কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত

bdnews24

Error loading feed.

কাজ পেতে কোকোকে ঘুষ দেয় সিমেন্স

ফখরুল ইসলাম হারুণ, আব্দুল্লাহ মামুন

সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো জার্মান বহুজাতিক কোম্পানি সিমেন্স এজির স্থানীয় প্রতিষ্ঠান সিমেন্স বাংলাদেশকে অর্থের বিনিময়ে কাজ পাইয়ে দিয়েছিলেন। এ জন্য কোকোকে কমপক্ষে এক কোটি ২৬ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছিল। এ পর্যন্ত পাওয়া তথ্যে জানা যায়, প্রতিশ্রুত টাকা দেওয়া হয়নি বলে কোকো অভিযোগ করলে অতিরিক্ত অর্থ হিসেবে ২০০৫ সালের সেপ্টেম্বরে তাঁর সিঙ্গাপুরের ব্যাংক হিসাবে এই অর্থ জমা পড়ে। সিঙ্গাপুরে কোকোর ব্যাংক হিসাবে যে ১১ কোটি ৬৬ লাখ টাকা জব্দ করা হয়েছে, তার মধ্যে এই টাকাও আছে।

বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে বাংলাদেশের সরকারি মোবাইল ফোন কোম্পানি টেলিটক প্রকল্পের কাজ পায় সিমেন্স ৫৩ লাখ ডলার ঘুষ দিয়ে। যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি ও ইতালির তদন্ত এবং সিমেন্স এজির নিজস্ব তদন্তে এসব তথ্য বেরিয়ে এসেছে। মার্কিন আদালতে ঘুষ দেওয়ার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়েছে সিমেন্স বাংলাদেশও। শাস্তিস্বরূপ তাদের পাঁচ লাখ ডলার জরিমানা দিতে হবে। গত ১২ ডিসেম্বর মার্কিন আদালত এই রায়দেন।

আদালতের এই রায়মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআইয়ের প্রতিবেদনে বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়েছে। এ ছাড়া মার্কিন বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমেও এই রায়ের বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশিত হয়েছে।

এ ছাড়া বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ঘুষ দেওয়ার অপরাধে সিমেন্সকে এ পর্যন্ত ১৬০ কোটি মার্কিন ডলার জরিমানা দিতে হয়েছে। আর নিজস্ব তদন্ত ও সংস্কারকাজে তাদের ব্যয় হয়েছে আরও ১০০ কোটি ডলার।

বাংলাদেশে বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসার পর দুর্নীতিবিরোধী অভিযান শুরু হলে অন্যান্য দেশের সঙ্গে মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাগ্রিমেন্ট বা পারস্পরিক আইনি সহায়তা চুক্তি না থাকার কারণে প্রথম দিকে বাইরে থেকে সাহায্য পাওয়া যায়নি। পরে সরকারের দুর্নীতিবিরোধী উদ্যোগে সাহায্যের ব্যাপারে বিশ্বের অনেক দেশ এগিয়ে এসেছে। সরকার বিভিন্ন দেশ থেকে পাওয়া বাংলাদেশি নাগরিকদের দুর্নীতিসংক্রান্ত তথ্য খতিয়ে দেখার জন্য অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়কে দায়িত্ব দিয়েছে। তারা এ সংক্রান্ত তথ্য পেতে শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্র, সিঙ্গাপুর ও ইতালি থেকে বিভিন্ন মামলার নথিপত্র ও তদন্ত প্রতিবেদন পেতে শুরু করেছে। শিগগির আরও এক ডজন সাবেক মন্ত্রী-রাজনীতিকের সম্পর্কে তথ্য অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় পেতে পারে বলে জানা গেছে।
বাংলাদেশের সরকারি মোবাইল ফোন কোম্পানি টেলিটকের কাজ পাওয়ার জন্য সিমেন্স বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ঘুষ দেওয়ার বিষয়টির বিস্তারিত জানা যায় যুক্তরাষ্ট্রের একটি আদালতের কাগজপত্র থেকে। বিশ্বব্যাপী দুর্নীতির অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের ডিস্ট্রিক্ট অব কলম্বিয়ার ডিস্ট্রিক্ট কোর্টে সিমেন্স এজির বিরুদ্ধে মামলা হয়। এর মধ্যে সিমেন্স বাংলাদেশও রয়েছে। ডিস্ট্রিক্ট জজ রিচার্ড জে লিওনের আদালতে শুনানি চলাকালে মূল প্রতিষ্ঠান সিমেন্স এজি তাদের দোষ স্বীকার করে নেয় এবং ৪৪ কোটি ৮৫ লাখ ডলার শোধ করতে সম্মত হয়। এর মধ্যে সিমেন্স বাংলাদেশের মতো সিমেন্স আর্জেন্টিনা ও সিমেন্স ভেনিজুয়েলাও আছে। এরা প্রত্যেকে পাঁচ লাখ ডলার করে জরিমানা দিতে সম্মত হয়েছে।

