ফখরুল ইসলাম হারুণ, আব্দুল্লাহ মামুন
সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো জার্মান বহুজাতিক কোম্পানি সিমেন্স এজির স্থানীয় প্রতিষ্ঠান সিমেন্স বাংলাদেশকে অর্থের বিনিময়ে কাজ পাইয়ে দিয়েছিলেন। এ জন্য কোকোকে কমপক্ষে এক কোটি ২৬ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছিল। এ পর্যন্ত পাওয়া তথ্যে জানা যায়, প্রতিশ্রুত টাকা দেওয়া হয়নি বলে কোকো অভিযোগ করলে অতিরিক্ত অর্থ হিসেবে ২০০৫ সালের সেপ্টেম্বরে তাঁর সিঙ্গাপুরের ব্যাংক হিসাবে এই অর্থ জমা পড়ে। সিঙ্গাপুরে কোকোর ব্যাংক হিসাবে যে ১১ কোটি ৬৬ লাখ টাকা জব্দ করা হয়েছে, তার মধ্যে এই টাকাও আছে।
বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে বাংলাদেশের সরকারি মোবাইল ফোন কোম্পানি টেলিটক প্রকল্পের কাজ পায় সিমেন্স ৫৩ লাখ ডলার ঘুষ দিয়ে। যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি ও ইতালির তদন্ত এবং সিমেন্স এজির নিজস্ব তদন্তে এসব তথ্য বেরিয়ে এসেছে। মার্কিন আদালতে ঘুষ দেওয়ার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়েছে সিমেন্স বাংলাদেশও। শাস্তিস্বরূপ তাদের পাঁচ লাখ ডলার জরিমানা দিতে হবে। গত ১২ ডিসেম্বর মার্কিন আদালত এই রায়দেন।
আদালতের এই রায়মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআইয়ের প্রতিবেদনে বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়েছে। এ ছাড়া মার্কিন বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমেও এই রায়ের বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশিত হয়েছে।
এ ছাড়া বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ঘুষ দেওয়ার অপরাধে সিমেন্সকে এ পর্যন্ত ১৬০ কোটি মার্কিন ডলার জরিমানা দিতে হয়েছে। আর নিজস্ব তদন্ত ও সংস্কারকাজে তাদের ব্যয় হয়েছে আরও ১০০ কোটি ডলার।
বাংলাদেশে বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসার পর দুর্নীতিবিরোধী অভিযান শুরু হলে অন্যান্য দেশের সঙ্গে মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাগ্রিমেন্ট বা পারস্পরিক আইনি সহায়তা চুক্তি না থাকার কারণে প্রথম দিকে বাইরে থেকে সাহায্য পাওয়া যায়নি। পরে সরকারের দুর্নীতিবিরোধী উদ্যোগে সাহায্যের ব্যাপারে বিশ্বের অনেক দেশ এগিয়ে এসেছে। সরকার বিভিন্ন দেশ থেকে পাওয়া বাংলাদেশি নাগরিকদের দুর্নীতিসংক্রান্ত তথ্য খতিয়ে দেখার জন্য অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়কে দায়িত্ব দিয়েছে। তারা এ সংক্রান্ত তথ্য পেতে শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্র, সিঙ্গাপুর ও ইতালি থেকে বিভিন্ন মামলার নথিপত্র ও তদন্ত প্রতিবেদন পেতে শুরু করেছে। শিগগির আরও এক ডজন সাবেক মন্ত্রী-রাজনীতিকের সম্পর্কে তথ্য অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় পেতে পারে বলে জানা গেছে।
বাংলাদেশের সরকারি মোবাইল ফোন কোম্পানি টেলিটকের কাজ পাওয়ার জন্য সিমেন্স বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ঘুষ দেওয়ার বিষয়টির বিস্তারিত জানা যায় যুক্তরাষ্ট্রের একটি আদালতের কাগজপত্র থেকে। বিশ্বব্যাপী দুর্নীতির অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের ডিস্ট্রিক্ট অব কলম্বিয়ার ডিস্ট্রিক্ট কোর্টে সিমেন্স এজির বিরুদ্ধে মামলা হয়। এর মধ্যে সিমেন্স বাংলাদেশও রয়েছে। ডিস্ট্রিক্ট জজ রিচার্ড জে লিওনের আদালতে শুনানি চলাকালে মূল প্রতিষ্ঠান সিমেন্স এজি তাদের দোষ স্বীকার করে নেয় এবং ৪৪ কোটি ৮৫ লাখ ডলার শোধ করতে সম্মত হয়। এর মধ্যে সিমেন্স বাংলাদেশের মতো সিমেন্স আর্জেন্টিনা ও সিমেন্স ভেনিজুয়েলাও আছে। এরা প্রত্যেকে পাঁচ লাখ ডলার করে জরিমানা দিতে সম্মত হয়েছে।
তিন যুগ আগে মার্কিন কংগ্রেসে পাস হওয়া একটি আইনে বলা হয়েছে, বাইরের দেশে কাজ পেতে কোনো মার্কিন কোম্পানি ঘুষ দিতে পারবে না। সিমেন্স মূলত জার্মান কোম্পানি হলেও তা নিউইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জে নিবন্ধিত। সে কারণে সিমেন্স বাংলাদেশের বিরুদ্ধে "দ্য ফরেন করাপ্ট প্র্যাকটিসেস অ্যাক্ট-১৯৭৭" আইনে মামলা করে যুক্তরাষ্ট্র সরকার। এ মামলার বিবরণে টেলিটকের কাজ পেতে সিমেন্স কী ধরনের অসাধু পন্থা অবলম্বন করেছিল, তার বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। কলম্বিয়ার ডিস্ট্রিক্ট কোর্টে পেশ করা যুক্তরাষ্ট্র সরকারের প্রতিবেদন, ইতালির সরকারি কৌঁসুলির দপ্তর থেকে পাঠানো অনুরোধপত্র ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যসংবলিত প্রতিবেদন প্রথম আলোর হাতে এসেছে।
সম্প্রতি ইতালির সরকারি কৌঁসুলি প্রয়োজনীয় তথ্য পেতে বাংলাদেশ সরকারের কাছে সহযোগিতা চেয়ে অনুরোধপত্র পাঠায়। এটি পাঠানো হয় বাংলাদেশে অবস্থিত ইতালি দুতাবাসকে। সঙ্গে পাঠায় সিমেন্স নিযুক্ত মার্কিন ল ফার্ম দেবেভয়স অ্যান্ড প্লিমটনের তৈরি তদন্ত প্রতিবেদনের সংক্ষিপ্তসার। এ তদন্ত প্রতিবেদনেও কীভাবে কোকো ও অন্যদের সঙ্গে ঘুষের লেনদেন হয়েছে, তার বিস্তারিত বর্ণনা আছে। ইতালি দুতাবাস ওই সংক্ষিপ্তসারসহ অনুরোধপত্রটি এ মাসের শুরুতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। আর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ মাসের মাঝামাঝি তা পাঠিয়ে দেয় আইন মন্ত্রণালয় ও অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে।
ইতালির সরকারি কৌঁসুলি লরা পেডিও স্বাক্ষরিত ওই অনুরোধপত্রে বাংলাদেশের আদালতের হস্তক্ষেপও চাওয়া হয়েছে। আরও তথ্য পেতে অনুরোধ জানানো হয়েছে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের দিলকুশা শাখায় পরিচালিত সিমেন্স বাংলাদেশের ব্যাংক হিসাবসহ (হিসাব নম্বর ০১-২০০৫৩৪৪-০১) একই শাখায় পরিচালিত এই দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের হিসাব পরীক্ষা করার। পাশাপাশি তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করার এবং তাঁদের বাসায় তল্লাশি চালানোরও অনুরোধ করা হয়।
এ প্রসঙ্গে যোগাযোগ করা হলে পররাষ্ট্রসচিব মো. তৌহিদ হোসেন গত বৃহস্পতিবার প্রথম আলোর কাছে সিমেন্স বাংলাদেশের দুর্নীতিবিষয়ক একটি চিঠি পাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, "চিঠিটি এসেছে বাংলাদেশের ইতালি দুতাবাস থেকে। পাওয়ার পরই চলতি মাসের মাঝামাঝি একাধিক কপি করে তা আইন মন্ত্রণালয় ও অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।" তিনি বলেন, "এ নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কিছু করার নেই। যাদের কিছু করার আছে, তাদের কাছেই তা পাঠানো হয়েছে।"
অ্যাটর্নি জেনারেল সালাহউদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, এটি অত্যন্ত গোপনীয় বিষয়। এ নিয়ে কোনো আলোচনা বা মন্তব্য করতে রাজি নন তিনি।
প্রায় একই ধরনের মন্তব্য করেন আইনসচিব কাজী হাবিবুল আউয়াল। গত বৃহস্পতিবার যোগাযোগ করা হলে তিনিও এ বিষয়ে কোনো কথা বলতে চাননি।
যেভাবে জড়িত হলেন কোকো ও তৎকালীন টেলিযোগাযোগমন্ত্রী ব্যারিস্টার আমিনুল হক: সিমেন্স ২০০০ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমল থেকেই টেলিটক মোবাইল ফোন প্রকল্পের কাজ পেতে চেষ্টা চালায়। এ জন্য ফজলে সেলিম ও জুলফিকার আলী নামের দুজনকে পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ দেয় সিমেন্স বাংলাদেশ। ২০০১ সালের ২৭ মার্চ সিমেন্স ইতালির বাণিজ্য বিভাগের একজন কর্মকর্তা ওই দুই পরামর্শকের সঙ্গে একটি চুক্তি সই করেন। এতে বলা হয়, ফজলে সেলিম ও জুলফিকার আলীর বিভিন্ন প্রকল্পে ১৫ বছরের সফলতার ইতিহাস আছে। সার্বিকভাবে জটিল এ কাজে ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত দুই রাজনৈতিক দল, দরপত্র মূল্যায়ন কমিটিতে বিটিটিবির শীর্ষ থেকে নিম্নপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করতে হবে। এ কারণে তাঁরা পরামর্শক ফি সাধারণ কমিশনের তুলনায় বেশি চেয়েছেন। ওই বছরের ২৪ এপ্রিল সিমেন্স বাংলাদেশ ও সিমেন্স ইতালি ওই দুই পরামর্শকের সঙ্গে ব্যবসাসংক্রান্ত কাজের ব্যাপারে তাঁদের কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়ে জানায়। সে সময় তাঁদের সঙ্গে মৌখিকভাবে চুক্তি হয় যে প্রকল্পের অর্থের মধ্যে ১০ শতাংশ তাঁদের দেওয়া হবে। যুক্তরাষ্ট্রে মামলার নথিতে এসব তথ্য দেওয়া আছে। এতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নাম সরাসরি না দিয়ে প্রতীকী শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। তবে ইতালির দেবেভয়স অ্যান্ড প্লিমটনের প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্টদের নাম সরাসরি এসেছে। বিটিসিএলের কর্মকর্তারাও তাঁদের পরিচয় নিশ্চিত করেছেন।
