বিশেষ প্রতিনিধি
জেলহত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকা একমাত্র আসামি এবং যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পাওয়া ৮ জনই বর্তমানে পলাতক। সাজা কার্যকর করার জন্য যাদের কারাগারে বন্দি রাখা হয়েছিল, গতকাল হাইকোর্টের রায়ে তারা এই হত্যাকাণ্ডের দায় থেকে এখন মুক্ত।
২০০৪ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকা মহানগর দায়রা জজ মতিউর রহমান জেলহত্যা মামলার রায়ে তাদের অভিযুক্ত করেন। সে রায়ে চার নেতার ঘাতক হিসেবে রিসালদার মোসলেহ উদ্দিন, দফাদার শরাফত আলী ও আবুল হোসেন মৃধাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। নেপথ্যের নায়ক হিসেবে এছাড়াও ১২ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
মৃত্যুদণ্ড পাওয়া তিন আসামিই ঘটনার পর থেকে পলাতক।
নিম্ন আদালতে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয় লে. কর্নেল (বরখাস্ত.) সৈয়দ ফারুক রহমান, কর্নেল (অব.) সৈয়দ শাহরিয়ার রশীদ, মেজর (অব.) বজলুল হুদা, লে. কর্নেল খন্দকার আবদুর রশীদ (বরখাস্ত), লে. কর্নেল (অব.) শরিফুল হক ডালিম, লে. কর্নেল (অব.) এমএইচএমবি নূর চৌধুরী, লে. কর্নেল (অব.) একেএম মহিউদ্দিন আহম্মদ এসি, লে. কর্নেল (অব.) এএম রাশেদ চৌধুরী, মেজর (অব্যাহতি) আহাম্মদ শরিফুল হোসেন, ক্যাপ্টেন (অব.) আবদুল মাজেদ, ক্যাপ্টেন (অব্যাহতি) মোঃ কিসমত হোসেন ও ক্যাপ্টেন (অব.) নাজমুল হোসেন আনসারের।
যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত ১২ আসামির চারজন আপিল করেন। বর্তমানে জেলে বন্দি এই চারজনকেই আদালত খালাস দিয়েছেন। যদিও বঙ্গবন্ধু হত্যামামলায় মৃত্যুদ- হওয়ায় তাদের এখনো কারাগারেই থাকতে হবে। এরা হচ্ছেন লে. কর্নেল (বরখাস্ত) সৈয়দ ফারুক রহমান, কর্নেল (অব.) সৈয়দ শাহরিয়ার রশীদ, মেজর (অব.) বজলুল হুদা ও লে. কর্নেল (অব.) একেএম মহিউদ্দিন আহমেদ।
হাইকোর্টের রায়ে অপর ৮ জন সম্পর্কে কিছুই বলা হয়নি। তাদের আপিল না থাকায় নিম্ন আদালতের রায়ই এখনো তাদের জন্য বহাল রয়েছে বলে আইনজীবীরা জানিয়েছেন।
ঘটনার পর থেকেই এরা বিদেশে পলাতক। লে. কর্নেল (অব.) খন্দকার আবদুর রশীদ বর্তমানে বেলজিয়ামে। তবে তিনি লিবিয়ায় বসবাস করেন বলেও কেউ কেউ দাবি করছেন। লিবিয়ার নেতা গাদ্দাফির ছোট ভাইয়ের ব্যবসায়িক অংশীদার হিসেবে ইতালির মিলান শহরেও রশীদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছিল। ১৯৯৮ সালে সে দেশের সরকারের সহযোগিতা নিয়ে ওই প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা হয়। তারপর থেকে তার আবাস যেখানেই হোক না কেন, নিয়মিত ইউরোপ এবং মধ্যপ্রাচ্যে যাতায়াত আছে তার।
লে. কর্নেল (অব.) শরিফুল হক ডালিম অধিকাংশ সময় থাকেন হংকং। পাকিস্তান, লিবিয়া ও কেনিয়ায় তার একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আছে।
লে. কর্নেল (অব.) এএম রাশেদ চৌধুরী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে অন্যত্র চলে গেছেন বলে বছর দুই আগে খবর প্রকাশিত হয়।
লে. কর্নেল (অব.) এমএইচএমবি নূর চৌধুরী বর্তমানে কানাডায়।
ক্যাপ্টেল্টন (অব.) আবদুল মাজেদ ভারতে থাকলেও অনেকদিন ধরে তার কোনো খবর নেই। একই অবস্থা মেজর (অব্যাহতি) আহাম্মদ শরিফুল হোসেন, ক্যাপ্টেন (অব্যাহতি) মোঃ কিসমত হোসেন ও ক্যাপ্টেন (অব.) নাজমুল হোসেন আনসারেরও।
সমকাল, ২৯ আগস্ট, ২০০৮
আসামিরা কে কোথায়
বিচার ভিক্ষা চাই না ন্যায়বিচার চাই
অ্যাডভোকেট আনিসুল হক
রায় পক্ষে না গেলেই আদালতকে কটাক্ষ করতে হবে আর পক্ষে গেলে প্রশংসা করা হবে−সেই দর্শন থেকে আমি লিখছি না। আমি যতটুকু জেনেছি, তা থেকেই রায়ের কয়েকটি অসংগতি তুলে ধরতে চাই।
আদালত তাঁর রায়ে একজনের ফাঁসি বহাল রেখেছেন এবং ছয়জনকে খালাস দিয়েছেন। আমার অভিমত, ফাঁসি বহাল রাখার জন্য আদালত অবশ্যই একজন সাক্ষীর ওপর বিশ্বাস রেখেছেন। আমার কথা হলো, একই সাক্ষীর ওপর বিশ্বাস করে একজনকে ফাঁসি দেওয়া হলো, অথচ আরেকজনের বেলায় সেই সাক্ষীকেই অবিশ্বাস করা হলো। এটা রায়ের একটি অসংগতি।
লক্ষ করেছি, বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিচারিক আদালত থেকে সব বিএনপি নেতা খালাস পেয়ে গেলেন। এখন হাইকোর্টে আসার পর এ মামলার প্রায় সব আসামি খালাস পেলেন। জনগণ যদি মনে করে দলীয় বিবেচনায় রায় হয়েছে−সেটা কি অন্যায় হবে?
ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ভেতরে জাতীয় নেতারা যে নিহত হয়েছিলেন, সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই। আসামি ও বাদী কোনো পক্ষই এ ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করেনি। আসামি খালাস পাওয়ার পর প্রশ্ন উঠতেই পারে, চার নেতাকে কারা হত্যা করল? আসলে দোষী কারা, সেটা আদালতের বিবেচনায় রাখা দরকার ছিল।
শুনেছি, মামলার ৬৪ নম্বর সাক্ষী ছিলেন তদন্তকারী কর্মকর্তা, রায়ে যাঁর সমালোচনা করা হয়েছে। বলা হয়েছে, মামলা সুষ্ঠুভাবে তদন্ত করা হয়নি। ২১ বছর তদন্ত না হওয়ার জন্য যেসব সরকার রাষ্ট্র পরিচালনায় ছিল, সেসব সরকার দায়ী। ২১ বছরে এ মামলার তদন্ত কেন হলো না, সে ব্যাপার আদালত কোনো বক্তব্য রাখেননি।
২১ বছর মামলা তদন্ত না হওয়ায় অনেক সাক্ষ্য, আলামত নষ্ট হয়ে গেছে, সেটা আদালত দেখেছেন। আমি আশা করেছিলাম, আদালত হয়তো এসব বিবেচনায় আনবেন, এসব আইনের বাইরে নয়। আইনকে সমুন্নত রাখতে এসব বিষয় বিবেচনায় আসতেই পারে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি আদালত সেটা করেননি।
আমার বক্তব্য, আমরা বিচার ভিক্ষা চাই না, সুষ্ঠু ও ন্যায়বিচার চাই। এটা পাওয়া আমার অধিকার।
অ্যাডভোকেট আনিসুল হক: রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি
প্রথম আলো, ২৯ আগস্ট, ২০০৮
ওরা সবাই খালাস

বিশেষ প্রতিনিধি
হাইকোর্ট ঐতিহাসিক জেলহত্যা মামলায় শুধু পলাতক আসামি রিসালদার মোসলেমউদ্দিন ওরফে হিরন খানের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন। নিম্ন আদালতের বিচারে মৃত্যুদন্ড পাওয়া অপর দু’জন এবং কারাগারে আটক যাবজ্জীবন কারাদন্ডের চার আসামিকেই খালাস দেওয়া হয়েছে। নিম্ন আদালত তিনজনকে মৃত্যুদন্ড এবং ১২ জনকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দিয়েছিলেন।
অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত না হওয়ায় মৃত্যুদন্ড থেকে অব্যাহতি পেয়েছে পলাতক দুই আসামি দফাদার মারফত আলী শাহ এবং এলডি দফাদার মোঃ আবুল হাসেম মৃধা। সন্দেহের সুবিধায় আরো খালাস পেয়েছে লে. কর্নেল (বরখাস্ত) সৈয়দ ফারুক রহমান, কর্নেল (অব.) সৈয়দ শাহরিয়ার রশীদ, মেজর (অব.) বজলুল হুদা ও লে. কর্নেল (অব.) একেএম মহিউদ্দিন আহমেদ।
কারাগারে বন্দি মাত্র এই চার আসামিই নিম্ন আদালতের দেওয়া যাবজ্জীবন কারাদন্ডের বিরুদ্ধে আপিল করেছিল। এ মামলায় খালাস পেলেও বঙ্গবন্ধ হত্যা মামলায় মৃত্যুদন্ড হওয়ায় এখনো তাদের কারাগারেই থাকতে হবে। অপরদিকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড পাওয়া পলাতক অপর আট আসামির সম্পর্কে হাইকোর্ট কোনো মতামত না দেওয়ায় তাদের দন্ড বহাল রয়েছে বলে আইনজীবীদের ব্যাখ্যা পাওয়া গেছে।
বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি আতাউর রহমান খান সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ গতকাল বৃহস্পতিবার নিম্ন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আসামিদের চারটি আপিল ও রাষ্ট্রপক্ষের ডেথ রেফারেন্স নিস্পত্তি করে এ রায় দেন। রায়ে আদালত বলেছেন, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা খুনির সঙ্গীদের চিহ্নিত করতে পারেননি। ভুল ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছিল।
হাইকোর্টের রায়ের পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি আনিসুল হক সর্বোচ্চ আদালতে আপিল করার ঘোষণা দিয়ে বলেছেন, ‘আইনের নামে এ প্রহসন দুঃখজনক। স্বাধীনতার জন্য যারা রক্ত দিয়েছেন এবং আমরা যারা রক্ত দিতে দেখেছি তারা এ রায়ে মর্মাহত।’
অপরদিকে নিম্ন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে দুই আপিলকারীর কৌঁসুলি ব্যারিষ্টার আবদুল্লাহ আল মামুন সমকালকে বলেন, হাইকোর্টের রায়ে প্রমাণ হলো বাংলাদেশে নির্দোষ ব্যক্তি আর ফাঁসিতে ঝুলবে না। এদেশে আইনের শাসন আছে।
তবে অপর এক খালাসপ্রাপ্ত আসামির কৌঁসুলি প্রবীণ আইনজীবী আবদুর রেজাক খান বলেন, এ মামলার তদন্ত যথাযথ হয়নি বলেই প্রকৃত আসামিরা চিহ্নিত হয়নি। একই কারণে কারো বিরুদ্ধে সন্দেহাতীতভাবে অপরাধ প্রমাণ করা সম্ভব হয়নি।
নিম্ন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে কারাগারে আটক যাবজ্জীবন কারাদন্ডপ্রাপ্ত চার আসামির আপিল ও রাষ্ট্রপক্ষের ডেথ রেফারেন্সর ওপর হাইকোর্ট দীর্ঘ ২৬ কার্যদিবস শুনানি গ্রহণ করেন এবং ৮ কার্যদিবসে রায় ঘোষণা শেষ করেন। আপিল ও ডেথ রেফারেন্সের এ শুনানি দীর্ঘ চার বছর পর গত ১৩ জুলাই হাইকোর্টে শুরু হয়।
নিম্ন আদালত যে পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন হাইকোর্টের রায়ে তার আংশিক পরিবর্তন হয়েছে। নিম্ন আদালতের রায়ের ভিত্তি ছিল, ১৫ আগষ্টের পট পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরাই একই বছর ২ নভেম্বরে খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থানে পরাজিত হওয়ার মুখে জেলহত্যা ঘটিয়েছে। এ সিদ্ধান্তের জন্য যে তথ্যকে গুরুত্ব দেওয়া হয় তা ছিল, বঙ্গভবন থেকে টেলিফোনে খুনিদের কারাগারে প্রবেশ করতে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। ১৫ আগস্টের পর থেকে তারা বঙ্গভবনেই থাকত। কিন্তু হাইকোর্ট খুনিদের কারাগারে প্রবেশ করতে টেলিফোনে দেওয়া নির্দেশের বিষয়টি সন্দেহাতীতভাবে বিশ্বাস করেননি।
