কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত

bdnews24

কি কপাল!

ধনিরদহে সেতুবিলাস!

এনামুল হক খোকন, সিরাজগঞ্জ

সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার ফুলকোচা-গারুদহ পাকা সড়কে ধনিরদহ খালের ওপরের তিনটি সেতুর মাঝখানেরটি নির্মাণ করা হয় ১৯৯৬ সালে। পাঁচ লাখ ১২ হাজার টাকায় নির্মিত সেতুটির দৈর্ঘ্য মাত্র তিন মিটার। সেতুটি অপ্রশস্ত হওয়ায় পানির স্বাভাবিক গতি বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে ওই বছরের বর্ষায় পানির চাপে সেতুর পূর্ব পাশের রাস্তা ভেঙে যায়। ১৯৯৭ সালে সেই ভাঙা জায়গায় আরেকটি সেতু নির্মাণ করা হয়। এটিরও দৈর্ঘ্য তিন মিটার। খরচও একই−পাঁচ লাখ ১২ হাজার টাকা। পরের বর্ষায় পানির তোড়ে ভাঙে রাস্তার পশ্চিম প্রান্ত। ১৯৯৮ সালে সেখানে আরেকটি সেতু বানানো হয়। এটিরও দৈর্ঘ্য এবং খরচ আগেরগুলোর সমান। কিন্তু গত বর্ষায় এ সেতুটি কয়েক ফুট দেবে যায়। স্থানীয় চেয়ারম্যানের অনুমতি নিয়ে এক যুবক এর ওপর একটি বাঁশের মাচান বানিয়ে বাকি সেতুগুলোর সঙ্গে এর সংযোগ তৈরি করেছেন। এই মাচান হয়ে সেতুগুলো পার হতে এলাকাবাসীকে টোল দিতে হয়।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর−এলজিইডি সুত্র জানায়, ধনিরদহের পূর্বপ্রান্তের সেতুটির ঠিকাদার ছিলেন গুনারগাতী গ্রামের ঠান্ডু ভুঁইয়া। পশ্চিম প্রান্তেরটির ঠিকাদার ছিলেন আনোয়ার হোসেন। এঁরা দুজনই স্থানীয় আওয়ামী লীগের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ছিলেন। মাঝখানের সেতুটির ঠিকাদারের নাম-পরিচয় জানাতে পারেনি স্থানীয় এলজিইডি।
তবে এলজিইডি বলেছে, সাধারণত স্থানীয় সাংসদের সুপারিশে এ ধরনের সেতুর জন্য টাকা বরাদ্দ হয়ে থাকে। ওই সময়ে এ এলাকার সাংসদ ছিলেন (সিরাজগঞ্জ-২, সদর) সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম। গত বছর বন্যার পানি ঢুকে স্থানীয় এলজিইডি অফিসের সব কাজগপত্র নষ্ট হয়ে যাওয়ায় সেতুগুলোর নির্মাণ প্রক্রিয়া সম্পর্কে এর বেশি কিছু জানা যায়নি।
ঠিকাদার দুজনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কথা বলা যায়নি। স্থানীয় সুত্রগুলো জানিয়েছে, তাঁরা ঠিকাদারি ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছেন এবং এলাকায় থাকেন না।
এলজিইডি সুত্র জানায়, সেতুগুলো গ্রামীণ সড়ক অবকাঠামো (এসআরআর) প্রকল্পের অধীনে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে নির্মাণ করা হয়। নিয়মানুযায়ী প্রাਆলন মূল্যের শতকরা ১০ ভাগ টাকা স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান এলজিইডি দপ্তরে জমা দিলে সেতু নির্মাণের অনুমতি দেওয়া হয়। স্থানীয় বাগবাটি ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আলী হোসেন জানান, টাকাটা চেয়ারম্যানের জমা দেওয়ার কথা থাকলেও ঠিকাদাররাই দিয়েছেন। তাঁদের সাহায্য করেছে তৎকালীন এলজিইডির কর্মকর্তারা। সহজেই অনুমোদন এবং লাভের অঙ্ক বেশি হওয়ায় ঠিকাদারদের এগুলো নির্মাণে বেশি আগ্রহ থাকত।
ঠিকাদারদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সুত্র জানায়, ওই সময়ে এমন ছোট সেতু নির্মাণ করলে মোট খরচের ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ লাভ হতো। লাভের ভাগ-বাটোয়ারার কারণে স্থানীয় এলজিইডির কর্মকর্তা যেখানে বড় সেতুর দরকার, সেখানেও এ ধরনের সেতু করার অনুমতি দিয়ে দেন।
