্যালোচনা-পরীক্ষা করে দেখবেন অরিজিনেটিং এজেন্সির প্রধান। তিনি যদি কোনো বিষয় প্রকাশ না করার সিদ্ধান্ত দেন তবে তা অনির্দিষ্টকাল আলোর মুখ দেখবে না। ১৫ আগষ্ট ট্র্যাজেডির সঙ্গে প্রত্যক্ষ সংশ্লিষ্টতা ছিল তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারের। এখনো তিনি বেঁচে আছেন। তাই গোপনীয় ও অতি গোপনীয় হিসেবে চিহ্নিত মার্কিন পররাষ্ট মন্ত্রণালয়ের দলিল প্রকাশের আগে তার মতামত নেওয়া হয়েছে এবং তিনি বেশকিছু দলিল সংশোধিত আকারে প্রকাশের সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। আর এ কারণেই বাংলাদেশের ইতিহাসের বিয়োগান্ত ও সুদূরপ্রসারী তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়ের কিছু অংশ আপাতত থেকে যাচ্ছে অন্ধকারে। কে জানে, হয়তোবা চিরকালের জন্যই।]

১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট। শুত্রক্রবার। ওয়াশিংটন সময় সকাল ৮টা। বাংলাদেশে তখন ১৫ আগষ্ট, রাত ১০টা। এদিন প্রত্যুষে বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার তার স্টাফ সভায় বসেছেন কয়েকজন কর্মকর্তা নিয়ে। এখানে কী আলোচনা হয়েছে তার বিবরণ
পররাষ্ট্র দফতরের অনেক দলিলে, যার সংশোধন করা হয়েছে। অর্থাৎ পূর্ণ বিবরণ আপাতত জানার অবকাশ নেই।
বৈঠকের শুরুতেই কিসিঞ্জার বলেন, আমরা এখন বাংলাদেশ প্রসঙ্গে কথা বলব।
নিকট প্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী আথারটন : এটা হচ্ছে সুপরিকল্কিপ্পত ও নিখুঁতভাবে বাস্তবায়ন করা অভ্যুত্থান।
কিসিঞ্জার : মুজিবুর কি জীবিত না মৃত?
আথারটন : মুজিব মৃত। তার অনেক ঘনিষ্ঠ সহচর, পরিবারের সদস্য, ভাই, ভাগ্নে নিহত হয়েছেন।
কিসিঞ্জার : আমি ব্যুরো অব ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড রিসার্চ (আইএনআর) থেকে ভালো পরামর্শ পেয়েছি [তিনি এ কর্মকর্তার সঙ্গে ওয়াশিংটনে আগেই কথা বলেছেন। তবে এটা ফোনে নাকি সরাসরি, সেটা স্পষ্ট নয়]।
হিল্যান্ড (ব্যুরো পরিচালক) : আমি যখন আপনার সঙ্গে কথা বলেছি তখন তিনি মৃত ছিলেন না।
কিসিঞ্জার : আচ্ছা? তারা কি কিছু সময় পর তাকে হত্যা করেছে?

এ আলোচনা থেকে স্পষ্ট, ১৫ আগষ্ট অভ্যুত্থান চলাকালেই কিসিঞ্জার অবহিত হচ্ছিলেন [১৫ আগষ্ট ঢাকার যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস প্রেরিত বার্তায় বলা হয় : ঢাকার সময় বিকেল চারটা পর্যন্ত দেখা যায়, অভ্যুত্থান সফল হচ্ছে বলেই প্রতীয়মান হয়। কোনো সক্রিয় প্রতিরোধ দেখা যাচ্ছে না]।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্টাফ বৈঠকে কিসিঞ্জারের প্রথম প্রশ্নও সন্দেহ সৃষ্টি করে। তিনি প্রথমেই জানতে চেয়েছেন, মুজিব জীবিত নাকি মৃত। এ ধরনের ঘটনায় প্রথম প্রশ্ন হওয়ার কথা, মুজিব ক্ষমতায় আছেন কি নেই। কিন্তু প্রভাবশালী মার্কিন নেতা জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি বেঁচে আছেন কি-না। ১০ ঘণ্টা আগে অভ্যুত্থান চলাকালেই তিনি ঘটনার বিবরণ পাচ্ছিলেন হিল্যান্ডের কাছ থেকে। এ অভ্যুত্থান রোধে তাদের কিছু করণীয় প্রতিকারের কথা ভাবেননি। বরং যেন মনে হয়, তিনি অপেক্ষা করে ছিলেন একটি দেশের রাষ্ট্রপতির মৃত্যু সংবাদের জন্য!