তিন যুগ আগে মার্কিন কংগ্রেসে পাস হওয়া একটি আইনে বলা হয়েছে, বাইরের দেশে কাজ পেতে কোনো মার্কিন কোম্পানি ঘুষ দিতে পারবে না। সিমেন্স মূলত জার্মান কোম্পানি হলেও তা নিউইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জে নিবন্ধিত। সে কারণে সিমেন্স বাংলাদেশের বিরুদ্ধে "দ্য ফরেন করাপ্ট প্র্যাকটিসেস অ্যাক্ট-১৯৭৭" আইনে মামলা করে যুক্তরাষ্ট্র সরকার। এ মামলার বিবরণে টেলিটকের কাজ পেতে সিমেন্স কী ধরনের অসাধু পন্থা অবলম্বন করেছিল, তার বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। কলম্বিয়ার ডিস্ট্রিক্ট কোর্টে পেশ করা যুক্তরাষ্ট্র সরকারের প্রতিবেদন, ইতালির সরকারি কৌঁসুলির দপ্তর থেকে পাঠানো অনুরোধপত্র ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যসংবলিত প্রতিবেদন প্রথম আলোর হাতে এসেছে।

সম্প্রতি ইতালির সরকারি কৌঁসুলি প্রয়োজনীয় তথ্য পেতে বাংলাদেশ সরকারের কাছে সহযোগিতা চেয়ে অনুরোধপত্র পাঠায়। এটি পাঠানো হয় বাংলাদেশে অবস্থিত ইতালি দুতাবাসকে। সঙ্গে পাঠায় সিমেন্স নিযুক্ত মার্কিন ল ফার্ম দেবেভয়স অ্যান্ড প্লিমটনের তৈরি তদন্ত প্রতিবেদনের সংক্ষিপ্তসার। এ তদন্ত প্রতিবেদনেও কীভাবে কোকো ও অন্যদের সঙ্গে ঘুষের লেনদেন হয়েছে, তার বিস্তারিত বর্ণনা আছে। ইতালি দুতাবাস ওই সংক্ষিপ্তসারসহ অনুরোধপত্রটি এ মাসের শুরুতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। আর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ মাসের মাঝামাঝি তা পাঠিয়ে দেয় আইন মন্ত্রণালয় ও অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে।

ইতালির সরকারি কৌঁসুলি লরা পেডিও স্বাক্ষরিত ওই অনুরোধপত্রে বাংলাদেশের আদালতের হস্তক্ষেপও চাওয়া হয়েছে। আরও তথ্য পেতে অনুরোধ জানানো হয়েছে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের দিলকুশা শাখায় পরিচালিত সিমেন্স বাংলাদেশের ব্যাংক হিসাবসহ (হিসাব নম্বর ০১-২০০৫৩৪৪-০১) একই শাখায় পরিচালিত এই দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের হিসাব পরীক্ষা করার। পাশাপাশি তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করার এবং তাঁদের বাসায় তল্লাশি চালানোরও অনুরোধ করা হয়।