বিটিটিবির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার আগে টেলিটক প্রকল্পটির জন্য তিনবার খোলা দরপত্র আহ্বান করা হয় এবং তিনবারই অংশ নেয় সিমেন্স বাংলাদেশ। এতে অংশ নিয়ে কারিগরি অযোগ্যতার কারণে বাদ পড়ে সিমেন্স। পরবর্তী সময়ে পুরো প্রক্রিয়াটিই অবশ্য বাতিল করা হয়। দ্বিতীয়বার ২০০১ সালে দরপত্র আহ্বান করা হলে তালিকায় নাম ওঠে সিমেন্সের। কিন্তু সদ্য ক্ষমতায় বসা তৎকালীন চারদলীয় জোট সরকার তা বাতিল করে দেয়। অর্থের পরিমাণ পরিবর্তন ও সরবরাহকারীর সংখ্যা কমিয়ে দিয়ে তৃতীয় দরপত্র আহ্বান করা হয় ২০০২ সালে। কিন্তু ২০০২ সালের ১৮ ডিসেম্বর সিমেন্স ওই দরপত্রে যথাযথভাবে সনদ দেখাতে না পারায় অকৃতকার্য হয়।
মার্কিন আদালতে মামলার নথিতে বলা হয়, পরদিন ১৯ ডিসেম্বর সিমেন্স বাংলাদেশের তৎকালীন বাণিজ্য বিভাগের প্রধান খালেদ শামস সিমেন্স ইতালির একজন কর্মকর্তার কাছে ই-মেইলে জানান, ওই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য ফজলে সেলিম ও জুলফিকারের কোনো ক্ষমতা নেই। এ ধরনের প্রকল্পের জন্য অবশ্যই শীর্ষ রাজনৈতিক নেতা, মন্ত্রণালয় এবং বিটিটিবির শীর্ষ ও কারিগরি ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ থাকতে হবে। ওই দুই পরামর্শকের সঙ্গে টেলিযোগাযোগমন্ত্রীর ভালো যোগাযোগ নেই।
এ সময় মিজানুর রহমান নামের এক ব্যক্তিকে তৃতীয় পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ দেয় সিমেন্স বাংলাদেশ। তিনি তৎকালীন টেলিযোগাযোগমন্ত্রী ব্যারিস্টার আমিনুল হকের বেয়াই। সিমেন্সের বাণিজ্য বিভাগের তৎকালীন প্রধান খালেদ শামস (বর্তমানে নকিয়া সিমেন্স নেটওয়ার্ক বাংলাদেশের কান্ট্রি পরিচালক) তাঁকে এ অনুরোধ করেন। খালেদ শামস এ কথা মার্কিন তদন্তকারীদের বলেছেন। মামলার নথি থেকে জানা যায়, মিজানুর রহমান প্রথমেই নিজেকে মন্ত্রীর লোক বলে পরিচয় দেন এবং বলেন, দরপত্র বাতিল হলেও কাজটি তিনি সিমেন্সকে পাইয়ে দিতে পারবেন।
২০০৩ সালের শেষ দিকে ব্যারিস্টার আমিনুল হক বিটিটিবির প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বুঝিয়ে বাতিল দরপত্র সচল করতে সক্ষম হন বলে যুক্তরাষ্ট্রের মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে আরও বলা হয়েছে, মন্ত্রী এ সময় সিমেন্সের প্রস্তাব সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত কমিটিতে পাঠাতে বলেন। ২০০৪ সালের ২৬ জানুয়ারি ক্রয় কমিটি সিমেন্সের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। এ সময় ব্যারিস্টার আমিনুল হক খালেদ শামসকে জানান, তিনি সিমেন্সকে একটি ভালো অবস্থানে আনার জন্য বিষয়টি দেশের শীর্ষস্তরে নিয়ে যেতে চান।
মার্কিন আইন সংস্থার তদন্তে জানা যায়, ওই সময়ই আরাফাত রহমান কোকো নির্দিষ্ট কমিশনের (পারসেন্টেজ) বিপরীতে সিমেন্সকে ওই অবস্থা থেকে উদ্ধার করার জন্য খালেদ শামসের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। আর আর্থিক বিষয়টি সুরাহার জন্য তাঁরা যোগাযোগ করেন কোকোর প্রতিনিধি সাজিদ করিম নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে। সাজিদ করিম দরপত্রে অংশ নেওয়া চীনা কোম্পানি হুয়াইয়ের প্রতিনিধি হিসেবেও কাজ করেন বলে ইতালি সরকারের অনুরোধপত্রে জানানো হয়েছে। সিমেন্সের সঙ্গে হুয়াইও টেলিটক প্রকল্পের আংশিক কাজ পায়।
সব ধরনের নিয়মনীতি উপেক্ষা করে সিমেন্সের দরপত্র পাস হয় এবং ২০০৪ সালের ১৪ জুন বিটিটিবির সঙ্গে তাঁদের চুক্তি হয়। দরপত্র পাস হওয়ার খবরটি কোকোই প্রথম জানান খালেদ শামসকে।
মার্কিন আদালতের মামলার নথিতে বলা হয়েছে, ২০০৫ সালের মাঝামাঝি কোকো ও খালেদ শামসের মধ্যে কথা হয়। এ সময় কোকো তাঁকে প্রতিশ্রুত টাকা দেওয়া হয়নি বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। খালেদ ও সিমেন্সের নতুন প্রধান নির্বাহী রুডলফ ক্লিংক কোকোর সঙ্গে দেখা করে আশ্বস্ত করেন যে তাঁরা প্রতিশ্রুত অর্থ দেওয়ার ব্যাপারে আন্তরিক।
২০০৫ সালের সেপ্টেম্বরে পরামর্শক জুলফিকার আলী সিঙ্গাপুরে ইউনাইটেড ওভারসিজ ব্যাংকে (ইউওবি) কোকোর ব্যাংক হিসাবে এক লাখ ৮০ হাজার ডলার পাঠিয়ে দেন।
এ ব্যাপারে কথা বলার জন্য গত বৃহস্পতিবার দুপুরে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হয় খালেদ শামসের সঙ্গে। তখন তিনি বলেন, পরে কথা বলবেন। তখন থেকে গতকাল রোববার পর্যন্ত বারবার তাঁর সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হয়। তাঁর ফোনে রিং হলেও তিনি ফোন ধরেননি। এমনকি কথা বলার জন্য এসএমএস পাঠানো হলেও এর উত্তর দেননি।
সিঙ্গাপুরে কোকোর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও সিমেন্সের টাকা: সংশ্লিষ্ট একটি সুত্রে জানা গেছে, ২০০৪ সালের ১২ এপ্রিল সিঙ্গাপুরের এক নাগরিকের সহযোগিতায় কোকো ওই দেশে জেডএএসজেড ট্রেডিং অ্যান্ড কনসালটিং প্রাইভেট লিমিটেড নামে একটি কোম্পানি নিবন্ধন করেন এবং ইউওবি ব্যাংকে হিসাব খোলেন। সিঙ্গাপুরের ওই নাগরিকের সঙ্গে কোকোর পরিচয় করিয়ে দেন কিউসি শিপিংয়ের এক কর্মকর্তা। ব্যাংক হিসাবটি যৌথ হলেও তা থেকে অর্থ তোলার ক্ষমতা ছিল একমাত্র কোকোর। যুক্ত সই কিংবা এককভাবে চেকে কোকো সই করে অর্থ তুলতে পারতেন। সিঙ্গাপুরের ওই ব্যাংকে কোনো বিদেশি নাগরিকের হিসাব খোলার নিয়ম নেই। সে কারণেই ওই নাগরিকের সহযোগিতা নেন কোকো। সিঙ্গাপুরের ওই নাগরিকের বক্তব্য ইতিমধ্যে জমা পড়েছে অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসে।
লিখিত ওই বক্তব্যে জানা যায়, সিমেন্সের পরামর্শক জুলফিকার আলী ২০০৫ সালের ৬ অক্টোবর কোকোর ওই হিসাবে এক কোটি ২৬ লাখ টাকা (এক লাখ ৮০ হাজার মার্কিন ডলার) জমা করেন। এর আগে ওই ব্যাংক হিসাবে চায়না হার্বার ইঞ্জিনিয়ারিং নামে একটি প্রতিষ্ঠান ২০০৫ সালের ৬ মে ও ৩১ মে যথাক্রমে নয় লাখ ২০ হাজার ৯৮৬ এবং আট লাখ ৩০ হাজার ৬৫৬ সিঙ্গাপুরি ডলার জমা করে। ২০০৫ সালে চট্টগ্রামে কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান চায়না হার্বার ইঞ্জিনিয়ারিং।
১৮ ডিসেম্বর সংবাদ ব্রিফিংয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন−দুদক জানায়, সিঙ্গাপুর সরকার সে দেশের ব্যাংকে জমা কোকোর ১১ কোটি ৬৬ লাখ টাকা জব্দ করেছে। কোকোর জমা থাকা ও জব্দ করা টাকার বিশদ বিবরণ সিঙ্গাপুর সরকার বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষকে জানালে ওই অর্থের উৎসের ব্যাপারে দুদক অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু করেছে।
সুত্র জানিয়েছে, ২০০৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে কোকো সিঙ্গাপুরের ওই নাগরিককে জেডএএসজেডের নামে থাকা হিসাব বন্ধ করে ওই টাকা অন্য একটি ব্যাংকে জমা দিতে নির্দেশ দেন। ওই সময় ক্রেডিট ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাট কমার্শিয়াল (সিআইসি) নামে ফরাসি ব্যাংকের সিঙ্গাপুর শাখায় কোকোর টাকা স্থানান্তর করেন তিনি। তবে এবার ওই হিসাব কোকোর নামে নয়, ওই নাগরিকের নামেই করা হয়। এ সময় ২০ লাখ ১৩ হাজার ৪৬৭ দশমিক ৩৮ সিঙ্গাপুরি ডলার স্থানান্তর করা হয়। তবে গত বছরের নভেম্বরে তিনি ওই অর্থ আবারও আগের ব্যাংকে স্থানান্তর করেন বলে জানা যায়।
তবে সিঙ্গাপুরে জেডএএসজেড নামে কোম্পানি ছাড়াও ফারহিল কনসালটিং প্রাইভেট লিমিটেড নামে কোকোর আরেকটি কোম্পানির সন্ধান পাওয়া গেছে। সুত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশে টেলিফোন ব্যবসার জন্য দুবাইয়ের একটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে পরামর্শক হিসেবে কাজ করার জন্য ওই কোম্পানি খোলেন তিনি। ২০০৫ সালের ১৯ ডিসেম্বর ইউওবির অন্য একটি শাখায় সিঙ্গাপুরের ওই নাগরিককে হিসাব খুলতে নির্দেশ দেন কোকো। তবে এবার সিঙ্গাপুরের ওই ব্যক্তির নামেই হিসাব খোলা হয়। ২০০৬ সালের ১৭ ও ১৯ জানুয়ারি হিসাবটিতে যথাক্রমে এক লাখ ৪৯ হাজার ৯৮৮ ও এক লাখ নয় হাজার ৯৮৮ মার্কিন ডলার জমা পড়ে। হাবিবুর রহমান নামের এক ব্যক্তি দুবাই থেকে ওই টাকা জমা দেন। এরপর ২০০৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি কোকোর নির্দেশে সিআইসি ব্যাংকে ওই টাকা স্থানান্তর করেন।
কাজ পেতে সিমেন্সের ব্যয় ৩৭ কোটি টাকা: ২০০১ সালের মে থেকে ২০০৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত টেলিটক প্রকল্পের কাজ পেতে সিমেন্স অন্তত ৫৩ লাখ ৩৫ হাজার ৮৩৯ দশমিক ৮৩ মার্কিন ডলার বা ৩৭ কোটির বেশি টাকা ব্যয় করে। এ টাকা তিন পরামর্শক সাজিদ সেলিম, জুলফিকার আলী ও মিজানুর রহমানকে দেওয়া হয়। তাঁদের হাত ঘুরে টাকা চলে যায় প্রকল্পসংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিটিটিবির কর্মকর্তাদের কাছে। কিছু টাকা হাতে হাতে তুলে দেওয়া হয় বিটিটিবির কর্মকর্তা বা তাঁদের আত্মীয়দের হাতে।