বাংলাদেশের স্থপতির প্রতি কিসিঞ্জারের বিরাগ ছিল ১৯৭১ সাল থেকেই। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই বৈঠকে তিনি মুজিব সম্পর্কে যে মন্তব্য করেছিলেন তাতেও ওই বিদ্বেষের প্রতিফলন : হি ওয়াজ ওয়ান অব দ্য ওয়ার্ল্ড’স প্রাইজ ফুলস।
১৯৭৪ সালের ৩০ অক্টোবর কিসিঞ্জার এসেছিলেন বাংলাদেশে। তিনি বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে। এ সফরের মাত্র তিনদিন আগে ২৭ অক্টোবর অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ পদত্যাগ করেন। মুক্তিযুদ্ধকালে দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকালে তিনি চমকপ্রদ দক্ষতা ও যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখেন। তাকে অপসারণের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের চাপ ছিল বলে ধারণা করা হয়। কিসিঞ্জাসের সফরের প্রাক্কালে তাকে অপসারণ কাকতালীয় নাকি এর পেছনে কোনো বিশেষ কারণ ছিল, সেটা ইতিহাসের গবেষণার বিষয় হতে পারে। তাজউদ্দীনের অনমনীয় মনোভাবের কারণে একাত্তর সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের পরিকল্পনা মেনে নেওয়ার জন্য খন্দকার মোশতাকের চক্রান্ত সফল হতে পারেনি।
১৯৭৪ সালের বন্যার পরপরই দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। এ সময়ে খাদ্যের ঘাটতি ছিল ব্যাপক এবং তা পহৃরণে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বাংলাদেশ সহায়তা চাইছিল।
কিসিঞ্জার বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বৈঠকে বলেন, ‘আপনার তো দেখছি চারদিক থেকেই সমস্যা।’
বঙ্গবন্ধু বন্যা সমস্যা, খাদ্য সমস্যা, রাসায়নিক সারের ঘাটতি, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পদ বণ্টন এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন শিবিরে অবস্থানকারী পাকিস্তানি নাগরিকদের তাদের দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রসঙ্গ তুললে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী সম্ভবত ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করেই ‘আপনার তো দেখছি চারদিক থেকেই সমস্যা’ বলেছিলেন। কারণ বৈঠকে তোলা প্রতিটি বিষয়েই তার অবস্থান ছিল বাংলাদেশের বিপক্ষে।