এ প্রসঙ্গে যোগাযোগ করা হলে পররাষ্ট্রসচিব মো. তৌহিদ হোসেন গত বৃহস্পতিবার প্রথম আলোর কাছে সিমেন্স বাংলাদেশের দুর্নীতিবিষয়ক একটি চিঠি পাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, "চিঠিটি এসেছে বাংলাদেশের ইতালি দুতাবাস থেকে। পাওয়ার পরই চলতি মাসের মাঝামাঝি একাধিক কপি করে তা আইন মন্ত্রণালয় ও অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।" তিনি বলেন, "এ নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কিছু করার নেই। যাদের কিছু করার আছে, তাদের কাছেই তা পাঠানো হয়েছে।"

অ্যাটর্নি জেনারেল সালাহউদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, এটি অত্যন্ত গোপনীয় বিষয়। এ নিয়ে কোনো আলোচনা বা মন্তব্য করতে রাজি নন তিনি।

প্রায় একই ধরনের মন্তব্য করেন আইনসচিব কাজী হাবিবুল আউয়াল। গত বৃহস্পতিবার যোগাযোগ করা হলে তিনিও এ বিষয়ে কোনো কথা বলতে চাননি।

যেভাবে জড়িত হলেন কোকো ও তৎকালীন টেলিযোগাযোগমন্ত্রী ব্যারিস্টার আমিনুল হক: সিমেন্স ২০০০ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমল থেকেই টেলিটক মোবাইল ফোন প্রকল্পের কাজ পেতে চেষ্টা চালায়। এ জন্য ফজলে সেলিম ও জুলফিকার আলী নামের দুজনকে পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ দেয় সিমেন্স বাংলাদেশ। ২০০১ সালের ২৭ মার্চ সিমেন্স ইতালির বাণিজ্য বিভাগের একজন কর্মকর্তা ওই দুই পরামর্শকের সঙ্গে একটি চুক্তি সই করেন। এতে বলা হয়, ফজলে সেলিম ও জুলফিকার আলীর বিভিন্ন প্রকল্পে ১৫ বছরের সফলতার ইতিহাস আছে। সার্বিকভাবে জটিল এ কাজে ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত দুই রাজনৈতিক দল, দরপত্র মূল্যায়ন কমিটিতে বিটিটিবির শীর্ষ থেকে নিম্নপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করতে হবে। এ কারণে তাঁরা পরামর্শক ফি সাধারণ কমিশনের তুলনায় বেশি চেয়েছেন। ওই বছরের ২৪ এপ্রিল সিমেন্স বাংলাদেশ ও সিমেন্স ইতালি ওই দুই পরামর্শকের সঙ্গে ব্যবসাসংক্রান্ত কাজের ব্যাপারে তাঁদের কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়ে জানায়। সে সময় তাঁদের সঙ্গে মৌখিকভাবে চুক্তি হয় যে প্রকল্পের অর্থের মধ্যে ১০ শতাংশ তাঁদের দেওয়া হবে। যুক্তরাষ্ট্রে মামলার নথিতে এসব তথ্য দেওয়া আছে। এতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নাম সরাসরি না দিয়ে প্রতীকী শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। তবে ইতালির দেবেভয়স অ্যান্ড প্লিমটনের প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্টদের নাম সরাসরি এসেছে। বিটিসিএলের কর্মকর্তারাও তাঁদের পরিচয় নিশ্চিত করেছেন।

বিটিটিবির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার আগে টেলিটক প্রকল্পটির জন্য তিনবার খোলা দরপত্র আহ্বান করা হয় এবং তিনবারই অংশ নেয় সিমেন্স বাংলাদেশ। এতে অংশ নিয়ে কারিগরি অযোগ্যতার কারণে বাদ পড়ে সিমেন্স। পরবর্তী সময়ে পুরো প্রক্রিয়াটিই অবশ্য বাতিল করা হয়। দ্বিতীয়বার ২০০১ সালে দরপত্র আহ্বান করা হলে তালিকায় নাম ওঠে সিমেন্সের। কিন্তু সদ্য ক্ষমতায় বসা তৎকালীন চারদলীয় জোট সরকার তা বাতিল করে দেয়। অর্থের পরিমাণ পরিবর্তন ও সরবরাহকারীর সংখ্যা কমিয়ে দিয়ে তৃতীয় দরপত্র আহ্বান করা হয় ২০০২ সালে। কিন্তু ২০০২ সালের ১৮ ডিসেম্বর সিমেন্স ওই দরপত্রে যথাযথভাবে সনদ দেখাতে না পারায় অকৃতকার্য হয়।