২০০৩ সালের এপ্রিলে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সদস্য নাদির শাহ কোরেশীর কাছে ১০ হাজার ডলার, বিটিটিবির অপর এক কর্মকর্তার মেয়ের কাছে পাঁচ হাজার ডলার এবং মন্ত্রীর ভাগ্নের কাছে এক হাজার ডলার তুলে দেয় সিমেন্স। যুক্তরাষ্ট্রে দায়ের করা মামলার নথিতে এ বিষয়গুলোর সুস্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে। সিমেন্স তৃতীয় দরপত্রে সনদসংক্রান্ত ত্রুটির জন্য যে অকৃতকার্য হয়, তার থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য অর্থ দেওয়া হয় কোরেশীকে। ২০০২-এর শেষপ্রান্তে কিংবা পরের বছরের শুরুতে বিটিটিবির প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সদস্য ও বর্তমানে টেলিটকে কর্মরত ইউসুফ নিয়াজকে ১০ হাজার ডলারের বিনিময়ে পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় বলে মার্কিন আদালতের নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
একই সময়ে কোরেশীর অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে মূল্যায়ন কমিটির আরেক সদস্যকে সিমেন্স "প্রকৌশলী" হিসেবে নিয়োগ দেয়। ওই প্রকৌশলীর মেয়ের কাছে পাঁচ হাজার ডলার তুলে দেওয়া হয়। বিটিটিবির একাধিক সুত্র জানিয়েছে, ওই প্রকৌশলী চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে এখন আরেকটি সরকারি সংস্থায় জ্যেষ্ঠ পরামর্শক হিসেবে নিয়োজিত আছেন। ২০০৩ সালের ডিসেম্বরে মন্ত্রী ব্যারিস্টার আমিনুল হকের অনুরোধে তাঁর ভাগ্নেকে এক হাজার ডলার দিয়ে চুক্তি করে সিমেন্স।
যোগাযোগ করা হলে তৎকালীন বিটিটিবির পরিচালক (ক্রয়) নাদির শাহ কোরেশী (বর্তমানে বিটিসিএলের ইনফোবাহন প্রকল্পের পরিচালক) গত বৃহস্পতিবার প্রথম আলোকে জানান, সিমেন্স থেকে এক কানাকড়িও নেননি তিনি। প্রতিবেদনে ১২ হাজার ডলার গ্রহণকারী হিসেবে তাঁর নাম থাকার কথা জানানো হলে তিনি বলেন, সিমেন্সের লোকজন নিজেরা অর্থ খেয়ে হয়তো তাঁর নাম ঢুকিয়ে দিয়েছে।
প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সদস্য ইউসুফ নিয়াজ এখন টেলিটক বাংলাদেশ লিমিটেডের নেটওয়ার্ক পরিকল্পনা বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক। অর্থ গ্রহণের কথা অস্বীকার করে প্রথম আলোকে তিনি বলেন, "আমি যদি অবৈধভাবে সিমেন্স থেকে অর্থ গ্রহণ করে থাকি, তাহলে আমার তো জেল হওয়া উচিত।"
তৃতীয়বারের মতো দরপত্র বাতিল হলেও সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত কমিটিতে এ প্রকল্প উঠল কী করে বা ক্রয়সংক্রান্ত কমিটি অনুমোদন না করলেও শেষ পর্যন্ত তা পাস হলো কীভাবে−এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পাঁচ বছর আগের ঘটনা তিনি মনে করতে পারছেন না।
পরামর্শক ব্যয়ের সিংহভাগ অর্থ সরাসরি দেওয়া হয় তিন পরামর্শক ফজলে সেলিম, জুলফিকার আলী ও মিজানুর রহমানকে। মার্কিন আদালতে মামলার নথি থেকে জানা গেছে, সিমেন্স জানত ওই টাকার অংশ বা পুরো টাকা পরামর্শকদের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের কাছে দেওয়া হবে।
বিটিটিবির মোবাইল প্রকল্পের কাজ পাওয়ার পর সিমেন্স ২০০৬ সালের ২৩ মার্চ তিন পরামর্শক ফজলে সেলিম, জুলফিকার আলী ও মিজানুর রহমানের জন্য ক্যালিফোর্নিয়ার সানফ্রান্সিসকোতে সিমেন্সের ব্যাংক হিসাব থেকে ৮০ হাজার ডলার করে পাঠায়। এর আগে ২০০৪ সালের সেপ্টেম্বরে মিজানুর রহমান যুক্তরাষ্ট্রে যান এবং তাঁর হংকংয়ের একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে এই অর্থ জমা দেওয়া হয়। এর বাইরে তাঁদের বিভিন্ন সময়ে টাকা দেওয়া হয়।
দুর্নীতির অভিযোগে গত বছর গ্রেপ্তার হন আরাফাত রহমান কোকো। বর্তমানে সরকারের নির্বাহী আদেশে মুক্তি পেয়ে তিনি চিকিৎসার জন্য ব্যাংককে আছেন। সে জন্য এ ব্যাপারে কথা বলতে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
প্রথম আলো, ২২ ডিসেম্বর, ২০০৮
কাজ পেতে কোকোকে ঘুষ দেয় সিমেন্স
কোকোর ১১ কোটি ৬৬ লাখ টাকা জব্দ সিঙ্গাপুরে
কোকোর ১১ কোটি ৬৬ লাখ টাকা জব্দ সিঙ্গাপুরে অর্থের উৎস নিয়ে অনুসন্ধানে নেমেছে দুদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর ১১ কোটি ৬৬ লাখ টাকা জব্দ করেছে সিঙ্গাপুর সরকার। এই অর্থ সিঙ্গাপুরের ব্যাংকে কোকোর নামে জমা ছিল।
কোকোর এই জব্দ অর্থের বিশদ বিবরণ সিঙ্গাপুর সরকার বাংলাদেশকে জানিয়েছে। এরপরই ওই টাকার উৎসের ব্যাপারে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন−দুদক। গতকাল বৃহস্পতিবার নিয়মিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে দুদকের মহাপরিচালক কর্নেল হানিফ ইকবাল এ তথ্য জানান।
দুদক জানিয়েছে, ২০০৪ সালে সিঙ্গাপুরের এক ব্যক্তির সহযোগিতায় কোকো সে দেশে জেডএএসজেড ট্রেডিং অ্যান্ড কনসালটিং প্রাইভেট লিমিটেড নামের একটি কোম্পানি নিবন্ধন করেন এবং ব্যাংকে হিসাব খোলেন। জেডএএসজেড কোম্পানিটি কোকোর পরিবারের সদস্যদের আদ্যাক্ষর দিয়ে গঠিত। ওই ব্যাংক হিসাবে চায়না হার্বার ইঞ্জিনিয়ারিং নামের একটি প্রতিষ্ঠান ২০০৫ সালের ৬ মে ও ৩১ মে যথাক্রমে নয় লাখ ২০ হাজার ৯৮৬ এবং আট লাখ ৩০ হাজার ৬৫৬ সিঙ্গাপুর ডলার জমা দেয়। চায়না হার্বার ইঞ্জিনিয়ারিং ২০০৫ সালে চট্টগ্রামে কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণের কাজ পায়।
একই বছরের ২৯ জুলাই জেডএএসজেড কোম্পানির ওই হিসাব থেকে কোকোর সই করা চেকের মাধ্যমে আট লাখ ৩০ হাজার ৬৫৬ সিঙ্গাপুর ডলার অন্য একটি হিসাবে স্থানান্তর করা হয়। দ্বিতীয় হিসাবে আবারও চায়না হার্বার ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি থেকে আট লাখ ২৯ হাজার ৭০৬ সিঙ্গাপুর ডলার জমা করা হয়। আরও একটি সুত্র থেকে ওই বছরের ৬ অক্টোবর তিন লাখ তিন হাজার ২৫৪ সিঙ্গাপুর ডলার ওই হিসাবে জমা দেওয়া হয়। সিঙ্গাপুরের অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় থেকে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষকে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
দুদক আরও জানিয়েছে, গত বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি ফরাসি ব্যাংক ক্রেডিট ইন্ডাস্ট্রিয়েল এট কমার্সিয়ালের (সিআইসি) সিঙ্গাপুর শাখায় ২০ লাখ ১৩ হাজার ৪৬৭ সিঙ্গাপুর ডলার স্থানান্তর করা হয়। টাকা স্থানাস্তরে সিঙ্গাপুরের ওই ব্যক্তি ভুমিকা রাখেন।
কর্নেল হানিফ ইকবাল জানান, দুর্নীতিবিরোধী জাতিসংঘ সনদের (ইউএনসিএসি) পরিপ্রেক্ষিতে পারস্পরিক আইনি সহযোগিতার অনুরোধ চাওয়া হলে সিঙ্গাপুরের অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় এ ব্যাপারে বাংলাদেশকে সহযোগিতা করতে এগিয়ে আসে।
মহাপরিচালক বলেন, অনুসন্ধানে যদি প্রমাণ পাওয়া যায় যে জব্দ করা ওই টাকা অবৈধ উৎস থেকে পাচার করা হয়েছে, তাহলে তা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
কোকোর বিরুদ্ধে আগের দুই মামলা: কোকোর বিরুদ্ধে দুদক দুটি দুর্নীতির মামলার অভিযোগপত্র দায়ের করেছে। তবে মামলা দুটির কার্যক্রম হাইকোর্টের আদেশে স্থগিত আছে। এর একটি জ্ঞাতআয়বহির্ভুত সম্পদ অর্জন, অন্যটি গ্যাটকো নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে চট্টগ্রাম বন্দর ও ঢাকার কমলাপুর অভ্যন্তরীণ কনটেইনার ডিপোতে কনটেইনার ওঠানো-নামানোর কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগে। কোকোর বিরুদ্ধে ১১ লাখ ২০ হাজার টাকার তথ্য গোপনসহ দুই কোটি চার লাখ ৬১ হাজার টাকার জ্ঞাতআয়বহির্ভুত সম্পদ অর্জনের প্রমাণ পেয়ে অভিযোগপত্র দাখিল করে দুদক।
গত বছরের ৩ সেপ্টেম্বর গ্যাটকো দুর্নীতির মামলায় কোকোকে গ্রেপ্তার করে নিরাপত্তা বাহিনী। এ বছর ১৭ জুলাই তিনি সরকারের নির্বাহী আদেশে মুক্তি পান। বর্তমানে তিনি থাইল্যান্ডে রয়েছেন।
প্রথম আলো, ১৯ ডিসেম্বর, ২০০৮
ইসলামিস্ট মিলিট্যানসি ইন বাংলাদেশ
মৌলবাদী সন্ত্রাসের রাজনৈতিক মানচিত্র
হাসান ফেরদৌস
ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক, একসময় ঢাকার দৈনিক সংবাদ ও পরে বিবিসি বাংলা বিভাগের সাংবাদিক, আলী রীয়াজ ২০০৪ সালে বাংলাদেশে ইসলামি জঙ্গিবাদের উত্থান নিয়ে তাঁর প্রথম বইটি লেখেন। গড উইলিং: দি পলিটিক্স অব ইসলামিজম ইন বাংলাদেশ নামের সে বইটি কিছুটা চটজলদি লেখা হলেও তাতে বাংলাদেশে সহিংস মৌলবাদের উত্থানের মূল বৈশিষ্ট্য ও তার ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিতটি নিরপেক্ষ গবেষকের দৃষ্টিতে তিনি ঠিকই ধরতে পেরেছিলেন। তাঁর যুক্তি ছিল, ইসলামের রাজনীতিকরণের পেছনে তাঁদের যে দায়-দায়িত্ব, দেশের মূলধারাভুক্ত রাজনৈতিক দল ও নেতৃত্ব তা থেকে ছাড় পেতে পারেন না। দেশের প্রতিটি প্রধান রাজনৈতিক দল ও নেতা সর্বগ্রাহ্য কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হয়ে নিজেদের বৈধতা খুঁজতে ধর্মের দিকে হাত বাড়ান। এরই ফলে ক্রমেই ধর্ম ও রাষ্ট্রের ভেতর বিভাজনরেখা বিলুপ্ত হয় এবং রাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানেই বাংলাদেশে ইসলামি রাজনীতির উত্থান ঘটে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি−দুই প্রধান দলই সে অপরাধে অপরাধী। এই দুই মধ্যপন্থী ও আপসকামী দলের পাশাপাশি কোনো প্রগতিশীল সামাজিক-গণতান্ত্রিক দল বা বামঘেষা আন্দোলন বাংলাদেশে দানা বাঁধতে পারেনি। এর ফলে যে শুন্যতার সৃষ্টি হয়, তার নরম ও উর্বর মাটিতেই মৌলবাদী শক্তি নিজেদের সংহত করার উদ্দাম ও সাহস খুঁজে পায়।