বিশ্বাস না করার ক্ষেত্রে তিনজন সাক্ষীর সাক্ষ্যকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছে। খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল এমন একজন সাক্ষী কর্নেল শাফায়াত জামিল এ মামলায় সাক্ষ্য দিতে গিয়ে বলেছেন, ১৯৭৫ সালের ২ নভেম্বর মধ্যরাতেই তারা কেন্দ্রীয় টেলিফোন এক্সচেঞ্জের নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব নিজেদের হাতে নিয়েছিলেন।
অপর সাক্ষী রাষ্ট্রপতির তৎকালীন এডিসি কমান্ডার রাব্বানী তার সাক্ষ্যে বলেছেন, ২ নভেম্বর রাত ১১টার দিকেই তিনি ঘুমিয়েছেন। রাত ২টার দিকে রাষ্ট্রপতি তাকে মেসেঞ্জার পাঠিয়ে ডেকে আনেন। তার কক্ষেই টেলিফোন ছিল।
হাইকোর্ট এক্ষেত্রে আসামি পক্ষের কৌঁসুলিদের যুক্তিকে বিবেচনায় নিয়েছেন। তাদের যুক্তি হচ্ছে, বঙ্গভবনের টেলিফোন সচল থাকলে মেসেঞ্জার পাঠিয়ে এডিসিকে ডেকে আনার প্রয়োজন হতো না।
এ পর্যবেক্ষণ সম্পর্কে আদালত আরো নিশ্চত হয়েছেন নিহত জাতীয় নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলামের বোনের ছেলে সেনা কর্মকর্তা আনিসুজ্জামানের সাক্ষ্য থেকে। এ সাক্ষ্যে উল্লেখ রয়েছে, তিনি সে রাতে সদরঘাট এলাকায় দায়িত্ব পালন করছিলেন। উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে টেলিফোনে কেন্দ্রীয় কারাগারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি। একজন হাবিলদার পাঠিয়ে কারাগারে খবর নিয়ে জানতে পারেন বাসা থেকে পাঠানো নাশতা ফেরত গেছে। তিনিই সেদিন কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে সৈয়দ নজরুল ইসলামের লাশ গ্রহণ করেছিলেন।
হাইকোর্টের রায়ে এসব সাক্ষ্যের ভিত্তিতে সেই রাতে বঙ্গভবন থেকে টেলিফোন করে খুনিদের কারাগারে প্রবেশ করতে দেওয়ার তথ্যকে গুরুত্ব দেওয়ার বিপক্ষে মত প্রকাশ করা হয়েছে। আর এ সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই পারিপার্শিকতার আলোকে সরাসরি জড়িত ছিলেন না এমনসব অপরাধীকে সন্দেহাতীতভাবে চিহ্নিত করা যায়নি বলে আদালতের কাছে প্রতীয়মান হয়েছে।
আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, তদন্তকারী কর্তৃপক্ষ প্রকৃত হত্যাকারীদের খুঁজে বের করতে ব্যর্থ হয়েছে। কেবল তিনজন সাক্ষী ছাড়া অন্যরা মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি দফাদার মারফত আলী ও দফাদার আবুল হাসেম মৃধার বিরুদ্ধে জোরালো কোনো সাক্ষ্য দেয়নি। ফলে প্রত্যক্ষদর্শী নয় এমন তিন সাক্ষীর সাক্ষ্যের ওপর ভিত্তি করে হত্যা মামলায় কারো মৃত্যুদন্ড দেওয়া যৌক্তিক নয়।
আরো বলা হয়, যেসব সাক্ষী বঙ্গভবন ও কারাগারে উপস্টি’ত ছিলেন বলে সাক্ষ্য দিয়েছেন তা অবিশ্বাস্য। বঙ্গভবনের যেসব কর্মচারী সাক্ষ্য দিয়েছেন তাদের সাক্ষ্যও বিশ্বাসযোগ্য নয়। কারণ সে রাতে তারা কেন সেখানে উপস্থিত ছিলেন তারও কোনো বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখ্যা নেই।
হাইকোর্টের রায়ে আরো বলা হয়েছে, বঙ্গভবন ও কেন্দ্রীয় কারাগারে আগমন ও প্রস্থানের নিবন্ধন বই নিম্ন আদালতে উপস্থাপন করে হত্যাকারীদের বিষয়টি প্রমাণ করা হয়নি। তাছাড়া সেদিন বঙ্গভবনে সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের আসা-যাওয়া থেকে তাদের উদ্দেশ্য কী ছিল তা প্রমাণ হয় না।
আদালত বলেন, আসামিদের চিহ্নিত করার বিষয়টিও অসামঞ্জস্যপূর্ণ। সাক্ষীদের কেউ কেউ বলেছেন কারাগারে প্রবেশ করা সেনাবাহিনীর সদস্যরা খাকি পোশাক পরা ছিল। আবার কেউ বলেছেন কালো পোশাকের কথা। সব সাক্ষীর বক্তব্য ও মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী কর্নেল শাফায়াত জামিলের সাক্ষ্যের অসামঞ্জস্যতা এ মামলায় বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
হাইকোর্টে রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি আনিসুল হককে শুনানিতে সহায়তা করেন অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলাম সুজন, অ্যাডভোকেট মোশাররফ হোসেন কাজল, অ্যাডভোকেট এসএম রেজাউল করিম, ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস, অ্যাডভোকেট মমতাজ উদ্দিন মেহেদী এবং অ্যাডভোকেট মোতাহার হোসেন সাজু।
আসামি সাবেক সেনা কর্মকর্তা কর্নেল শাহরিয়ারের পক্ষে সাবেক অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল আবদুর রেজাক খান, মেজর মহিউদ্দিন এবং মেজর বজলুল হুদার পক্ষে ব্যারিস্টার আবদুল্লাহ আল মামুন, কর্নেল ফারুক রহমানের পক্ষে অ্যাডভোকেট সৈয়দ মিজানুর রহমান ছাড়াও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক তিন আসামি রিসালদার মোসলেম উদ্দিন, দফাদার মারফত আলী এবং দফাদার আবুল হাসেম মৃধার পক্ষে নিযুক্ত স্টেট ডিফেন্স অ্যাডভোকেট আবদুল হান্নান শুনানি পরিচালনা করেন।