মার্কিন আদালতে মামলার নথিতে বলা হয়, পরদিন ১৯ ডিসেম্বর সিমেন্স বাংলাদেশের তৎকালীন বাণিজ্য বিভাগের প্রধান খালেদ শামস সিমেন্স ইতালির একজন কর্মকর্তার কাছে ই-মেইলে জানান, ওই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য ফজলে সেলিম ও জুলফিকারের কোনো ক্ষমতা নেই। এ ধরনের প্রকল্পের জন্য অবশ্যই শীর্ষ রাজনৈতিক নেতা, মন্ত্রণালয় এবং বিটিটিবির শীর্ষ ও কারিগরি ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ থাকতে হবে। ওই দুই পরামর্শকের সঙ্গে টেলিযোগাযোগমন্ত্রীর ভালো যোগাযোগ নেই।

এ সময় মিজানুর রহমান নামের এক ব্যক্তিকে তৃতীয় পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ দেয় সিমেন্স বাংলাদেশ। তিনি তৎকালীন টেলিযোগাযোগমন্ত্রী ব্যারিস্টার আমিনুল হকের বেয়াই। সিমেন্সের বাণিজ্য বিভাগের তৎকালীন প্রধান খালেদ শামস (বর্তমানে নকিয়া সিমেন্স নেটওয়ার্ক বাংলাদেশের কান্ট্রি পরিচালক) তাঁকে এ অনুরোধ করেন। খালেদ শামস এ কথা মার্কিন তদন্তকারীদের বলেছেন। মামলার নথি থেকে জানা যায়, মিজানুর রহমান প্রথমেই নিজেকে মন্ত্রীর লোক বলে পরিচয় দেন এবং বলেন, দরপত্র বাতিল হলেও কাজটি তিনি সিমেন্সকে পাইয়ে দিতে পারবেন।

২০০৩ সালের শেষ দিকে ব্যারিস্টার আমিনুল হক বিটিটিবির প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বুঝিয়ে বাতিল দরপত্র সচল করতে সক্ষম হন বলে যুক্তরাষ্ট্রের মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে আরও বলা হয়েছে, মন্ত্রী এ সময় সিমেন্সের প্রস্তাব সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত কমিটিতে পাঠাতে বলেন। ২০০৪ সালের ২৬ জানুয়ারি ক্রয় কমিটি সিমেন্সের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। এ সময় ব্যারিস্টার আমিনুল হক খালেদ শামসকে জানান, তিনি সিমেন্সকে একটি ভালো অবস্থানে আনার জন্য বিষয়টি দেশের শীর্ষস্তরে নিয়ে যেতে চান।

মার্কিন আইন সংস্থার তদন্তে জানা যায়, ওই সময়ই আরাফাত রহমান কোকো নির্দিষ্ট কমিশনের (পারসেন্টেজ) বিপরীতে সিমেন্সকে ওই অবস্থা থেকে উদ্ধার করার জন্য খালেদ শামসের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। আর আর্থিক বিষয়টি সুরাহার জন্য তাঁরা যোগাযোগ করেন কোকোর প্রতিনিধি সাজিদ করিম নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে। সাজিদ করিম দরপত্রে অংশ নেওয়া চীনা কোম্পানি হুয়াইয়ের প্রতিনিধি হিসেবেও কাজ করেন বলে ইতালি সরকারের অনুরোধপত্রে জানানো হয়েছে। সিমেন্সের সঙ্গে হুয়াইও টেলিটক প্রকল্পের আংশিক কাজ পায়।
সব ধরনের নিয়মনীতি উপেক্ষা করে সিমেন্সের দরপত্র পাস হয় এবং ২০০৪ সালের ১৪ জুন বিটিটিবির সঙ্গে তাঁদের চুক্তি হয়। দরপত্র পাস হওয়ার খবরটি কোকোই প্রথম জানান খালেদ শামসকে।