তাঁর নতুন বই, ইসলামিস্ট মিলিট্যানসি ইন বাংলাদেশ (রুটলেজ, নিউইয়র্ক, ২০০৮), তাতে রীয়াজ ইসলামবাদীদের উত্থানের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণের পাশাপাশি এর ভু-রাজনৈতিক মানচিত্র খোঁজার চেষ্টা করেছেন। সহিংস ইসলামি রাজনীতি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সম্ভাবনার প্রতি কত বড় হুমকি ও সে হুমকি মোকাবিলার পথ কী, তা নির্দেশের চেষ্টাও করেছেন তিনি। এই বইয়ে আলী রীয়াজ সাংবাদিক নন, তিনি নিয়মনিষ্ঠ রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। পূর্বনির্ধারিত কোনো সিদ্ধান্ত আরোপের বদলে তিনি এখানে তথ্য ও উপাত্তের ভিত্তিতে যৌক্তিক উপসংহারে পৌঁছাতে তাঁর স্পষ্ট আগ্রহ দেখিয়েছেন। তাঁর যুক্তি, বাংলাদেশে সহিংস ইসলামি মৌলবাদের উত্থান মূলত একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া, দেশি ও বিদেশি শক্তিচক্র একযোগে তার পক্ষে কাজ করেছে। ১৯৭৫-পরবর্তী ঘটনাবলির ওপর আলোকপাত করে তিনি এই যৌক্তিক সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতর মৌলবাদ ও মৌলবাদী রাজনীতি সমর্থন ও আশ্রয় পাওয়ার ফলেই এই সহিংস মৌলবাদ এত দ্রুত প্রসার লাভ করেছে। তাঁর সবচেয়ে নির্দয় সমালোচনার লক্ষ্য ২০০১ থেকে ২০০৬-এর বিএনপির নেতৃত্বে চারদলীয় জোট সরকার। এই পাঁচ বছরে রাষ্ট্র ও রাষ্ট্র-বহির্ভুত শক্তিসমূহ (স্টেট ও নন-স্টেট অ্যাকটর্স) একে অপরের সঙ্গে হাত মিলিয়ে কাজ করেছে, একে অপরকে ব্যবহার করেছে। শুধু তাদের রাজনৈতিক ও আদর্শগত উদ্দেশ্য সাধনই সেই সহযোগিতার লক্ষ্য নয়, তাদের দীর্ঘমেয়াদি রণকৌশলের অংশ হিসেবেও এই আঁতাত কাজ করেছে।
আলী রীয়াজ তাঁর গ্রন্থে প্রায় গোড়া থেকেই ইসলামিক দলগুলোর রাজনৈতিক ক্ষমতার বিষয়ে যে ‘মিথ’ চালু রয়েছে, তা ভাঙার চেষ্টা করেছেন। ১৯৯১-এর নির্বাচনের সময় থেকে জামায়াত ও অন্য ইসলামি দলগুলো বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘কিং-মেকার’-এর ভুমিকা নেয়, অথচ তাদের নীতি ও আদর্শের প্রতি দেশের জনসমর্থন বরাবরই নামমাত্র। জামায়াতে ইসলামী একমাত্র ইসলামবাদী রাজনৈতিক দল, যাদের কোনো অর্থবহ জনসমর্থন রয়েছে। কিন্তু সেই সমর্থনও গত ১৫ বছরে ক্রমাগত নিম্নমুখী হয়েছে। যেমন, ১৯৯১ সালের নির্বাচনে এই দল মোট ভোটের ১২ দশমিক ১৩ শতাংশ অর্জন করে। পরবর্তী প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনেই তাদের বাক্সে ভোটের পরিমাণ ক্রমেই কমে আসে। ২০০১ সালের নির্বাচনে তাদের প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক পরিমাণ দাঁড়ায় ৪ দশমিক ২৯ শতাংশ। অন্য কথায়, এক দশকে জামায়াতে ইসলামীর সমর্থন−ভোটপ্রাপ্তি ও জনসমর্থনের নিক্তিতে ৪১ শতাংশ হ্রাস পায়। তার পরেও দল হিসেবে জামায়াতের রাজনৈতিক সমর্থন আদায়ে দেশের দুই প্রধান দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি যে উদগ্র আগ্রহ দেখিয়েছে, তা থেকে এই অব্যাহত পতনের কোনো ইঙ্গিত পাওয়া অসম্ভব।
রাজনীতির যে ইসলামিকরণ, তার ফল বাংলাদেশে প্রকাশিত হয়েছে নানাভাবে। সহিংসতা তার একটি প্রধান ও চুড়ান্ত প্রকাশ, কিন্তু তার অন্য প্রকাশও রয়েছে। যেমন, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর ক্রমাগত বৈষম্য ও সহিংসতা, নাগরিক সংস্কৃতির বিজাতিকরণ এবং মাদ্রাসা শিক্ষার উল্লম্ফন। আলী রীয়াজ তাঁর গ্রন্েথ এই শেষ বিষয়টি, অর্থাৎ মাদ্রাসা শিক্ষার প্রসার নিয়ে তথ্যভিত্তিক দীর্ঘ বিশ্লেষণ করেছেন। ইসলামি মৌলবাদীদের উত্থানের সঙ্গে মাদ্রাসা-ব্যবস্থার অবিশ্বাস্য প্রসার যে গুণগতভাবে সম্পৃক্ত, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ জাগে না, যখন আমরা এই তথ্যের মুখোমুখি হই যে ১৯৭২ থেকে ২০০৪ সালের ভেতর বাংলাদেশে উত্তর-প্রাথমিক মাদ্রাসার সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে ৭৩২ শতাংশ। কোনো সন্দেহ নেই, আওয়ামী লীগের আমলেও মাদ্রাসা-ব্যবস্থা জোরদার হয় এবং আওয়ামী সরকার মাদ্রাসা-ব্যবস্থার প্রতি সমর্থন তাদের নির্বাচনী রণকৌশলের অঙ্গীভুত করে। কিন্তু বিএনপির জোটের শেষ পাঁচ বছরে মাদ্রাসার যে প্রসার ও তার সহিংস পরিবর্তন ঘটে, পূর্ববর্তী যেকোনো সময়কে তা হার মানায়। ২০০১−২০০৫ সালে দেশের সাধারণ শিক্ষা খাতে বৃদ্ধি যেখানে ৯ দশমিক ৭৪ শতাংশ, সেখানে মাদ্রাসা খাতের সম্প্রসারণ দাঁড়ায় ২২ দশমিক ২২ শতাংশ। একই সময়ে সাধারণ শিক্ষা খাতে মোট শিক্ষার্থীর পরিমাণ বৃদ্ধি পায় ৩৩ শতাংশ, কিন্তু মাদ্রাসা ছাত্রদের সংখ্যা বৃদ্ধি পায় ৫৮ শতাংশ।
মাদ্রাসাগুলো, বিশেষ করে বেসরকারি কওমি মাদ্রাসার অনেকাংশ যে সন্ত্রাসী তৎপরতার সঙ্গে জড়িত, সে কথা পত্র-পত্রিকায় নানা সময়ে লেখা হলেও তার অকাট্য প্রমাণ মেলেনি। সে প্রমাণ মিলল ১৭ আগস্ট ২০০৫ সালে দেশজুড়ে সন্ত্রাসী বোমাবাজির পর। নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে আটক অনেক সন্ত্রাসীই পরে স্বীকার করেছে, তারা বিভিন্ন মাদ্রাসাকে প্রশিক্ষণ ও সদস্য সংগ্রহের কাজে ব্যবহার করেছে। ‘আহলে হাদিস আন্দোলন বাংলাদেশ’ ও ‘মাহাদুত তারবিয়ালতিল ইসলামিয়া মাদ্রাসা’ এই কাজে অগ্রণী ভুমিকা পালন করে। গোয়েন্দা সুত্রের তথ্য উদ্ধৃত করে আলী রীয়াজ জানিয়েছেন, সরকারিভাবে এ পর্যন্ত ২৩৩টি মাদ্রাসা চিহ্নিত করা হয়েছে, যেখানে সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো।
বিএনপির আমলে ২০০১−২০০৬-এর ভেতর সহিংস ইসলামপন্থীদের তৎপরতা যে আশ্চর্য রকম বেড়ে যায়, তার প্রধান কারণ সরকারের ভেতরেই ইসলামপন্থী নীতিনির্ধারকের ভুমিকা গ্রহণ করে। এই নীতিনির্ধারকেরা বাংলাদেশে ইসলামি সন্ত্রাসের অস্তিত্ব এক কথায় কেবল নাকচই করে দেননি, অনেক ক্ষেত্রে সন্ত্রাসীদের সহযোগী হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করেন। আলী রীয়াজ সে ধরনের বেশ কিছু প্রামাণিক উদাহরণ দিয়েছেন। হারকাতুল জিহাদ নামে যে সংগঠনটি পরে সন্ত্রাসী হিসেবে আন্তর্জাতিক কালো তালিকাভুক্ত হয়, তার অন্যতম নেতা আতাউর রহমান খান−যিনি বিন লাদেন বাহিনীর সদস্য হিসেবে আফগান-যুদ্ধে অংশ নেন−১৯৯১ সালে বিএনপির সদস্য হিসেবে আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হন। মুফতি শহিদুল ইসলাম, যিনি ১৯৯৮ সালে বিন লাদেনের সঙ্গে বৈঠক করেন বলে নিজেই স্বীকার করেছেন, ২০০১ সালে বিএনপির সমর্থিত ইসলামী ঐক্যজোটের ব্যানারে আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হন। কুখ্যাত বাংলা ভাইয়ের ‘জাগ্রত মুসলিম জনতা’ রাজশাহীর বাগমারায় প্রথম যে প্রকাশ্য জনসভা করে, তাতে অন্যতম বক্তা ছিলেন স্থানীয় বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। ২০০৪ সালের মে মাসে রাজশাহীতে বাংলা ভাই যখন তাঁর সন্ত্রাসী অভিযানের শীর্ষে, সে সময় রাজশাহীর বিভাগীয় পুলিশের ইনস্পেক্টর জেনারেল নুর মোহাম্মদ সাংবাদিকদের জানান, সরকারি আইন প্রয়োগকারী বাহিনী বাংলা ভাইকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজে সাহায্য করছে। ১৮ আগস্ট ২০০৬ সালে ঢাকায় ‘সচেতন ইসলামি জনতা’ এই ব্যানারে যে প্রকাশ্য জনসভা করে, তাতেও নিষিদ্ধ ‘হুজি’র একাধিক নেতা (যেমন, মুফতি শফিকুর রহমান, মৌলানা মোহাম্মদুল্লাহ) এবং চারদলীয় জোটের একাধিক নেতা (যেমন, শাইখুল হাদিস) অংশ নেন।
রাষ্ট্র নিজেই যখন সন্ত্রাসের লালন ও পালন করে, তখন সে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন না হয়ে উপায় থাকে না। বুদ্ধিজীবীদের একাংশ এ ব্যাপারে বিপদঘণ্টি বাজানোর চেষ্টা করেছে, সরকারি ঢਆা-নিনাদে তা সহজেই ঢাকা পড়ে যায়। কিন্তু থলের বেড়াল বেরোয়, যখন খোদ বাংলা ভাই সে কথা ফাঁস করে দেন। ২০০৬ সালের শেষ মাথায় আদালতের বিচারে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর তিনি সক্ষোভে বলেন, সরকারই তাঁদের ইসলামি হুকুমাত কায়েমের জন্য কাজ করতে উৎসাহিত করেছিল। এখন তারাই সে কাজের জন্য মানুষের তৈরি আইনে তাঁকে শাস্তি দিচ্ছে। তিনি প্রশ্ন করেন, ‘এ অবস্থায় এই সরকারের কি শাস্তি পাওয়া উচিত?’