কিসিঞ্জারের বাংলাদেশ সফরের কিছুদিন আগে বঙ্গবন্ধু জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দিয়েছিলেন। ওই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ডের সঙ্গে তার বৈঠক হয়। কিসিঞ্জারের সঙ্গে ঢাকায় আলোচনাকালে বঙ্গবন্ধু ফোর্ডকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানিয়ে বলেন, তিনি ভারতে তার আসন্ন সফরের সঙ্গে মিল রেখে ঢাকা আসতে পারেন। এর জবাবে কিসিঞ্জারের মন্তব্য ছিল কূটনৈতিক শিষ্টাচারের পরিপন্থী। তিনি ঢাকায় বঙ্গবন্ধুকে বলেন, ‘ফোর্ড ভারত সফরের সময়ে বাংলাদেশে আসতে পারেন। তবে আমরা মনে করি না বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের তরফে ভারতের অনুমতি গ্রহণের প্রয়োজন রয়েছে।’
কিসিঞ্জার ওয়াশিংটনে ফোর্ডের সঙ্গেও বঙ্গবন্ধুর বৈঠকের প্রসঙ্গ তোলেন। তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট আপনার সঙ্গে আলোচনায় সন্তুষ্ট। ণড়ঁ নধসনড়ড়ুষবফ যরস! এ বাক্যের অর্থ হতে পারে, আপনি তাকে মুগ্ধ করেছেন। আবার, আপনি তাকে কথার জাদুমালা আর ব্যক্তিত্ব দিয়ে ভুলিয়েছেন বলেও ধরে নেওয়া যায়। কিন্তু ধুরন্ধর কূটনীতিক যদি নধসনড়ড়ুষবফ শব্দের আক্ষরিক অর্থ ‘প্রতারণা’ বুঝিয়ে থাকেন?
ঢাকার বৈঠকে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কাছে বাংলাদেশের ন্যায্য পাওয়ার প্রসঙ্গ তোলেন। তিনি বলেন, আমরা সম্পর্ক স্থাপনের জন্য অনেক কিছু করেছি। যুদ্ধবন্দিদের ছেড়ে দিয়েছি। পাকিস্তানের বৈদেশিক সম্পদের দায়দেনার যতটা আমাদের ওপর বর্তায় তা বহনের কথা জানিয়েছি। কিন্তু পাকিস্তান কেবল কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনে আগ্রহী।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতর যে গোপনীয় দলিল সংশোধন করে প্রকাশ করেছে তাতে দেখা যায়, কিসিঞ্জার এ প্রশ্নে পাকিস্তানের বক্তব্যই তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, আমি পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আজিজ আহমদের সঙ্গে কথা বলেছি। তিনি দায়দায়িত্ব গ্রহণের বিষয়ে আপনাদের অনাগ্রহের কথা জানিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী মুজিব : আমি ইতিমধ্যেই দায়দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। আমরা এ বিষয়ে ঋণদাতাদের সঙ্গে চুক্তি করেছি। কিন্তু কেন আমি সম্পদের ভাগ পাব না?
মুজিব : আমরা এক বা দুই বছর খাদ্য সহায়তা চাই। আমি দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার জন্য ব্যাপক সহায়তা চাই। আমরা শিল্পের কাঁচামাল চাই। আমাদের পাটের জন্য ভালো দাম চাই।
এর জবাবেই কিসিঞ্জার বলেন, আপনার তো দেখি চারদিক থেকেই সমস্যা।
বঙ্গবন্ধু চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক স্থাপনে আগ্রহের কথাও বলেন। এ প্রসঙ্গে কিসিঞ্জারের বক্তব্য : তারা হয়তো আপনাদের সঙ্গে পাকিস্থানের সম্পর্ক স্থাপন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে চাইবে।