মার্কিন আদালতের মামলার নথিতে বলা হয়েছে, ২০০৫ সালের মাঝামাঝি কোকো ও খালেদ শামসের মধ্যে কথা হয়। এ সময় কোকো তাঁকে প্রতিশ্রুত টাকা দেওয়া হয়নি বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। খালেদ ও সিমেন্সের নতুন প্রধান নির্বাহী রুডলফ ক্লিংক কোকোর সঙ্গে দেখা করে আশ্বস্ত করেন যে তাঁরা প্রতিশ্রুত অর্থ দেওয়ার ব্যাপারে আন্তরিক।

২০০৫ সালের সেপ্টেম্বরে পরামর্শক জুলফিকার আলী সিঙ্গাপুরে ইউনাইটেড ওভারসিজ ব্যাংকে (ইউওবি) কোকোর ব্যাংক হিসাবে এক লাখ ৮০ হাজার ডলার পাঠিয়ে দেন।

এ ব্যাপারে কথা বলার জন্য গত বৃহস্পতিবার দুপুরে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হয় খালেদ শামসের সঙ্গে। তখন তিনি বলেন, পরে কথা বলবেন। তখন থেকে গতকাল রোববার পর্যন্ত বারবার তাঁর সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হয়। তাঁর ফোনে রিং হলেও তিনি ফোন ধরেননি। এমনকি কথা বলার জন্য এসএমএস পাঠানো হলেও এর উত্তর দেননি।

সিঙ্গাপুরে কোকোর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও সিমেন্সের টাকা: সংশ্লিষ্ট একটি সুত্রে জানা গেছে, ২০০৪ সালের ১২ এপ্রিল সিঙ্গাপুরের এক নাগরিকের সহযোগিতায় কোকো ওই দেশে জেডএএসজেড ট্রেডিং অ্যান্ড কনসালটিং প্রাইভেট লিমিটেড নামে একটি কোম্পানি নিবন্ধন করেন এবং ইউওবি ব্যাংকে হিসাব খোলেন। সিঙ্গাপুরের ওই নাগরিকের সঙ্গে কোকোর পরিচয় করিয়ে দেন কিউসি শিপিংয়ের এক কর্মকর্তা। ব্যাংক হিসাবটি যৌথ হলেও তা থেকে অর্থ তোলার ক্ষমতা ছিল একমাত্র কোকোর। যুক্ত সই কিংবা এককভাবে চেকে কোকো সই করে অর্থ তুলতে পারতেন। সিঙ্গাপুরের ওই ব্যাংকে কোনো বিদেশি নাগরিকের হিসাব খোলার নিয়ম নেই। সে কারণেই ওই নাগরিকের সহযোগিতা নেন কোকো। সিঙ্গাপুরের ওই নাগরিকের বক্তব্য ইতিমধ্যে জমা পড়েছে অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসে।

লিখিত ওই বক্তব্যে জানা যায়, সিমেন্সের পরামর্শক জুলফিকার আলী ২০০৫ সালের ৬ অক্টোবর কোকোর ওই হিসাবে এক কোটি ২৬ লাখ টাকা (এক লাখ ৮০ হাজার মার্কিন ডলার) জমা করেন। এর আগে ওই ব্যাংক হিসাবে চায়না হার্বার ইঞ্জিনিয়ারিং নামে একটি প্রতিষ্ঠান ২০০৫ সালের ৬ মে ও ৩১ মে যথাক্রমে নয় লাখ ২০ হাজার ৯৮৬ এবং আট লাখ ৩০ হাজার ৬৫৬ সিঙ্গাপুরি ডলার জমা করে। ২০০৫ সালে চট্টগ্রামে কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান চায়না হার্বার ইঞ্জিনিয়ারিং।