সরকারের গোয়েন্দা বিভাগের ভেতরও ইসলামি জঙ্গিদের সহযোগী রয়েছে, তারাও সরাসরি বা অপ্রত্যক্ষভাবে ইসলামি জঙ্গিদের তৎপরতার সঙ্গে যুক্ত, এই দাবির সপক্ষে রীয়াজ একটি আগ্রহোদ্দীপক তথ্য দিয়েছেন। গোপন নথিপত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেছেন, ১৯৯৯ সালে এক প্রতিবেদনে গোয়েন্দা বিভাগ জানায় যে দক্ষিণ আফ্রিকাভিত্তিক ‘সারভেন্টস অব সাফারিং হিউম্যানিটি’ নামের একটি ইসলামি সাহায্য সংস্থার সঙ্গে বাংলাদেশের ইসলামি জঙ্গিদের যোগসাজশ রয়েছে, তারা সন্ত্রাসী তৎপরতার সঙ্গে যুক্ত, এই অভিযোগে ১৯৯৯ সালের ২৫ জানুয়ারি দুজন বিদেশিসহ পাঁচ সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করা হয়। কিন্তু ইসলামী ঐক্যজোটের এক নেতা, যিনি ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির সমর্থনে আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হন, তাঁর হস্তক্ষেপে তিন বাংলাদেশিকেই মুক্তি দেওয়া হয়। সন্ত্রাস ও রাজনীতির এই সহাবস্থানে তিক্ত এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা সে সময়ে তাঁর সরকারি প্রতিবেদনে লেখেন: ‘আমাদের কাছে স্পষ্ট প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও দুর্নীতির কারণে ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার যোগসাজশে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তৎপরতায় নিয়োজিত লোকদের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান অর্থহীন হয়ে পড়ছে। তাদের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় সন্ত্রাসীরা নতুন করে বলীয়ান হবে। বিদেশি শক্তিসমূহও উপলব্ধি করবে, সন্ত্রাসীদের চাপের মুখে সরকার কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থাই গ্রহণ করবে না।’
১/১১-এর পট পরিবর্তনের পর রাষ্ট্র ও ইসলামি সন্ত্রাসের এই যোগসাজশের বিষয়টি আমাদের কাছে আরও খোলামেলাভাবে ধরা পড়ে। আলী রীয়াজ অতি সম্প্রতি প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে এই দুইয়ের যে আন্তসম্পর্ক, তার একটি তাত্ত্বিক কাঠামো প্রস্তুত করেছেন। তার ওপর ন্যস্ত ভুমিকা পালনে রাষ্ট্রের ব্যর্থতাকে রীয়াজ ‘রাষ্ট্রের অনুপস্িথতি’ বলে চিহ্নিত করেছেন। ‘অনুপস্িথত রাষ্ট্র’ যখন দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর স্বার্থ তুলে ধরার বদলে শুধু একটি ক্ষুদ্র দল বা গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষা করে, তখন এক ধরনের শুন্যতার জন্ন নেয়। এই শুন্যতার সুযোগেই বাম ও ডান উভয়পক্ষের চুড়ান্তবাদী গ্রুপসমূহ চাঙা হয় এবং কাজ করার জায়গা খুঁজে নেয়। দেশের উত্তরাঞ্চল, যা সবচেয়ে অনুন্নত ও অবহেলিত অঞ্চলের অন্তর্গত, সেখানে এই দুই ধরনের চুড়ান্তবাদীরাই তাদের তৎপরতার ক্ষেত্র নির্বাচন করে। ২০০১−২০০৬ সালে যে চারদলীয় জোট ক্ষমতা গ্রহণ করে, তারা সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক বিবেচনা থেকেই ডানপন্থী গ্রুপসমূহ অর্থাৎ ইসলামি জঙ্গিদের সঙ্গে হাত মেলায়। তাদের জন্য এর পেছনে যেমন আদর্শিক চাপ ছিল, তেমনি ছিল নির্বাচনী রণকৌশলগত বিবেচনা।
তাঁর প্রথম গ্রন্েথ রীয়াজ বাংলাদেশে ইসলামবাদের উত্থানকে প্রধানত একটি ‘বাংলাদেশি ঘটনা’ বলে প্রমাণে আগ্রহী ছিলেন। এই গ্রন্েথ তিনি সে বিশ্লেষণ কিছুটা বদলে নিয়েছেন। বাংলাদেশে ইসলামি জঙ্গিবাদের উত্থানের পেছনে মধ্যপ্রাচ্য থেকে ওয়াহাবি ইসলাম রপ্তানি যেমন এক ধরনের ভুমিকা রেখেছে, তেমনি পরিবর্তিত ভু-রাজনৈতিক বাস্তবতাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে উপমহাদেশের দেশসমূহের ঐতিহ্যিক বৈরিতা ও প্রভাব-বলয় নির্মাণের প্রতিযোগিতা। এই প্রতিযোগিতায় ভারত ও পাকিস্তানের ‘স্যাটেলাইট’ হিসেবে ব্যবহূত হয়েছে বাংলাদেশ। রীয়াজ ভারত ও পাকিস্তান একে অপরের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি প্রভাবিত করার লক্ষ্যে কীভাবে বাংলাদেশ, বিশেষ করে তার সহিংস দলসমূহকে ব্যবহার করেছে, তার তথ্যপূর্ণ বিবরণ দিয়েছেন। বিদেশি অর্থ, বিশেষত মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন এনজিওর মাধ্যমে পাঠানো অর্থ, কীভাবে সন্ত্রাসীকাজে ব্যবহূত হয়েছে, সে কথাও তিনি জানিয়েছেন। তাঁর হিসাবে, ২০০৬ সাল নাগাদ বাংলাদেশে ৩৪টির মতো ইসলামি এনজিও তৎপর ছিল, যাদের মাধ্যমে সেখানে বছরে ২০০ কোটি টাকার হাতবদল হয়। বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিরাও জেনে বা না জেনে অর্থ প্রদানের মাধ্যমে সন্ত্রাসী কাজে মদদ দিয়েছে।
ইসলামি সন্ত্রাসীরা তাদের প্রয়োজনে ‘পপুলার কালচার’, যেমন সংগীত ও নাটককে ব্যবহার করে থাকে, মৌলবাদী উত্থানের সম্পুরক কারণ হিসেবে সম্পুর্ণ নতুন এই দিকটির প্রতি আলী রীয়াজ তাঁর এই গ্রন্েথ আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। ওয়াজ-মাহফিলের মাধ্যমে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ও অন্যরা ধর্মের নামে সহিংসতার পক্ষে উসকানি দিয়েছেন, তা কোনো গোপন কথা নয়। টেপ ও সিডিতে তাঁর ভাষণ দেশের ভেতর যেমন, দেশের বাইরেও এন্তার মেলে। আটককৃত একাধিক সন্ত্রাসী স্বীকার করেছেন, সাঈদীর ভাষণ শুনেই তাঁরা অনুপ্রাণিত হয়েছেন (যেমন, চট্টগ্রামের জেএমবির নেতা জাবেদ ইকবাল)। ইসলামি মৌলবাদীদের আয়োজিত ওয়াজ-মাহফিলের পর সহিংসতা ঘটেছে, এমন ঘটনাও অজ্ঞাত নয়। যেমন, ব্র্যাক অফিস জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে, গ্রামীণ ব্যাংক আক্রান্ত হয়েছে। নব্বইয়ের গোড়া থেকেই এসব ঘটনা ঘটেছে, কিন্তু বাংলাদেশে আমরা কখনোই খুব গুরুত্বের সঙ্গে দুয়ে দুয়ে চার মিলিয়ে দেখিনি। এর সঙ্গে যে জঙ্গিবাদ যুক্ত, তাও ভেবে দেখিনি।
ইসলামি সংগঠনগুলো তাদের উগ্র ধর্মীয় মতাদর্শ প্রচারে কীভাবে সংগীতের ব্যবহার করে থাকে, আলী রীয়াজ তার প্রতিও আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। এ ব্যাপারে অগ্রণী ভুমিকা পালন করেছে ইসলামী ছাত্র শিবিরের সাংস্কৃতিক অঙ্গসংগঠন সাইমুম শিল্পীগোষ্ঠী। তাদের নেতৃত্বে ২০টি ইসলামি সাংস্কৃতিক দল নিয়ে যে জাতীয় সাংস্কৃতিক জোট গঠিত হয় ২০০৫ সালের ২৩ আগস্ট, তারা প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে একটি ‘ইসলামিক কনসার্ট’-এর আয়োজন করে। কনসার্ট শব্দটি বিজাতীয়, অনৈসলামিক, তা সত্ত্বেও এর ব্যবহার থেকে স্পষ্ট তরুণ ও যুবকদের আকর্ষিত করাই এই ‘সাংস্কৃতিক’ আক্রমণের লক্ষ্য। আলী রীয়াজ রণাঙ্গন শিল্পীগোষ্ঠী নামের আরেক ইসলামি দলের কথাও জানিয়েছেন। এই দল শুধু ২০০৪ সালেই ২০টি ইসলামি গানের সিডি প্রকাশ করে। তালিবান নামে যে অ্যালবাম তারা প্রকাশ করে, তার ভুমিকা হিসেবে এই ভাষ্যটি রয়েছে (আমি রীয়াজের উদ্ধৃত ইংরেজি থেকে বাংলায় রূপান্তর করছি): ‘ওসামা বিন লাদেন বিশ শতকের এক মহান মুজাহিদের নাম। আমেরিকা তাঁর নামে কেঁপে ওঠে। আজ সমগ্র বিশ্বে ওসামা বিন লাদেন বীরের সম্মানে ভুষিত। আমেরিকাকে টুকরো টুকরো করে ফেলতে হলে আমাদের দরকার ওসামা। ওসামা, মুসলিম বিশ্বের তুমি নেতা, সারা বিশ্বের মুজাহিদিনদের কাছে তুমি সবচেয়ে প্রিয়। তুমিই আমাদের জিহাদের অগ্রনায়ক।’
আলী রীয়াজের বক্তব্য অনুসারে, বাংলাদেশে ইসলামি সন্ত্রাসবাদ ঠেকাতে হলে একটা প্রধান কাজ হবে সন্ত্রাসী কারা তা চিহ্নিত করা এবং তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ। ইসলামবাদীদের দাবি উদ্ধৃত করে তিনি বলেছেন, বাংলাদেশে ইসলামি সন্ত্রাসীর মোট সংখ্যা ১০ থেকে ১৫ হাজার হবে। ‘আফগান মুজাহিদ’ শুধু এমন সন্ত্রাসীর সংখ্যাই তাঁর হিসাবমতে, দুই হাজার ৮০০। নির্ঘণ্ট হিসেবে আলী রীয়াজ বাংলাদেশের প্রধান ইসলামি জঙ্গি দল ও তাদের প্রধান নেতাদের একটি তালিকা ও বিবরণ সংযুক্ত করেছেন। সন্ত্রাসীদের নেটওয়ার্ক ও তাদের অর্থ ও অস্ত্রের উৎস খুঁজে বের করা ও উৎস নির্মুল করা তাঁর বিবেচনায়, বাংলাদেশের নিজের স্বার্থে অগ্রাধিকারের সঙ্গে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। তিনি শিক্ষা সংস্কারের পাশাপাশি দেশের দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারের ওপরও জোর দিয়েছেন। তাঁর প্রস্তাব, সন্ত্রাসীদের ঠেকাতে হলে বাংলাদেশের মানুষ ও সরকারকে একযোগে কাজ করতে হবে। এই কাজটা সবার, কোনো এক দলের বা গ্রুপের নয়, সে কথা তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন।
২.