হ্যাঁ, পাকিস্তান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছিল ১৫ আগষ্ট বঙ্গবন্ধুকে নৃশংসভাবে হত্যার পর। চীনও সম্পর্ক স্থাপন করে এ বিয়োগান্ত ঘটনার পর।
কিসিঞ্জার কি ১৫ আগষ্টের ঘটনা আগেই জানতেন?
বঙ্গবন্ধু বন্যায় খাদ্যশস্য বিনষ্ট হওয়া এবং বিশ্ববাজারে খাদ্যের দাম অনেক বেড়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সাহায্য চাইলে কিসিঞ্জার বলেন, ‘আমাদের সমস্যা হচ্ছে, আমাদের কাছে উদ্বৃত্ত খাদ্য নেই। ... সাহায্য প্রসঙ্গে আমাদের কংগ্রেসের সঙ্গেও সমস্যা রয়েছে। আগামী মঙ্গলবার আমাদের কংগ্রেসের (প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট) নির্বাচন। তবে ১৯৭০ সালে আপনি যেভাবে জিতেছিলেন তেমন সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রশাসন আশা করে না।
জবাবে বঙ্গবন্ধু রসিকতা করে বলেন, ‘নির্বাচনে অত বেশি আসন পাবেন না। আপনারা জানেন, আমি বিপুলভাবে জয়ী হওয়ার পর কী ঘটেছিল : পাকিস্তানিরা এখানে সবকিছু ধ্বংস করে দেয়। আমাকে গ্রেফতার করে। আমার পাঁচ বছরের ছেলেও বলে, আর নির্বাচনে দাঁড়াবে না।’
এর জবাবে কিসিঞ্জার বলেন, ‘আপনি নিশ্চয়ই কিছু সময়ের জন্য আপনার দেশে নির্বাচন এড়াতে চাইবেন না!’
বঙ্গবন্ধু যে কোনো সময়েই নির্বাচন এড়াতে চাননি সেটা কিসিঞ্জার সম্ভবত জানতেন না।
১৫ আগষ্ট ওয়াশিংটনের সকালের বৈঠকে ফিরে তাকানো যাক।
বৈঠকে আথারটন জানান, অভ্যুত্থানকারীরা মুজিবকে হত্যার জন্যই এসেছিল। তারা বাড়িটি ঘেরাও করে এবং ভেতরে গিয়ে তাকে মেরে ফেলে।
আগেও তাকে হত্যার চক্রান্ত প্রসঙ্গ তুলে
কিসিঞ্জার বলেন : তাকে কি গত বছর আমরা এ বিষয়ে কিছু বলিনি?
আথারটন : গত মার্চে এ বিষয়ে আমরা অনেক ইঙ্গিত পাচ্ছিলাম।
কিসিঞ্জার : তাকে কি আমরা কিছু জানাইনি?
আথারটন : তাকে সে সময়ে জানিয়েছি।
কিসিঞ্জার : কারা এর পেছনে, সে বিষয়ে কি মোটামুটি কিছু ধারণা দিয়েছি?
আথারটন : কারা জড়িত সেসব নাম তাকে বলেছি কি-না, সেটা পরীক্ষা করে দেখতে হবে।
হিল্যান্ড : আমরা এ বিষয়ে ঠিক যথাযথ ধারণা দিইনি।
আথারটন : তিনি বিশ্বাস করেননি। তিনি বলেছেন, কেউ তাকে এ ধরনের কিছু করবে না।
বাংলাদেশের অভ্যুত্থান ‘সফল’ হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতরের কাছে খবর পৌঁছে যায় : ‘যারা অভ্যুত্থান করেছে তাদের মধ্যে রয়েছে সামরিক অফিসার, মধ্য পর্যায় ও সিনিয়র অফিসার- যাদের সাধারণভাবে পূর্ববর্তী শাসকদের তুলনায় কম ভারতপন্থি, সোভিয়েতবিরোধী এবং মার্কিনপন্থি হিসেবে গণ্য করা যায়।
কিসিঞ্জার : এটাই হতে হবে।
আথারটন : তারা দেশের নাম পরিবর্তন করে ইসলামী প্রজাতন্ত্র রেখেছে।
কিসিঞ্জার : তারা যুক্তরাষ্ট্রপন্থি হবে, এটা অপরিহার্য নয়। প্রকৃতপক্ষে পথপরিক্রমায় তারা চীনাপন্থি এবং ভারতবিরোধী হবে বলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি। আমি সবসময়ই জানতাম, ভারত বাংলাদেশকে স্বাধীন করার জন্য একদিন অনুতাপ করবে। এ ভবিষ্যদ্বাণী আমি একাত্তর সালেই করেছি।
আথারটন : আমাদের বড় সমস্যা হবে বাংলাদেশের নতুন শাসকদের সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠতা বা মাখামাখি পরিহার করা।
কিসিঞ্জার : কেন তারা আমাদের প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন বলে?
ঝানু কূটনীতিক কিসিঞ্জার ঠিকই বুঝেছিলেন স্বাধীন দেশের স্থপতিকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে যারা রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছে তারা তাদের বন্ধু এবং বৈঠকেই তিনি জানিয়ে দেন : ‘তারা আমাদের কাছ থেকে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ পাবে। আমরা তাদের স্বীকৃতি দেব।’
১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট বাংলাদেশ তার ইতিহাসের কঠিনতম পথে যাত্রা শুরু করে। এর পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা ছিল ৩০ লাখ শহীদের রক্তে অর্জিত বাংলাদেশের জনগণের জন্য অগ্রহণযোগ্য এবং অবশ্যই ক্ষতিকর। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতরের যেসব গোপনীয় দলিল প্রকাশ করা হচ্ছে, তা থেকেও এ সাক্ষ্য মেলে।

Permalink

BBC Asia-Pacific

CNN.com - Asia