বঙ্গবন্ধ শেখ মুজিবুর রহমান হত্যার পর ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, মনসুর আলী ও এএইচএম কামরুজ্জামানকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে হত্যা করা হয়। মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রবাসী সরকারের চার প্রধান ব্যক্তিত্বকে খুন করার পরদিন লালবাগ থানায় তৎকালীন কারাপুলিশের ডিআইজি কাজী আবদুল আওয়াল আসামি মোসলেমউদ্দিনসহ চারজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। মামলাটি পরবর্তীতে সরকারিভাবেই স্থগিত করা হয়। দীর্ঘ ২৩ বছর পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতা গ্রহণের পর মামলাটি পুনরুজ্জীবিত করে ১৯৯৮ সালের ১৫ অক্টোবর আসামি মোসলেমউদ্দিন, লে. কর্নেল সৈয়দ ফারুক রহমানসহ ২৩ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়।
দীর্ঘ ৬ বছরে মামলার বিচার প্রক্রিয়া শেষ করে ২০০৪ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকা মহানগর দায়রা জজ মোঃ মতিউর রহমান রায় দেন। রায়ে আদালত মোসলেমউদ্দিন, দফাদার মারফত আলী ও দফাদার আবুল হাসেম মৃধাকে মৃত্যুদন্ড দেন। নিল্ফু আদালতে ১২ জনের যাবজ্জীবন কারাদন্ড হয়।
হাইকোর্ট থেকে খালাস পাওয়া চারজন ছাড়াও যাবজ্জীবন পাওয়া অন্যরা হলো লে. কর্নেল খন্দকার আবদুর রশীদ (বরখাস্ত), লে. কর্নেল শরিফুল হক ডালিম, লে. কর্নেল (অব.) এমএইচএমবি নূর চৌধুরী, লে. কর্নেল (অব.) এএম রাশেদ চৌধুরী, মেজর (অব্যাহতি) আহাম্মদ শরিফুল হোসেন, ক্যাপ্টেল্টন (অব.) আবদুল মাজেদ, ক্যাপ্টেন (অব্যাহতি) মোঃ কিসমত হোসেন এবং ক্যাপ্টেন (অব.) নাজমুল হোসেন আনসার। রায়ের পরপরই দন্ডাদেশপ্রাপ্তরা আপিল করে। ল্যান্সার মহিউদ্দিন গত বছর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফেরত পাঠানোর পর জেল আপিল করে।
নিম্ন আদালতের বিচারে মেজর মোঃ খায়রুজ্জামান, কেএম ওবায়দুর রহমান, শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, নুরুল ইসলাম মঞ্জুর ও তাহেরউদ্দিন ঠাকুরকে এ হত্যাকান্ডের দায় থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি আপিল করবেন
রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি অ্যাডভোকেট আনিসুল হক হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবেন। তিনি সমকালকে বলেন, ‘রায়ে কোর্ট কী লিখবেন সেটা পরীক্ষা করে আইনি প্রতিকার চাইব। রায় সম্পর্কে এ মুহূর্তে শুধু এ কথাই বলতে পারি, আইনের নামে এটা প্রহসন। যা দুঃখজনক। বাস্তবতাকে অস্বীকার করা এই রায় বিচারের প্রতি সাময়িকভাবে হতাশাব্যঞ্জক হলেও শেষ পর্যন্ত ন্যায়বিচার পাওয়া যাবে বলে আমি বিশ্বাস করি। বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের ওপর আমার অগাধ বিশ্বাস আছে। তাই আইনি লড়াই চালিয়ে যাব।’
তিনি আরো বলেন, ‘এর আগেও হাইকোর্টের কিছু কিছু বিচারপতির ব্যবহার আমরা দেখেছি। কিন্তু পরবর্তীতে আপিল বিভাগ তা ঠিক করে দিয়েছেন। এখনো আপিল বিভাগের ওপর আমার বিশ্বাস ও আস্থা রয়েছে।’
সমকাল, ২৯ আগস্ট, ২০০৮
ফারুক, রশিদ, হুদাসহ মূল আসামিরা বেকসুর খালাস!

হাইকোর্টে জেলহত্যা মামলার রায় ঘোষণা * এ রায় প্রহসন: রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি
আশরাফ-উল-আলম
১৯৭৫ সালের প্রাসাদ ষড়যন্ত্র, ক্ষমতা দখল-পাল্টা দখলের ধারাবাহিকতায় রাতের অন্ধকারে কারাগারে বন্দী অবস্থায় জাতীয় চার নেতাকে হত্যার দায় থেকে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামি দফাদার মারফত আলী শাহ, দফাদার মো. আবুল হাশেম মৃধা ও যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামি লে. কর্নেল (বরখাস্তকৃত) সৈয়দ ফারুক রহমান, লে. কর্নেল (অব্যাহতিপ্রাপ্ত) সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান, মেজর (অব্যাহতিপ্রাপ্ত) বজলুল হুদা ও মেজর (অব.) এ কে এম মহিউদ্দিন আহাম্মদকে খালাস দিয়েছেন হাইকোর্ট।
একই সঙ্গে পলাতক এক আসামির মৃত্যুদন্ড বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট। নিম্ন আদালতে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত অপর আট আসামির সাজাও বহাল রাখা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামিদের মৃত্যুদন্ড নিশ্চিতকরণ (ডেথ রেফারেন্স) ও কারাগারে আটক যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের আপিলের রায় ঘোষণা করা হয়।
বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি আতাউর রহমান খানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের একটি বিশেষ বেঞ্চ এই রায় দেন। গত ১৩ জুলাই হাইকোর্টে জেলহত্যাসংক্রান্ত মৃত্যুদন্ড নিশ্চিতকরণ ও আপিল শুনানি শুরু হয়। গত ১৮ আগস্ট রায় ঘোষণা শুরু হয়। টানা আট কার্যদিবস ধরে রায় ঘোষণা করা হয়।