আলী রীয়াজের এই গ্রন্থটি আমার বিবেচনায় বাংলাদেশে ইসলামি জঙ্গিবাদের ওপর লেখা এ যাবৎকালের মধ্যে সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ বই। এখানে তিনি কেবল জঙ্গিবাদ নামের অসুখের লক্ষণ ও গতি-প্রকৃতি চিহ্নিত করেননি, কীভাবে সে রোগের নিরাময় সম্ভব তার প্রতিও আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন। তাঁর বিবেচনায়, যে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে বাংলাদেশের লালন, সেখানে ধর্মের নামে সহিংসতার কোনো স্থান কোনো কালেই ছিল না। রাষ্ট্রের মদদ ছাড়া এই জঙ্গিবাদের উত্থান সেখানে অসম্ভব ছিল।
ক্ষীণদৃষ্টি রাজনীতিক তাঁদের আশু স্বার্থ উদ্ধার করতে সাধ করে এই সর্বনাশ ডেকে এনেছেন, রীয়াজের এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে আমি একমত, কিন্তু এই অপরাধে আমি শুধু রাজনীতিককে একা দায়ী করতে রাজি নই। আমরা সবাই কমবেশি সে অপরাধে অপরাধী। ইসলামিবাদের প্রধান বহির্লক্ষণ সন্ত্রাস হতে পারে, কিন্তু বাংলাদেশে জঙ্গিদের হাতে বোমাবাজি একমাত্র সমস্যা নয়, এমনকি তা প্রধান সমস্যাও নয়। বোমাবাজির যে সমস্যা, তা আইনশৃঙ্খলার সঙ্গে জড়িত। দেশের আইন ও বিচার বিভাগ চাইলে সে সমস্যা নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে। কোনো কোনো জঙ্গির বিচার ও ফাঁসির ভেতর দিয়ে সে কথার প্রমাণও মিলেছে। কিন্তু বাংলাদেশে ধর্মীয় প্রশ্নে যে অসহিষ্ণুতা ক্রমেই জন্ন নিচ্ছে ও প্রসারিত হচ্ছে, সহিংস ও জঙ্গি সংস্কৃতির সেটিই প্রধান আশ্রয়স্থল। তাদের নিজস্ব ধর্মীয় প্রেসক্রিপশনে ধরা না পড়লে যেকোনো ধরনের সাংস্কৃতিক কাজকেই অনৈসলামিক বলে ইসলামি জঙ্গিরা তার ওপর চড়াও হচ্ছে। তারা যা দাবি করছে, অল্প-স্বল্প প্রতিবাদের পর আমরাও তা মেনে নিচ্ছি। আর একবার যা মেনে নেওয়া হচ্ছে, তাই ‘নর্ম’ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
এর একটা প্রধান কারণ, দেশের মূলধারাভুক্ত দলসমূহ প্রায় বিনা বাক্য ব্যয়ে মৌলবাদী রাজনীতি ও সংস্কৃতির এজেন্ডা নিজেদের এজেন্ডা বলে তার আত্তীকরণ করে ফেলেছে। ফলে মৌলবাদী সংস্কৃতি দেশের প্রধান সংস্কৃতিতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সংখ্যালঘুদের প্রতি অব্যাহত আক্রমণ ও মেয়েদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণের ভেতর এই সংস্কৃতির প্রকাশ এখনো ঘটছে হরহামেশা। মধ্যরাতে শহরের রাস্তায় মেয়েরা আক্রান্ত হলে সব দোষ মেয়েদের, এ কথা বলতে সমাজের দায়িত্বসম্পন্ন লোকেরাও দ্বিধা করেন না। আহমদিয়াদের বিরুদ্ধে ‘কাফন মিছিল’ খুব পুরোনো কোনো ঘটনা নয়। পত্রিকার পাতায় নিরীহ কার্টুনকে উপলক্ষ করে সেকুলার তথ্য-মাধ্যমের ওপর আক্রমণ হচ্ছে প্রকাশ্যে, কার্যত প্রশাসনিক সমর্থনে। আমাদের দৃষ্টির গোচরে বাংলা ভাষার ওপরও আক্রমণ চলছে। ব্রাਜ਼ণ্যবাদের বিরুদ্ধে জাগরণ বলে কেউ কেউ বাংলা ভাষার ইসলামিকরণের বস্তাপচা যুক্তি এখনো তুলে ধরছেন। এর কোনোটাই তুচ্ছ বলে অগ্রাহ্য করার উপায় নেই।
ইসলামি জঙ্গিদের ঠেকাতে হলে তাই প্রতিরোধটা হতে হবে দুমুখো। একদিকে তা হতে হবে রাজনৈতিক, অন্য দিকে সাংস্কৃতিক। সংস্কৃতি বরাবরই বাঙালিদের রাজনৈতিক অধিকার অর্জনে হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছে। ’৫২ থেকে ’৭১−এই দীর্ঘ সময়ের সব পর্যায়েই আমাদের সামগ্রিক আন্দোলনে অবিভাজ্য উপাদান হয়ে থেকেছে সংস্কৃতি। এখন আবার প্রয়োজন সেই হাতিয়ারকে সামনে আনা, তাকে ছাতার মতো তুলে ধরা। বাঙালিদের নিজস্ব সংস্কৃতি যত প্রবল ও ব্যাপকভাবে আমাদের দৈনন্দিন সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার অবিভাজ্য উপাদানে পরিণত হবে, জঙ্গিদের প্রভাব তত হ্রাস পাবে। ক্লাসে হিজাব পরে আসার দাবি জানান বিশ্ববিদ্যালয়ের যে শিক্ষক, বাহবা পাওয়ার বদলে তিনি তাহলে ধিਆারের সম্মুখীন হবেন। জঙ্গিদের বিরুদ্ধে সেটিই হবে প্রকৃত বিজয়।
সংস্কৃতির মতো রাজনীতিতেও জঙ্গিদের অনুপ্রবেশ ঘটেছে ধীরে ধীরে। গুটি গুটি পায়ে ঢুকে এখন তারা কার্যত রাজনীতির একটি প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে। প্রথমে বিরোধী রাজনীতির ছত্রচ্ছায়ায় এবং পরে সরকারের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় জঙ্গিরা রাজনৈতিক ‘লেজিটিমেসি’ও অর্জন করেছে। তাদের এখন আর অবৈধ বা বে-আইনি বলে বাতিল করা যাবে না। এসব দলের বিরুদ্ধে একাত্তরের কথা বলে যত গালই দিই না কেন, আজকের বাংলাদেশে তাদের রাজনৈতিকভাবে মার্জিনাল ভাবাও মোটেই বুদ্ধিমানের কাজ নয়। নির্বাচনের ভেতর দিয়ে দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অন্তর্ভুক্ত হয়েছে তারা। ঠিক সে কারণে এসব দলকে ‘মডারেট ইসলামিক পার্টি’ বলে স্বীকৃতিও দিয়েছে আমাদের কোনো কোনো বিদেশি অভিভাবক। এখন তাদের ঠেকানোর একমাত্র উপায় হলো, এসব দলকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করে তাদের সেই লেজিটিমেসিটুকু ছিনিয়ে আনা। আমি জামায়াত বা ইসলামি দলগুলো নিষিদ্ধ হোক সে দাবি তুলছি না, কিন্তু মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলো মৌলবাদ প্রতিহত করার লক্ষ্যে যদি ন্যুনতম একটি কর্মসুচিতে একমত হয়, তাহলে জামায়াত-জাতীয় দলগুলোকে একঘরে করা কঠিন নয়।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে যাঁরা ভাবেন, এমন সবাইকে সে দাবিটি তুলতে হবে, জোরে, আরও জোরে।
ইসলামিস্ট মিলিট্যানসি ইন বাংলাদেশ−আলী রীয়াজ, রুটলেজ, নিউইয়র্ক ২০০৮
নিউইয়র্ক, ২ জুলাই ২০০৮
প্রথম আলো, ২২ আগস্ট, ২০০৮ Permalink
আসামিরা কে কোথায়
বিশেষ প্রতিনিধি
জেলহত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকা একমাত্র আসামি এবং যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পাওয়া ৮ জনই বর্তমানে পলাতক। সাজা কার্যকর করার জন্য যাদের কারাগারে বন্দি রাখা হয়েছিল, গতকাল হাইকোর্টের রায়ে তারা এই হত্যাকাণ্ডের দায় থেকে এখন মুক্ত।
২০০৪ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকা মহানগর দায়রা জজ মতিউর রহমান জেলহত্যা মামলার রায়ে তাদের অভিযুক্ত করেন। সে রায়ে চার নেতার ঘাতক হিসেবে রিসালদার মোসলেহ উদ্দিন, দফাদার শরাফত আলী ও আবুল হোসেন মৃধাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। নেপথ্যের নায়ক হিসেবে এছাড়াও ১২ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
মৃত্যুদণ্ড পাওয়া তিন আসামিই ঘটনার পর থেকে পলাতক।
নিম্ন আদালতে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয় লে. কর্নেল (বরখাস্ত.) সৈয়দ ফারুক রহমান, কর্নেল (অব.) সৈয়দ শাহরিয়ার রশীদ, মেজর (অব.) বজলুল হুদা, লে. কর্নেল খন্দকার আবদুর রশীদ (বরখাস্ত), লে. কর্নেল (অব.) শরিফুল হক ডালিম, লে. কর্নেল (অব.) এমএইচএমবি নূর চৌধুরী, লে. কর্নেল (অব.) একেএম মহিউদ্দিন আহম্মদ এসি, লে. কর্নেল (অব.) এএম রাশেদ চৌধুরী, মেজর (অব্যাহতি) আহাম্মদ শরিফুল হোসেন, ক্যাপ্টেন (অব.) আবদুল মাজেদ, ক্যাপ্টেন (অব্যাহতি) মোঃ কিসমত হোসেন ও ক্যাপ্টেন (অব.) নাজমুল হোসেন আনসারের।
যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত ১২ আসামির চারজন আপিল করেন। বর্তমানে জেলে বন্দি এই চারজনকেই আদালত খালাস দিয়েছেন। যদিও বঙ্গবন্ধু হত্যামামলায় মৃত্যুদ- হওয়ায় তাদের এখনো কারাগারেই থাকতে হবে। এরা হচ্ছেন লে. কর্নেল (বরখাস্ত) সৈয়দ ফারুক রহমান, কর্নেল (অব.) সৈয়দ শাহরিয়ার রশীদ, মেজর (অব.) বজলুল হুদা ও লে. কর্নেল (অব.) একেএম মহিউদ্দিন আহমেদ।
হাইকোর্টের রায়ে অপর ৮ জন সম্পর্কে কিছুই বলা হয়নি। তাদের আপিল না থাকায় নিম্ন আদালতের রায়ই এখনো তাদের জন্য বহাল রয়েছে বলে আইনজীবীরা জানিয়েছেন।
ঘটনার পর থেকেই এরা বিদেশে পলাতক। লে. কর্নেল (অব.) খন্দকার আবদুর রশীদ বর্তমানে বেলজিয়ামে। তবে তিনি লিবিয়ায় বসবাস করেন বলেও কেউ কেউ দাবি করছেন। লিবিয়ার নেতা গাদ্দাফির ছোট ভাইয়ের ব্যবসায়িক অংশীদার হিসেবে ইতালির মিলান শহরেও রশীদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছিল। ১৯৯৮ সালে সে দেশের সরকারের সহযোগিতা নিয়ে ওই প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা হয়। তারপর থেকে তার আবাস যেখানেই হোক না কেন, নিয়মিত ইউরোপ এবং মধ্যপ্রাচ্যে যাতায়াত আছে তার।
লে. কর্নেল (অব.) শরিফুল হক ডালিম অধিকাংশ সময় থাকেন হংকং। পাকিস্তান, লিবিয়া ও কেনিয়ায় তার একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আছে।
লে. কর্নেল (অব.) এএম রাশেদ চৌধুরী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে অন্যত্র চলে গেছেন বলে বছর দুই আগে খবর প্রকাশিত হয়।
লে. কর্নেল (অব.) এমএইচএমবি নূর চৌধুরী বর্তমানে কানাডায়।
ক্যাপ্টেল্টন (অব.) আবদুল মাজেদ ভারতে থাকলেও অনেকদিন ধরে তার কোনো খবর নেই। একই অবস্থা মেজর (অব্যাহতি) আহাম্মদ শরিফুল হোসেন, ক্যাপ্টেন (অব্যাহতি) মোঃ কিসমত হোসেন ও ক্যাপ্টেন (অব.) নাজমুল হোসেন আনসারেরও।
সমকাল, ২৯ আগস্ট, ২০০৮
তেহরানে উদ্ভট প্রচার
১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড ছিল নারকীয়। কিন্তু জনতার প্রতিক্রিয়া কী ছিল? অভ্যুত্থানের বিষয়ে ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাস ওয়াশিংটনে ১৬ আগস্ট তার ‘প্রাথমিক মন্তব্যে’ জানিয়েছেন : ‘প্রথম ২৪ ঘণ্টার ঘটনাবলি থেকে স্পষ্ট যে অভ্যুত্থান চ্যালেঞ্জ হবে না।’ আর জনগণের প্রতিক্রিয়া কী ছিল? এ প্রসঙ্গে ইউজেন বোস্টারের মন্তব্য : ‘জনগণ মুজিবের পতনে বিশেষ কোনো আনন্দ-উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেনি। বরং তাদের মনোভাব ছিল : শান্তভাবে মেনে নেওয়া এবং সম্ভবত কিছুটা স্বস্তির প্রকাশ। যে তুলনামূলক সহজভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর হয়েছে তা থেকে এটা বলা যায়, মুজিব এবং বাঙালিরা পরস্পর থেকে দূরে সরে গিয়েছিল। বাঙালিরা মুজিবের কাছ থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে নিয়েছিল, কারণ তিনি তাদের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। ডাইন্যাস্টির মনোভাবও তার মধ্যে কাজ করেছে। অন্যদিকে মুজিব জনগণ থেকে দূরে সরে গিয়েছিলেন, কারণ তিনি বাস্তবানুগ পরামর্শ গ্রহণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছিলেন এবং নিজেকে অসীম ক্ষমতাধর শাসক ভাবতে শুরু করেছিলেন।’
[যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের ভাষ্য থেকে স্পষ্ট, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় যে পরিবর্তন সংঘটিত হয় তাতে জনগণের প্রতিক্রিয়ায় আনন্দ-উচ্ছ্বাস ছিল না। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতাসীনরা বিশেষ করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার এবং তার সহকর্মীরা যে খুশি হয়েছিল তাতে সন্দেহ নেই। অসাংবিধানিক উপায়ে রাষ্ট্রপতিকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে খন্দকার মোশতাক আহমদের রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণকে বোস্টার অভিহিত করেছিলেন ‘তুলনামূলক সহজে ক্ষমতা হস্তান্তর’ হিসেবে। তিনি মুজিবের ‘পতন’ শব্দটিও ব্যবহার করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর দেশের শাসনভার যারা গ্রহণ করেছিলেন- খন্দকার মোশতাক আহমদ ও জিয়াউর রহমানসহ, তারা বিভিন্ন সময়ে দৃঢ়তার সঙ্গেই দাবি করছিলেন, ‘মুজিবের পতনে’ বাংলাদেশের জনতা আনন্দ-উল্লাস প্রকাশ করে। এ দাবি যথার্থ ছিল না। এটা ঠিক যে হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক গণবিক্ষোভ ঘটেনি। স্বাধীন দেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতিকে পরিবারের নারী-শিশুসহ নিষ্ঠুর উপায়ে হত্যার পর যে ধরনের প্রতিক্রিয়ার বিষয়ে শগ্ধিকত ছিল যুক্তরাষ্ট্র সেটাও দেখা যায়নি। কিন্তু এ থেকে হত্যাকা- মেনে নেওয়া বোঝায় না।]
অভ্যুত্থানের ২৪ ঘণ্টা পার না হতেই ঢাকাস্থ মার্কিন রাষ্ট্রদূত ওয়াশিংটনে নিশ্চিত খবর পাঠান : ‘এ পর্যন্ত প্রাপ্ত লক্ষণ থেকে ধারণা করা যায়, নতুন সরকারের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক এমনকি মুজিবের সময়ের তুলনায় অধিকতর আন্তরিক ও বন্ধত্বপূর্ণ হবে।’
[ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে ঠিক এটাই ঘটেছিল।]
১৯ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রের ইরানি দূতাবাস ওয়াশিংটনে হেনরি কিসিঞ্জারের কাছে তেহরানের একটি দৈনিকে বাংলাদেশের অভ্যুত্থান প্রসঙ্গে একটি বার্তা প্রেরণ করে। এর কপি ঢাকায় বোস্টারের কাছেও পাঠানো হয়। এর শিরোনাম ছিল : ‘ঢাকায় দক্ষিণপন্থি অভ্যুত্থান ঘটেছিল সোভিয়েতপন্থি অভ্যুত্থানের পর।’
প্রতিবেদনে বলা হয় : “ফারসি ভাষার পত্রিকা ‘কেইহান’ ১৭ আগ¯দ্ব তাদের প্রতিবেদনে দাবি করে, ১৫ আগস্ট বাংলাদেশে প্রকৃতপক্ষে দুটি অভ্যুত্থান ঘটেছিল। একটি শুরু হয় রাত সাড়ে তিনটায়- সোভিয়েতপন্থি এ অভ্যুত্থানে শেখ মুজিব নিহত হন। এরপর সকাল সাড়ে পাঁচটায় দক্ষিণপন্থি পাল্টা অভ্যুত্থান ঘটে, যাতে বামপন্থি অভ্যুত্থানকারীদের মৃত্যু ঘটে। আমাদের ধারণা এ তথ্যের সূত্র হচ্ছে বার্তা সংস্থা এএফপি, তাদের দাবি বাংলাদেশ সরকার এ মত সমর্থন করতে প্রস্তুতি নিচ্ছে। ইরানের অন্য ফারসি ও অন্যান্য ভাষার সংবাদপত্রগুলো ঘটনার এ ধরনের ভাষ্য উল্লেখ করেনি।”
‘এ ভাষ্যে বলা হয়, মুজিব যেসব মস্কোপন্থি বামপন্থিকে মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দিয়েছিলেন তারাই কয়েক মাস ধরে অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা আঁটছিলেন। এদের মধ্যে ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ [সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রী], আবদুস সামাদ আজাদ [বঙ্গবন্ধু তাকে মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দেননি, তবে তার পরিবর্তে ড. কামাল হোসেনকে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব দিয়ে তাকে কৃষি মন্ত্রণালয় দেওয়া হয়], মোহাম্মদ সোহরাব হোসেন, কামারুজ্জামান [আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করায় তার মন্ত্রিসভায় স্থান পাওয়ার সুযোগ ছিল না। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু দল ও সরকার পরিচালনায় ভিন্ন ব্যক্তি রাখার পক্ষে বলিষ্ঠ অবস্থান নিয়েছিলেন। পঞ্চাশের দশকে পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ মন্ত্রিসভা গঠনের পরও তিনি দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। তবে ১৯৭৫ সালের ৭ জুন বাকশাল গঠনের সময় তিনি এ অবস্থান থেকে সরে আসেন- তিনি একই সঙ্গে দেশের রাষ্ট্রপতি এবং দলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন], আবদুর রব [সম্ভবত আবুদর রব সেরনিয়াবাত, তাকে মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দেওয়া হয়নি। ১৫ আগস্ট তাকে পরিবারের কয়েকজন সদস্যসহ হত্যা করা হয়], কোরবান আলী [তাকে মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দেওয়া হয়নি। তিনি দলে বামপন্থি হিসেবেও পরিচিত ছিলেন না। বরং যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ হিসেবে তাকে মনে করা হতো। আশির দশকে তিনি এইচএম এরশাদের জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়ে ডেপুটি স্পিকারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন] এবং মস্কোয় নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত শামসুল হক। মুজিবের দু’জন কাজিন শহীদ ও মনির বামপন্থিদের সঙ্গে সহযোগিতা করেন। [প্রকৃতপক্ষে ভাগ্নে, মনির নয়, শেখ ফজলুল হক মনিকে বোঝানো হয়েছে। তিনি বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ ছিলেন। কিন্তু তাকে কেউই বামপন্থি মনে করত না। তাজউদ্দীন আহমদের বিরুদ্ধে তার অবস্থানও সুবিদিত। শেখ শহীদুল ইসলাম ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সময় তিনি ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্রলীগের সমন্বয়ে গঠিত একক ছাত্র সংগঠন জাতীয় ছাত্রলীগের সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর কোনো প্রতিবাদী আন্দোলন গড়ে তোলায় উদ্যোগী হননি। আশির দশকে তিনি সামরিক শাসক এইচএম এরশাদের মন্ত্রিসভায় যোগ দেন।] তেহরানের পত্রিকাটির দাবি : ‘সাবেক উপরাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামও বামপন্থিদের সঙ্গে ছিলেন। বামপন্থি এ গ্রুপের শঙ্কা ছিল, মুজিব পাশ্চাতের দিকে ঝুঁকে পড়বেন। দক্ষিণপন্থিরাও আগস্টের শেষদিকে একটি অভ্যুত্থান সংগঠনের পরিকল্পনা করছিলেন। কিন্তু তাদের লক্ষ্য ছিল শেখ মুজিবকে প্রতীকী ক্ষমতায় রেখেই এগিয়ে যাওয়া। খন্দকার মোশতাক ছাড়াও তাদের সঙ্গে আরো ছিলেন ট্রেড ইউনিয়ন নেতা আবদুল মান্নান [শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক], আবু সাঈদ চৌধুরী [সাবেক রাষ্ট্রপতি- ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করায় তাকে রাষ্ট্রপতি নিযুক্ত করা হয়। ১৯৭৪ সালে পদত্যাগ করেন। খন্দকার মোশতাক আহমদ তাকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিয়োগ করেছিলেন], অধ্যাপক ইউসুফ আলী [মুজিব মন্ত্রিসভার শিক্ষামন্ত্রী]। যখন তারা ১৪ আগস্ট দিবাগত গভীর রাতে বামপন্থিদের অভ্যুত্থানের খবর পান (সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যেসব গোয়েন্দা কাজ করছিল তাদের মাধ্যমে) তারা সঙ্গে সঙ্গে ঢাকা রেডিও সেন্টার দখল করে নেয় এবং অভ্যুত্থানের খবর প্রচার করে। তবে এ সময় মুজিবের হত্যাকাণ্ড বিষয়ে কিছুই বলা হয়নি। তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন সৈন্যরা তখন ধানমণ্ডি এবং অফিসার্স ক্লাবের আশপাশে লড়াইয়ে নিয়োজিত ছিল। এতে উভয়পক্ষে ব্যাপক সংখ্যক সৈন্য নিহত হয়। মস্কোপন্থি অভ্যুত্থানকারীরা ঢাকা আক্রমণের জন্য হাজার হাজার সশস্ত্র লোককে প্রস্তুত রেখেছিল কিন্তু দক্ষিণপন্থিরা রাজধানীকে ঘিরে ফেলে সামরিক আইন জারি করে এ পরিকল্পনা ব্যর্থ করে দেয়।’
[ইরানি সংবাদপত্রটির ভাষ্য ছিল একেবারেই আষাঢ়ে গল্প। কিন্তু ওই সময়ের দেশি-বিদেশি সংবাদপত্রে এ ধরনের অনেক খবর প্রকাশিত হয়। এতে যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের নামি-দামি অনেক সংবাদপত্রও অংশ নেয়। বিশেষভাবে এর লক্ষ্য ছিল শেখ মুজিবকে হেয় প্রতিপন্ন করা। তাকে হত্যা ব্যতীত যে কোনো উপায় ছিল না, সেটাও বলা হতে থাকে। ওই সময়ে ঘাতকরা প্রচার করেছিল, মুজিব চেয়েছিলেন তার পুত্র শেখ জামালকে সেনাবাহিনী প্রধান নিযুক্ত করা। শেখ ফজলুল হক মনি হবেন প্রধানমন্ত্রী এবং শেখ কামালকে দেওয়া হবে ছাত্র সংগঠনের দায়িত্ব। অভ্যুত্থান চলাকালে হতাহত নিয়ে গুজব থাকতেই পারে। যেমন- ১৫ আগস্ট গুজব ছিল, প্রধানমন্ত্রী মনসুর আলী নিহত হয়েছেন। অভ্যুত্থানের পেছনে তাজউদ্দীন আহমদ ছিলেন, এমন রটনাও প্রথমদিকে ছিল। এটা পরিকল্পিত হওয়ারই সম্ভাবনা। খন্দকার মোশতাক আহমদ ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালেই পাকিস্তানের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা চালান। তার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতরের যোগসাজশ ছিল। এটা ব্যর্থ করে দেওয়ার পেছনে মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের সক্রিয় তৎপরতা সুবিদিত। খন্দকার মোশতাক আহমদ ক্ষমতা দখল করার পর তাজউদ্দীন আহমদকে গ্রেফতার করে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রাখা হয়। ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্ভর সৈয়দ নজরুল ইসলাম, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী এবং আবু হেনা মোহাম্মদ কামারুজ্জামানের সঙ্গে তাকেও ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়।]
সমকাল, ২২ আগস্ট, ২০০৮ Permalink
মুজিব হত্যায় সিআইএ জড়িত নেই প্রচারে মরিয়া মার্কিন দূতাবাসগুলো
অজয় দাশগুপ্ত