১৮ ডিসেম্বর সংবাদ ব্রিফিংয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন−দুদক জানায়, সিঙ্গাপুর সরকার সে দেশের ব্যাংকে জমা কোকোর ১১ কোটি ৬৬ লাখ টাকা জব্দ করেছে। কোকোর জমা থাকা ও জব্দ করা টাকার বিশদ বিবরণ সিঙ্গাপুর সরকার বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষকে জানালে ওই অর্থের উৎসের ব্যাপারে দুদক অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু করেছে।
সুত্র জানিয়েছে, ২০০৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে কোকো সিঙ্গাপুরের ওই নাগরিককে জেডএএসজেডের নামে থাকা হিসাব বন্ধ করে ওই টাকা অন্য একটি ব্যাংকে জমা দিতে নির্দেশ দেন। ওই সময় ক্রেডিট ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাট কমার্শিয়াল (সিআইসি) নামে ফরাসি ব্যাংকের সিঙ্গাপুর শাখায় কোকোর টাকা স্থানান্তর করেন তিনি। তবে এবার ওই হিসাব কোকোর নামে নয়, ওই নাগরিকের নামেই করা হয়। এ সময় ২০ লাখ ১৩ হাজার ৪৬৭ দশমিক ৩৮ সিঙ্গাপুরি ডলার স্থানান্তর করা হয়। তবে গত বছরের নভেম্বরে তিনি ওই অর্থ আবারও আগের ব্যাংকে স্থানান্তর করেন বলে জানা যায়।

তবে সিঙ্গাপুরে জেডএএসজেড নামে কোম্পানি ছাড়াও ফারহিল কনসালটিং প্রাইভেট লিমিটেড নামে কোকোর আরেকটি কোম্পানির সন্ধান পাওয়া গেছে। সুত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশে টেলিফোন ব্যবসার জন্য দুবাইয়ের একটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে পরামর্শক হিসেবে কাজ করার জন্য ওই কোম্পানি খোলেন তিনি। ২০০৫ সালের ১৯ ডিসেম্বর ইউওবির অন্য একটি শাখায় সিঙ্গাপুরের ওই নাগরিককে হিসাব খুলতে নির্দেশ দেন কোকো। তবে এবার সিঙ্গাপুরের ওই ব্যক্তির নামেই হিসাব খোলা হয়। ২০০৬ সালের ১৭ ও ১৯ জানুয়ারি হিসাবটিতে যথাক্রমে এক লাখ ৪৯ হাজার ৯৮৮ ও এক লাখ নয় হাজার ৯৮৮ মার্কিন ডলার জমা পড়ে। হাবিবুর রহমান নামের এক ব্যক্তি দুবাই থেকে ওই টাকা জমা দেন। এরপর ২০০৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি কোকোর নির্দেশে সিআইসি ব্যাংকে ওই টাকা স্থানান্তর করেন।

কাজ পেতে সিমেন্সের ব্যয় ৩৭ কোটি টাকা: ২০০১ সালের মে থেকে ২০০৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত টেলিটক প্রকল্পের কাজ পেতে সিমেন্স অন্তত ৫৩ লাখ ৩৫ হাজার ৮৩৯ দশমিক ৮৩ মার্কিন ডলার বা ৩৭ কোটির বেশি টাকা ব্যয় করে। এ টাকা তিন পরামর্শক সাজিদ সেলিম, জুলফিকার আলী ও মিজানুর রহমানকে দেওয়া হয়। তাঁদের হাত ঘুরে টাকা চলে যায় প্রকল্পসংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিটিটিবির কর্মকর্তাদের কাছে। কিছু টাকা হাতে হাতে তুলে দেওয়া হয় বিটিটিবির কর্মকর্তা বা তাঁদের আত্মীয়দের হাতে।

২০০৩ সালের এপ্রিলে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সদস্য নাদির শাহ কোরেশীর কাছে ১০ হাজার ডলার, বিটিটিবির অপর এক কর্মকর্তার মেয়ের কাছে পাঁচ হাজার ডলার এবং মন্ত্রীর ভাগ্নের কাছে এক হাজার ডলার তুলে দেয় সিমেন্স। যুক্তরাষ্ট্রে দায়ের করা মামলার নথিতে এ বিষয়গুলোর সুস্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে। সিমেন্স তৃতীয় দরপত্রে সনদসংক্রান্ত ত্রুটির জন্য যে অকৃতকার্য হয়, তার থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য অর্থ দেওয়া হয় কোরেশীকে। ২০০২-এর শেষপ্রান্তে কিংবা পরের বছরের শুরুতে বিটিটিবির প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সদস্য ও বর্তমানে টেলিটকে কর্মরত ইউসুফ নিয়াজকে ১০ হাজার ডলারের বিনিময়ে পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় বলে মার্কিন আদালতের নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

