কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত

bdnews24

বঙ্গবন্ধু বাঁচালেন ভুট্টোকে, ভুট্টো বদলা নিলেন একাত্তরে

ইতিপূর্বে সমকাল (১৩ আগস্ট ২০০৮) পত্রিকায় সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন গোপন দলিলে প্রাপ্ত তথ্য নিয়ে অজয় দাশগুপ্তের একটি মূল্যবান লেখা প্রকাশিত হয়েছিল। এতে বঙ্গবন্ধু হত্যাকালীন সময়ে আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরী কিসিঞ্জার ও তার স্টাফ অফিসারদের কথোপকথনের কিছু ব্যাখ্যা রয়েছে।

সমকাল পত্রিকার ১৪ আগস্ট সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে আর একটি বিষয় নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ রচনা। সমকাল পত্রিকার এই লেখায় বঙ্গবন্ধুর প্রতি পাকিস্তানী রাষ্ট্রনায়ক জুলফিকার আলী ভুট্টোর মনোভঙ্গী সম্পর্কে স্বচ্ছ প্রতিচ্ছবি প্রকাশিত হয়েছে।

বঙ্গবন্ধু বাঁচালেন ভুট্টোকে, ভুট্টো বদলা নিলেন একাত্তরের
’৭৫ এর ট্র্যাজেডি। মার্কিন দলিল -২
অজয় দাশগুপ্ত

১৯৭৪ সালের ৩০ অক্টোবর ঢাকায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে সফররত মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারের আলোচনা চলছে। সেখানে আলোচনা প্রসঙ্গে এলো একাত্তর সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্কের প্রশ্ন। মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের সদ্য প্রকাশিত গোপন দলিলে বৈঠকের এ সংক্রান্ত অংশের বিররণ তুলে ধরা হয়েছে এভাবে :

কিসিঞ্জার : আপনি [মুজিব] কখন স্বাধীনতা অর্জনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন? আপনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে পারতেন!
শেখ মুজিব : অবশ্যই। আইয়ুব খান আমাকে গোলটেবিল বৈঠকে [রাওয়ালপিন্ডি, মার্চ ১৯৬৯] এ প্রস্তাব দিয়েছিলেন। আমি দীর্ঘদিন পাকিস্তানের নেতৃস্থানীয় রাজনীতিক ছিলাম।
কিসিঞ্জার : পাকিস্তান তার বর্তমান রাজনৈতিক সমস্যা কাটিয়ে উঠতে পারবে বলে মনে করেন?
শেখ মুজিব : বলপ্রয়োগে সমাধান নেই। সেনাবাহিনী পাঞ্জাবের। তারা বেলুচিস্তানকে দমিয়ে রাখতে পারবে না। কিন্তু ভুট্টো [জুলফিকার আলি] একজন রাজনীতিবিদ এবং তিনি এভাবেই সমস্যা মোকাবেলার চেষ্টা করবেন। আমি সব পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দিকে ছেড়ে দিতে সম্ভত হয়েছি, কারণ আমি ভুট্টোকে সাহায্য করতে চেয়েছি। আমি এটা ইচ্ছাকৃতভাবে করেছি। যদি আমি না করতাম তাহলে পাকিস্তানে আবার সামরিক বাহিনী ক্ষমতায় আসত।
কিসিঞ্জার : এটা আপনার দূরদৃষ্টি।

বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীকে বাঁচালেন এভাবে। কিন্তু তিনি কী করলেন? একাত্তরে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী যে গণহত্যা অভিযান পরিচালনা করে তার প্ররোচনাদানকারীদের মধ্যে ছিলেন জুলফিকার আলি ভুট্টো। একাত্তরের ডিসেম্বরের প্রথমদিকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের চূড়ান্ত পর্যায়ে পাকিস্তান এবং যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘের মাধ্যমে যুদ্ধবিরতির অপচেষ্টা চালায়। নিরাপত্তা পরিষদে এ সংক্রান্ত আলোচনায় পাকিস্তান প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন ভুট্টো। তিনি তখন কথা বলেন পাকিস্তানের জান্তার পক্ষ হয়ে। বঙ্গবন্ধু অতীতের তিক্ততা ভুলে পাকিস্তানের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক চেয়েছিলেন। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট প্রত্যুষে দেখা গেল ভুট্টো একটুও বদলাননি। তিনি একাত্তরের মতোই রয়ে গেছেন বাঙালিবিদ্বেষী, মুজিববিদ্বেষী। একাত্তরে বলপ্রয়োগে পাকিস্তানি সেনারা বাঙালির কণ্ঠ চিরতরে রোধ করতে চেয়েছিল। পঁচাত্তরে হত্যা করা হলো আমাদের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতাকে। আর এর সঙ্গে ভুট্টোর সংশ্লিষ্টতা তিনি নিজেই গোপন রাখতে চাননি।

মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের সদ্য প্রকাশিত গোপন দলিলে ১৬ আগস্ট, ১৯৭৫ পাকিস্তানের মার্কিন দূতাবাস ওয়াশিংটনে যে বার্তা পাঠিয়েছে তাতে বাংলাদেশের অভ্যুত্থানের ব্যাপারে পাকিস্তানের প্রাথমিক প্রতিত্রিক্রয়া তুলে ধরা হয়েছে। এতে দেখা যায়, পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আগাশাহী নতুন বাংলাদেশ সরকারকে স্বীকৃতি প্রদানের বিষয়ে তাদের সরকারের সিদ্ধান্ত প্রকাশের আগেই যুক্তরাষ্ট্রকে অবহিত করেছেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খন্দকার মোশতাকের কাছে যে বার্তা পাঠিয়েছেন তা বাংলাদেশের কাছে এ পর্যন্ত পাঠানো পাকিস্তান সরকারের বার্তাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উষ্ণ। বার্তায় উল্কেèখ করা হয়, ‘বাংলাদেশের ভ্রাতৃপ্রতিম জনগণের জন্য প্রাথমিক ও স্বতঃস্ফুর্ত শুভেচ্ছা হিসেবে আমি অনতিবিলম্বে পাকিস্তানি জনগণের পক্ষ থেকে বাংলাদেশকে ৫০ হাজার টন চাল, ১ কোটি গজ লং ক্লথ কাপড় এবং ৫০ লাখ গজ ব্লিচড কাপড় পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এটা হচ্ছে বাংলাদেশের ভাইদের প্রয়োজনে সামান্য উপহার।’ ভুট্টো তার বার্তায় দু’দেশের অবিনাশী সংহতি, যা ১৯৭১ সালের বিয়োগান্তক ঘটনাতেও ছিন্ন হয়ে যায়নি, সেটাও খন্দকার মোশতাককে স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি বলেন, বিশ্ব জানুক, আমরা সুখে-দুঃখে একসঙ্গে আছি।

জুলফিকার আলি ভুট্টোর বার্তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে : ‘আমরা শ্রদ্ধার সঙ্গে ইসলামী সম্মেলন সংস্থার সদস্যদের ইসলামী রিপাবলিক অব বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদানের আবেদন জানাচ্ছি।’
কেন এ আবেদন? তার কারণ তিনি বলেছেন এভাবে : ‘আমাদের দেশকে একটি আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের প্রেক্ষাপটে পরিচালিত আগ্রাসন দ্বারা বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে।’

ভুট্টোর কাছে একাত্তরে বাংলাদেশে পাকিস্তানি জান্তার গণহত্যা কিংবা স্বাধীনতা অর্জনে বাঙালিদের বীরত্বপূর্ণ সংগ্রাম কোনো বিষয় ছিল না!

ভুট্টো বাংলাদেশকে ‘ইসলামী প্রজাতন্ত্র হিসেবে উল্লেখ করেন। কিন্তু এমনকি ১৫ আগষ্টের বিয়োগান্তক পরিবর্তনের পরও বাংলাদেশের নাম ছিল গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ। পাকিস্তানের শাসকরা আমাদের দেশের নাম কেন বদলে দিলেন? ১৭ আগস্ট ঢাকাস্থ মার্কিন রাষ্ট্রদূত ওয়াশিংটনে যে বার্তা পাঠান তাতে বলা হয়, ‘বাংলাদেশকে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করা হয়েছে, এমন কোনো ঘোষণা ঢাকা থেকে দেওয়া হয়নি। ১৬ আগস্ট পররাষ্ট্র দফতরের সার্কুলারেও গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ উল্লেখ করা হয়েছে।’

১৫ আগস্ট অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসীন খন্দকার মোশতাক কেমন ব্যক্তি সেটা জানা গেছে ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের প্রতিবেদনে। এতে বলা হয় : ‘পাকিস্তান সরকার তাকে মধ্যপন্থি, তীক্ষ্ণবুদ্ধির [নাকি ধূর্ত], ঠাণ্ডমাথার রাজনৈতিক নেতা মনে করে। তারা মুজিবনগর সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে পাকিস্তানের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে তিনি যে ফয়সালা চেয়েছিলেন সেটাও এ প্রসঙ্গে স্মরণ করে।’
বাংলাদেশের অভ্যুত্থানের পর যুক্তরাষ্ট্র সরকার তাৎক্ষণিক স্বীকৃতি প্রদান করবে না বলে সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু একই সঙ্গে ১৫ আগষ্ট ২১ ঘণ্টা ৫২ মিনিটে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক গোপন বার্তায় এটাও জানিয়ে দেয় যে, ‘আমরা তাদের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক স্থাপনে প্রস্তুত।’

কিসিঞ্জার ১৫ আগস্ট সকালে তার স্টাফ সভায় যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের সম্পর্কের ওপর বাংলাদেশে পরিবর্তনের প্রভাব পড়বে বলে মন্তব্য করেন।