১৯৭৫ সালের ১৬ আগস্ট নয়াদিল্লিস্থ যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতত উইলিয়াম বি স্যাক্সবি ‘বাংলাদেশে অভ্যুত্থান প্রসঙ্গে ভারতের প্রতিক্রিয়া’ শীর্ষক প্রতিবেদন পেশ করেন ওয়াশিংটনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারের কাছে। যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহকারী সচিব (যিনি ছিলেন আমেরিকা বিভাগের ভারপ্রাপ্ত) জে বড়ূয়ার বাংলাদেশে সামরিক অভ্যুত্থান প্রসঙ্গে আলোচনা এতে স্থান পেয়েছে। জে বড়ূয়া বলেন, বাংলাদেশের নতুন প্রেসিডেন্ট খন্দকার মোশতাক আহমদ ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের সঙ্গে সমঝোতা [স্বাধীনতার পরিবর্তে] চেয়েছিলেন এবং এখন নিঃসন্দেহে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা চালাবেন। এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্রের একজন কর্মকর্তা বলেন, এমনটি ঘটলে তা উপমহাদেশে উত্তেজনা কমাতে পারে এবং তাতে প্রধান তিনটি শক্তিই উপকৃত হবে।
স্পষ্টতই ওই মার্কিন কর্মকর্তা রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে যে পটপরিবর্তন ঘটেছে তার প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন ব্যক্ত করেন।
মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনাকালে জে বড়ূয়া কৌতুক করে বলেন যে, ‘ভারত এবং বাইরের বামপন্থি শক্তি সম্ভবত বাংলাদেশের এ অভ্যুত্থানের সঙ্গে সিআইয়ের যোগসাজশ দেখাতে চেষ্টা করবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘সম্প্রতি ঢাকা থেকে ফিরেছেন এমন একজন ভারতীয় কূটনীতিক তাকে আগের সপ্তাহে বলেছেন, বাংলাদেশে কয়েক মাস ধরে অভ্যুত্থানের গুজব শোনা যাচ্ছে।’
ওই সময়ে ভারতে ক্ষমতায় ছিল কংগ্রেস এবং প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। জে বড়ূয়া ছিলেন একজন আমলা। তবে রাজনীতিকদের মতামত তার জানা থাকার কথা। কৌতুকছলে তিনি মুজিব হত্যার পেছনে সিআইয়ের সংশ্লিষ্টতার কথা বলেছেন। এ মত কেবলই বামপন্থিদের ছিল, নাকি ক্ষমতাসীন কংগ্রেস দলেও কেউ কেউ তা পোষণ করতেন? প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর প্রশাসনের কি এ মূল্যায়ন ছিল? এসব হচ্ছে ইতিহাসের মুল্যায়নের বিষয়। এখনো এ অধ্যায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রামাণ্য দলিলে অনাবিষ্কৃত। বিশেষ করে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের যেসব দলিল প্রকাশ করেছে তার কিছু অংশ ওই সময়ের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার কাটছাঁট করায় অনেক সত্য চিরকাল অন্ধকারে থেকে যেতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাংবাদিক-গবেষক লরেন্স লিফসুলজ মনে করেন, এ ঘটনার পেছনে গভীর ষড়যন্ত্র কাজ করেছে। তার মতে ওই সময়ে ঢাকাস্থ যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত বোস্টার বাংলাদেশে সিআইয়ের স্টেশন চিফ পিলিপ চেরির ষড়যন্ত্র বন্ধ করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন [ডেইলি স্টার, ১৫ আগস্ট, ২০০৫]।
১৮ আগস্ট নয়াদিল্লিস্থ যুক্তরাষ্ট্রের দূতবাস ওয়াশিংটনে যে বার্তা পাঠায় তাতে ১৬ আগস্ট কলকাতায় ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি আয়োজিত দেড় হাজার লোকের একটি মিছিলের প্রসঙ্গ উল্লেখ রয়েছে। মিছিলে মুজিব হত্যার জন্য সিআইয়েকে অভিযুক্ত করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র প্রশ্ন তোলে যে, ভারতে জরুরি আইন বলবৎ থাকাকালে কীভাবে মিছিল বের হলো।
২৫ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস কিসিঞ্জারকে যে বার্তা পাঠায় তাতে বলা হয় : বোম্বের বামপন্থি ‘ক্লারিটি’ সাময়িকী ২৩ আগস্ট সংখ্যায় লিখেছে : ‘সিআইএ বাংলাদেশে আঘাত হেনেছে।’ এতে লেখা হয় : ‘রাষ্ট্রপতি মুজিব এবং তার পরিবারের সদস্যদের হত্যাকাণ্ডে আমেরিকার সহায়তার বিষয়টি এখন এত জোরালোভাবে প্রকাশ করা হচ্ছে যে, এটা এখন সন্দেহের ঊর্ধ্বে।’
এ নিবন্ধ প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত স্যাক্সবির মন্তব্য : ‘ভারতে বাংলাদেশের ঘটনাবলির বিষয়ে সেন্সরশিপ আরোপের কথা বলা হলেও এটা আরো বেশি বেশি করে স্পষ্ট হচ্ছে যে, ভারতের বামপন্থি-সিপিআইপন্থি/মস্কোপন্থিদের ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য হচ্ছে না।’
পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রকাশিত অমৃতবাজার পত্রিকায় বাংলাদেশে অভ্যুত্থানের বিষয়ে সিআইয়ের হাত রয়েছে বলে যে অভিমত ছাপা হয় তার প্রতিবাদ জানাতে কলকাতাস্ট’ যুক্তরাষ্ট্র কনস্যুলেটের এক কর্মকর্তা ওই পত্রিকার সম্পাদক এস আর দত্তের কাছে গিয়েছিলেন ২০ আগস্ট।
২১ আগস্ট নয়দিল্লিস্থ যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস ওয়াশিংটনে আরো যে প্রতিবেদন পাঠায় তাতে বলা হয় : ২১ আগস্ট ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় ‘মুজিব সাম্রাজ্যবাদের শিকার’ শিরোনামে যে প্রতিবেদন প্রকাশ করে তাতে বলা হয় : সিপিআই নেতা ভুপেশ গুপ্ত অভিযোগ করেছেন, মুজিবের হত্যাকারীরা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও সিআইয়ের মদদপুষ্ট। এ প্রতিবেদনে বিশ্ব শান্তি পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রমেশ চন্দ্রের বক্তব্য ছাপা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘মুজিব তাকে বাংলাদেশে সিআইয়ের ক্রমবর্ধমান তৎপরতা সম্পর্কে অবহিত করেছেন।’ রমেশ চন্দ্র বলেন, ‘গত এপ্রিলে [১৯৭৫] আমি বাংলাদেশ সফর করেছি। সেখানে বিভিন্ন সাহায্য সংস্থার স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে সিআইএ এজেন্টরা সক্রিয় বলে আমি জানতে পেরেছি।’
এসব প্রতিবেদন প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র দূতবাসের কর্মকর্তার মন্তব্য ছিল নিম্নরূপ : ভারতে সেন্সরশিপ বজায় থাকলেও তা যুক্তরাষ্ট্রকে অভিযুক্ত করে যেসব প্রতিবেদন প্রকাশিত হচ্ছে সে ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হচ্ছে না।
২১ আগস্ট স্যাক্সবি ওয়াশিংটনে আরেকটি প্রতিবেদন প্রেরণ করেন। এতে বলা হয় : ‘আনন্দবাজার পত্রিকায় বিশিষ্ট সাংবাদিক বরুণ সেনগুপ্ত ঢাকার অভ্যুত্থান বিষয়ে একটি প্রতিবেদন পত্রিকা কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেন। এতে ওই অভ্যুত্থানে সিআইয়ের সংশ্লিষ্টতার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ সরকার বরুণ সেনগুপ্তের লেখাটি প্রকাশের অনুমতি দেয়নি।’
এ ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রকে না চটানোর বিষয়ে ভারত সরকারের নতুন নীতি প্রকাশ পেয়েছে বলে ধারণা করা যায়।
স্যাক্সবি ২২ আগস্ট ওয়াশিংটনে জানান : এদিন কলকাতার ইংরেজি দৈনিকগুলোতে বাংলাদেশের অভ্যুত্থানে সিআইয়ের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে কিছু লেখা হয়নি। তবে সিপিআইয়ের পত্রিকা কালান্তরে ব্যানার হেডলাইন ছিল ‘মুজিবের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি’। এতে কলকাতা বিশ^বিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধুর স্মরণসভার বিবরণ প্রকাশিত হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক সৌগত রায় উত্থাপিত শোক প্রস্তাবে অভ্যুত্থানের পেছনে সিআইয়ের হাত রয়েছে বলে অভিযাগ করা হয়েছে।
১৯ আগস্ট আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয় : যুব কংগ্রেস নেতা প্রিয়রঞ্জন দাস মুন্সি [বর্তমানে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী] অভিযোগ করেছেন, মুজিব হত্যাকাণ্ড থেকে প্রমাণ হয় যে, এ উপমহাদেশে সিআইএ এবং চীন কতটা সক্রিয়।
বাংলাদেশে ক্ষমতা পরিবর্তনের পরপরই ভারত সফরে এসেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর ঈগলটন। তিনি ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে আলোচনাকালে তাকে সরাসরি জিজ্ঞেস করেন : ‘আপনি কি বিশ্বাস করেন, সিআইএ বাংলাদেশের ঘটনাবলিতে জড়িত ছিল?’ স্যাক্সবি ওয়াশিংটনে জানান : ঈগলটনের প্রশ্নের উত্তরে ইন্দিরা গান্ধী পর পর দু’বার বলেছেন, ‘আমাদের কাছে এ ধরনের কোনো খবর নেই।’
ইন্দিরা গান্ধী বোঝাতে চেয়েছেন, তার কাছে কোনো খবর নেই। কিন্তু তার জানার বাইরেও যে ঘটনা ঘটতে পারে?
রাষ্ট্রদূত ২২ আগস্ট আরো জানিয়েছেন : বাংলাদেশের ঘটনাবলিতে যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্টতা বিষয়ে আজ কম প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। তবে সিপিআইয়ের সাপ্তাহিক প্যাট্রিয়ট এবং দৈনিক কালান্তর ব্যতিক্রম। কলকাতাস্ট’ যুক্তরাষ্ট্র কনসাল অফিসের মি. কর্ন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্য সচিবের কাছে কলকাতাস্থ বিভিন্ন সংবাদপত্রে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী সংবাদ ও মতামত প্রকাশের তীব্র প্রতিবাদ জানান।
২২ আগস্ট কর্ন-এর প্রতিবেদনে বলা হয় : ‘আমি মুখ্য সচিবকে জানিয়েছি, যুক্তরাষ্ট্র পররাষ্ট্র দফতর এবং নয়াদিল্লিস্থ’ আমেরিকান দূতাবাস ভারত সরকারকে সম্পূর্ণ আশ্বস্থ করেছে যে, যুক্তরাষ্ট্র সরকার কিংবা তার কোনো সংস্থা বাংলাদেশের অভ্যুত্থানে কোনোভাবেই জড়িত ছিল না। এরপরও এ বিষয়ে যেসব প্রতিবেদন প্রকাশিত হচ্ছে তাতে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্থ হবে। তাদের এটাও স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয় যে, এ ধরনের প্রতিবেদন ভারতের সেন্সরশিপ গাইডলাইন লঙ্ঘন করছে।’
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার বিভিন্ন দেশের মার্কিন দূতাবাসকে ২০ আগস্ট জানান : ভারতের বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার বক্তব্যে ও সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী যেসব মন্তব্য করা হচ্ছে তাকে ভিত্তিহীন বলে অভিহিত করেছেন তাদের পররাষ্ট্র বিষয়ক একজন ডেপুটি সেত্রেক্রটারি। ভারত সরকার এসব প্রচার বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে বলে ওই কর্মকর্তা আশা প্রকাশ করেন।
যুক্তরাষ্ট্র সব সময় সংবাদপত্র ও গণমাধ্যমে সেন্সরশিপ আরোপের বিরুদ্ধে বলছে। কিন্তু বাংলাদেশে অভ্যুত্থানের বিষয়ে তাদের সংশ্লিষ্টতা বিষয়ে যেসব অভিযোগ উঠেছে তা প্রকাশ না করার জন্য তারা বারবার ভারত সরকারের কাছে এ অস্ত্র প্রয়োগের দাবি জানাচ্ছে। তারা এ ধরনের অবস্থান কেন নিয়েছিল? কেন সিআইয়ের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ এলেই তা বন্ধ করার জন্য তারা আদাজল খেয়ে লেগেছিল? এসব প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিত।
সমকাল ১৮ আগস্ট ২০০৮ Permalink