ফুলকোচা গ্রামের শাহ্ আলী ও আলতাফ হোসেন জানান, ধনিরদহ খাল দিয়ে এলাকার বৃষ্টির পানিসহ যমুনা নদীর পানি প্রবাহিত হয়। ১৯৮৮ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত সেতু আর রাস্তা যেভাবে ভেঙেছে এবং তা মেরামত করতে যে টাকা খরচ হয়েছে, সে টাকায় এ সড়কে বড় দুটি সেতু নির্মাণ করা যেত। এলাকার ১২টি গ্রামের কয়েক হাজার লোককেও যাতায়াতের এমন দুর্ভোগ পোহাতে হতো না।
সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার প্রকৌশলী মো. শাহানুর বলেন, যখন এই তিনটি সেতু নির্মাণ করা হয়েছিল, তখন বড় সেতু নির্মাণের প্রকল্প সিরাজগঞ্জ এলজিইডির ছিল না। প্রতিবছর বন্যায় রাস্তা ভেঙে যাওয়ায় এলাকাবাসীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ছোট এই সেতুগুলো নির্মাণ করা হয়। তিনি জানান, বর্তমানে ওই খাল দিয়ে পানিপ্রবাহের মাত্রা চিন্তায় এনে প্রাਆলন তৈরি করে প্রধান কার্যালয়ে পাঠানোর পর রুরাল ট্রান্সপোর্ট ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্ট-২৬ (আরটিআইটি) প্রকল্পের আওতায় বড় সেতু নির্মাণের জন্য সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়েছে। প্রকৌশলী শাহনুর বলেন, এখন বরাদ্দ পাওয়া গেলেই এই তিনটি সেতু ভেঙে ফেলে বড় সেতু করা হবে। অবশ্য তিনি জানিয়েছেন, এসআরআর প্রকল্পের এই ছোট সেতুগুলোর স্থায়িত্বকাল ৫০ বছর ধরে নির্মাণ করা হয়েছিল।
সিরাজগঞ্জ জেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি বৈদ্যঢোল গ্রামের মো. জুলফিকার হায়দার ফিরোজ বলেন, ছোট ছোট সেতু নির্মাণ করে শুধু সরকারি অর্থের অপচয় হয়েছে। প্রথমেই যদি বড় সেতু নির্মাণ করা হতো, তাহলে তো এটা হতো না। জনগণও দুর্ভোগে পড়ত না। তিনি বলেন, বর্তমানে তিন কিলোমিটার পথ ঘুরে অন্য রাস্তা দিয়ে এলাকাবাসীকে মালামাল পরিবহন করতে হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, সেতু নিয়ে পরিকল্পনাহীনতা ও অর্থের অপচয়ের পেছনে দুর্নীতির বিষয়টি তদন্ত হওয়া উচিত।
টোল আদায়: ৪০ ফুট জায়গায় তিনটি সেতু নির্মাণের অবিশ্বাস্য গল্পটি এখানে শেষ হতে পারত। কিন্তু আরও বড় বিস্নয়ের জন্ন দিয়েছেন জনৈক মজনু মিয়া। তিনি দেবে যাওয়া সেতুটির ওপর একটা বাঁশের মাচান বানিয়ে বাকি দুই সেতুর সঙ্গে সংযোগ দিয়ে লোক পারাপার করছেন। বিনিময়ে জনপ্রতি এক টাকা এবং মোটরসাইকেল, রিকশা ও বাইসাইকেলের জন্য দুই টাকা হারে টোল আদায় করছেন। তিনি ইউসুফ নামের এক যুবককে টোল আদায়ের জন্য নিয়োগ দিয়েছেন। তবে এই বাণিজ্যিক বুদ্ধিমত্তার পেছনে আছেন একজন জনপ্রতিনিধি−বাগবাটি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আমজাদ হোসেন। চেয়ারম্যান প্রথম আলোকে বলেন, রাস্তাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি সেতু দেবে যাওয়ায় এলাকায় তাঁতশিল্পের সঙ্গে জড়িত লোকজন তাদের সুতার ট্রাক নিয়ে এলাকায় ঢুকতে পারছে না। রিকশা-ভ্যান যাতে চলতে পারে, সেজন্য মজনুকে এই সাঁকো বানানোর জন্য মৌখিক নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
টোল আদায়কারী ইউসুফ জানান, প্রতিদিন এই মাচান সেতু দিয়ে রিকশা, ভ্যান, মোটরসাইকেলসহ অন্তত দেড় হাজার লোকজন যাতায়াত করে। জনপ্রতি এক টাকা এবং মোটরসাইকেল, রিকশা ও ভ্যানপ্রতি দুই টাকা করে তোলা হচ্ছে। ইউসুফের দাবি, পরিচিত হওয়ায় অনেক লোকই টাকা দেয় না। তবে সব মিলিয়ে প্রতিদিন ছয় থেকে সাত শ টাকা আদায় করেন তিনি।
৬ জুন, ২০০৮, প্রথম আলো।

BBC Asia-Pacific

CNN.com - Asia