রায়ের প্রতিক্রিয়ায় রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি অ্যাডভোকেট আনিসুল হক সাংবাদিকদের বলেন, এ রায় প্রহসন, দুঃখজনক ও বাস্তবতাকে অস্বীকার করা। তিনি বলেন, রায়ে মনে হয়েছে যে একজন লোক কারাগারে এসে চারজনকে খুন করে চলে গেল। এর পেছনে যেন আর কেউ জড়িত নয়। হত্যার পেছনে কোনো পরিকল্পনা ছিল না বা কোনো ষড়যন্ত্র ছিল না। কিন্তু বাস্তবতা তো ভিন্ন। আনিসুল হক বলেন, ‘এ রায়ের বিরুদ্ধে আমরা আপিল করব। লড়াই চালিয়ে যাব। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের প্রতি আমাদের বিশ্বাস রয়েছে। শেষ পর্যন্ত আমরা ন্যায়বিচার পাব।’
হাইকোর্টের রায়ে পলাতক আসামি রিসালদার মোসলেম উদ্দিন ওরফে মুসলেম উদ্দিন ওরফে হিরন খান ওরফে মুসলেম উদ্দিন খানের মৃত্যুদন্ড বহাল রাখা হয়েছে। পলাতক অপর আট আসামি কর্নেল (অব.) খন্দকার আবদুর রশীদ, লে. কর্নেল (অব.) শরিফুল হক ডালিম, কর্নেল (অব.) এম বি নুর চৌধুরী, লে. কর্নেল (অব.) এ এম রাশেদ চৌধুরী, মেজর (অব.) আহম্মদ শরিফুল হোসেন, ক্যাপ্টেন (অব.) আবদুল মাজেদ, ক্যাপ্টেন (অব.) কিশমত হাশেম ও ক্যাপ্টেন (অব.) নাজমুল হোসেন আনসারের যাবজ্জীবন কারাদন্ড বহাল রেখেছেন আদালত।
২০০৪ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালত জেলহত্যা মামলার রায় দেন। রায়ে পলাতক তিন আসামিকে ফাঁসি ও ১২ জনকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেন। নৃশংসতম এই হত্যার পেছনে কোনো ষড়যন্ত্র খুঁজে না পাওয়ায় ঢাকা মহানগর দায়রা জজ মো. মতিউর রহমান ষড়যন্ত্রের অভিযোগে অভিযুক্ত চার রাজনীতিবিদ কে এম ওবায়েদুর রহমান, শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, নুরুল ইসলাম মঞ্জুর ও তাহেরউদ্দিন ঠাকুর এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা মেজর (অব.) খায়রুজ্জামানকে বেকসুর খালাস দেন। শুধু তা-ই নয়, ষড়যন্ত্রের কোনো প্রমাণ না পাওয়ায় মামলার ২০ আসামির সবাইকে ফৌজদারি কার্যবিধি ১২০(খ) ধারায় ষড়যন্ত্রের অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
জাতীয় চার নেতাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী অবস্থায় হত্যার ২৯ বছর পর দেওয়া নিম্ন আদালতের ওই রায়ে মূল পরিকল্পনাকারীদের সঙ্গে সেনা কর্মকর্তাদের যোগাযোগ ছিল বলে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু কারা ওই পরিকল্পনাকারী, বিচারিক আদালত তা চিহ্নিত করেননি। নিম্ন আদালতের রায় নিয়ে ব্যাপক সমালোচনাও হয়।
নিম্ন আদালত রায় দেওয়ার চার বছর পর আপিল আদালতের (হাইকোর্ট) রায়েও বলা হয়েছে, জেল হত্যাকান্ডে কোনো ষড়যন্ত্রের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। আপিল আদালতের দৃষ্টিতে জেল হত্যাকান্ড একটি বর্বরোচিত ও কাপুরুষোচিত ঘটনা মনে হলেও ঘটনার প্রকৃত নায়কদের চিহ্নিত করা যায়নি।
হাইকোর্ট বলেছেন, যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আট আসামি আপিল করেননি বলে তাঁদের বিরুদ্ধে আদালত কোনো সিদ্ধান্ত দিচ্ছেন না। তাঁরাও আপিল করলে রায় তাঁদের অনুকুলে যেত। সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের অভিমত, হাইকোর্টের দৃষ্টিতে একজনকেই দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে।
হাইকোর্টের অভিমত: হাইকোর্ট রায়ে বলেছেন, জেলহত্যা মামলায় যাঁরা সাক্ষ্য দিয়েছেন, তাঁদের পরস্পরের বক্তব্যের মধ্যে কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যায়নি। একজন সাক্ষীর সঙ্গে অন্য সাক্ষীর বক্তব্যের বৈপরীত্য রাষ্ট্রপক্ষের পুরো মামলাটিকে সন্দেহপূর্ণ মনে হয়েছে। এই সন্দেহের সুবিধাটুকু আসামিরাই পেয়ে থাকেন।
আদালত বলেছেন, এই মামলার আসামিরা পরস্পর ষড়যন্ত্র করেছেন বা ঘটনা সংঘটনের জন্য বঙ্গভবন থেকে টেলিফোনে কারা কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করেছেন−রাষ্ট্রপক্ষের এই অভিযোগ আদালতের কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়নি।
লে. কর্নেল (বরখাস্তকৃত) সৈয়দ ফারুক রহমান, লে. কর্নেল (অব্যাহতিপ্রাপ্ত) সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান, মেজর (অব্যাহতিপ্রাপ্ত) বজলুল হুদা ও মেজর (অব.) এ কে এম মহিউদ্দিন আহাম্মদসহ বেশকিছু সেনা কর্মকর্তা জেল হত্যাকান্ডের আগে বঙ্গভবনে অবস্থান করছিলেন বলে সাক্ষীরা তাঁদের সাক্ষ্যে বলেছেন। এ প্রসঙ্গে আদালতের রায়ে বলা হয়, সেনা কর্মকর্তারা কোন উদ্দেশ্য নিয়ে বঙ্গভবনে আসা-যাওয়া করেছিলেন, আদালতের কাছে তা সুস্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয়নি।
বঙ্গভবনের তৎকালীন কর্মকর্তারা এই মামলায় সাক্ষ্য দিয়ে সেনা কর্মকর্তাদের বঙ্গভবনে উপস্িথতির কথা বললেও আদালত তা বিশ্বাস করেননি। এ প্রসঙ্গে রায়ে বলা হয়েছে, ঘটনার আগে পরে কারা বঙ্গভবনে আসা-যাওয়া করেছেন, তা নির্ণয় করা হয়নি। ওই সময়কার বঙ্গভবনে রক্ষিত রেজিস্টার আদালতে উপস্থাপন করা হয়নি। উপস্থাপন করা হলে অবশ্যই বঙ্গভবনে যাতায়াতকারীদের চিহ্নিত করা যেত।
কারাগার সম্পর্কেও আদালত বলেন, ঘটনার সময়কার কারা রেজিস্টারগুলো আদালতে উপস্থাপন করা হয়নি বলে কারাগারে কে কে প্রবেশ করেছিলেন, তা চিহ্নিত হয়নি। এসব কারণে আদালত কারাগার ও বঙ্গভবনের সাক্ষীদের সাক্ষ্য বিশ্বাস করেননি।