১৬ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্র পররাষ্ট্র দফতর ইসলামাবাদে তাদের দূতাবাসে যে বার্তা পাঠায় তাতে বলা হয় : ‘যেহেতু পাকিস্তান সরকার বাংলাদেশের চলতি ঘটনাবলির বিষয়ে গভীরভাবে আগ্রহী, এ কারণে পাকিস্তানের কর্মকর্তাদের জানা থাকা দরকার যে, আমরা তাদের সঙ্গে অব্যাহতভাবে মতামত বিনিময়ে আগ্রহী। আমরা ওয়াশিংটনে পাকিস্তান দূতাবাসের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছি এবং তাদের অপরিহার্য তথ্যাদি জানাচ্ছি।’
১৭ আগস্ট ইসলামাবাদের মার্কিন দহৃতাবাস থেকে ওয়াশিংটন পররাষ্ট্র দফতরে বার্তা যায়। এর বিষয়বস্তু ছিল আফগানিস্তান ও বাংলাদেশ বিষয়ে সোভিয়েত রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে তার আলোচনা এবং বাংলাদেশের নতুন সরকার সম্পর্কে তার মূল্যায়ন। আগের রাতে (১৬ আগস্ট) ভুট্টো এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে কথা বলেন। তার ভিত্তিতেই এ প্রতিবেদন পাঠানো হয়। ভুট্টো শুরুতেই মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে বলেছিলেন, ‘আপনারা মন্দ লোক নন এবং বাংলাদেশে অভ্যুত্থান ঘটানোর সঙ্গে ছিলেন না। তবে সোভিয়েতরা অন্যভাবে মনে করে।’ এর জবাবে মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলেন, যখনই জেনেছি বাংলাদেশের নতুন প্রেসিডেন্ট পাশ্চাত্যপন্থি হিসেবে পরিচিত, তখনই সোভিয়েত তরফ থেকে এ অভিযোগ উঠবে বলে ধরে নিয়েছি। যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত বার্তায় লিখেছেন : ‘আমি কৌতুক করে বলেছি যে, ভুট্টো বাংলাদেশের নতুন সরকারকে এত দ্রুত স্বীকৃতি দিয়েছেন যে, এতে সন্দেহ সৃষ্টি হতে পারে।’ বার্তা থেকে ধারণা করা যায়, খন্দকার মোশতাকের সরকারকে পাকিস্তানের আগে যে সৌদি আরব ও লিবিয়ার মতো দেশ স্বীকৃতি দিয়ে কৃতিত্ব নিতে না পারে সেজন্য ভুট্টো এত দ্রুত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেন।

১৮ আগস্ট ইসলামাবাদ থেকে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ওয়াশিংটনে যে বার্তা পাঠান তাতে এমন দ্রুততার সঙ্গে স্বীকৃতির ভিন্ন ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়, বাংলাদেশের অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে ভারত ও সোভিয়েত সরকারের কী প্রতিক্রিয়া হয় সে বিষয়ে পাকিস্তানের সরকারি মহলে উদ্বেগ ছিল। বিশেষ করে ভারতের সশস্ত্র হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা তারা বিবেচনায় রেখেছে। আর এটাই এত দ্রুত স্বীকৃতি প্রদান এবং অন্যান্য ইসলামী দেশকে একই পথ অনুসরণের আহ্বানের কারণ হতে পারে। তারা আশা করেছিল, এভাবে ভারতীয় সামরিক পদক্ষেপের শঙ্কা কমবে।

১৮ আগস্ট ইসলামাবাদের মার্কিন দূতাবাসের আরেক বার্তায় দেখা যায়, বাংলাদেশকে ইসলামী প্রজাতন্ত্র হিসেবে পাকিস্তান সরকার প্রচার করলেও বাংলাদেশের তরফে এ ধরনের কোনো ঘোষণা না আসায় পাকিস্তান সরকারের কর্মকর্তাদের মধ্যে হতাশা রয়েছে। অথচ বাংলাদেশ ইসলামী প্রজাতন্ত্র হয়ে গেছে- এটা ধরে নিয়েই ভুট্টো এত দ্রুত মোশতাক সরকারকে স্বীকৃতি দিয়েছেন। তিনি মনে করেছেন, একাত্তরে যে দ্বিজাতিতত্ত্বকে (হিন্দু-মুসলমান) বাংলাদেশে মৃত ঘোষণা করে ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ ঘোষণা করা হয়েছে তা ঢাকায় টিকে আছে। ঢাকায় অভ্যুত্থানের পর পাকিস্তানের বিভিন্ন সংবাদপত্রের সম্পাদকীয় মন্তব্যে ‘মুসলিম বাংলা’ ব্যবহার করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের মন্তব্য : যদি বাংলাদেশের নাম পরিবর্তন করা না হয় [অর্থাৎ ইসলামী প্রজাতন্ত্র না হয়] তাহলে পাকিস্তান সরকারের কী প্রতিক্রিয়া হয়, সেটা দেখার বিষয়।

BBC Asia-Pacific

CNN.com - Asia