একই সময়ে কোরেশীর অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে মূল্যায়ন কমিটির আরেক সদস্যকে সিমেন্স "প্রকৌশলী" হিসেবে নিয়োগ দেয়। ওই প্রকৌশলীর মেয়ের কাছে পাঁচ হাজার ডলার তুলে দেওয়া হয়। বিটিটিবির একাধিক সুত্র জানিয়েছে, ওই প্রকৌশলী চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে এখন আরেকটি সরকারি সংস্থায় জ্যেষ্ঠ পরামর্শক হিসেবে নিয়োজিত আছেন। ২০০৩ সালের ডিসেম্বরে মন্ত্রী ব্যারিস্টার আমিনুল হকের অনুরোধে তাঁর ভাগ্নেকে এক হাজার ডলার দিয়ে চুক্তি করে সিমেন্স।

যোগাযোগ করা হলে তৎকালীন বিটিটিবির পরিচালক (ক্রয়) নাদির শাহ কোরেশী (বর্তমানে বিটিসিএলের ইনফোবাহন প্রকল্পের পরিচালক) গত বৃহস্পতিবার প্রথম আলোকে জানান, সিমেন্স থেকে এক কানাকড়িও নেননি তিনি। প্রতিবেদনে ১২ হাজার ডলার গ্রহণকারী হিসেবে তাঁর নাম থাকার কথা জানানো হলে তিনি বলেন, সিমেন্সের লোকজন নিজেরা অর্থ খেয়ে হয়তো তাঁর নাম ঢুকিয়ে দিয়েছে।

প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সদস্য ইউসুফ নিয়াজ এখন টেলিটক বাংলাদেশ লিমিটেডের নেটওয়ার্ক পরিকল্পনা বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক। অর্থ গ্রহণের কথা অস্বীকার করে প্রথম আলোকে তিনি বলেন, "আমি যদি অবৈধভাবে সিমেন্স থেকে অর্থ গ্রহণ করে থাকি, তাহলে আমার তো জেল হওয়া উচিত।"

তৃতীয়বারের মতো দরপত্র বাতিল হলেও সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত কমিটিতে এ প্রকল্প উঠল কী করে বা ক্রয়সংক্রান্ত কমিটি অনুমোদন না করলেও শেষ পর্যন্ত তা পাস হলো কীভাবে−এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পাঁচ বছর আগের ঘটনা তিনি মনে করতে পারছেন না।

পরামর্শক ব্যয়ের সিংহভাগ অর্থ সরাসরি দেওয়া হয় তিন পরামর্শক ফজলে সেলিম, জুলফিকার আলী ও মিজানুর রহমানকে। মার্কিন আদালতে মামলার নথি থেকে জানা গেছে, সিমেন্স জানত ওই টাকার অংশ বা পুরো টাকা পরামর্শকদের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের কাছে দেওয়া হবে।

বিটিটিবির মোবাইল প্রকল্পের কাজ পাওয়ার পর সিমেন্স ২০০৬ সালের ২৩ মার্চ তিন পরামর্শক ফজলে সেলিম, জুলফিকার আলী ও মিজানুর রহমানের জন্য ক্যালিফোর্নিয়ার সানফ্রান্সিসকোতে সিমেন্সের ব্যাংক হিসাব থেকে ৮০ হাজার ডলার করে পাঠায়। এর আগে ২০০৪ সালের সেপ্টেম্বরে মিজানুর রহমান যুক্তরাষ্ট্রে যান এবং তাঁর হংকংয়ের একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে এই অর্থ জমা দেওয়া হয়। এর বাইরে তাঁদের বিভিন্ন সময়ে টাকা দেওয়া হয়।

দুর্নীতির অভিযোগে গত বছর গ্রেপ্তার হন আরাফাত রহমান কোকো। বর্তমানে সরকারের নির্বাহী আদেশে মুক্তি পেয়ে তিনি চিকিৎসার জন্য ব্যাংককে আছেন। সে জন্য এ ব্যাপারে কথা বলতে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

প্রথম আলো, ২২ ডিসেম্বর, ২০০৮