কর্নেল শাফায়াত জামিলের সাক্ষ্য আদালত গুরুত্ব দিয়েছেন বলে রায়ে বলা হয়। কিন্তু ওই সাক্ষীর সাক্ষ্যকে অন্য কোনো সাক্ষী সমর্থন করেননি। যে কারণে সন্দেহের ঊর্ধ্বে গিয়ে মামলা প্রমাণ করতে পারেনি রাষ্ট্রপক্ষ।
মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামি মারফত আলী ও আবুল হাশেম মৃধার ঘটনাস্থলে উপস্িথতি সম্পর্কে তিনজন সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন। এই তিনজন সাক্ষী যে ঘটনাস্থলে উপস্িথত ছিলেন, তা আদালতের কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়নি বলে রায়ে বলা হয়েছে। আসামিদের শনাক্ত করার বিষয়ে সাক্ষীরা যে সাক্ষ্য দিয়েছেন, তাও আদালতের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হয়নি। অনেক গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীকে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য আদালতে উপস্িথত করা হয়নি বলে রায়ে বলা হয়েছে।
এই মামলার বিচার চলাকালে আসামিপক্ষ জেলহত্যার ঘটনা খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থানের ফল বলে দাবি করেছিল। এ প্রসঙ্গে রায়ে আদালত বলেছেন, খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে অভ্যুত্থান চেষ্টাকারীদেরও এই ঘটনায় সম্পৃক্ত করার বিষয়টি আদালত বিবেচনায় নিয়েছেন।
জেলহত্যা মামলাটি যথাযথভাবে তদন্ত হয়নি বলে আদালত বারবার তাঁর রায়ে উল্লেখ করেছেন। আদালত বলেছেন, তদন্ত কর্মকর্তা সঠিকভাবে তদন্ত করলে প্রকৃত দুষ্ককৃতকারীদের চিহ্নিত করা সম্ভব হতো।
ঘটনার বিবরণ: ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর একই বছরের ৩ নভেম্বর রাত চারটার দিকে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী ও কামরুজ্জামানকে নৃশংসভাবে খুন করা হয়। ৪ নভেম্বর তৎকালীন কারা উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি, প্রিজন) আব্দুল আউয়াল লালবাগ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় রিসালদার মোসলেম উদ্দিনের নাম উল্লেখ করে বলা হয়, তাঁর নেতৃত্বে চার-পাঁচজন সেনাসদস্য কারাগারে ঢুকে চার নেতাকে হত্যা করেন।
অভিযোগপত্র: ঘটনার পরদিন মামলা দায়ের করা হলেও এই মামলার তদন্ত ২১ বছর থেমে ছিল। বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকা সরকারগুলো জেলহত্যা মামলার তদন্তে বাধার সৃষ্টি করে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর তদন্ত শুরু হয়। ১৯৯৮ সালের ১৫ অক্টোবর পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ−সিআইডির এএসপি আবদুল কাহার আকন্দ ২১ জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। আসামি আবদুল আজিজ পাশা মামলা চলাকালে জিম্বাবুয়েতে মারা যাওয়ায় তাঁকে রায়ের আগে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। ২০০১ সালের ১৪ এপ্রিল সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়। মোট ৭৫ জন সাক্ষীর মধ্যে ৬৪ জনের সাক্ষ্য নেওয়া হয় এই মামলায়।
গতকালের আদালত: গতকাল রায় ঘোষণার সময় আদালতের নিরাপত্তাব্যবস্থা কিছুটা বাড়ানো হয়। তবে নিহতদের আত্মীয়রা কেউ উপস্িথত ছিলেন না। সংবাদকর্মীদের উপস্িথতি লক্ষণীয় হলেও কোনো রাজনীতিক বা সাধারণের উপস্িথতি চোখে পড়ার মতো ছিল না।
আইনজীবীদের প্রতিক্রিয়া: রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি অ্যাডভোকেট আনিসুল হক রায়ের প্রতিক্রিয়ায় বলেন, এর আগেও বিভিন্ন মামলায় হাইকোর্ট বাজে রায় দিয়েছেন। ওই সব রায় কিছুক্ষণের জন্য হতাশা তৈরি করলেও আপিল বিভাগে সে হতাশা কেটে গেছে। তিনি বলেন, সার্বিকভাবে স্বাধীনতার পক্ষের শক্তির প্রতিটি লোকই এ রায়ে মর্মাহত।
জেলহত্যা মামলার রাষ্ট্রপক্ষের আরেক আইনজীবী শ ম রেজাউল করিম বলেন, হাইকোর্টের রায় অপ্রত্যাশিত। যথেষ্ট সাক্ষ্য-প্রমাণ রয়েছে এই মামলায়। সাক্ষ্য ও ঘটনার পারিপার্শ্বিকতা সব আসামির সাজা বহাল রাখার জন্য যথেষ্ট। অ্যাডভোকেট মোতাহার হোসেন সাজু বলেন, জেল হত্যাকান্ড সম্পর্কে আপিল আদালতের দৃষ্টিভঙ্গি সঠিক নয়।
আসামিপক্ষের আইনজীবী ব্যারিস্টার আবদুল্লাহ আল-মামুন বলেন, জেলহত্যার সঙ্গে এই আসামিরা জড়িত ছিলেন না তা প্রমাণিত হয়েছে। খালেদ মোশাররফের অনুসারীরা এই ঘটনা ঘটিয়েছে, এটাও এ রায়ে স্পষ্ট হয়েছে। তিনি জেলহত্যা মামলার বিচার চেয়ে বলেন, ‘প্রকৃত অপরাধীদের খুঁজে বের করে শাস্তির ব্যবস্থা করা হোক।’
প্রথম আলো, ২৯ আগস্ট ২০০৮
তেহরানে উদ্ভট প্রচার
১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড ছিল নারকীয়। কিন্তু জনতার প্রতিক্রিয়া কী ছিল? অভ্যুত্থানের বিষয়ে ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাস ওয়াশিংটনে ১৬ আগস্ট তার ‘প্রাথমিক মন্তব্যে’ জানিয়েছেন : ‘প্রথম ২৪ ঘণ্টার ঘটনাবলি থেকে স্পষ্ট যে অভ্যুত্থান চ্যালেঞ্জ হবে না।’ আর জনগণের প্রতিক্রিয়া কী ছিল? এ প্রসঙ্গে ইউজেন বোস্টারের মন্তব্য : ‘জনগণ মুজিবের পতনে বিশেষ কোনো আনন্দ-উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেনি। বরং তাদের মনোভাব ছিল : শান্তভাবে মেনে নেওয়া এবং সম্ভবত কিছুটা স্বস্তির প্রকাশ। যে তুলনামূলক সহজভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর হয়েছে তা থেকে এটা বলা যায়, মুজিব এবং বাঙালিরা পরস্পর থেকে দূরে সরে গিয়েছিল। বাঙালিরা মুজিবের কাছ থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে নিয়েছিল, কারণ তিনি তাদের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। ডাইন্যাস্টির মনোভাবও তার মধ্যে কাজ করেছে। অন্যদিকে মুজিব জনগণ থেকে দূরে সরে গিয়েছিলেন, কারণ তিনি বাস্তবানুগ পরামর্শ গ্রহণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছিলেন এবং নিজেকে অসীম ক্ষমতাধর শাসক ভাবতে শুরু করেছিলেন।’
[যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের ভাষ্য থেকে স্পষ্ট, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় যে পরিবর্তন সংঘটিত হয় তাতে জনগণের প্রতিক্রিয়ায় আনন্দ-উচ্ছ্বাস ছিল না। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতাসীনরা বিশেষ করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার এবং তার সহকর্মীরা যে খুশি হয়েছিল তাতে সন্দেহ নেই। অসাংবিধানিক উপায়ে রাষ্ট্রপতিকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে খন্দকার মোশতাক আহমদের রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণকে বোস্টার অভিহিত করেছিলেন ‘তুলনামূলক সহজে ক্ষমতা হস্তান্তর’ হিসেবে। তিনি মুজিবের ‘পতন’ শব্দটিও ব্যবহার করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর দেশের শাসনভার যারা গ্রহণ করেছিলেন- খন্দকার মোশতাক আহমদ ও জিয়াউর রহমানসহ, তারা বিভিন্ন সময়ে দৃঢ়তার সঙ্গেই দাবি করছিলেন, ‘মুজিবের পতনে’ বাংলাদেশের জনতা আনন্দ-উল্লাস প্রকাশ করে। এ দাবি যথার্থ ছিল না। এটা ঠিক যে হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক গণবিক্ষোভ ঘটেনি। স্বাধীন দেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতিকে পরিবারের নারী-শিশুসহ নিষ্ঠুর উপায়ে হত্যার পর যে ধরনের প্রতিক্রিয়ার বিষয়ে শগ্ধিকত ছিল যুক্তরাষ্ট্র সেটাও দেখা যায়নি। কিন্তু এ থেকে হত্যাকা- মেনে নেওয়া বোঝায় না।]
অভ্যুত্থানের ২৪ ঘণ্টা পার না হতেই ঢাকাস্থ মার্কিন রাষ্ট্রদূত ওয়াশিংটনে নিশ্চিত খবর পাঠান : ‘এ পর্যন্ত প্রাপ্ত লক্ষণ থেকে ধারণা করা যায়, নতুন সরকারের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক এমনকি মুজিবের সময়ের তুলনায় অধিকতর আন্তরিক ও বন্ধত্বপূর্ণ হবে।’
[ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে ঠিক এটাই ঘটেছিল।]
১৯ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রের ইরানি দূতাবাস ওয়াশিংটনে হেনরি কিসিঞ্জারের কাছে তেহরানের একটি দৈনিকে বাংলাদেশের অভ্যুত্থান প্রসঙ্গে একটি বার্তা প্রেরণ করে। এর কপি ঢাকায় বোস্টারের কাছেও পাঠানো হয়। এর শিরোনাম ছিল : ‘ঢাকায় দক্ষিণপন্থি অভ্যুত্থান ঘটেছিল সোভিয়েতপন্থি অভ্যুত্থানের পর।’
প্রতিবেদনে বলা হয় : “ফারসি ভাষার পত্রিকা ‘কেইহান’ ১৭ আগ¯দ্ব তাদের প্রতিবেদনে দাবি করে, ১৫ আগস্ট বাংলাদেশে প্রকৃতপক্ষে দুটি অভ্যুত্থান ঘটেছিল। একটি শুরু হয় রাত সাড়ে তিনটায়- সোভিয়েতপন্থি এ অভ্যুত্থানে শেখ মুজিব নিহত হন। এরপর সকাল সাড়ে পাঁচটায় দক্ষিণপন্থি পাল্টা অভ্যুত্থান ঘটে, যাতে বামপন্থি অভ্যুত্থানকারীদের মৃত্যু ঘটে। আমাদের ধারণা এ তথ্যের সূত্র হচ্ছে বার্তা সংস্থা এএফপি, তাদের দাবি বাংলাদেশ সরকার এ মত সমর্থন করতে প্রস্তুতি নিচ্ছে। ইরানের অন্য ফারসি ও অন্যান্য ভাষার সংবাদপত্রগুলো ঘটনার এ ধরনের ভাষ্য উল্লেখ করেনি।”
‘এ ভাষ্যে বলা হয়, মুজিব যেসব মস্কোপন্থি বামপন্থিকে মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দিয়েছিলেন তারাই কয়েক মাস ধরে অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা আঁটছিলেন। এদের মধ্যে ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ [সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রী], আবদুস সামাদ আজাদ [বঙ্গবন্ধু তাকে মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দেননি, তবে তার পরিবর্তে ড. কামাল হোসেনকে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব দিয়ে তাকে কৃষি মন্ত্রণালয় দেওয়া হয়], মোহাম্মদ সোহরাব হোসেন, কামারুজ্জামান [আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করায় তার মন্ত্রিসভায় স্থান পাওয়ার সুযোগ ছিল না। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু দল ও সরকার পরিচালনায় ভিন্ন ব্যক্তি রাখার পক্ষে বলিষ্ঠ অবস্থান নিয়েছিলেন। পঞ্চাশের দশকে পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ মন্ত্রিসভা গঠনের পরও তিনি দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। তবে ১৯৭৫ সালের ৭ জুন বাকশাল গঠনের সময় তিনি এ অবস্থান থেকে সরে আসেন- তিনি একই সঙ্গে দেশের রাষ্ট্রপতি এবং দলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন], আবদুর রব [সম্ভবত আবুদর রব সেরনিয়াবাত, তাকে মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দেওয়া হয়নি। ১৫ আগস্ট তাকে পরিবারের কয়েকজন সদস্যসহ হত্যা করা হয়], কোরবান আলী [তাকে মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দেওয়া হয়নি। তিনি দলে বামপন্থি হিসেবেও পরিচিত ছিলেন না। বরং যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ হিসেবে তাকে মনে করা হতো। আশির দশকে তিনি এইচএম এরশাদের জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়ে ডেপুটি স্পিকারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন] এবং মস্কোয় নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত শামসুল হক। মুজিবের দু’জন কাজিন শহীদ ও মনির বামপন্থিদের সঙ্গে সহযোগিতা করেন। [প্রকৃতপক্ষে ভাগ্নে, মনির নয়, শেখ ফজলুল হক মনিকে বোঝানো হয়েছে। তিনি বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ ছিলেন। কিন্তু তাকে কেউই বামপন্থি মনে করত না। তাজউদ্দীন আহমদের বিরুদ্ধে তার অবস্থানও সুবিদিত। শেখ শহীদুল ইসলাম ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সময় তিনি ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্রলীগের সমন্বয়ে গঠিত একক ছাত্র সংগঠন জাতীয় ছাত্রলীগের সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর কোনো প্রতিবাদী আন্দোলন গড়ে তোলায় উদ্যোগী হননি। আশির দশকে তিনি সামরিক শাসক এইচএম এরশাদের মন্ত্রিসভায় যোগ দেন।] তেহরানের পত্রিকাটির দাবি : ‘সাবেক উপরাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামও বামপন্থিদের সঙ্গে ছিলেন। বামপন্থি এ গ্রুপের শঙ্কা ছিল, মুজিব পাশ্চাতের দিকে ঝুঁকে পড়বেন। দক্ষিণপন্থিরাও আগস্টের শেষদিকে একটি অভ্যুত্থান সংগঠনের পরিকল্পনা করছিলেন। কিন্তু তাদের লক্ষ্য ছিল শেখ মুজিবকে প্রতীকী ক্ষমতায় রেখেই এগিয়ে যাওয়া। খন্দকার মোশতাক ছাড়াও তাদের সঙ্গে আরো ছিলেন ট্রেড ইউনিয়ন নেতা আবদুল মান্নান [শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক], আবু সাঈদ চৌধুরী [সাবেক রাষ্ট্রপতি- ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করায় তাকে রাষ্ট্রপতি নিযুক্ত করা হয়। ১৯৭৪ সালে পদত্যাগ করেন। খন্দকার মোশতাক আহমদ তাকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিয়োগ করেছিলেন], অধ্যাপক ইউসুফ আলী [মুজিব মন্ত্রিসভার শিক্ষামন্ত্রী]। যখন তারা ১৪ আগস্ট দিবাগত গভীর রাতে বামপন্থিদের অভ্যুত্থানের খবর পান (সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যেসব গোয়েন্দা কাজ করছিল তাদের মাধ্যমে) তারা সঙ্গে সঙ্গে ঢাকা রেডিও সেন্টার দখল করে নেয় এবং অভ্যুত্থানের খবর প্রচার করে। তবে এ সময় মুজিবের হত্যাকাণ্ড বিষয়ে কিছুই বলা হয়নি। তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন সৈন্যরা তখন ধানমণ্ডি এবং অফিসার্স ক্লাবের আশপাশে লড়াইয়ে নিয়োজিত ছিল। এতে উভয়পক্ষে ব্যাপক সংখ্যক সৈন্য নিহত হয়। মস্কোপন্থি অভ্যুত্থানকারীরা ঢাকা আক্রমণের জন্য হাজার হাজার সশস্ত্র লোককে প্রস্তুত রেখেছিল কিন্তু দক্ষিণপন্থিরা রাজধানীকে ঘিরে ফেলে সামরিক আইন জারি করে এ পরিকল্পনা ব্যর্থ করে দেয়।’
[ইরানি সংবাদপত্রটির ভাষ্য ছিল একেবারেই আষাঢ়ে গল্প। কিন্তু ওই সময়ের দেশি-বিদেশি সংবাদপত্রে এ ধরনের অনেক খবর প্রকাশিত হয়। এতে যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের নামি-দামি অনেক সংবাদপত্রও অংশ নেয়। বিশেষভাবে এর লক্ষ্য ছিল শেখ মুজিবকে হেয় প্রতিপন্ন করা। তাকে হত্যা ব্যতীত যে কোনো উপায় ছিল না, সেটাও বলা হতে থাকে। ওই সময়ে ঘাতকরা প্রচার করেছিল, মুজিব চেয়েছিলেন তার পুত্র শেখ জামালকে সেনাবাহিনী প্রধান নিযুক্ত করা। শেখ ফজলুল হক মনি হবেন প্রধানমন্ত্রী এবং শেখ কামালকে দেওয়া হবে ছাত্র সংগঠনের দায়িত্ব। অভ্যুত্থান চলাকালে হতাহত নিয়ে গুজব থাকতেই পারে। যেমন- ১৫ আগস্ট গুজব ছিল, প্রধানমন্ত্রী মনসুর আলী নিহত হয়েছেন। অভ্যুত্থানের পেছনে তাজউদ্দীন আহমদ ছিলেন, এমন রটনাও প্রথমদিকে ছিল। এটা পরিকল্পিত হওয়ারই সম্ভাবনা। খন্দকার মোশতাক আহমদ ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালেই পাকিস্তানের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা চালান। তার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতরের যোগসাজশ ছিল। এটা ব্যর্থ করে দেওয়ার পেছনে মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের সক্রিয় তৎপরতা সুবিদিত। খন্দকার মোশতাক আহমদ ক্ষমতা দখল করার পর তাজউদ্দীন আহমদকে গ্রেফতার করে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রাখা হয়। ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্ভর সৈয়দ নজরুল ইসলাম, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী এবং আবু হেনা মোহাম্মদ কামারুজ্জামানের সঙ্গে তাকেও ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়।]
সমকাল, ২২ আগস্ট, ২০০৮ Permalink